ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ এটি কি দোয়া, কোনো মুসলিমের মৃত্যুতে শুধু এটা পড়াই কি যথেষ্ট? নাকি আলাদাভাবে দোয়া করতে হবে?
প্রশ্ন: কোনো মুসলিম মারা গেলে আমাদের সমাজে অনেকেই কেবল ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি‘উন’ পড়ে ক্ষান্ত হন। আমার জানার বিষয় হলো—
১. এই আয়াতটি পাঠ করা কি আদৌ মাইয়েতের জন্য কোনো দোয়া?
২. মৃত ব্যক্তির জন্য কেবল এই বাক্যটি পাঠ করাই কি যথেষ্ট, নাকি তাঁর মাগফিরাতের জন্য আলাদাভাবে দোয়া করা জরুরি?
এ বিষয়ে সঠিক শরিয়তের নির্দেশনা জানিয়ে উপকৃত করবেন।
উত্তর: আল্লাহ তাআলা বলেন,
الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
“যাদের ওপর কোনো বিপদ আপতিত হলে তারা বলে, ‘নিশ্চয় আমরা আল্লাহরই এবং নিশ্চয় আমরা তাঁরই কাছে ফিরে যাব।’” [সূরা বাকারা: ১৫৬]
‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি‘উন’ মূলত কোনো দোয়া বা ক্ষমা প্রার্থনার বাক্য নয়; বরং এটি আল্লাহর কাছে বান্দার স্বীকারোক্তিমূলক বাক্য। এর সাধারণ অর্থ হলো—‘আমরা তো আল্লাহরই এবং তাঁর কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে।’
যেহেতু এখানে নির্দিষ্ট কারো জন্য রহমত বা মাগফিরাত চাওয়া হচ্ছে না বরং আল্লাহর মালিকানা ও তাঁর সিদ্ধান্তের প্রতি অনুগত থাকা প্রকাশ পাচ্ছে সেহেতু জীবনের কোনো প্রাণহানি, বিপদ-মসিবত, গবাদি পশুর মৃত্যু, ফল-ফসল কিংবা সম্পদের ক্ষতি—এমনকি কোনো অমুসলিমের মৃত্যুর সংবাদ শুনলেও এই বাক্যটি বলা জায়েজ। ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি‘উন’ পাঠ করার মাধ্যমে বিপদে ধৈর্য প্রকাশ পায় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয়। কিন্তু এটি নিজে মৃত ব্যক্তির জন্য মাগফিরাতের দোয়া নয়।
উম্মে সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি—
مَا مِنْ مُسْلِمٍ تُصِيبُهُ مُصِيبَةٌ فَيَقُولُ مَا أَمَرَهُ اللَّهُ: إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ، اللَّهُمَّ أْجُرْنِي فِي مُصِيبَتِي، وَأَخْلِفْ لِي خَيْرًا مِنْهَا، إِلَّا أَخْلَفَ اللَّهُ لَهُ خَيْرًا مِنْهَا
উচ্চারণ: মা মিন মুসলিমিন তুসিবুহু মুসিবাতুন ফাইয়াকুলু মা আমারাহুল্লাহ: ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন, আল্লাহুম্মাজুরনি ফি মুসিবাতি, ওয়া আখলিফ লি খাইরান মিনহা, ইল্লা আখলাফাল্লাহু লাহু খাইরান মিনহা
অর্থ: “যে মুসলিমের ওপর কোনো বিপদ আসে, আর সে আল্লাহর নির্দেশমতো বলে—ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন, হে আল্লাহ! আমার এই বিপদে আমাকে সওয়াব দাও এবং এর চেয়ে উত্তম কিছু দিয়ে এর ক্ষতিপূরণ করো—আল্লাহ তাকে অবশ্যই এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করবেন।” [সহিহ মুসলিম, ৯১৮] তাই কোনো মুসলিমের মৃত্যুতে শুধু এই আয়াত পড়ে চুপ থাকা যথেষ্ট নয়; বরং তাঁর জন্য রহমত ও মাগফিরাতের দোয়া করা উচিত। রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মৃতের জন্য বিশেষ দোয়া শিখিয়েছেন। যেমন—
মৃত ব্যক্তির জন্য বিশেষ দোয়া:
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ، وَعَافِهِ، وَاعْفُ عَنْهُ، وَأَكْرِمْ نُزُلَهُ، وَوَسِّعْ مُدْخَلَهُ، وَاغْسِلْهُ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرَدِ، وَنَقِّهِ مِنَ الْخَطَايَا كَمَا نَقَّيْتَ الثَّوْبَ الْأَبْيَضَ مِنَ الدَّنَسِ، وَأَبْدِلْهُ دَارًا خَيْرًا مِنْ دَارِهِ، وَأَهْلًا خَيْرًا مِنْ أَهْلِهِ، وَزَوْجًا خَيْرًا مِنْ زَوْجِهِ، وَأَدْخِلْهُ الْجَنَّةَ، وَأَعِذْهُ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَعَذَابِ النَّارِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফির লাহু ওয়ারহামহু, ওয়া আফিহি, ওয়া’ফু আনহু, ওয়া আকরিম নুজুলাহু, ওয়া ওয়াসসি মুদখালাহু, ওয়াগসিলহু বিল মায়ি ওয়াস সালজি ওয়াল বারাদ, ওয়া নাক্কিহি মিনাল খাতায়া কামা নাক্কাইতাস সাওবাল আবইয়াদা মিনাদ দানাস, ওয়া আবদিলহু দারান খাইরান মিন দারিহি, ওয়া আহলান খাইরান মিন আহলিহি, ওয়া জাওজান খাইরান মিন জাওজিহি, ওয়া আদখিলহুল জান্নাহ, ওয়া আইজহু মিন আজাবিল কাবরি ওয়া আজাবিন নার
অর্থ: “হে আল্লাহ! তুমি তাকে ক্ষমা করো, তার ওপর রহম করো, তাকে আফিয়াত দাও এবং তার গুনাহ মাফ করে দাও। তার মেহমানদারি উন্নত করো। তার কবর প্রশস্ত করো এবং তাকে পানি, বরফ ও শিশির দিয়ে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করো। তাকে গুনাহ থেকে এমনভাবে পরিষ্কার করে দাও যেমন সাদা কাপড়কে ময়লা থেকে পরিষ্কার করা হয়। তাকে তার বর্তমান ঘরের চেয়ে উত্তম ঘর দাও, তার পরিবারের চেয়ে উত্তম পরিবার দাও এবং তার স্ত্রীর চেয়ে উত্তম স্ত্রী দাও। তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাও এবং কবরের আজাব ও জাহান্নামের আজাব থেকে তাকে রক্ষা করো।” [সহিহ মুসলিম, ৯৬৩] অথবা রহমত ও মাগফিরাতের অন্য যেকোনো দোয়া পড়া যায়। এমনকি যদি কারো আরবি দোয়া মুখস্থ না থাকে তবে নিজ ভাষায়ও আল্লাহ তাআলার দরবারে মৃত ব্যক্তির পাপমোচন ও জান্নাত কামনায় দোয়া করলেও তা কবুল হবে, ইনশাআল্লাহ। এর পাশাপাশি, শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়া ও তাদের প্রতি সমবেদনা জানানো সুন্নত। এতে বিয়োগব্যথায় কাতর স্বজনদের মনে সাহস জাগে এবং তাদের ধৈর্য ধারণে উৎসাহিত করা যায়।
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।