বৃষ্টিপাতের সময় দোয়া করার সঠিক পদ্ধতি এবং বৃষ্টি, ঝড়ো হাওয়া ও বজ্রপাতের সময় সুন্নতি আমল ও দোয়া সমূহ:
প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:
১. বৃষ্টি বর্ষণের সময় কি দোয়া কবুল হয়?
২. বৃষ্টির সময় কীভাবে দোয়া করব?৩. বৃষ্টি বর্ষণ, বজ্রপাত এবং ঝড়ো হাওয়া প্রবাহের সময় কোন কোন দোয়া পাঠ করতে হয়?
৪. বৃষ্টি বর্ষণের সময় দুয়ার শুরুতে প্রথমে হামদ ও সালাত পড়ার পরে দোয়া করতে হবে নাকি সাধারণভাবে দোয়া করলেই যথেষ্ট হবে?
৬. এ সময় কি হাত তুলতে হবে নাকি হাত তোলা ছাড়া দোয়া করব?
৭. বৃষ্টিতে ভেজা কি সুন্নত?
━━━━━━━━━━━━━
হ্যাঁ, এই সময়টা দোয়া কবুলের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।
প্রখ্যাত সাহাবি সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
ثِنْتَانِ مَا تُرَدَّانِ: الدُّعَاءُ عِنْدَ النِّدَاءِ، وَتَحْتَ المَطَرِ
“দুটি মুহূর্তের দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না: আজানের সময়কার দোয়া এবং বৃষ্টি বর্ষণের সময়কার দোয়া।” [হাকিম, “মুসতাদরাক”, হাদিস নম্বর ২৫৩৪; আলবানি, সহিহুল জামি, হাদিস নম্বর ৩০৭৮]
বিশেষ কোনো প্রস্তুতির শর্ত নেই। ঘরে বা যেকোনো নিরাপদ স্থানে স্বাভাবিকভাবে দোয়া করা যায়। দুয়ার আদব হিসেবে শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা এবং নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি দুরুদ পাঠ করা উত্তম। (বিস্তারিত দেখুন ৫ নম্বরে)।
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন,
الدُّعَاءُ مَوْقُوفٌ بَيْنَ السَّمَاءِ وَالأَرْضِ لَا يَصْعَدُ مِنْهُ شَيْءٌ حَتَّى تُصَلِّيَ عَلَى نَبِيِّكَ
“দোয়া আসমান ও জমিনের মাঝামাঝি স্থানে থেমে থাকে। যতক্ষণ না তুমি তোমার নবির প্রতি দরুদ পাঠ কর ততক্ষণ তা থেকে কিছুই ওপরে ওঠে না।” [তিরমিজি, ২/২৮, হাদিস নম্বর ৪৮৬। এ হাদিসটি মাওকুফ হলেও মারফু হাদিসের হুকুমে]
ক) বৃষ্টি বর্ষণের সময়:
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বৃষ্টি দেখলে বলতেন,
اللَّهُمَّ صَيِّبًا نَافِعًا
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা সাইয়িবান না-ফিয়া।
অর্থ: “হে আল্লাহ, উপকারী বৃষ্টি বর্ষণ করুন।” [বুখারি, হাদিস নম্বর ১০৩২]
আবু দাউদের এক বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলতেন:
اللَّهُمَّ صَيِّبًا هَنِيئًا
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা সাইয়িবান হানিয়া।
অর্থ: “হে আল্লাহ, আনন্দদায়ক ও কল্যাণকর বৃষ্টি বর্ষণ করুন।” [আবু দাউদ, হাদিস নম্বর ৫০৯৯]
খ) বৃষ্টি প্রবল আকার ধারণ করলে ও ক্ষতিকর রূপ নিলে:
اللَّهُمَّ حَوَالَيْنَا وَلَا عَلَيْنَا، اللَّهُمَّ عَلَى الآكَامِ وَالظِّرَابِ، وَبُطُونِ الأَوْدِيَةِ، وَمَنَابِتِ الشَّجَرِ
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা হাওয়া-লাইনা ওয়ালা আলাইনা, আল্লা-হুম্মা আলাল আকা-মি ওয়ায যিরা-বি, ওয়া বুতুনিল আওদিয়াতি, ওয়া মানা-বিতিশ শাজার।
অর্থ: “হে আল্লাহ, আমাদের আশপাশে বর্ষণ করুন, আমাদের ওপর নয়।
হে আল্লাহ, টিলা-পাহাড়, উপত্যকা ও গাছপালা জন্মানোর স্থানে বর্ষণ করুন।” [বুখারি, হাদিস নম্বর ১০১৪]
গ) বৃষ্টি থামার পর:
مُطِرْنَا بِفَضْلِ اللَّهِ وَرَحْمَتِهِ
উচ্চারণ: মুতিরনা বিফাদলিল্লা-হি ওয়া রাহমাতিহ।
অর্থ: “আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতেই আমরা বৃষ্টিপ্রাপ্ত হয়েছি।” [বুখারি, হাদিস নম্বর ৮৪৬]
ঘ) ঝড় হাওয়া বা প্রবল বায়ু প্রবাহের সময়:
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, ঝড়ো হাওয়া বা তীব্র বাতাস প্রবাহিত হলে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এই দোয়া পড়তেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا وَخَيْرَ مَا فِيهَا وَخَيْرَ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَشَرِّ مَا فِيهَا وَشَرِّ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ
উচ্চারণ: আল্ল-হুম্মা ইন্নী আসআলুকা খাইরাহা, ওয়া খাইরা মা ফীহা, ওয়া খাইরা মা উরসিলাত বিহি; ওয়া আঊযু বিকা মিন শাররিহা, ওয়া শাররি মা-ফীহা, ওয়া শাররি মা উরসিলাত বিহি।
অর্থ: “হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে এর কল্যাণ, এতে যা আছে তার কল্যাণ এবং যে উদ্দেশ্যে একে পাঠানো হয়েছে তার কল্যাণ প্রার্থনা করছি। আর এর অনিষ্ট, এতে যা আছে তার অনিষ্ট এবং যে উদ্দেশ্যে একে পাঠানো হয়েছে তার অনিষ্ট থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাইছি।” [মুসলিম, হাদিস নম্বর ৮৯৯]
ঙ) বজ্রপাতের সময়:
আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.) বজ্রধ্বনি শুনলে কথাবার্তা বন্ধ করে সুরা রাদের ১৩ নম্বর আয়াতের এই অংশ পাঠ করতেন:
سُبْحَانَ الَّذِي يُسَبِّحُ الرَّعْدُ بِحَمْدِهِ وَالْمَلَائِكَةُ مِنْ خِيفَتِهِ
উচ্চারণ: সুবহা-নাল্লাযি ইউসাব্বিহুর রাদু বিহামদিহি ওয়াল মালা-ইকাতু মিন খিফাতিহ।
অর্থ: “পবিত্র সেই সত্তা, যাঁর প্রশংসাসহ তাসবিহ পাঠ করে বজ্র এবং তাঁর ভয়ে ফেরেশতারাও।” [সুরা রাদ: ১৩]
এরপর তিনি বলতেন:
إِنَّ هَذَا لَوَعِيدٌ شَدِيدٌ لِأَهْلِ الْأَرْضِ
উচ্চারণ: ইন্না হাযা লাওয়াঈদুন শাদিদুল লিআহলিল আরদ।
অর্থ: “নিশ্চয়ই এটি পৃথিবীবাসীর জন্য কঠোর সতর্কবাণী।” [বুখারি, আল আদাবুল মুফরাদ, হাদিস নম্বর ৭২৩; মালিক, মুয়াত্তা, হাদিস নম্বর ৩৬৪১, এই আমলটি সাহাবি থেকে মওকুফ সূত্রে বর্ণিত হলেও হুকুমগতভাবে তা মারফু]
দোয়ার অন্যতম আদব হলো, শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা করা অতঃপর নবির প্রতি দরুদ পাঠ করা। এরপর নিজের চাওয়া তুলে ধরা।
ফাদালা ইবনে উবাইদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এক ব্যক্তিকে আল্লাহর প্রশংসা বা দরুদ ছাড়াই সরাসরি দোয়া করতে শুনে বললেন:
إِذَا صَلَّى أَحَدُكُمْ فَلْيَبْدَأْ بِتَحْمِيدِ رَبِّهِ وَالثَّنَاءِ عَلَيْهِ، ثُمَّ يُصَلِّي عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، ثُمَّ يَدْعُو بَعْدُ بِمَا شَاءَ
“তোমাদের কেউ দোয়া করতে চাইলে প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা ও তাঁর গুনাগুন বর্ণনা করার মাধ্যমে শুরু করা উচিত, এরপর নবির প্রতি দরুদ পাঠের পর যা ইচ্ছা দোয়া করবে।” [তিরমিজি, হাদিস নম্বর ৩৪৭৬]
মোটকথা হামদ ও সালাত দিয়ে শুরু করা উত্তম ও সুন্নতসম্মত পদ্ধতি। কিন্তু কেউ যদি শুধু আম ভাবে “আল্লাহুম্মা সাইয়িবান নাফিয়া” পাঠ করে অথবা বা নিজের ভাষায় সরাসরি দোয়া করে তা-ও শুদ্ধ ও যথেষ্ট।
হাত তোলা দোয়ার একটি স্বীকৃত সুন্নত পদ্ধতি, বিশেষত ইসতিসকার (বৃষ্টি প্রার্থনার) দোয়ায় এর গুরুত্ব হাদিসে স্পষ্টভাবে এসেছে। আনাস (রা.) বর্ণনা করেন,
كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يَرْفَعُ يَدَيْهِ فِي شَيْءٍ مِنْ دُعَائِهِ إِلَّا فِي الِاسْتِسْقَاءِ، وَإِنَّهُ يَرْفَعُ حَتَّى يُرَى بَيَاضُ إِبْطَيْهِ
“নবি অন্য কোনো দোয়ায় এতটা হাত তুলতেন না, যতটা ইসতিসকার দোয়ায় তুলতেন; এমনকি তাঁর বগলের শুভ্রতা দেখা যেত।” [বুখারি, হাদিস নম্বর ১০৩১; মুসলিম, হাদিস নম্বর ৮৯৫]
তাই বৃষ্টির সময় সাধারণ দোয়া করার ক্ষেত্রে হাত তোলা-না তোলা উভয়টাই শরিয়ত সম্মত। তবে হাত তোলা অধিক উত্তম। তবে এক্ষেত্রে সম্মিলিত দোয়া করা অর্থাৎ একজন দোয়া করবে আর সবাই হাত তুলে আমিন আমিন বলবে তা শরিয়ত সম্মত নয়। অনুরূপভাবে বৃষ্টির সময় পঠিতব্য বিশেষ দোয়া (যেমন: আল্ল-হুম্মা সাইয়্যিবান নাফিয়া…) পড়ার সময় হাত উঠানোর প্রয়োজন নাই। কেননা তা সুন্নাহ দ্বারা সাব্যস্ত নয়।
বৃষ্টির পানি শরীরে লাগানো মুস্তাহাব। তবে তা দোয়া কবুলের কোনো শর্ত নয়।
আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
أَصَابَنَا وَنَحْنُ مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَطَرٌ، قَالَ: فَحَسَرَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثَوْبَهُ، حَتَّى أَصَابَهُ مِنَ الْمَطَرِ، فَقُلْنَا: يَا رَسُولَ اللهِ لِمَ صَنَعْتَ هَذَا؟ قَالَ: لِأَنَّهُ حَدِيثُ عَهْدٍ بِرَبِّهِ تَعَالَى
“আমরা রসুলুল্লাহর সঙ্গে ছিলাম। এমন সময় আমাদের ওপর বৃষ্টি পড়ল। রসুলুল্লাহ তাঁর কাপড় কিছুটা সরিয়ে নিলেন, যাতে বৃষ্টির পানি তাঁর গায়ে লাগে। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসুল, আপনি এমন কেন করলেন? তিনি বললেন, কারণ এটি সদ্য তার প্রভুর কাছ থেকে এসেছে।” [মুসলিম, হাদিস নম্বর ৮৯৮] [সূত্র: ইসলাম কিউএ, ফতোয়া নম্বর: ১৯৫০৮৫ এবং অন্যান্য]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।