আমরা প্রায়ই বক্তাদের মুখে একটি সুন্দর কাহিনি শুনি এবং তা সোশ্যাল মিডিয়া ও ইন্টারনেট জগতে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে আছে। তা হলো, জগৎ বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম আহমদ বিন হাম্বল এবং এক রুটিওয়ালার গল্প। এটি মূলত ইস্তেগফার বা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার ফজিলতে বর্ণনা করা হয়।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) ইলম অন্বেষণের উদ্দেশ্যে সফরে থাকাকালীন কোন এক দূরের শহরে একটি মসজিদে রাত কাটানোর মনস্থ করলেন। কিন্তু দারোয়ান তাঁকে চিনতে না পেরে মসজিদ থেকে বের করে দেন। পরে এক রুটিওয়ালা তাঁকে আশ্রয় দেন। সম্মানিত ইমাম গভীরভাবে লক্ষ্য করলেন যে, উক্ত রুটিওয়ালা কাজের ফাঁকে ফাঁকে সারারাত ইস্তিগফার করছেন। সকালে ইমাম আহমদ এর কারণ জানতে চাইলে রুটিওয়ালা বলেন, এই ইস্তিগফারের বদৌলতে তাঁর জীবনের সব দোয়া কবুল হয়েছে—শুধু একটি বাদে। আর তা হল, এই যুগের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস এবং ফকিহ ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলকে এক নজর দেখার দোয়া। তখন ইমাম নিজের পরিচয় দেন। এতে ইস্তিগফারের ফলাফল হিসেবে তার সারা জীবনের লালিত স্বপ্নটি বাস্তবায়িত হওয়ায় তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করলেন। কাহিনিটি প্রায়ই ইবনুল জাওযি (রহ.)-এর নামে বলা হয় এবং একজন প্রসিদ্ধ ওয়ায়েজের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পেয়েছে। (তিনি হলেন, সৌদি আরবের বিখ্যাত বক্তা মুহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান আল আরিফি।যিনি বর্তমানে সৌদি জেলে বন্দি রয়েছেন) কিন্তু বাস্তবে যাচাই করলে দেখা যায়, এই কাহিনি ইবনুল জাওযি (রহ.)-এর কোনো গ্রন্থে পাওয়া যায় না।
রুটিওয়ালার গল্পের কাছাকাছি একটি বর্ণনা ইবনুন নাজ্জার (রহ.) তাঁর ‘যাইলু তারিখি বাগদাদ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তবে সেখানে রুটিওয়ালা নয়; ইমাম আহমদ (রহ.) ও ইসহাক ইবনে রাহাওয়াইহ (রহ.)-এর মধ্যকার একটি ঘটনার কথা বলা হয়েছে।
আব্বাসিয় খলিফা আল মামুনের শাসনামলে ‘মিহনাহ’ (কুরআন সৃষ্টি বিতর্ক)-এর সেই কঠিন ও সংকটময় সময়ে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) যখন সফরে বের হন তখন তিনি ভাবলেন, তাঁর এই কঠিন বিপদের খবর পেয়ে খুরাসানের বিখ্যাত মুহাদ্দিস বন্ধুবর ইমাম ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ (রহ.) হয়তো সুদূর সফর অতিক্রম করে তাঁর সাথে দেখা করতে চলে আসবেন। পরম শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় বন্ধুকে এত বড় সফরের কষ্ট থেকে বাঁচাতে ইমাম আহমদ (রহ.) নিজেই তাঁর সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান। ইমাম ইসহাক বিন রাহওয়াইহ (রহ.)-ও বন্ধু ইমাম আহমদের বিপদের কথা শুনে তাঁকে সাহায্য করা বা তাঁর সাথে দেখা করার জন্য খুরাসান থেকে বাগদাদের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন! কিন্তু সফরকালে ‘রেই’ শহরে পৌঁছে ইমাম আহমদ এক মসজিদে প্রবেশ করেন। এমন সময় তীব্র মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। ইশার সালাতের পরে মসজিদের পাহারাদার বা দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা তাঁকে মসজিদ থেকে বের হয়ে যেতে বলে। কারণ তারা মসজিদ বন্ধ করে দেবে। ইমাম আহমদ রহ. বলেন, “এটি আল্লাহর ঘর এবং আমি আল্লাহর বান্দা।” কিন্তু তারা কড়া ভাষায় সাফ জানিয়ে দেয় যে, তাঁকে বের হতেই হবে। অন্যথায় পা ধরে টেনে বের করা হবে। পরিস্থিতি বুঝে ইমাম শান্তভাবে সালাম জানিয়ে মসজিদ থেকে বের হয়ে আসেন। বাইরে তখন প্রচণ্ড বৃষ্টি, বজ্রপাত ও বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। ঘোর অন্ধকারে তিনি বুঝতে পারছিলেন না কোথায় যাবেন। এমন সময় এক ব্যক্তি একটি বাড়ি থেকে বের হয়ে তাঁকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে ভাই, এই অসময়ে আপনি কোথায় যাচ্ছেন?” ইমাম বললেন, “আমি জানি না কোথায় যাচ্ছি।”
লোকটি তাঁকে নিজ ঘরে ডেকে নেন। তাঁর ভেজা কাপড় বদলে শুকনা পোশাক পরতে দেন এবং নামাজের জন্য পবিত্র হওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। এরপর একটি ঘরে বসিয়ে, যেখানে আগুনের উষ্ণতা ও খাবারের সুন্দর আয়োজন ছিল, তাঁকে আপ্যায়ন করেন।
আহারের পর লোকটি জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার বাড়ি কোথায়?” ইমাম উত্তর দিলেন, “বাগদাদে।” লোকটি পুনরায় প্রশ্ন করলেন, “আপনি কি আহমদ ইবনে হাম্বল নামের কাউকে চেনেন?” ইমাম আহমাদ রহ. জবাব দিলেন, “আমিই আহমদ ইবনে হাম্বল।”
তখন লোকটি আনন্দে ও বিস্ময়ে বলে উঠলেন, “আর আমিই ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ!” ইমাম যাহাবী (রহ.) তাঁর ‘সিয়ারু আ’লামিন নুবালা’ গ্রন্থে এই বর্ণনাটি উদ্ধৃত করে ইবনুল জাওযির দিকে সম্পর্কিত করেছেন। কিন্তু পরক্ষণেই একে মাউদু (জাল বা বানোয়াট) বলে মন্তব্য করেছেন। [সূত্র: ajurry com]
সুতরাং ‘ইমাম আহমদ বিন হাম্বল ও রুটিওয়ালার কাহিনি’ নামে যা ছড়িয়ে আছে তা ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। আর এর কাছাকাছি ‘ইমাম আহমদ বিন হাম্বল এবং ইমাম ইসহাক বিন রাহাওয়াইহ : এর নামে যে বর্ণনাটি বাস্তবে পাওয়া যায় তাও সহিহ সনদে প্রমাণিত নয় বরং জাল বা বানোয়াট বলে প্রমাণিত। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ
”হে ইমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।” [সুরা তাওবা:১১৯]
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ
”শোনা প্রতিটি কথা বলে বেড়ানোই একজন মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট।” [সহিহ মুসলিম, মুকাদ্দিমা]
তাই কোনো কাহিনি বা কোন কিছুর ফজিলত ছড়ানোর আগে তার সত্যতা যাচাই করা আমাদের অপরিহার্য দায়িত্ব। শুধু শোনা কথায় বিশ্বাস করে তা ছড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। আল্লাহ তৌফিক দান করুন ।আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।