সদকা নাকি উমরা কোনটা বেশি উত্তম

প্রশ্ন: যদি একই সাথে দুটি কাজ করা সম্ভব না হয় তবে উমরা করা উত্তম নাকি গরিব-অসহায়দের মাঝে দান-সদকা করা বেশি ভালো?
উত্তর: সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর পরিবারবর্গ ও সহচরদের ওপর। অতঃপর-
▪️ সদকা যদি ফরজ হয় (যেমন: জাকাত, মানত, মানত ভঙ্গের কাফফারা, কসম ভঙ্গের কাফফারা ইত্যাদি) তবে তা আদায় করা নফল উমরার চেয়ে নিঃসন্দেহে অনেক বেশি উত্তম। তবে সাধারণ নিয়মে নফল সদকার চেয়ে নফল হজ ও উমরা করা উত্তম। কারণ উমরার মাধ্যমে অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি শারীরিক ইবাদত—যেমন: তাওয়াফ, সাঈ, জিকির, সালাত ও তালবিয়ার মতো একাধিক ইবাদত একসাথে পালনের সুযোগ হয়।
▪️তবে যদি আপনার আশেপাশে এমন সমস্যাগ্রস্থ মানুষ থাকে যাদের‌ নিকট বেঁচে থাকার ন্যূনতম রসদ বা অবলম্বন নেই কিংবা আপনার নিজের নিকটাত্মীয়রা অভাব-অনটনে ভুগছে অথচ তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করার পাশাপাশি উমরা আদায় করবেন -এমন সমন্বয় করাও আপনার দ্বারা সম্ভব না হয়—তবে এই অবস্থায় অভাবগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই বেশি উত্তম।
– হানাফি মাজহাবের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কানজুদ দাকায়িক’-এ রয়েছে:
«حَجُّ النَّفْلِ أَفْضَلُ مِنَ الصَّدَقَةِ»
“সাধারণ দানের চেয়ে নফল হজ করা বেশি উত্তম।”[কানযুদ দাকায়িক]
– ইমাম মালেক (রহ.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, নফল হজ নাকি সদকা—কোনটি আপনার কাছে বেশি প্রিয়? তিনি জবাবে বলেন:
«الْحَجُّ، إِلَّا أَنْ تَكُونَ سَنَةُ مَجَاعَةٍ»
“হজ করাই উত্তম। তবে দেশ যদি দুর্ভিক্ষের মধ্য দিয়ে যায় তবে দান করা উত্তম।”[মওয়াহিবুল জলীল]
– শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) তার ‘আল ইখতিয়ারাত’ গ্রন্থে বলেছেন:
«وَأَمَّا إِذَا كَانَ لَهُ أَقَارِبُ مَحَاوِيجُ، فَالصَّدَقَةُ عَلَيْهِمْ أَفْضَلُ، وَكَذَا إِذَا كَانَ هُنَاكَ قَوْمٌ مُضْطَرُّونَ إِلَى نَفَقَتِهِ، فَأَمَّا إِذَا كَانَ كِلَاهُمَا تَطَوُّعًا، فَالْحَجُّ أَفْضَلُ، لِأَنَّهُ عِبَادَةٌ بَدَنِيَّةٌ مَالِيَّةٌ، وَكَذَا الْأُضْحِيَةُ وَالْعَقِيقَةُ أَفْضَلُ مِنَ الصَّدَقَةِ بِقِيمَةِ ذَلِكَ»
“কিন্তু কারও যদি অভাবগ্রস্ত আত্মীয়স্বজন থাকে তবে তাদের সাহায্য করাই বেশি উত্তম। একইভাবে যদি এমন লোকজন থাকে যে তারা তার আর্থিক সাহায্যের ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল তাহলেও তাদের দান করা উত্তম। আর যদি দুটিই সাধারণ নফল কাজ হয় (অর্থাৎ কেউ চরম বিপদে নেই) তবে হজ করাই উত্তম। কারণ এটি একই সাথে শারীরিক ও আর্থিক ইবাদত। ঠিক যেমন কুরবানি ও আকিকা করা অধিক উত্তম সেগুলোর মূল্য দান করে দেওয়ার চেয়ে।”[আল ইখতিয়ারাত]
– ইমাম শাওকানি (রহ.) ‘নাইলুল আওতার’ গ্রন্থে
«أَيُّ الأَعْمَالِ أَفْضَلُ؟ فَذَكَرَ الإِيمَانَ، ثُمَّ الْجِهَادَ، ثُمَّ الْحَجَّ»
“কোন আমলটি সবচেয়ে উত্তম? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইমানের কথা উল্লেখ করলেন, তারপর জিহাদ, এরপর হজের কথা।” [সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম] এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন:
«هُوَ حُجَّةٌ لِمَنْ فَضَّلَ حَجَّ النَّفْلِ عَلَى الصَّدَقَةِ»
“এটি সেই আলেমদের পক্ষে দলিল, যারা সাধারণ দানের চেয়ে নফল হজকে অগ্রাধিকার দেন।” [নাইলুল আওতার]
বর্তমান যুগে মুসলিম উম্মাহর বাস্তব পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, তীব্র সংকট ও অভাবের মুখে থাকা মানুষের সংখ্যা অগুনতি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বহু মুসলমান আজ খাদ্য, পানি ও বাসস্থানের মৌলিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে বারবার নফল উমরা বা হজ না করে সেই অর্থ বিপন্ন মানুষের সেবায় ব্যয় করা নিঃসন্দেহে বেশি সওয়াব ও অগ্রগণ্য।
والله أعلم
(আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন)
🔶 ইসলাম ওয়েব-এর আরেকটি ফতওয়ায় বলা হয়েছে, “ইসলামে বারবার হজ ও উমরা করার এবং একটির পর আরেকটি আদায় করার বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে। হাদিসে এসেছে, এটি মানুষের দারিদ্র্য দূর করে এবং গুনাহ মিটিয়ে দেয়। তিরমিজি, নাসায়ি ও ইবনে মাজাহ-তে বর্ণিত হাদিসে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«تَابِعُوا بَيْنَ الحَجِّ وَالعُمْرَةِ، فَإِنَّهُمَا يَنْفِيَانِ الفَقْرَ وَالذُّنُوبَ كَمَا يَنْفِي الكِيرُ خَبَثَ الحَدِيدِ وَالذَّهَبِ وَالفِضَّةِ، وَلَيْسَ لِلحَجَّةِ المَبْرُورَةِ ثَوَابٌ إِلاَّ الجَنَّةُ»
“তোমরা বারবার হজ ও উমরা পরপর আদায় করো। কারণ এ দুটো দারিদ্র্য ও গুনাহকে এমনভাবে দূর করে দেয়, যেভাবে কামারের হাপর লোহা, সোনা ও রুপার ময়লা দূর করে পরিষ্কার করে দেয়। আর কবুল হজের প্রতিদান তো জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।” [সহিহুল জামে]
এ ছাড়া আরও অনেক দলিল রয়েছে, যা হজের মর্যাদা, গুনাহ মাফের শক্তি এবং মর্যাদা বৃদ্ধির কথা প্রমাণ করে। সাধারণ নফল দান-সদকার চেয়ে হজ ও ওমরা আদায় করা বেশি উত্তম। তবে নিকটাত্মীয়দের মধ্যে যদি কেউ আর্থিক সংকটে থাকে তাহলে ভিন্ন কথা।” (অর্থাৎ সেক্ষেত্রে বারবার নফল হজ বা উমরা আদায় করার থেকে আর্থিক সংকটে নিপতিত ও বিপদগ্রস্ত এই মানুষগুলোর জন্য সাহায্য-সহযোগিতা করা অধিক উত্তম এবং এতে বেশি সওয়াব রয়েছে।)
💢 সারাংশ: সাধারণ ও স্বাভাবিক অবস্থায় নফল উমরা বা হজ করাই বেশি উত্তম। তবে যদি নিকটাত্মীয় বা আশেপাশের মানুষ চরম অভাব-অনটন বা সংকটে থাকে তখন উমরার চেয়ে তাদের মাঝে দান-সদকা করাই অধিক উত্তম। মহান আল্লাহ আমাদেরকে যথাসাধ্য গরিব-অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি অধিক পরিমাণে নফল ওমরা ও হজ আদায়ের তৌফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
Share: