নিম্নে লোবানের পরিচয় এবং তার স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন উপকারিতা উল্লেখ করার পর এ সংক্রান্ত বর্ণিত হাদিস ও আসার সমূহের সংক্ষিপ্ত তাহকিক পেশ করা হল:
❑ লোবান বা কন্দুর পরিচয়:
লোবান হলো, এক ধরণের সুগন্ধযুক্ত প্রাকৃতিক আঠা বা রজন, যা প্রধানত ‘বোসওয়েলিয়া’ (Boswellia) প্রজাতির গাছের ছাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। এটি দেখতে কিছুটা স্বচ্ছ পাথরের টুকরো বা স্ফটিকের মতো এটি অতি প্রাচীন একটি ঔষধি উপাদান। সাধারণত লোবান পুড়িয়ে সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ঘরবাড়িতে লোবান পোড়ালে এর সুগন্ধি ধোঁয়া বাতাসের দুর্গন্ধ দূর করার পাশাপাশি পরিবেশ জীবাণুমুক্ত রাখতে সাহায্য করে। এটি আগরবাতি এবং আতরেও ব্যবহৃত হয়। সাধারণত ওমান, ইয়েমেন, সোমালিয়া ও ভারতে ভালো জাতের লোবান পাওয়া যায়।
❑ লোবানের স্বাস্থ্যগত উপকারিতা:
• কফ ও সর্দি-কাশি উপশম: লোবানের বাষ্প বা নির্যাস বুক ও গলার জমে থাকা কফ পরিষ্কার করতে এবং হাঁপানি বা সর্দির অস্বস্তি কমাতে বেশ কার্যকর।
• বাতের ব্যথা ও প্রদাহ কমানো: এতে শক্তিশালী প্রদাহ রোধী (anti-inflammatory) উপাদান রয়েছে, যা হাড়ের জোড়ায় বাত বা প্রদাহজনিত ব্যথা উপশমে সাহায্য করে।
• মানসিক প্রশান্তি ও চাপ হ্রাস: এর প্রাকৃতিক সুগন্ধ মস্তিষ্কের স্নায়ুকে শিথিল করে, যা মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও অনিদ্রা দূর করতে বেশ সহায়ক।
• মুখের স্বাস্থ্য রক্ষা: লোবান চিবানোর অভ্যাস মুখের ভেতরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে, দুর্গন্ধ দূর করে এবং মাড়ি মজবুত রাখে।
• ত্বকের বার্ধক্য রোধ: লোবানের তেল বা নির্যাস ত্বকের বলিরেখা ও বয়সের ছাপ দূর করে ত্বককে সতেজ ও উজ্জ্বল রাখতে ব্যবহৃত হয়।
• পরিবেশ বিশুদ্ধিকরণ: ঘরবাড়িতে লোবান পোড়ালে এর সুগন্ধি ধোঁয়া বাতাসের দুর্গন্ধ দূর করার পাশাপাশি পরিবেশ জীবাণুমুক্ত রাখতে সাহায্য করে।
➧ উল্লেখ্য যে, লোবান ও ধূপ এক নয়। লোবান হলো নির্দিষ্ট গাছের প্রাকৃতিক সুগন্ধি আঠা, যা পোড়ালে ধূপের মতো সুগন্ধি ধোঁয়া দেয়। তাই সবাই একে ধূপ বললেও, বাজারের সাধারণ সব ধূপ খাঁটি লোবান নয়।
❑ লোবান খাওয়ার ব্যাপারে বর্ণিত হাদিস কি শুদ্ধ?
প্রশ্ন: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি কখনো বলেছেন:
أَكْلُ اللَّبَانِ يُورِثُ الْحِفْظَ وَيُذْهِبُ النِّسْيَانَ وَيَقْطَعُ الْبَلْغَمَ
“লোবান বা কন্দুর খাওয়া স্মরণশক্তি বাড়ায়, ভুলে যাওয়ার সমস্যা দূর করে এবং কফ বিনাশ করে”? এ কথাটি কি তাঁর থেকে সহিহ সূত্রে প্রমাণিত?
উত্তর: সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য, আর দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর। এরপর বক্তব্য হলো━ “আল মুজামুল ওয়াসিত” (২/৮১৪) গ্রন্থে লোবানের পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়েছে: “এটি সুগন্ধযুক্ত উদ্ভিদের একটি প্রজাতি, যা থেকে আঠা বা রজন নির্গত হয় এবং একে ‘কন্দুর’ বলা হয়।” আর আল্লামা ইবনে মুফলিহ আল হাম্বলি “আল আদাব আশ শারইয়্যাহ” (২/৪০৩) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, একে “হাসা লুবান” বা লোবানের কঙ্কর বা দানা’ও বলা হয়।
(লোবান বা কন্দুর যখন গাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় তখন এটি শুকিয়ে ছোট ছোট স্বচ্ছ দানা, পাথর বা স্ফটিকের টুকরোর মতো আকার ধারণ করে। দেখতে অনেকটা ছোট নুড়ি পাথরের মতো লাগার কারণেই একে আরবিতে “হাসা লোবান” বা লোবানের দানা বলা হয়ে থাকে।) হাদিসে এই গাছ বা উপাদানের কোনও উল্লেখ পাওয়া যায়নি। কোনও মুহাদ্দিস এর কোনও সনদ বর্ণনা করেননি এবং হাদিসের কোনও প্রামাণ্য গ্রন্থেই এর কোনও মূল বা সনদ আমাদের নজরে আসেনি। অবশ্য আব্দুল মালিক ইবনে হাবিব আল কুরতুবি (মৃত্যু: ২৩৮ হিজরি) খাদ্য ও চিকিৎসা ভিত্তিক তাঁর একটি ছোট গ্রন্থে (পৃষ্ঠা: ৪১) কোনও ধরনের সনদ বা সূত্র ছাড়াই এটি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন:
রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
“أكل اللبان يُورث الْحِفْظ وَيذْهب النسْيَان وَيقطع البلغم”
“লোবান খাওয়া স্মরণশক্তি বৃদ্ধি করে, ভুলে যাওয়া দূর করে এবং কফ দূর করে।” অতঃপর তিনি নিজেই এর ব্যাখ্যায় বলেছেন: “লোবান খাওয়া কফ দূর করে আর যে জিনিসই কফ দূর করে সেটিই ভুলে যাওয়া দূর করে এবং স্মরণশক্তি বাড়ায়।”
তবে হাদিস শাস্ত্রের মূলনীতি অনুযায়ী, কোনও বর্ণনাকে সহিহ বা গ্রহণযোগ্য প্রমাণ করার জন্য এ ধরনের বক্তব্য যথেষ্ট নয়। বরং এর সঠিক সনদ ও উৎস খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত এটি ঝুলন্ত বা ভিত্তিহীন কথাই থেকে যায়। যেহেতু কথাটি প্রমাণিত নয় তাই কারো পক্ষ থেকেই এটি হাদিস হিসেবে বর্ণনা করা বা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর চালিয়ে দেওয়া কিছুতেই জায়েজ নয়। কারণ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন:
“مَنْ يَقُلْ عَلَيَّ مَا لَمْ أَقُلْ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ”
“যে ব্যক্তি আমার পক্ষ থেকে এমন কোনও কথা বলে যা আমি বলিনি, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।” [সহিহ বুখারি: ১০৯]
আল্লাহু আলাম। (সবকিছু ভালো জানেন একমাত্র আল্লাহ)। [Islamqa info]
❑ লোবান সংক্রান্ত অন্যান্য হাদিসগুলো সংক্ষিপ্ত তাহকিক:
উপরে লোবানের ব্যাপারে একটি হাদিসের ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণের মতামত দেওয়া হয়েছে। নিম্নে আরও কয়েকটি হাদিস ও আসারের সংক্ষিপ্ত তাহকিক পেশ করা হলো:
✪ ১. ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর আসার:
“عليكم باللبانِ فإنه يمسحُ الحزنَ من القلبِ كما يمسحُ الأصبعُ العرَقَ عن الجبينِ وإنه يشدُّ القلبَ ويزيدُ في العقلِ ويُذَكِّي الذهنَ ويجلو البصرَ ويُذهبُ النسيانَ”
“তোমরা লোবান ব্যবহার করো; কেননা তা হৃদয় থেকে দুশ্চিন্তা দূর করে, যেভাবে আঙুল কপাল থেকে ঘাম মুছে ফেলে। এটি হৃদয়কে মজবুত করে, বুদ্ধিমত্তা বাড়ায়, মেধা তীক্ষ্ণ করে, দৃষ্টিশক্তি পরিষ্কার করে এবং ভুলে যাওয়া দূর করে।”
➧ এ হাদিসটি দুর্বল। কারণ এর সনদে মুহাম্মদ ইরাহিম ইবনে আমর ইবনে ইউসুফ রয়েছেন। মুহাদ্দিস ইবনে মানদাহ বলেছেন, “তিনি মুনকার বা আপত্তিকর হাদিস বর্ণনা করতেন।”
আর আলি ইবনে যানজওয়াইহ তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, “আমি তাঁকে চিনি না।” [ইবনে ইরাক আল কিনানি, তানজিহুশ শারিয়াহ ২/২৬২]
✪ ২. আলি রা.)-এর উক্তি: (জইফ বা দুর্বল)
“عليكم باللبان فإنه يشجع القلب ويذهب بالنسيان”
“তোমরা লোবান ব্যবহার করো; কেননা তা হৃৎপিণ্ডকে সবল করে এবং বিস্মৃতি বা ভুলে যাওয়ার সমস্যা দূর করে।”
➧ এটিও দুর্বল। এই উক্তটি আবু নুয়াইম তার আত ত্বিব্বুন নব্বীতে দু জায়গায় বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তার উল্লেখিত সনদও দুর্বল (মুনকার)। এতে সুলাইমান ইবনে সালমাহ ও ইয়াহইয়া বিন সাঈদ আল আত্তার-এর মতো দুর্বল ও মাতরূক রাবি (মুহাদ্দিসগণের নিকট পরিত্যক্ত ও অগ্রহণযোগ্য বর্ণনাকারী) রয়েছেন। এর আরেকটি সনদও রয়েছে। কিন্তু সেটাও দুর্বল।
৪. আলি (রা.) এর নামে লুবানের তেল মালিশ সংক্রান্ত বর্ণনা: (জাল বা বানোয়াট)
“ادَّهِنوا بالِّلبانِ فإنه أحظى لكم عند نسائِكم”
“তোমরা লোবান দ্বারা তেল মালিশ করো। কেননা এটি স্ত্রীদের কাছে তোমাদের আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।”
➧ এই বর্ণনাটি মউজু বা জাল। এটি আহলে বাইত (আলি রা. এর) নামে মিথ্যাচার। এর শায়েখ বা বর্ণনাকারীগণ অপরিচিত। এর আদভী একজন কাযযাব বা মিথ্যুক বর্ণনাকারী। [ইবনুল কায়সারানি, যখিরাতুল হুফফাজ (১/২৬০]
সারাংশ: লোবান ঔষধি গুণ সম্পন্ন ও অত্যন্ত উপকারী বস্তু। কিন্তু এর উপকারিতা সম্পর্কে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে কোনও হাদিস বা কোনও সাহাবি থেকে এর সংক্রান্ত বিশুদ্ধ সূত্রে আসার সাব্যস্ত হয়নি।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।