গোপনীয়তা রক্ষা প্রসঙ্গে সালাফ ও মনিষীদের একগুচ্ছ অমূল্য বাণী

◈ ১. আলি ইবনে আবু তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন,
(سِرُّك أسيرُك، فإن تكَلَّمْتَ به صِرْتَ أسيرَه)
“তোমার গোপন কথাটি যতক্ষণ তোমার কাছে আছে ততক্ষণ সে তোমার বন্দি। কিন্তু যখনই তুমি তা বলে ফেলবে তখনই তুমি তার বন্দি হয়ে যাবে।”
[আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দ্বীন, পৃষ্ঠা নং ৩০৬]
◈ ২. মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.) বলেন,
(الحازِمُ مَن كَتَم سِرَّه مِن صديقِه؛ مخافةَ أن تُبَدَّلَ صداقتُه عَداوةً، فيُذيعَ سِرَّه)
“বিচক্ষণ সেই ব্যক্তি, যে তার বন্ধুর কাছ থেকেও নিজের গোপন কথা লুকিয়ে রাখে—এই ভয়ে যে বন্ধুত্ব একদিন শত্রুতায় পরিণত হতে পারে এবং সে তার গোপন কথা ফাঁস করে দিতে পারে।”
[আল মুওয়াশশা, পৃষ্ঠা নং ৪৭]
◈ ৩. মুআবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এবং তার ভাতিজা ওয়ালিদ ইবনে উতবার মধ্যকার একটি গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথন:
(يا أبتِ، إنَّ أميرَ المُؤمِنين أسَرَّ إليَّ حديثًا، وما أراه يطوي عنك ما بسَطه إلى غيرِك. قال: فلا تحَدِّثْني به؛ فإنَّ مَن كتَم سِرَّه كان الخيارُ إليه، ومَن أفشاه كان الخيارُ عليه. قال: فقُلتُ: يا أبتِ، وإنَّ هذا ليَدخُلُ بَيْنَ الرَّجُلِ وبَينَ ابنِه؟! فقال: لا واللهِ يا بُنَيَّ، ولكِنْ أحِبُّ ألَّا تُذَلِّلَ لسانَك بأحاديثِ السِّرِّ، قال: فأتيتُ مُعاويةَ فأخبَرْتُه. فقال: يا وَليدُ، أعتَقَك أخي من رِقِّ الخَطَأِ)
ওয়ালিদ: (পিতার কাছে এসে) হে আব্বাজান! আমিরুল মুমিনিন আমার কাছে একটি গোপন কথা বলেছেন। আমার মনে হয় না যে, তিনি আপনার কাছে এমন কোনো কথা গোপন রাখবেন যা তিনি অন্যের কাছে প্রকাশ করেছেন। (অর্থাৎ আমি চাইলে আপনাকে গোপন কথাটি বলতে পারি)।
ওয়ালিদের পিতা (উতবা): না বৎস, তুমি আমাকে সেই কথাটি বলো না। কারণ, যে ব্যক্তি নিজের গোপন কথা গোপন রাখে তার ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে। কিন্তু যে তা প্রকাশ করে দেয় বিষয়টি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং এর দায়ভার তার ওপরই বর্তায়।
ওয়ালিদ: আব্বাজান! পিতা ও পুত্রের সম্পর্কের মাঝেও কি এই রাখঢাক থাকতে পারে?
উতবা: আল্লাহর কসম, হে বৎস! বিষয়টি তেমন নয়। কিন্তু আমি চাই না যে তুমি তোমার জিহ্বাকে অন্যের গোপন কথা প্রকাশে অভ্যস্ত করে ফেলো (যাতে ভবিষ্যতে তোমার জিহ্বা শিথিল না হয়ে যায়)।
(পরবর্তীতে ওয়ালিদ ঘটনাটি তার চাচা আমিরুল মুমিনিন মুআবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে জানালেন)
মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু: হে ওয়ালিদ! আমার ভাই (উতবা) তোমাকে ভুলের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে দিয়েছেন। (অর্থাৎ তোমাকে গোপন কথা ফাঁসের মতো চারিত্রিক স্খলন ও বড় ধরনের ভুল থেকে রক্ষা করে সঠিক পথের দিশা দিয়েছেন।)
[আস সমত (৪০৭) এবং তারিখে দেমাশক ৩৮/২৭১]
◈ ৪. উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রাহ.) বলেন,
الْقُلُوبُ أَوْعِيَةُ الأَسْرَارِ، وَالشِّفَاهُ أَقْفَالُهَا، وَالأَلْسُنُ مَفَاتِيحُهَا، فَلْيَحْفَظْ كُلُّ امْرِئٍ مِفْتَاحَ سِرِّهِ
“অন্তর হলো গোপন কথার আধার, ঠোঁট হলো তার তালা এবং জিহ্বা হলো সেই তালার চাবি। সুতরাং প্রত্যেকের উচিত, তার নিজের গোপনীয়তার চাবিকাঠি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সংরক্ষণ করা।”
[আস সমত (৪০৭) এবং তারিখে দেমাশক ৩৮/২৭১]
◈ ৫. মুহাল্লাব ইবনে আবু সুফরা বলেন,
مَن ضاق قَلبُه اتَّسع لِسانُه
“যার অন্তর সংকীর্ণ তার জিহ্বা বিস্তৃত হয়ে যায় (অর্থাৎ সে আবোল-তাবোল বা অনর্থক কথা বেশি বলে)।” [আল মুওয়াশশা পৃষ্ঠা নং ৪৬]
◈ ৬. আবু হাতিম ইবনে হিব্বান বলেন,
مَنْ حَصَّنَ بِالْكِتْمَانِ سِرَّهُ تَمَّ لَهُ تَدْبِيرُهُ، وَكَانَ لَهُ الظَّفَرُ بِمَا يُرِيدُ، وَالسَّلامَةُ مِنَ الْعَيْبِ وَالضَّرَرِ، وَإِنْ أخطأَه التَّمَكُّنُ وَالظَّفَرُ، وَالْحَازِمُ يَجْعَلُ سِرَّهُ فِي وِعَاءٍ، وَيَكْتُمُهُ عَنْ كُلِّ مُسْتَوْدَعٍ، فَإِنِ اضْطَرَّهُ الأَمْرُ وَغَلَبَهُ أَوْدَعَهُ الْعَاقِلَ النَّاصِحَ لَهُ؛ لأَنَّ السِّرَّ أَمَانَةٌ، وَإِفْشَاؤُهُ خِيَانَةٌ، وَالْقَلْبُ لَهُ وِعَاؤُهُ، فَمِنَ الأَوْعِيَةِ مَا يَضِيقُ بِمَا يُودَعُ، وَمِنْهَا مَا يَتَّسِعُ لِمَا اسْتُودِعَ
“যে ব্যক্তি গোপনীয়তা রক্ষার মাধ্যমে নিজের রহস্যকে সুরক্ষিত রাখে, তার পরিকল্পনা পূর্ণতা পায়, সে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সফল হয় এবং দোষ ও ক্ষতি থেকে নিরাপদ থাকে—এমনকি যদি সে সুযোগ বা বিজয় লাভে ব্যর্থও হয় (তবুও সে বিপদমুক্ত থাকে)।
একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি তার গোপন কথাকে একটি পাত্রে (অন্তরে) আবদ্ধ রাখে এবং তা গচ্ছিত রাখার মতো সবার কাছে প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকে। তবে যদি সে পরিস্থিতির কারণে বাধ্য হয়, তবে যেন কেবল এমন একজন বুদ্ধিমান ও কল্যাণকামী ব্যক্তির কাছে তা ব্যক্ত করে যে তাকে সঠিক পরামর্শ দিতে পারে। কারণ গোপন কথা হলো একটি আমানত, আর তা প্রকাশ করে দেওয়া হলো খিয়ানত (বিশ্বাসঘাতকতা)।
অন্তর হলো গোপন কথার পাত্র—কোনো পাত্র সংকীর্ণ হয়, কোনোটি আবার প্রশস্ত।”
[রওযাতুল উকালা পৃষ্ঠা নং ১৮৯]
◈ ৭. আবু হাতিম ইবনে হিব্বান আরও বলেন,
الإِفْرَاطُ فِي الاسْتِرْسَالِ بِالأَسْرَارِ عَجْزٌ، وَمَا كَتَمَهُ الْمَرْءُ مِنْ عَدُوِّهِ فَلا يَجِبُ أَنْ يُظْهِرَهُ لِصَدِيقِهِ، وَكَفَى لِذَوِي الأَلْبَابِ عِبَرًا مَا جَرَّبُوا! وَمَنِ اسْتُودِعَ حَدِيثًا فَلْيَسْتُرْ، وَلا يَكُنْ مِهْتَاكًا وَلا مِشْيَاعًا؛ لأَنَّ السِّرَّ إِنَّمَا سُمِّيَ سِرًّا؛ لأَنَّهُ لا يُفْشَى، فَيَجِبُ عَلَى الْعَاقِلِ أَنْ يَكُونَ صَدْرُهُ أَوْسَعَ لِسِرِّهِ مِنْ صَدْرِ غَيْرِهِ، بِأَلَّا يُفْشِيَهُ
“অযথা সব গোপন কথা বলে বেড়ানো এক ধরনের দুর্বলতা। মানুষ তার শত্রুর কাছে যা গোপন রাখে তা বন্ধুর কাছেও প্রকাশ করা উচিত নয়। বুদ্ধিমানদের জন্য তাদের অভিজ্ঞতাই শিক্ষা হিসেবে যথেষ্ট! যাকে কোনো কথা আমানত হিসেবে বলা হয়েছে, সে যেন তা ঢেকে রাখে; সে যেন গোপনীয়তা ভঙ্গকারী কিংবা রটনাকারী না হয়। কেননা গোপন বিষয়কে ‘গোপন’ এ কারণেই বলা হয় যে তা প্রকাশ করা যায় না। সুতরাং একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তির কর্তব্য হলো—অন্যের হৃদয়ের তুলনায় নিজের হৃদয়ে নিজের গোপন কথার জন্য অধিক প্রশস্ত স্থান রাখা, যাতে সে তা ফাঁস না করে দেয়।”
[রওযাতুল উকালা পৃষ্ঠা নং ১৯০]
৮. তিনি আরও বলেছেন,
الظَّفَرُ بِالْحَزْمِ، وَالْحَزْمُ بِإِجَالَةِ الرَّأْيِ، وَالرَّأْيُ بِتَحْصِينِ الأَسْرَارِ، وَمَنْ كَتَمَ سِرَّهُ كَانَتِ الْخِيَرَةُ فِي يَدِهِ، وَمَنْ أَنْبَأَ النَّاسَ بِأَسْرَارِهِ هَانَ عَلَيْهِمْ وَأَذَاعُوهَا، وَمَنْ لَمْ يَكْتُمِ السِّرَّ اسْتَحَقَّ النَّدَمَ، وَمَنْ اسْتَحَقَّ النَّدَمَ صَارَ نَاقِصَ الْعَقْلِ، وَمَنْ دَامَ عَلَى هَذَا رَجَعَ إِلَى الْجَهْلِ؛ فَتَحْصِينُ السِّرِّ لِلْعَاقِلِ أَوْلَى بِهِ مِنَ التَّلَهُفِ بِالنَّدَمِ بَعْدَ خُرُوجِهِ مِنْهُ، وَلَقَدْ أَحْسَنَ الَّذِي يَقُولُ: خَشِيتُ لِسَانِي أَنْ يَكُونَ خَؤُونَا، فَأَوْدَعْتُهُ قَلْبِي فَكَانَ أَمِينَا، فَقُلْتُ لِيَخْفَى دُونَ شَخْصِي وَنَاظِرِي، أَيَا حَرَكَاتِي كُنَّ فِيَّ سُكُونَا
“সফলতা আসে দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে, সংকল্প আসে চিন্তাশীল মতামতের মাধ্যমে, আর সঠিক মতামত আসে গোপনীয়তা রক্ষার মাধ্যমে। যে ব্যক্তি নিজের গোপন কথা গোপন রাখে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের চাবিকাঠি তার হাতেই থাকে। কিন্তু যে মানুষকে নিজের গোপন কথা বলে বেড়ায়, সে মানুষের কাছে তুচ্ছ হয়ে যায় এবং তারা তা ছড়িয়ে দেয়। যে ব্যক্তি গোপনীয়তা রক্ষা করতে পারে না, সে অনুশোচনার যোগ্য হয়; আর যে অনুশোচনার যোগ্য হয়, তার বুদ্ধি লোপ পায়। যে ব্যক্তি এই পথেই চলতে থাকে, সে শেষ পর্যন্ত মূর্খতায় ফিরে যায়। তাই বুদ্ধিমানের জন্য গোপন কথা প্রকাশ হয়ে যাওয়ার পর অনুতপ্ত হওয়ার চেয়ে আগে থেকেই তা সংরক্ষণ করা অনেক বেশি শ্রেয়।
কবি কতই না চমৎকার বলেছেন!
خَشِيتُ لِساني أن يكونَ خَؤونَا
فأودَعْتُه قلبي فكان أمينَا
فقُلتُ لِيَخفى دونَ شخصي وناظِري
أيا حَرَكاتي كُنَّ فيَّ سُكونَا
‘আমি আমার জিহ্বাকে বিশ্বাসঘাতক হওয়ার ভয় করেছিলাম,
তাই আমি কথাকে হৃদয়ে জমা রাখলাম—ফলে তা আমানতদার হয়ে রইল।
আমি মনে মনে বললাম, যেন তা আমার সত্তা ও দৃষ্টির আড়ালে লুকানো থাকে;
হে আমার প্রাণের স্পন্দন! তোমরা আমার ভেতরে নীরব হয়ে যাও (প্রকাশ পেয়ো না)।'” [রওযাতুল উকালা পৃষ্ঠা নং ১৯১]

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।

Share: