শ্যালিকা ও ভাবীর সাথে পর্দার বিধান ও বেপর্দা নারী সামনে এসে গেলে করণীয়

প্রশ্ন: নারীদের পাশাপাশি যেহেতু পুরুষদের ও মাহরাম নন-মাহরাম মেনে পর্দা করা ফরজ। তাই একজন পুরুষের ক্ষেত্রে তার স্ত্রীর বোন (শ্যালিকা) এবং ভাবী যেহেতু সেই পুরুষের জন্য নন-মাহরাম। এ ক্ষেত্রে একজন পুরুষ শ্বশুরবাড়িতে গেলে তার স্ত্রীর বোন কিংবা ভাবীর সাথে কি কথা বলতে পারবে? আর যেহেতু বাড়ির মহিলারা পরিপূর্ণ পর্দা করে না সেহেতু শ্বশুরবাড়ির মহিলারা সামনে পড়ে গেলে সালাম দিয়ে “কেমন আছেন” এসব কথা বলা কি জায়েজ হবে, নাকি সামনে পড়লেও মাথা নিচু করে এড়িয়ে যাওয়া একজন পুরুষের জন্য উত্তম হবে? বিস্তারিত জানাবেন।
উত্তর: ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, একজন পুরুষের জন্য তার শ্যালিকা এবং ভাবী ‘অস্থায়ী হারাম’ বা নন-মাহরামের অন্তর্ভুক্ত। তাদের সাথে পর্দার বিধান পালন করা ফরজ। নিম্নে আপনার প্রশ্নের আলোকে উত্তর প্রদান করা হল:
❑ শ্যালিকা ও ভাবীর সাথে কথা বলা:
একজন পুরুষ তার শ্যালিকা বা ভাবীর সাথে একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কথা বলা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়। তবে যদি বিশেষ প্রয়োজনে কথা বলতে হয় তবে সরাসরি দেখা না করে পর্দার আড়াল থেকে সংক্ষেপে এবং স্বাভাবিক কণ্ঠে, গাম্ভীর্য বজায় রেখে (ইচ্ছাকৃত কোমল বা আকর্ষণীয় ভঙ্গীতে নয়) প্রয়োজনীয় কথা বলা জায়েজ। এক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন কোনও প্রকার ফেতনা বা আকর্ষণ সৃষ্টি না হয় বা অন্তরে কোনও ধরণের লালসাকে স্থান দেওয়া যাবে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا نِسَاءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِّنَ النِّسَاءِ إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوفًا
“হে নবী-পত্নীগণ! তোমরা অন্য সাধারণ নারীদের মতো নও; যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তোমরা পরপুরুষের সাথে কোমল বা আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না; পাছে যার অন্তরে ব্যাধি আছে, সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা ন্যায়সংগত ও সদ্ভাবপূর্ণ কথা বলো।” [সূরা আহযাব: ৩২]
অধিকাংশ তাফসিরবিদের মতে, যখন নবী-পত্নীদের মতো পবিত্র চরিত্রের নারীদের জন্য এই সতর্কতা প্রয়োজন হয় তবে অন্য সাধারণ নারীদের জন্য এটি পালন করা আরও বেশি জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ।
মূলতঃ এই আয়াতটি মুসলিম নারীদের কথোপকথনের একটি মৌলিক নীতিমালা (Code of Conduct) নির্ধারণ করে দিয়েছে। প্রয়োজনবশত পরপুরুষের সাথে কথা বলতে হলে তা হতে হবে গম্ভীর, শালীন এবং আকর্ষণমুক্ত; যেন কোনো কুরুচিপূর্ণ ব্যক্তি কুমতলব পোষণ করার সুযোগ না পায়। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন:
إِيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلَى النِّسَاءِ. فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الأَنْصَارِ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَفَرَأَيْتَ الْحَمْوُ؟ قَالَ: “الْحَمْوُ الْمَوْت
“তোমরা (নন মাহরাম) নারীদের নিকট প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকো। একজন আনসারি সাহাবি প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রসুল! দেবরের (বা শ্যালক/নিকটাত্মীয়) ব্যাপারে আপনার মত কী? তিনি বললেন: দেবরাদি তো মৃত্যু সমতুল্য।” [সহিহ বুখারি: ৫২৩২ও সহিহ মুসলিম: ২১৭২]
এখানে ‘হামউ’ বলতে স্বামীর ভাই (দেবর) বা স্ত্রীর ভাই-বোন অর্থাৎ নিকটাত্মীয় নন-মাহরামদের বোঝানো হয়েছে। তাদেরকে মৃত্যুর সাথে তুলনা করার কারণ হলো, তাদের সাথে পর্দার শিথিলতার কারণে চারিত্রিক স্খলন বা ফেতনার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে।
❑ শ্বশুরবাড়িতে যদি মহিলারা পরিপূর্ণ পর্দা না করে এবং হঠাৎ সামনে কোনও বেপর্দা নারী এসে যায় তাহলে কী করণীয়?
এ ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত পদ্ধতি অবলম্বন করা কর্তব্য:
✦ যদি এমন পরিস্থিতি হয় যে, অপ্রত্যাশিতভাবে শ্বশুর বাড়িতে বেপর্দা নারীর মুখোমুখি হয়ে গেছেন তাহলে প্রথমত নজর পড়ার সাথে সাথে দৃষ্টি সরিয়ে নিতে হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ
“মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র। তারা যা করে নিশ্চয়ই আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত।” [সূরা নূর: ৩০]
✦ ফিতনার আশঙ্কা না থাকলে দৃষ্টি অবনত রেখে কেবল সালাম দিয়ে বা সামান্য কুশল বিনিময় করে দ্রুত সেখান থেকে সরে পড়তে হবে। তবে ফিতনার আশঙ্কা থাকে তাহলে সালাম ও কুশলাদি বিনিময় থেকেও বিরত থাকা আবশ্যক। পর্দার বিধান লঙ্ঘিত হচ্ছে এমন পরিবেশে অবস্থান না করাই একজন আত্মমর্যাবান মুত্তাকি পুরুষের জন্য নিরাপদ। সামাজিকতার দোহায় দিয়ে বা অপ্রয়োজনে সেখানে দাঁড়িয়ে অযথা দ্বীর্ঘ আলাপচারিতা ও গল্পগুজবে লিপ্ত হওয়া শোভনীয় নয়।
✦ জ্ঞাতব্য যে, একজন পুরুষ যখন এমন বেপর্দা নারীদের নিকটে নিজের পক্ষ থেকে কঠোরভাবে পর্দার বিধান মেনে চলবে তখন সেটি তাদের জন্যও একটি নীরব দাওয়াত হিসেবে কাজ করতে পারে।
✦ তাছাড়া অযথা কথা বলার মাধ্যমে শয়তান মনে কুমন্ত্রণা দেওয়ার সুযোগ পায়। তাই আল্লাহভীতি এবং নিজের আমল-আখলাক রক্ষার স্বার্থে যতটুকু সম্ভব দূরত্ব বজায় রাখাই ইসলামের শিক্ষা।
মোটকথা, আত্মমর্যাদাবান মুত্তাকি পুরুষের জন্য নিরাপদ হলো অপ্রয়োজনে পরনারীর সাথে মেলামেশা এড়িয়ে চলা এবং দৃষ্টি ও চরিত্রের পবিত্রতা রক্ষায় সর্বদা আল্লাহর ভয় অন্তরে রাখা। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সকল ফিতনা-ফ্যাসাদ থেকে হেফাজত করুন এবং ইসলামের বিধিবিধানগুলো মেনে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
Share: