রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আজান শোনার সময় মুয়াজ্জিনের অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
إِذَا سَمِعْتُمُ الْمُؤَذِّنَ فَقُولُوا مِثْلَ مَا يَقُولُ
“যখন তোমরা মুয়াজ্জিনকে আজান দিতে শুনবে তখন তিনি যা বলেন তোমরাও তাই বলো।” [সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম, আবু সাঈদ (রা.) থেকে বর্ণিত]
আর সহিহ মুসলিমে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
إِذَا سَمِعْتُمُ الْمُؤَذِّنَ فَقُولُوا مِثْلَ مَا يَقُولُ، ثُمَّ صَلُّوا عَلَيَّ فَإِنَّهُ مَنْ صَلَّى عَلَيَّ صَلَاةً وَاحِدَةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ بِهَا عَشْرًا، ثُمَّ سَلُوا اللَّهَ لِيَ الْوَسِيلَةَ…
“যখন তোমরা মুয়াজ্জিনকে (আজান দিতে) শুনবে তখন তিনি যা বলেন তোমরা তাই বলো।তারপর আমার উপর দরূদ পড়ো। কারণ যে আমার উপর একবার দরূদ পড়ে আল্লাহ তার উপর দশটি রহমত নাজিল করেন। তারপর আল্লাহর কাছে আমার জন্য ওয়াসিলা (জান্নাতের সুউচ্চ স্থান) চাও। যে আমার জন্য ওয়াসিলা চাইবে তার জন্য আমার শাফায়াত (সুপারিশ) অবধারিত হয়ে যাবে।” জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বুখারিতে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
مَنْ قَالَ حِينَ يَسْمَعُ النِّدَاءَ: اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ، وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ، آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ، وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودًا الَّذِي وَعَدْتَهُ إِلَّا حَلَّتْ لَهُ شَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ
“যে ব্যক্তি আজান শোনার সময় বলে: (আল্লাহুম্মা রব্বা হাযিহিদ দাওয়াতিত তাম্মাহ, ওয়াস সালাতিল ক্বয়িমাহ, আতি মুহাম্মাদানিল ওয়াসিলাতা ওয়াল ফাদিলাহ, ওয়াবআছহু মাক্বামাম মাহমূদানিল্লাযি ওয়াআত্তাহ)
অর্থ: “হে আল্লাহ! এই পরিপূর্ণ আহ্বান এবং প্রতিষ্ঠিত সালাতের আপনিই মালিক। মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে ‘ওয়াসিলা’ (জান্নাতের একটি বিশেষ মর্যাদা) ও উচ্চমর্যাদা দান করুন এবং তাঁকে সেই ‘মাকামে মাহমুদ’ বা প্রশংসিত স্থানে পৌঁছে দিন, যার ওয়াদা আপনি তাঁকে করেছেন।” —তার জন্য কিয়ামতের দিন আমার শাফায়াত অবধারিত হয়ে যাবে।” [সহিহ বুখারি]
والدرجة الرفيعة
(ওয়াদ দারাজাতার রাফীয়াহ-সুউচ্চ মর্যাদা)। কিন্তু এর কোনো ভিত্তি নেই। এটি কোনো বিশুদ্ধ বর্ণনায় নেই। মূলত ওয়াসিলা ও ফজিলতই উঁচু মর্যাদা। অর্থাৎ এটি তার ব্যাখ্যা।
আর হাদিসে শুধু:
الوسيلة والفضيلة
“আল ওয়াসিলতা আল ফাযীলাহ” আছে,
الدرجة الرفيعة
(ওয়াদ দারাজাতার রাফীয়াহ) নেই।
যখন মুয়াজ্জিন বলেন,
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ، أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّه
(আশহাদু আল্লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ, আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লা-হ)
তখন শ্রোতাও বলবে:
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ، أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ
(আশহাদু আল্লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ, আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লা-হ)
অথবা শ্রোতা বলবে:
وَأَنَا أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ
“ওয়া আনা আশহাদু আল্লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লা-হ)
এই শাহাদার পরে বলবে:
رَضِيتُ بِاللَّهِ رَبًّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا
(রদীতূ বিল্লাহি ….)
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) থেকে মুসলিমে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
مَنْ قَالَ حِينَ يَقُولُ الْمُؤَذِّنُ: أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ، أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَأَنَا أَشْهَدُ، رَضِيتُ بِاللَّهِ رَبًّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا؛ غُفِرَ لَهُ ذَنْبُهُ
“যে ব্যক্তি মুয়াজ্জিন যখন বলেন,
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ، أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ
(আশহাদু আল্লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ, আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ) তখন বলেন,
رَضِيتُ بِاللَّهِ رَبًّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا
(রদীতু বিল্লাহি রব্বা,
ওয়া বিল ইসলামে দ্বীনা
ওয়াবি মুহাম্মাদিন রসূলা)
অর্থ: আমি রব বা প্রতিপালক হিসেবে আল্লাহর প্রতি, দ্বীন বা জীবন বিধান হিসেবে ইসলামের প্রতি এবং রসুল বা আল্লাহর প্রেরিত দূত হিসেবে মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি সন্তুষ্ট) তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।” [সহিহ মুসলিম]
অন্য বর্ণনায় এসেছে, যখন মুয়াজ্জিন বলেন,
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ
(আশহাদু আল্লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহদাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহ)
অর্থ: “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নেই। তাঁর কোন অংশীদার নেই এবং আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রসুল।”
তখন তার গুনাহ সমূহ মাফ হয়ে যায়।
এ থেকে বোঝা যায়, শাহাদাতের সময় এই কথা বলা মুস্তাহাব।
অর্থাৎ মুয়াজ্জিনের সাথে সাথে বলবেন:
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ
“আশহাদু আল্লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ”
(দু বার)
أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ
“আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ।” (দু বার)
অথবা বলবেন:
وَأَنَا أَشْهَدُ…
“ওয়া আনা আশহাদু….”
তারপর বলবেন,
رَضِيتُ بِاللَّهِ رَبًّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا
“রাদীতু বিল্লাহি রব্বা,
ওয়াবিল ইসলামি দ্বীনা,
ওয়াবি মুহাম্মাদিন রাসুলা।”
এর সময় বলবেন:
لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
“লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।”
অর্থ: আল্লাহর শক্তি ছাড়া সৎকাজ করার কিংবা পাপ থেকে বাঁচার কোন শক্তি নাই।
(মুয়াজ্জিন যতবার বলবেন শ্রোতাও ততবার এটি বলবে)।
উমর (রা.) থেকে সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, যে এটি অন্তর থেকে বলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
শাহাদাতের সময় বলবেন,
رَضِيتُ بِاللَّهِ رَبًّا…
‘(রাদীতু বিল্লাহি রব্বা…)”
হাইআলা বলার সময় বলবেন,
لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
(লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ)।
আজান শেষ হলে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর উপর দরূদ পড়বেন। তারপর বলবেন:
اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ، وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ، آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ، وَابْعَثْهُ الْمَقَامَ الْمَحْمُودَ الَّذِي وَعَدْتَهُ
যেভাবে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নির্দেশ দিয়েছেন। আজান শোনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কেউ এর প্রতি যত্ন নেন না, যা বড় ক্ষতি। এতে অনেক ফজিলত রয়েছে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুন্নাত অনুসরণের তাওফিক দান করুন। আমিন। [উৎস: শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায রহ.-এর অফিসিয়াল ওয়েব সাইট-এর ‘ফাতাওয়া আর জামি আল কাবীর’ বিভাগ]
❑ রাদীতু বিল্লাহি রব্বান: আজানের মধ্যে কখন এই দোয়াটি পড়বে?
সৌদি আরবের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের সাবেক সদস্য এবং ইমাম মুহাম্মদ বিন সাউদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়াহ অনুষদের অধ্যাপক শাইখ ড. সা’দ বিন আব্দুল্লাহ আল-খাসলান বলেন,
رَضِيتُ بِاللَّهِ رَبًّا، وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولاً، وَبِالإِسْلاَمِ دِينًا» غُفِرَ لَهُ ذَنْبُهُ. (رواه مسلم)
” রদীতু বিল্লাহি রব্বান, ওয়াবি মুহাম্মাদিন রাসুলান, ওয়াবিল ইসলামি দিনান।”
(আমি আল্লাহকে রব হিসেবে, মুহাম্মাদ (সা.)-কে রাসুল হিসেবে এবং ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট।” এটি আজানের মধ্যে কোথায় পড়তে হব? আজান শেষে নাকি, মোয়াজ্জিন যখন বলবে ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ” তারপরে? তিনি বলেন, ”বিজ্ঞ আলেমদের মতে, এই দোয়াটি আজান শেষ হওয়ার পর পড়ার জন্য নয়। বরং মুয়াজ্জিন যখন দ্বিতীয়বার ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ বলা শেষ করবেন তখন বলতে হয়। মুয়াজ্জিন দ্বিতীয়বার যখন সাক্ষ্য শেষ করবেন তখন আপনিও সেই সাক্ষ্য দেবেন এবং সাথে সাথেই ওপরের এই দোয়াটি পড়বেন।” ”শায়খ বিন বাজ (রহ.) এবং শায়খ ইবনে উসাইমিন (রহ.) সহ অধিকাংশ সিনিয়র আলেম এই মতটিই প্রদান করেছেন। এটিই হলো এই বিশেষ জিকিরটি পড়ার সঠিক সুন্নাহসম্মত সময়।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এসোসিয়েশন, সৌদি আরব।