খ্রিস্টানদের ইস্টার সানডে কী? ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ভ্রষ্টতার জবাব এবং খ্রিস্টান ও অন্যান্য অমুসলিমদের উৎসবে অংশগ্রহণের বিধান:
✪ ইস্টার সানডে (Easter Sunday) কী?
শাব্দিক অর্থে ‘ইস্টার’ হলো বসন্ত বা ঊষার দেবীর নাম থেকে আসা শব্দ আর ‘সানডে’ হলো রবিবার। অর্থাৎ “বসন্তকালীন রবিবারের পুনরুত্থান উৎসব”। খ্রিষ্টানদের বিশ্বাস অনুযায়ী, যিশু খ্রিষ্টকে (ইসা আ.) ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করার তিন দিন পর তিনি অলৌকিকভাবে পুনরায় জীবিত হয়ে উঠেছিলেন। এই পুনরুত্থান দিবসটিকেই তারা ‘ইস্টার সানডে’ হিসেবে পালন করে। এটি তাদের কাছে পাপের বিরুদ্ধে জয় ও নতুন জীবনের প্রতীক।
✪ কখন পালন করা হয়?
প্রতি বছর ২১শে মার্চের পর যখন প্রথম পূর্ণিমা হয়। তার পরবর্তী রবিবার ইস্টার সানডে পালিত হয়। এই নিয়ম অনুযায়ী, ইস্টার সাধারণত ২২শে মার্চ থেকে ২৫শে এপ্রিলের মধ্যে যেকোনো একটি রবিবারে পড়ে।
❑ ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এই দিবসের ভ্রষ্টতা এবং তার জবাব:
ইসলামি শরিয়া অনুযায়ী, ইস্টার সানডে মূল ভিত্তিটি কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এর প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
✪ ১. ইসা (আ.)-এর মৃত্যু ও ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার দাবি খণ্ডন:
ইস্টার পালিত হয় ইসা (আ.)-এর মৃত্যুর পর পুনরুত্থানকে কেন্দ্র করে। কিন্তু কুরআন স্পষ্ট জানিয়েছে যে তাঁকে হত্যা বা ক্রুশবিদ্ধ করাই হয়নি। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَٰكِن شُبِّهَ لَهُمْ ۚ
“অথচ তারা তাকে হত্যা করেনি এবং ক্রুশবিদ্ধও করেনি; বরং তাদের জন্য (এক ব্যক্তিকে) তাঁর সদৃশ করা হয়েছিল।” [সূরা নিসা: ১৫৭]
✪ ২. তাঁকে সশরীরে আসমানে তুলে নেওয়া:
ইস্টারের বিশ্বাসের বিপরীতে ইসলাম বলে যে, আল্লাহ তাঁকে জীবিত অবস্থায় আসমানে তুলে নিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
بَل رَّفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ ۚ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا
“বরং আল্লাহ তাকে নিজের দিকে তুলে নিয়েছেন এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা নিসা: ১৫৮]
তবে ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, ইসা (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) কেয়ামতের পূর্বে বিশ্বব্যাপী চরম অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলতাময় পরিবেশে আল্লাহর হুকুমে পৃথিবীতে পুনগমন করবেন এবং রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আদর্শের আলোকে বিশ্বব্যাপী ইসলামি শাসন ব্যবস্থা ও শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করবেন এবং ন্যায়-ইনসাফ ভিত্তিক বিশ্ব গড়ে তুলবেন। পাশাপাশি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী ফিতনা বাজ দজ্জাল কে ধ্বংস করবেন।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন,
لَيَنْزِلَنَّ ابْنُ مَرْيَمَ حَكَمًا عَدْلاً…”
“অবশ্যই ইবনে মরিয়ম (ইসা আলাইহিস সালাম) একজন ন্যায়বিচারক শাসক হিসেবে অবতীর্ণ হবেন…।” [সহীহ বুখারি]
✪ ৩. আল্লাহর সন্তান ও অংশীদারিত্বের প্রতিবাদ:
ইস্টারের আকিদায় যিশুকে ‘ঈশ্বরের পুত্র’ (নাউযুবিল্লাহ) মনে করা হয়, যা ইসলামের তৌহিদ বা একত্ববাদের পরিপন্থী। মহান আল্লাহ বলেন,
لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ * وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ
“তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি। এবং তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।” [সূরা ইখলাস: ৩-৪]
✪ ৪. অন্যের পাপের বোঝা বহন না করা:
খ্রিষ্টানদের ধারণা যিশু মানুষের ‘আদি পাপের’ প্রায়শ্চিত্ত করতে জীবন দিয়েছেন। ইসলাম এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ
“কোনও বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝার ভার বহন করবে না।” [সূরা আনআম: ১৬৪]
✪ ৫. বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুকরণ:
ধর্মীয় বিষয়ে অন্য জাতির স্বতন্ত্র ইবাদত বা আকিদাগত উৎসব পালন করা ইসলামে নিষিদ্ধ। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُم
“যে ব্যক্তি যে জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করবে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে।” [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪০৩১]
সংক্ষেপে: ইসলামের দৃষ্টিতে ইস্টার সানডে একটি ভিত্তিহীন বিশ্বাস। যেহেতু ইসা (আ.) ক্রুশে মৃত্যুবরণই করেননি। তাই তাঁর পুনরুত্থানের বিষয়টি অবান্তর। একজন মুসলিমের জন্য ইসা (আ.)-কে আল্লাহর বান্দা ও রসুল হিসেবে বিশ্বাস করা অপরিহার্য কিন্তু তাঁর সাথে সম্পৃক্ত এই ধরণের বিজাতীয় ও আকিদা বিরোধী উৎসবে অংশ নেওয়া বা বিশ্বাস করা বৈধ নয়।
❑ খ্রিস্টান ও অন্যান্য অমুসলিমদের উৎসবে অংশগ্রহণের বিধান:
প্রশ্ন: জনৈক ভাই বলছেন: লক্ষ্য করা যায় যে, কিছু সংখ্যক মুসলমান খ্রিস্টানদের সাথে তাদের বড়দিন বা ‘ক্রিসমাস’-এ অংশগ্রহণ করে। এ বিষয়ে আপনার দিকনির্দেশনা প্রত্যাশা করছি।
উত্তর:
لَا يَجُوزُ لِلْمُسْلِمِ وَلَا لِلْمُسْلِمَةِ مُشَارَكَةُ النَّصَارَى أَوِ الْيَهُودِ أَوْ غَيْرِهِمْ مِنَ الْكُفَّارِ فِي أَعْيَادِهِمْ، بَلْ يَجِبُ تَرْكُ ذَلِكَ؛ لِأَنَّ (مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ)، وَالرَّسُولُ ﷺ حَذَّرَنَا مِنْ مُشَابَهَتِهِمْ وَالتَّخَلُّقِ بِأَخْلَاقِهِمْ.
فَعَلَى الْمُؤْمِنِ وَعَلَى الْمُؤْمِنَةِ الْحَذَرُ مِنْ ذَلِكَ، وَأَلَّا يُسَاعِدَ فِي إِقَامَةِ هَذِهِ الْأَعْيَادِ بِأَيِّ شَيْءٍ؛ لِأَنَّهَا أَعْيَادٌ مُخَالِفَةٌ لِشَرْعِ اللَّهِ، وَيُقِيمُهَا أَعْدَاءُ اللَّهِ، فَلَا يَجُوزُ الِاشْتِرَاكُ فِيهَا وَلَا التَّعَاوُنُ مَعَ أَهْلِهَا وَلَا مُسَاعَدَتُهُمْ بِأَيِّ شَيْءٍ، لَا بِالشَّايِ وَلَا بِالْقَهْوَةِ وَلَا بِأَيِّ شَيْءٍ مِنَ الْأُمُورِ كَالْأَوَانِي وَنَحْوِهَا.
وَأَيْضًا يَقُولُ اللَّهُ سُبْحَانَهُ: وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ [المائدة: 2].
فَالْمُشَارَكَةُ مَعَ الْكُفَّارِ فِي أَعْيَادِهِمْ نَوْعٌ مِنَ التَّعَاوُنِ عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ، فَالْوَاجِبُ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ وَعَلَى كُلِّ مُسْلِمَةٍ تَرْكُ ذَلِكَ، وَلَا يَنْبَغِي لِلْعَاقِلِ أَنْ يَغْتَرَّ بِالنَّاسِ فِي أَفْعَالِهِمْ، الْوَاجِبُ أَنْ يَنْظُرَ فِي الشَّرْعِ الْإِسْلَامِيِّ وَمَا جَاءَ بِهِ، وَأَنْ يَمْتَثِلَ أَمْرَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ، وَأَنْ لَا يَنْظُرَ إِلَى أُمُورِ النَّاسِ، فَإِنَّ أَكْثَرَ الْخَلْقِ لَا يُبَالِي بِمَا شَرَعَ اللَّهُ، كَمَا قَالَ اللَّهُ فِي كِتَابِهِ الْعَظِيمِ: وَإِنْ تُطِعْ أَكْثَرَ مَنْ فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ [الأنعام: 116]، قَالَ سُبْحَانَهُ: وَمَا أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِينَ [يوسف: 103].
فَالْعَوَائِدُ الْمُخَالِفَةُ لِلشَّرْعِ لَا يَجُوزُ الْأَخْذُ بِهَا وَإِنْ فَعَلَهَا النَّاسُ.
وَالْمُؤْمِنُ يَزِنُ أَفْعَالَهُ وَأَقْوَالَهُ وَيَزِنُ أَفْعَالَ النَّاسِ وَأَقْوَالَ النَّاسِ بِالْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ، بِكِتَابِ اللَّهِ وَسُنَّةِ رَسُولِهِ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ، فَمَا وَافَقَهُمَا أَوْ أَحَدَهُمَا فَهُوَ الْمَقْبُولُ وَإِنْ تَرَكَهُ النَّاسُ، وَمَا خَالَفَهُمَا أَوْ أَحَدَهُمَا فَهُوَ الْمَرْدُودُ وَإِنْ فَعَلَهُ النَّاسُ، رَزَقَ اللَّهُ الْجَمِيعَ التَّوْفِيقَ وَالْهِدَايَةَ.
কোনো মুসলিম পুরুষ বা নারীর জন্য খ্রিস্টান, ইহুদি বা অন্য কোনো কাফিরদের ধর্মীয় উৎসবে অংশগ্রহণ করা জায়েজ নয়; বরং তা বর্জন করা ওয়াজিব। কারণ, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের তাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করা এবং তাদের স্বভাব-চরিত্রে প্রভাবিত হওয়া থেকে সতর্ক করেছেন। হাদিসে এসেছে:
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ
“যে ব্যক্তি যে জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত গণ্য হবে।” [সহিহ আবু দাউদ-আলবানি, হাদিস নং ৪০৩১]
অতএব, মুমিন পুরুষ ও নারীদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত। এসব উৎসব উদযাপনে কোনোভাবেই সহযোগিতা করা যাবে না। কারণ এগুলো আল্লাহর শরিয়ত বিরোধী উৎসব এবং আল্লাহর শত্রুরা তা পালন করে। সুতরাং এতে অংশ নেওয়া, তাদের সাথে একাত্ম হওয়া বা কোনো প্রকার সাহায্য—যেমন চা, কফি বা থালাবাসন দিয়ে সহযোগিতা করাও জায়েজ নয়।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আরও বলেন:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
“তোমরা নেকি ও তাকওয়ার কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করো এবং গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।” [সূরা মায়িদা: ২]
কাফিরদের উৎসবে অংশগ্রহণ করা এক ধরনের গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করা। সুতরাং প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর কর্তব্য হলো এটি ত্যাগ করা। কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তির উচিত নয় মানুষের কাজ দেখে বিভ্রান্ত হওয়া। বরং কর্তব্য হলো, ইসলামি শরিয়ত ও এর বিধিবিধানের দিকে তাকানো এবং আল্লাহ ও তাঁর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদেশ পালন করা। অধিকাংশ মানুষ কী করছে সেদিকে তাকানো যাবে না। কারণ অধিকাংশ মানুষই আল্লাহর শরিয়তের পরোয়া করে না। যেমনটি মহান আল্লাহ তাঁর কিতাবে বলেছেন:
وَإِن تُطِعْ أَكْثَرَ مَن فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ
“আর যদি আপনি জমিনের অধিকাংশ মানুষের আনুগত্য করেন তবে তারা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে।” [সূরা আনআম: ১১৬]
তিনি আরও বলেন:
وَمَا أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِينَ
“আপনি যতই চান না কেন, অধিকাংশ মানুষই ইমান আনয়নকারী নয়।” [সূরা ইউসুফ: ১০৩]
অতএব, শরিয়ত বিরোধী কোনো প্রথা বা অভ্যাস গ্রহণ করা জায়েজ নয় যদিও মানুষ তা ব্যাপকভাবে করে থাকে। একজন মুমিন তার নিজের এবং মানুষের কথা ও কাজকে কুরআন এবং সুন্নাহর মানদণ্ডে পরিমাপ করবে। যা এই দুটির (বা যেকোনো একটির) অনুকূলে হবে তা গ্রহণ করা হবে—চাই মানুষ তা বর্জন করুক না কেন। আর যা এই দুটির পরিপন্থী হবে তা বর্জনীয়—চাই মানুষ তা পালন করুক না কেন। আল্লাহ সকলকে সঠিক পথ ও হিদায়েত দান করুন। আমিন। আল্লাহ সবচেয়ে জ্ঞানী।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
ফতওয়া প্রদানে: ইমাম আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ. (সাবেক প্রধান মুফতি, সৌদি আরব)।
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।