প্রশ্ন: অনেক মানুষ রোগ প্রতিরোধক ভ্যাক্সিন গ্রহণ করাকে পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্র মনে করে থাকেন। এটি কতটুকু সঠিক? কোনো ঔষধ বা ভ্যাক্সিনে ক্ষতিকর উপাদান আছে বলে প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও এমন অভিযোগ তোলা কি সংগত?
উত্তর: রোগ-ব্যাধির আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য আগাম ভ্যাক্সিন বা টিকা গ্রহণ করা জায়েজ। এতে শরিয়তের কোনো বাধা নেই। বরং রোগ হওয়ার পর চিকিৎসা করার চেয়ে রোগ হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা অধিক উত্তম। (prevention is better than cure) কোনো বিপর্যয় ঘটার পর তার ক্ষয়ক্ষতি সামলানোর চেয়ে তা থেকে বাঁচার জন্য আগাম সতর্কতা অবলম্বন করা যে শ্রেয়—এ বিষয়ে কোনো বিবেকবান মানুষের দ্বিমত থাকার কথা নয়। আমরা এই শিক্ষা স্বয়ং রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর জীবন থেকে লাভ করি। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
عَامِرِ بْنِ سَعْدِ بْنِ أَبِي وَقَّاصٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ “ مَنْ تَصَبَّحَ سَبْعَ تَمَرَاتِ عَجْوَةٍ مْ يَضُرُّهُ ذَلِكَ الْيَوْمَ سَمٌّ وَلاَ سِحْرٌ ”
“যে ব্যক্তি সকালে সাতটি আজওয়া খেজুর খাবে, সেদিন বিষ এবং যাদু তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।” [সহীহ বুখারী ও মুসলিম]। এই হাদিস এ তিনি আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছেন। এছাড়া তিনি সকাল-সন্ধ্যা, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এর পর এবং ঘুমানোর পূর্বে বিভিন্ন দোয়া ও জিকির শিক্ষা দিয়েছেন, যেন মানুষ জিন-শয়তান, যাদু এবং বদনজর থেকে রক্ষা পায়। এগুলোও মূলত আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। এমনকি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যুদ্ধে যাওয়ার পূর্বে শিরস্ত্রাণ ও বর্ম পরিধান করতেন যেন শত্রুর আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায়। এটি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার আগাম প্রস্তুতি। সীরাত বা নববী জীবনী অধ্যয়ন করলে আমরা এমন শত শত উদাহরণ খুঁজে পাব, যেখানে তিনি অসুখ-বিসুখ, দুর্ঘটনা ও বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছেন। সুতরাং যারা টিকা গ্রহণ করাকে তাকওয়া (আল্লাহভীতি), তাওয়াককুল (আল্লাহর ওপর ভরসা) কিংবা সবরের পরিপন্থী মনে করেন অথবা স্রেফ ষড়যন্ত্র বলে প্রচার করেন তারা মূলত ভুলের মধ্যে আছেন। তারা ইসলামের প্রকৃত মর্মবাণী বুঝতে সক্ষম হননি।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেছেন:
مَا أَنْزَلَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ دَاءً، إِلَّا أَنْزَلَ لَهُ دَوَاءً، عَلِمَهُ مَنْ عَلِمَهُ، وَجَهِلَهُ مَنْ جَهِلَهُ
“আল্লাহ তাআলা এমন কোনো রোগ অবতীর্ণ করেননি যার প্রতিষেধক তিনি সৃষ্টি করেননি। কেউ তা জানতে পেরেছে, আবার কেউ জানে না।” [মুসনাদ আহমাদ; ইমাম আলবানী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন]। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছিলেন সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠ মুত্তাকী ও তাওয়াককুলকারী। অথচ তিনি নিজে অসুস্থ হলে চিকিৎসা নিয়েছেন, অন্যদের উৎসাহিত করেছেন এবং আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে উম্মতকে হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়েছেন। তবে হ্যাঁ, যদি নির্দিষ্ট কোনো ঔষধ বা ভ্যাক্সিন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে এটি প্রমাণিত হয় যে, তা শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর—তবে তা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। কারণ, জেনে-বুঝে নিজের ধ্বংস বা ক্ষতি ডেকে আনা ইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
লিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।