লাইলাতুল কদর ও আমাদের প্রচলিত ধারণা

আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের মাঝে কেবল রমজানের সাতাশ তারিখের রাত জেগে ইবাদত করার এবং এই রাতেই শবে কদর হওয়ার একটি দৃঢ় ধারণা প্রচলিত রয়েছে। তবে এই ধারণা সুন্নাহর সাথে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ নয়। কারণ রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্দিষ্ট কোনো একটি রাতের পরিবর্তে শেষ দশকের রাতগুলোতে, বিশেষ করে বেজোড় রাতগুলোতে কদর তালাশ করতে নির্দেশনা দিয়েছেন। যেমন:
▪️আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
أُرِيتُ لَيْلَةَ الْقَدْرِ ثُمَّ أَيْقَظَنِي بَعْضُ أَهْلِي فَنُسِّيتُهَا فَالْتَمِسُوهَا فِي الْعَشْرِ الْغَوَابِرِ
“স্বপ্নে আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হয়েছিল। কিন্তু আমার পরিবারের জনৈক সদস্য আমাকে জাগিয়ে দেওয়ায় আমি তা ভুলে গিয়েছি। অতএব তোমরা তা রমজানের শেষ দশকে অনুসন্ধান করো।” [সহিহ বুখারি: ২০২৩]
▪️অন্য একটি হাদিসে তিনি বলেন,
الْتَمِسُوهَا فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ
“তোমরা শেষ দশকে এটি (লাইলাতুল কদর) অনুসন্ধান করো।” [সহিহ বুখারি: ২০২০]
– তবে অন্য হাদিসে শেষ দশকের বেজোড় রাত্রিগুলোতে তা অনুসন্ধানে নির্দেশনা এসেছে যেমন:
মা জননী আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِى الْوِتْرِ مِنَ الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ
“তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো।”
[সহিহ বুখারি: ২০১৭, সহিহ মুসলিম: ১১৬৯]
এ কারণে মুহাক্কিক আলিমগণ বলেন, রমজানের শেষ দশকের যেকোনো রাতেই তা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বেজোড় রাতগুলো অধিক সম্ভাবনাময়।
💠 এই বিষয়ে শাইখ বিন বাযের একটি ফতোয়া অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য:
তিনি একটি প্রশ্নের উত্তরে বলেন,
إذا تم الشهر، كل الليالي كلها محل ظن؛ لأنه في اللفظ الآخر: التمسوها في العشر الأواخر، وفي اللفظ الآخر: في الوتر من العشر الأواخر….. نعم عُيّنت له ﷺ ثم تلاحى رجلان فرفعت، وأخفي أمرها
“যদি মাস পূর্ণ হয় তবে শেষ দশকের প্রতিটি রাতই সম্ভাবনা রাখে। কারণ হাদিসের এক বর্ণনায় এসেছে:
«الْتَمِسُوهَا فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ»
“তোমরা শেষ দশকে এটি অনুসন্ধান করো।”
আবার অন্য বর্ণনায় এসেছে: «فِي الْوِتْرِ مِنَ الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ»
“শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে।”
হ্যাঁ, রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এটি নির্দিষ্টভাবে জানানো হয়েছিল, এরপর দুজন লোক বিবাদে লিপ্ত হওয়ায় সেই নির্দিষ্ট জ্ঞান উঠিয়ে নেওয়া হয় এবং বিষয়টি গোপন রাখা হয়।”
🔸শাইখকে আবার প্রশ্ন করা হয়, যদি মাস পূর্ণ হয় তবে কি বলা যাবে যে লাইলাতুল কদর শেষ দশকের রাতগুলোতে আছে?
উত্তরে তিনি বলেন,
تُرجى في الليالي كلها، والأوتار آكد، والأوتار معروفة: إحدى وعشرين وثلاث وعشرين، خمس وعشرون وسبع وعشرون وتسع وعشرون، وإذا نقص الشهر صار كلها أوتار
“শেষ দশকের প্রতিটি রাতেই এর আশা করা যায় তবে বেজোড় রাতগুলোতে সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
আর বেজোড় রাতগুলো হলো, একুশ, তেইশ, পঁচিশ, সাতাশ এবং উনত্রিশ। তবে মাস যদি উনত্রিশ দিনে শেষ হয় তখন সব রাতই বেজোড় হওয়ার অর্থাৎ কদর হওয়ার মতো শক্তিশালী সম্ভাবনা থাকে।
প্রশ্ন: এর কি কোনো আলামত বা চিহ্ন আছে?
উত্তর:
“উবাই ইবনে কাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) যেমনটি বলেছেন, এর পরবর্তী সকালের সূর্য হবে কিরণহীন। কারণ রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের এভাবেই জানিয়েছেন।” (শায়খ বিন বায রাহ.- এর ফতোয়া সমাপ্ত)।
উল্লেখ্য যে, অনেক সালাফ বা পূর্বসূরি আলেম সাতাশ তারিখের রাতটিকে লাইলাতুল কদর হওয়ার প্রবল সম্ভাবনাময় রাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে তা সুনিশ্চিত নয়; অর্থাৎ কদর এই রাতে হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। তাই মহিমান্বিত এই রাতটি পাওয়ার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো রমজানের শেষ দশকের প্রতিটি রাতেই ইবাদতের প্রচেষ্টা চালানো। যদি তা সম্ভব না হয় তবে কমপক্ষে বেজোড় পাঁচটি রাত জাগার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা উচিত।
আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
Share: