স্বামী ধনী হোক বা গরিব পিতা-মাতার সম্পত্তিতে মেয়ের উত্তরাধিকার তার শরিয়তসম্মত অধিকার

প্রশ্ন: স্বামী সম্পদশালী হওয়া সত্ত্বেও কোনো মেয়ে যদি পিতা-মাতার সম্পত্তিতে তার প্রাপ্য অংশ না ছাড়ে এবং বাবা-মায়ের অনুরোধ সত্ত্বেও নিজের হক দাবি করে তাহলে এটি কি নাজায়েজ হবে? এতে সে কি গুনাহগার হবে এবং বাবা-মায়ের কথা অমান্য করার কারণে আখিরাতে আল্লাহ তাআলা তাকে পাকড়াও করবেন কি?
🔸উত্তর: কোনো বিবাহিত মেয়ের স্বামী যত সম্পদশালী হোক না কেন পিতা-মাতার সম্পত্তিতে মেয়ের যে উত্তরাধিকার বা হক রয়েছে তাতে কোনো পরিবর্তন ঘটে না। তাই ওই মেয়ের জন্য তার প্রাপ্য অধিকার দাবি করা শরিয়তসম্মত। এতে সে মোটেও গুনাহগার হবে না। এমনকি পিতা-মাতা জীবিতাবস্থায় যদি মেয়েকে তাদের মৃত্যুর পর তার হক ছেড়ে দিতে বলেন (নাদাবি দেওয়ার নির্দেশ দেন) তবুও পিতা-মাতার এই নির্দেশ পালন করা আবশ্যক নয়। এর জন্য আল্লাহ তাআলা আখিরাতে তাকে পাকড়াও বা শাস্তি দেবেন না। কারণ কুরআনে আল্লাহ তাআলা পুরুষদের পাশাপাশি নারীদেরও মিরাসের অধিকার সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি বলেন:
لِّلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ مِمَّا قَلَّ مِنْهُ أَوْ كَثُرَ ۚ نَصِيبًا مَّفْرُوضًا
“পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষদের অংশ আছে এবং পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ আছে; তা অল্প হোক কিংবা বেশি। এ অংশ নির্ধারিত ফরজ।” [সূরা নিসা: ৭]
সুতরাং হকদার ব্যক্তি স্বেচ্ছায় তার প্রাপ্য হক না ছাড়লে মা-বাবা কিংবা অন্য কেউ তাকে তা ছাড়তে বাধ্য করতে পারে না; বাবা-মা ছাড়তে নির্দেশ দিলেও তা পালন করা আবশ্যক নয়। বরং এক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি করে নাদাবি নেওয়া সম্পূর্ণ অন্যায় ও জুলুম।
✪ অন্যায় আদেশে পিতা-মাতার আনুগত্য করা আবশ্যক নয়:
পিতা-মাতা যদি আল্লাহর নির্ধারিত কোনো ফরজের বিরুদ্ধে আদেশ করেন তবে তা মেনে চলা জায়েজ নয়। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
لَا طَاعَةَ فِي مَعْصِيَةٍ، إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوفِ
“আল্লাহর অবাধ্যতার কাজে কোনো আনুগত্য নেই; আনুগত্য কেবল সৎ ও ন্যায়সংগত কাজে।” [সহিহ বুখারি: ৭২৫৭, সহিহ মুসলিম: ১৮৪০]
মেয়েটি নিজের অধিকার দাবি করে কোনো গুনাহ করছে না। তাই তাকে নাদাবি দিতে বাধ্য করা পিতা-মাতা বা ভাইদের জন্য কোনোভাবেই বৈধ নয়। সুতরাং মেয়েটি নিজের শরিয়তসম্মত মিরাসি হক দাবি করার অধিকার রাখে; শরিয়তে এতে কোনো বাধা নেই। তবে হক ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ বা অনুরোধের প্রেক্ষাপটে পিতা-মাতা ও ভাই-বোনদের সাথে সম্পর্ক অটুট রাখতে নম্রতা ও প্রজ্ঞার সাথে বিষয়টি বুঝিয়ে বলা উচিত যে, এই হক আল্লাহর নির্ধারিত ফরজ বিধান; এর সাথে স্বামীর আর্থিক অবস্থার কোনো সম্পর্ক নেই। কোনো কারণে স্বামীর সাথে মনোমালিন্য হয়ে তালাক ঘটলে ভবিষ্যতে তার নিজের অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। আর সে আসলে অন্যায্য কিছু দাবি করছে না—এটা মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তার পাওনা। তবে হ্যাঁ, কোনো নারী যদি চান প্রয়োজন না থাকলে তিনি তার প্রাপ্য হক পুরোটা কিংবা আংশিক তার অন্যান্য গরিব উত্তরাধিকারীদের জন্য ছেড়ে দিতে পারেন। এতে তিনি সওয়াবের অধিকারী হবেন। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই কাউকে তার প্রাপ্য অংশ ছেড়ে দিতে বা নাদাবি দিতে বাধ্য করা যাবে না। কেউ এমনটি করলে সে গুনাহগার হবে। তার উচিত আল্লাহকে ভয় করা এবং প্রাপককে তার প্রাপ্য কোনো ধরনের দ্বিধা-সংকট ছাড়া নিঃশর্তভাবে প্রদান করা। আল্লাহু আলাম।
⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯
❑ ফতওয়া: মেয়ের তার বাবার ওয়ারিশি সম্পত্তি দাবি করার অধিকার আছে, সে গরিব হোক বা ধনী হোক:
প্রশ্ন: আমি বিবাহিতা এবং আমার স্বামী গরিব। তাঁর বেতন কম যা দিয়ে আমাদের সংসার চলে না। এমতাবস্থায় আমি কি আমার মৃত বাবার সম্পত্তি থেকে আমার ওয়ারিশি অংশ পরিবারের কাছে দাবি করতে পারি? আর আমার বাবার একটি বিল্ডিংয়ে যেভাবে অন্যান্য ওয়ারিশরা ভাড়া ছাড়াই থাকছেন, সেভাবে আমিও কি বিনা ভাড়ায় একটি ফ্ল্যাটে থাকার অধিকার রাখি?
ওয়ারিশরা হলেন: আমার মা, সাত বোন এবং দুই ভাই। বিল্ডিংয়ে থাকেন আমার মা, তাঁর স্বামী, আমার ভাইয়েরা এবং চার বোন। বাকি বোনেরা বিবাহিত এবং নিজেদের বাড়িতে থাকেন। আমি আমার স্বামীর সাথে ভাড়া বাসায় থাকি। কিন্তু স্বামীর বেতন কম হওয়ায় ভাড়া দিতে কষ্ট হয়। আমাকে জানাবেন কী করণীয়?
🔸 উত্তর: “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওপর, তাঁর পরিবার ও সাহাবিদের (রা.) ওপর। প্রশ্নকারী বোন, আপনার পিতার সম্পত্তি থেকে আপনার সম্পূর্ণ শরিয়তসম্মত অংশ দাবি করার অধিকার আপনার রয়েছে—আপনি গরিব হোন বা ধনী হোন—এতে কোনো পার্থক্য নেই। এটি পিতামাতার অবাধ্যতা বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা বলে গণ্য হবে না। আপনার পরিবারের উচিত, আল্লাহকে ভয় করা এবং প্রত্যেক ওয়ারিশকে তার শরিয়তসম্মত অংশ বুঝিয়ে দেওয়া। যে ওয়ারিশ মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া কোনো ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন তাঁর উচিত বাকি ওয়ারিশদের ভাড়া পরিশোধ করা—যদি না তারা স্বেচ্ছায় তা মাফ করে দেন। শুধু তাই নয়, অতীতের বছরগুলোর জন্যও আপনি আপনার প্রাপ্য ভাড়ার অংশ দাবি করতে পারেন। কারণ মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া প্রতিটি ফ্ল্যাট সমস্ত ওয়ারিশের যৌথ সম্পত্তি বলে বিবেচিত হয় এবং প্রত্যেকে তার শরিয়তসম্মত অংশ অনুযায়ী তাতে অংশীদার। কোনো একজন ওয়ারিশ সেখানে বসবাস করলেই বাকি ওয়ারিশদের অধিকার বাতিল হয়ে যায় না—তারা ভাড়া দাবি করার সম্পূর্ণ অধিকার রাখেন।”
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
Share: