প্রশ্ন: একজন নারীর বোনের স্বামী (দুলাভাই) তার মাহরাম নন। এ অবস্থায়━
১. বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া একজন নারী কি তার বোনের স্বামীর সাথে মুখ খোলা রেখে সামনাসামনি কথা বলতে পারবেন? এ বিষয়ে পর্দা ও কথাবার্তার শরয়ি বিধান কী?
২. প্রয়োজন ছাড়া তাঁর সাথে অডিও বা ভিডিও কলে কথা বলা এবং ভিডিও কলে পরস্পরকে দেখার হুকুম কী?
৩. ওই নারী যদি তাঁর বোনের স্বামীর সাথে কথা বলতে না চান তাহলে তাঁর বোন, মা বা পরিবারের অন্য কেউ কি তাঁকে চাপ প্রয়োগ বা মানসিক পীড়নের মাধ্যমে কথা বলতে বাধ্য করতে পারে?
কুরআন-হাদিস ও নির্ভরযোগ্য আলেমদের বক্তব্যসহ বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দিলে উপকৃত হব।
❑ ১. বোনের স্বামী বা দুলাভাইয়ের সামনাসামনি বসা এবং কথা বলার বিধান:
কোনও অবস্থাতেই বোনের স্বামী তথা ভগ্নিপতি বা দুলাভাইয়ের সামনে বেপর্দা অবস্থায় আসা অথবা মুখমণ্ডল খোলা রেখে সামনাসামনি বসা, খোশগল্প করা, হাসি-দুষ্টুমি, আড্ডাবাজি ইত্যাদি জায়েজ নয়। তবে নিতান্ত জরুরি প্রয়োজন হলে ভিন্ন কথা। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই পূর্ণ পর্দা বজায় রাখতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় আলাপচারিতা, হাসি-দুষ্টুমি ও ফিতনা সৃষ্টি করে এমন সব কিছু এড়িয়ে সংক্ষেপে কেবল প্রয়োজনীয় কথা বলতে হবে। কথা বলার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন ইচ্ছাকৃতভাবে কণ্ঠস্বর বা বাচন ভঙ্গি কোমল ও প্রলুব্ধকর না করা হয়।
✪ আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ ۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰ أَنْ يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ ۗ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا
“হে নবি! আপনি আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ ও মুমিনদের নারীদেরকে বলে দিন, তারা যেন নিজেদের চাদর নিজেদের ওপর টেনে নেয়। এটিই উপযুক্ত পদ্ধতি, যাতে তাদেরকে (পর্দানশীন ও শালীন নারী হিসেবে) চেনা যায় এবং তাদেরকে কষ্ট দেওয়া না হয়। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সুরা আল-আহযাব: ৫৯] উম্মুল মুমিনিন উম্মে সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “যখন আয়াতে হিজাব— (يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ) ‘তারা যেন তাদের চাদরের অংশ নিজেদের ওপর নামিয়ে দেয়’— অবতীর্ণ হলো তখন আনসার নারীরা এমন অবস্থায় বের হলেন, যেন তাঁদের শান্ত-স্থির ভঙ্গিমার কারণে মাথায় কাক বসে আছে এবং তাঁদের পরনে ছিল কালো রঙের চাদর।” [সুনানে আবু দাউদ, ৪১০১, সহিহ] [তাফসিরে ইবনে কাসির] ইমাম ইবনে জারির আত তাবারি এবং ইমাম ইবনে আবি হাতিম (র.) প্রমুখ মুহাদ্দিসগণও উম্মুল মুমিনিন উম্মে সালামা এবং আয়েশা (রা.) থেকে অনুরূপ বর্ণনা বিভিন্ন সনদে তাঁদের গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন, যা আয়াতে হিজাব অবতীর্ণ হওয়ার সময় সাহাবি-নারীদের (আনসার ও মুহাজির) আমল ও পর্দার ধরণকে স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে। যাহোক, উপরোক্ত আয়াতে নারীদের বহিরাগত ও নন মাহরাম পুরুষদের সামনে পর্দাবৃত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর বোনের স্বামী বা দুলাভাইও যেহেতু গায়রে মাহরাম সেহেতু তাঁর সামনেও এ বিধান প্রযোজ্য।
✪ আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
يٰنِسَآءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَاَحَدٍ مِّنَ النِّسَآءِ اِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِيْ فِيْ قَلْبِهٖ مَرَضٌ وَّقُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوْفًا
“হে নবি-পত্নীগণ! তোমরা সাধারণ নারীদের মতো নও। যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো, তবে পরপুরুষের সাথে কথা বলার সময় কণ্ঠে কোমলতা এনো না, যাতে যার অন্তরে ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়ে পড়ে। বরং ন্যায়সঙ্গত ও স্বাভাবিকভাবে কথা বলো। [সুরা আল-আহজাব: ৩২]
✪ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দেবর-দুলাভাইয়ের মতো নিকটাত্মীয়দের ব্যাপারেও বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন,
إِيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلَى النِّسَاءِ، فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الأَنْصَارِ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَفَرَأَيْتَ الْحَمْوَ؟ قَالَ: الْحَمْوُ الْمَوْتُ
“তোমরা পরনারীদের কাছে অবাধ যাতায়াত থেকে সতর্ক থাকো।” তখন এক আনসারি সাহাবি জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রসুল! দেবর-দুলাভাই সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?” তিনি বললেন, “দেবর তো মৃত্যুস্বরূপ” (অর্থাৎ তাদের সাথে নিয়ন্ত্রণহীন মেলামেশা ধ্বংসাত্মক—বাইরের মানুষ থেকেও বেশি)। [সহিহ বুখারি: ৫২৩২; সহিহ মুসলিম: ২১৭২]
✪ মাহরাম নয় এমন পুরুষের সাথে কোনও নারীর জন্য নির্জনে একাকী অবস্থান করাও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلاَّ كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ
“কোনও পুরুষ যেন পরনারীর সাথে নির্জনে অবস্থান না করে; কারণ তখন তাদের তৃতীয় জন হিসেবে শয়তান উপস্থিত হয়। [জামে তিরমিজি: ১১৭১]
زَوْجُ الْأُخْتِ لَيْسَ مِنْ مَحَارِمِ الْمَرْأَةِ، وَيُعْتَبَرُ أَجْنَبِيًّا عَنْهَا، لَا يَحِلُّ لَهَا أَنْ تَكْشِفَ وَجْهَهَا لَهُ، وَلَا تُصَافِحَهُ، وَلَا تَخْلُوَ بِهِ، وَلَا أَنْ تُسَافِرَ مَعَهُ، شَأْنُهُ شَأْنُ الرِّجَالِ الْأَجَانِبِ، لَكِنْ إِذَا جَلَسَتْ مَعَهُ مَعَ وُجُودِ مَحْرَمٍ مِنْ مَحَارِمِهَا وَمَعَ احْتِجَابِهَا وَتَسَتُّرِهَا وَتَحَفُّظِهَا فَلَا بَأْسَ
“বোনের স্বামী নারীর মাহরামদের অন্তর্ভুক্ত নন, বরং তিনি তার জন্য গায়রে মাহরাম হিসেবে গণ্য। তার সামনে মুখমণ্ডল উন্মুক্ত করা, তার সাথে মুসাফাহা (হাত মেলানো) করা, তার সাথে নির্জনে অবস্থান করা কিংবা তার সাথে সফর করা তার জন্য বৈধ নয়—অন্যান্য গায়রে মাহরাম পুরুষের ক্ষেত্রে যেমন বিধান, তার ক্ষেত্রেও তেমনি। তবে যদি তার কোনও মাহরাম উপস্থিত থাকা অবস্থায়, পূর্ণ পর্দা, আবরণ ও সতর্কতা বজায় রেখে সে তার সাথে বসে, তাহলে তাতে কোনও অসুবিধা নেই।” [ফাতাওয়াল লাজনাতিদ দায়িমাহ: ১৭/৪২০] এই ফতওয়া থেকে স্পষ্ট হয়, দুলাভাই বা ভগ্নিপতি শরিয়তের দৃষ্টিতে নন মাহরাম পুরুষ। সুতরাং তাঁর সাথে আচরণের ক্ষেত্রে অন্য যেকোনো গায়রে মাহরাম পুরুষের মতোই বিধান প্রযোজ্য হবে। তবে কেবল মাহরামের উপস্থিতিতে ও পূর্ণ পর্দা রক্ষা করে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলার অনুমতি রয়েছে।
❑ ২. অডিও-ভিডিও কলে কথা বলা ও পারস্পরিক দেখাদেখি করা:
বাস্তব জীবনে যা নিষিদ্ধ, ডিজিটাল বা অনলাইন যোগাযোগের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য। কোনও দ্বীনি বা পারিবারিক জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বোনের স্বামী বা দুলাভাইয়ের সাথে অডিও কলের মাধ্যমে খোশগল্পে লিপ্ত হওয়া কিংবা ভিডিও কলে মুখমণ্ডল উন্মুক্ত রেখে পরস্পরকে দেখাদেখি করা ও আড্ডা দেওয়া নিষিদ্ধ ও গুনাহের কাজ। কারণ এতে শয়তান ও কুপ্রবৃত্তি উভয়কে ফিতনার দিকে টেনে নেওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে।
✪ তাই তো আল্লাহ তাআলা পরপুরুষ ও পরনারী উভয়কেই দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দিয়ে বলেন:
قُلْ لِّلْمُؤْمِنِيْنَ يَغُضُّوْا مِنْ اَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوْا فُرُوْجَهُمْ ؕ ذٰلِكَ اَزْكٰى لَهُمْ ؕ اِنَّ اللّٰهَ خَبِيْرٌ بِمَا يَصْنَعُوْنَ
“মুমিন পুরুষদের বলে দাও, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটিই তাদের জন্য অধিক পবিত্র পন্থা। তারা যা করে, নিশ্চয় আল্লাহ সে সম্পর্কে পরিপূর্ণভাবে অবগত। [সুরা নুর: ৩০]
✪ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্যায় দৃষ্টি ও শ্রবণ সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন:
فَالْعَيْنَانِ زِنَاهُمَا النَّظَرُ، وَالأُذُنَانِ زِنَاهُمَا الاِسْتِمَاعُ
“চোখের জিনা হলো (অন্যায় ও হারাম) দৃষ্টিপাত করা আর কানের জিনা হলো (অন্যায় ও হারাম কথাবার্তা) শ্রবণ করা। [সহিহ মুসলিম: ২৬৫৭]
❑ ৩. কথা বলতে চাপ প্রয়োগ করলে:
কোনও ইমানদার নারী যখন আল্লাহর নির্দেশ পালনের উদ্দেশ্যে পর্দা রক্ষা করা ফরজ এমন পুরুষের সাথে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা ও যোগাযোগ বন্ধ করতে চান তখন তাঁর মা-বাবা, পরিবারের কোনও সদস্য কিংবা আত্মীয়স্বজনের কারো অধিকার নেই তাঁকে তা করতে বাধ্য করার বা চাপ প্রয়োগ করার। শরিয়তবিরোধী হারাম কাজে কাউকে চাপ দেওয়া তো দূরের কথা, এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করাও ইসলামে নিষিদ্ধ।
✪ আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَتَعَاوَنُوْا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوٰى ۖ وَلَا تَعَاوَنُوْا عَلَى الْاِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
“তোমরা সৎকাজ ও তাকওয়ার ব্যাপারে একে অপরকে সহযোগিতা করো। কিন্তু পাপাচার ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না। [সুরা মায়েদা: ২] আল্লাহর নির্দেশের বাইরে গিয়ে অন্য কারও অন্যায় আদেশ বা নির্দেশ মেনে নেওয়ার কোনও সুযোগ ইসলামে নেই। পরিবারের কেউ হলেও যদি আপনাকে আল্লাহর বিধান বিরোধী কাজ করতে বাধ্য করে, যোগাযোগ বা মেলামেশার সীমা লঙ্ঘন করতে চাপ দেয় কিংবা হারাম কোনও কাজে জড়িয়ে পড়ার জন্য মানসিক নিপীড়ন চালায়—তবে সে স্পষ্টত জুলুমকারী হিসেবে গণ্য হবে। পরিবার কিংবা আপনজনের আনুগত্য কেবল সৎ ও হালাল কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। দ্বীন পরিপন্থী কাজে জোরজবরদস্তি করা এক ধরনের চরম অন্যায়, আর আল্লাহর দরবারে জুলুমের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ ও কঠিন। বান্দাকে খুশি করতে গিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে অসন্তুষ্ট করার পথ বেছে নেওয়া কখনোই একজন মুমিনের কাজ হতে পারে না।
✪ রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
لاَ طَاعَةَ فِي مَعْصِيَةٍ، إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوفِ
“আল্লাহর অবাধ্যতা বা পাপের কাজে কারো আনুগত্য করা যাবে না। আনুগত্য কেবল ভালো ও ন্যায়সংগত কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।” [সহিহ বুখারি: ৭২৫৭; সহিহ মুসলিম: ১৮৪০]
পরিবারের যতই চাপ থাকুক না কেন, কোনও অবস্থাতেই হারাম বা গুনাহের কাজে পা বাড়ানো যাবে না। শত প্রতিকূলতার মাঝেও অন্তরে আল্লাহর ভয় লালন করে নিজের ইমান ও আখলাকের উপর পাহাড়ের মতো অটল ও অবিচল থাকতে হবে। একই সাথে, দ্বীনের সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে যে স্বজনেরা ভুল পথে চালিত করছেন তাদের ওপর রাগান্বিত না হয়ে বরং গভীর ধৈর্য ও প্রজ্ঞার পরিচয় দেওয়া চাই। অসীম ভদ্রতা, প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তাদের সামনে ইসলামের আলো তুলে ধরতে হবে—বোঝাতে হবে কোনটি হালাল আর কোনটি হারাম। হেদায়েত ও সঠিক পথ দেখানোর মূল মালিক আল্লাহ। তিনি সবাইকে সেই তাওফিক দান করুন। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর প্রতিটি আদেশ-নিষেধ একনিষ্ঠভাবে মেনে চলার তাওফিক দান করুন। সব ধরনের নাফরমানি, পাপাচার ও ফিতনা থেকে তিনি আমাদের আপন রহমতে হেফাজত করুন এবং দ্বীনের ওপর মজবুত রাখুন। আমিন, ইয়া রাব্বাল আলামিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।