সৌদি আরবকে কেন তাওহিদের দেশ বলা হয়

পৃথিবীর মানচিত্রে সৌদি আরব কেবল একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড নয়; এটি ইসলামের উৎসভূমি, মক্কা ও মদিনার দেশ। অষ্টাদশ শতকে সৌদি শাসকগোষ্ঠী এবং সংস্কারক শায়খ মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব (রাহ.)-এর তাওহিদভিত্তিক দাওয়াতের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এ ভূখণ্ডে শিরক ও বিদআতের প্রকাশ্য চর্চার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়। আলহামদুলিল্লাহ, এর ফলে এখানে তাওহিদ-চর্চার একটি স্বতন্ত্র পরিবেশ গড়ে উঠেছে।
❑ নিচে এই ভূখণ্ডের তাওহিদভিত্তিক কতিপয় বৈশিষ্ট্য নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সৌদি আরবের জাতীয় পতাকার মাঝখানে কালিমাতুত তাওহিদ “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” লেখা রয়েছে। এটি তাওহিদভিত্তিক রাষ্ট্রের প্রকাশ্য ঘোষণা।
২. সৌদি আরবে অমুসলিমদের প্রকাশ্য উপাসনালয় নেই। প্রকাশ্যে মূর্তিপূজা, ক্রুশপূজা বা অন্য ধর্মের গণ-উপাসনাও অনুমোদিত নয়।
৩. পিরপূজা, মাজার ও কবরপূজা, গাছ, মাছ ও খুঁটিপূজা বা এ জাতীয় কুসংস্কারের প্রকাশ্য চর্চা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ।
৪. কবর পাকা করা, কবরের ওপর ভবন নির্মাণ, তাতে চুনকাম করা, কবর সুসজ্জিত করা ও আলোকসজ্জা করা, কবরের ওপর গম্বুজ নির্মাণ এবং কবরকে কেন্দ্র করে সব ধরনের শিরকি কার্যক্রম রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ।
৫. একইভাবে লালসালুর ভণ্ডামি, জটধারী বাউলের আড্ডা ও গাঁজার আসর কিংবা ন্যাংটা বাবা, খাজা বাবা, পাগলা বাবা, কালুশাহ ও গোবিন্দ বাবার মতো তথাকথিত পীর-ফকিরদের আস্তানায় ওরশের নামে চলা শিরক, কুফর ও শয়তানি উৎসবের কোনো অস্তিত্ব তাওহিদের এই পবিত্র ভূমিতে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
৬. তাবিজ-কবচের ব্যবসা, গণকগিরি, রাস্তাঘাটে টিয়াপাখির মাধ্যমে ভাগ্য গণনা, কথিত সাধুবাবাদের অলৌকিক ক্ষমতার দাবি এবং হাত বা চেহারা দেখে অতীত-ভবিষ্যৎ বলে দেওয়ার মতো কার্যক্রম আইনত দণ্ডনীয়।
৭. জাদুবিদ্যা, তন্ত্রমন্ত্র, তাবিজ-তুমার ইত্যাদি সংক্রান্ত বইপত্রের বেচাকেনা রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোরভাবে দমন করা হয়। এটি তাওহিদ সুরক্ষার একটি শক্ত প্রাচীর।
৮. রাষ্ট্র তার সংবিধান ও শাসনব্যবস্থায় কুরআন ও সুন্নাহকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধকে (আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার) রাষ্ট্রীয় কাঠামোর একটি মৌলিক স্তম্ভ করেছে। ১৯৯২ সালের মৌলিক শাসনব্যবস্থা আইনে কুরআন ও সুন্নাহকে দেশের সংবিধান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
৯. বিচারব্যবস্থার মূল ভিত্তি শরিয়ত। অর্থাৎ বিচারব্যবস্থা সামগ্রিকভাবে আলেম-উলামার হাতে ন্যস্ত। এটি ইসলামি অনুশাসন ও তাওহিদ ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
১০. বিদ্যালয়ের সব শ্রেণির পাঠ্যক্রমে ইসলামি শিক্ষা এবং তাওহিদ ও আকিদার পাঠ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়েও ইসলামি শিক্ষাবিষয়ক বাধ্যতামূলক বিভিন্ন কোর্স আছে। ফলে নতুন প্রজন্ম শৈশব থেকেই তাওহিদ ও বিশুদ্ধ আকিদার শিক্ষা পায়।
১১. মসজিদগুলো ইসলামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। ইমাম ও খতিব নিয়োগে এবং খুতবার বিষয়বস্তুতে তাওহিদ ও সুন্নাহর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিদআতি কার্যক্রম, মনগড়া আমল ও বাড়াবাড়িমূলক কার্যক্রম সম্পর্কে সতর্কতামূলক খুতবা, দরস ইত্যাদি অগ্রাধিকার পায়। তাই কুসংস্কার ও শরিয়তবিরোধী রসম-রেওয়াজ মসজিদে স্থান পায় না।
এর মানে এই নয় যে তাওহিদের এই দেশে কোনো গুনাহের কাজ হয় না। নিশ্চয়ই ছোট-বড় পাপ সেখানেও ঘটে। তবে পার্থক্য হলো, আলেম-উলামা বসে নেই। তাঁরা এসব পাপের পথ বন্ধ করতে সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছেন। শাসকের দরবারে গিয়ে, বাদশাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এবং আলেম ও শাসকদের যৌথ বৈঠকে স্পষ্ট ও জোরালো নসিহত পেশ করার মাধ্যমে তাঁরা সমাজকে পাপমুক্ত রাখতে নিরলস দায়িত্ব পালন করছেন। আলহামদুলিল্লাহ।মহান আল্লাহ এ দেশকে তাওহিদের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন এবং সব ধরণের ষড়যন্ত্র ও ক্ষয়-ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করুন। আমিন।
– আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি –
Share: