শিশুদের রুকিয়া করার সহজ ও সঠিক পদ্ধতি

শিশুদের রুকিয়া (ঝাড়ফুঁক) করার সহজ ও সঠিক পদ্ধতি:
সন্তান আমাদের জীবনের অমূল্য আমানত। তাদের সুস্থতা ও নিরাপত্তার জন্য পার্থিব চেষ্টার পাশাপাশি পরম করুণাময়ের ওপর ভরসা রাখা এবং সুন্নাহসম্মত উপায় অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি। শিশুদের বিভিন্ন বালা-মুসিবত, বদনজর ও অসুস্থতা থেকে সুরক্ষায় কুরআনের আয়াত ও হাদিসে বর্ণিত দোয়ার মাধ্যমে রুকিয়া বা ঝাড়ফুঁক একটি পরীক্ষিত ও কার্যকর মাধ্যম। তাই এ বিষয়ে আমাদের সঠিক জ্ঞান থাকা উচিত।
নিচে শিশুদের সুরক্ষায় রুকিয়ার শরিয়তসম্মত সহজ ও সঠিক পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় দোয়া (উচ্চারণ ও অর্থ সহ) উপাস্থাপন করা হলো:
❑ প্রতিরক্ষামূলক দোয়া: (ইবরাহিম আ. এর রুকিয়া)
«أُعِيذُكَ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّةِ، مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ»
উচ্চারণ: উঈযুকা বিকালিমাতিল্লাহিত তা-ম্মাহ, মিন কুল্লি শাইতানিওঁ ওয়া হা-ম্মাহ, ওয়া মিন কুল্লি আ’ইনিন লা-ম্মাহ।
অর্থ: আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালিমা দ্বারা তোমাকে আশ্রয় দিচ্ছি সব ধরনের শয়তান, বিষাক্ত জীবজন্তু এবং ক্ষতিকর নজর থেকে।
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হাসান ও হুসাইন (রা.) এই দোয়া দিয়ে আশ্রয় দিতেন এবং বলতেন: “তোমাদের পিতা (ইবরাহিম) তার দুই সন্তান ইসমাইল ও ইসহাককে এই কালিমা দিয়ে আশ্রয় দিতেন। ” [সহিহ বুখারি]
এই দুয়াটি সকাল-সন্ধ্যা ও ঘুমানোর আগে পড়া যায়। এর জন্য নির্দিষ্ট কোনও সংখ্যা আবশ্যক নয়। শুধু পড়াই যথেষ্ট; ফুঁ দেওয়ারও প্রয়োজন নেই।
❑ রোগ ও নজর থেকে আরোগ্যের দোয়া: (জিরাইল আ. এর রুকিয়া)
«بِسْمِ اللهِ أَرْقِيكَ، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ، مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ، اللهُ يَشْفِيكَ، بِسْمِ اللهِ أَرْقِيكَ»
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আরক্বীকা, মিন কুল্লি শাইয়িন ইউ’যিকা, মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও আ’ইনি হাসিদিন, আল্লাহু ইয়াশফীকা, বিসমিল্লাহি আরক্বীকা।
অর্থ: “আল্লাহর নামে তোমাকে রুকিয়া করছি সেসব জিনিস থেকে যা তোমাকে কষ্ট দেয় সব অনিষ্টকারী আত্মা বা হিংসুকের নজর থেকে। আল্লাহ তোমাকে সুস্থতা দিন। আল্লাহর নামে তোমাকে রুকিয়া করছি।”
জিবরাইল (আ.) নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে এই দোয়া দিয়ে রুকিয়া করেছিলেন। [সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১৮৬]
এটি রুকিয়ার দোয়া। তাই পড়ার পর সাধারণ রুকিয়ার নিয়মে বাচ্চার শরীরে হালকা ফুঁ দিতে পারেন।
❑ বালা-মসিবত, বদনজর, জাদু-টোনা, জিনের আক্রমণ ইত্যাদি থেকে বাঁচার দোয়া:
«بِسْمِ اللهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ»
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহিল্লাযী লা ইয়াদুররু মা’আসমিহি শাইয়ুন ফিল আরদি ওয়া লা ফিস সামা-ই, ওয়া হুওয়াস সামি’উল আ’লীম।
অর্থ: “আল্লাহর নামে, যাঁর নামের বরকতে আসমান ও জমিনের কোনও কিছুই কোনও ক্ষতি করতে পারে না। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” (৩ বার পড়বেন)
প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় এটি ৩ বার পড়লে কোনও কিছু ক্ষতি করতে পারে না বলে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন। [সুনানে আবু দাউদ, তিরমিজি; হাসান সহিহ]
শুধু পড়াই যথেষ্ট; ফুঁ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
❑ শরীরে ব্যথা থাকলে:
বাচ্চার ব্যথার জায়গায় হাত রেখে ৩ বার বলুন “বিসমিল্লাহ”। এরপর ৭ বার বলুন:
«أَعُوذُ بِاللهِ وَقُدْرَتِهِ مِنْ شَرِّ مَا أَجِدُ وَأُحَاذِرُ»
উচ্চারণ: আউযু বিল্লাহি ওয়া ক্বুদরাতিহি মিন শাররি মা আজিদু ওয়া উহাযিরু।
অর্থ: “আমি আল্লাহর সত্তা ও তাঁর কুদরতের আশ্রয় চাচ্ছি, যে কষ্ট আমি অনুভব করছি এবং যা আমি ভয় করছি তা থেকে।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২০২]
ব্যথার জায়গায় হাত রেখে এই দোয়াটি পাঠ করবেন; ফুঁ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
❑ দোয়ায়ে শিফা বা রোগমুক্তির বিশেষ দোয়া:
«اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبِ الْبَاسَ، اشْفِهِ وَأَنْتَ الشَّافِي، لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ، شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا»
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা রব্বান নাস, আযহিবিল বা’স, ইশফিহি ওয়া আনতাশ শাফি, লা শিফাআ ইল্লা শিফাউকা, শিফাআন লা ইউগাদিরু সাক্বামা।
অর্থ: হে আল্লাহ, মানুষের রব! কষ্ট দূর করুন, একে সুস্থ করে দিন, আপনিই একমাত্র আরোগ্য দানকারী। আপনার আরোগ্য দান ছাড়া অন্য কোনও আরোগ্য নেই। এমন আরোগ্য দিন যা কোনও রোগ অবশিষ্ট রাখে না।
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, “নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে ডান হাত দিয়ে মুছে দিতে দিতে এই দোয়া পড়তেন।” [সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৭৪৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১৯১]
❑ শিশুদের রুকিয়া করার সঠিক নিয়ম ও প্রয়োগ পদ্ধতি:
✪ ১. প্রথমে একবার সূরা ফাতিহা পড়ুন।
✪ ২. আয়াতুল কুরসি এবং সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত (আমানার রসূলু…) পড়ুন। এগুলো শুধু পড়াই যথেষ্ট; এক্ষেত্রে ফুঁ দেওয়ার কথা হাদিসে আসেনি।
✪ ৩. সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস — প্রতিটি সূরা ৩ বার করে পড়ুন।
অতঃপর শেষে নিচের যেকোনো পদ্ধতিতে রুকিয়া প্রয়োগ করুন:
– ক. নিজের দুই হাতের তালুতে ফুঁ দিন (হালকা বাতাস ও সামান্য থুথুর ছিটাসহ; মুখের গরম বাতাস সহ ফুঁ নয়), এরপর হাত দুটি দিয়ে বাচ্চার মাথা, মুখমণ্ডল ও পুরো শরীরে আলতো করে মুছে দিন। এই নিয়মটি নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রমাণিত সুন্নাহ। তবে এটি নির্দিষ্টভাবে তিন কুলের (ইখলাস, ফালাক, নাস) ক্ষেত্রে বর্ণিত। [সহিহ বুখারি, হাদিস ৫০১৭]
– খ. পড়ার সময় বাচ্চার মাথায় বা বুকের ওপর নিজের ডান হাত রেখে দিন।
– গ. পরিষ্কার পানিতে উপরের সূরা ও দোয়াগুলো পড়ে ফুঁ দিয়ে (মুখের হালকা বাতাস ও সামান্য থুথুর ছিটাসহ; মুখের গরম বাতাস সহ ফুঁ নয়) সেই পানি বাচ্চাকে পান করান এবং শরীরে হালকা মুছে দিন বা প্রয়োজনে গোসল করান।
✪ ৪. প্রতিদিন সকাল-বিকেল দুই বেলা নিয়মিত রুকিয়া চালিয়ে যান, যাতে বাচ্চা সার্বক্ষণিক মহান আল্লাহর সুরক্ষায় থাকে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: সকালে রুকিয়া করার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো, ফজরের পর থেকে সূর্য ওঠা পর্যন্ত, আর বিকেলের জন্য আসরের পর থেকে সূর্য ডোবা পর্যন্ত। তবে কোনও কারণে এই নির্দিষ্ট সময়ে করা সম্ভব না হলে, ফজর বা সন্ধ্যার পরেও তা করা যেতে পারে।
✪ ৫. মনে সম্পূর্ণ বিশ্বাস রাখুন যে, একমাত্র আল্লাহই প্রকৃত রক্ষাকারী ও আরোগ্য দানকারী; দোয়া, রুকিয়া বা ঝাড়ফুঁক ইত্যাদি মাধ্যম মাত্র।
❑ কিছু জরুরি কথা:
◈ ১. শুধু অসুস্থতার সময়ই নয় বরং সন্তানকে সুস্থ রাখতে এবং জাদু-টোনা, বদনজর ও জিনের আক্রমণসহ সব ধরনের অদৃশ্য ক্ষতি থেকে নিরাপদ রাখতে নিয়মিত রুকিয়া করা উচিত।
◈ ২. রুকিয়া কেবল পবিত্র কুরআনের আয়াত এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত সহিহ দোয়া দ্বারাই জায়েজ বা শরিয়তসম্মত। এর বাইরে অর্থহীন শব্দ, অপরিচিত নাম বা কুসংস্কারে ভরা মন্ত্র দিয়ে রুকিয়া করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই।
◈ ৩. সন্তানের সুরক্ষার নামে গলায় বা হাতে তাবিজ-কবজ, রিং, বালা, তামা-লোহার সুতা কিংবা সুতা বা কড়ি ঝোলানো সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও হারাম। অনেক সময় না বুঝে অনেকে এগুলোকে রোগবালাই বা বদনজর থেকে বাঁচার উপায় মনে করেন, যা মারাত্মক শিরকের অন্তর্ভুক্ত। কারণ উপকার বা অপকার করার মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা; কোনও বস্তু, সুতা বা তাবিজ মানুষের কোনও ক্ষতি বা কল্যাণ করতে পারে না। নবিজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঝুলিয়ে রাখল, তাকে সেটার সাথেই সঁপে দেওয়া হয় (অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ওপর ভরসা করলে আল্লাহ তাকে রক্ষা করেন না)।
তাই কুসংস্কার ও শিরক সকল উপায়-উপকরণ থেকেে দূরে থাকা অপরিহার্য।
◈ ৪. ওঝা, বৈদ্য, কবিরাজ, জ্যোতিষী, গণক, ভবিষ্যৎ বক্তা কিংবা অমুসলিম কোনও তন্ত্র-মন্ত্র বা ঝাড়ফুঁক কারী—যারা শয়তানের সাহায্য নেয় বা অবৈজ্ঞানিক ও শরিয়াবহির্ভূত পন্থায় চিকিৎসা করেন—তাদের কাছে রোগব্যাধির চিকিৎসার জন্য যাওয়া সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও নিষিদ্ধ। কারণ এসব পন্থায় শিরক ও কুসংস্কারের সংমিশ্রণ থাকে, যা মানুষের ইমান ও আকিদাকে ধ্বংস করে দেয়। চিকিৎসা নিতে হবে কেবল কুরআন-সুন্নাহসম্মত রুকিয়া, অভিজ্ঞ মুসলিম চিকিৎসক এবং হালাল ও প্রমাণিত উপায় অবলম্বন করে।
◈ ৫. মা-বাবা বা পরিবারের যে কেউ এই দোয়াগুলো শিখে সন্তানের জন্য রুকিয়া করতে পারেন। এর জন্য আলাদা কোনও রাক্বি বা রুকিয়া বিশেষজ্ঞ-এর কাছে যাওয়া জরুরি নয়।
◈ ৬. এই সকল দোয়া মুখস্ত না থাকলে দেখে দেখে পড়াও জায়েজ।
◈ ৭. ইসলামে শরিয়তসম্মত রুকিয়ার পাশাপাশি আধুনিক বা প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করায় কোনও দোষ নেই। বরং অসুস্থতার সুচিকিৎসা নেওয়া শরিয়তে সম্পূর্ণ অনুমোদিত এবং এটি তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে যেমন বিভিন্ন অসুস্থতায় চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন, তেমনি তাঁর উম্মতকেও রোগব্যাধির চিকিৎসাসেবা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন।
হাদিসে এসেছে, “আল্লাহ তাআলা এমন কোনও রোগ সৃষ্টি করেননি যার প্রতিকার বা ওষুধ তিনি রাখেননি।” তাই রুকিয়া বা দোয়া-কালামের পাশাপাশি প্রয়োজনে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং ওষুধ সেবন করা সুন্নাহসম্মত ও বাস্তবসম্মত উপায়।
◈ ৮. সন্তানকে ছোট থেকেই এই বিশ্বাসে বড় করা উচিত যে, বিপদ-আপদ বা রোগ-ব্যাধি থেকে প্রকৃত রক্ষাকারী একমাত্র আল্লাহ তাআলা। দোয়া, রুকিয়া বা চিকিৎসা কেবল বাহ্যিক মাধ্যম মাত্র; প্রকৃত শেফা ও হেফাজত তাঁরই হাতে। তাই জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিতে সব ধরনের শঙ্কা ও নির্ভরতা ঝেড়ে ফেলে একমাত্র তাঁরই ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) রাখতে হবে। আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
Share: