প্রশ্ন: কোনো মুসলিম কি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পক্ষ থেকে কুরবানি দিতে পারেন? এ মাসআলায় উলামায়ে কিরামের মতামত কী? এবং নিম্নোক্ত হাদিসটির সনদগত মান কী এবং এর ব্যাখ্যা কী?
হানাশ (রাহ.) থেকে বর্ণিত, আলি (রা.) সম্পর্কে এসেছে:
«أَنَّهُ كَانَ يُضَحِّي بِكَبْشَيْنِ أَحَدُهُمَا عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَالْآخَرُ عَنْ نَفْسِهِ، فَقِيلَ لَهُ، فَقَالَ: أَمَرَنِي بِهِ يَعْنِي النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَসَلَّمَ، فَلَا أَدَعُهُ أَبَدًا»
“তিনি দুটি ভেড়া দিয়ে কুরবানি দিতেন—একটি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পক্ষ থেকে, অপরটি নিজের পক্ষ থেকে। তাঁকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে এটি করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তাই আমি এটি কখনো ছাড়ব না।” [তিরমিজি ও আবু দাউদ]
উত্তর: আলহামদুলিল্লাহ। ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসুলিল্লাহ। আম্মা বাদ:
কারো জন্য নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পক্ষ থেকে কুরবানি দেওয়া জায়েজ নয়। কারণ ইবাদতের মূলনীতি হলো, নিষেধাজ্ঞা ও তাওকিফিয়াত (অর্থাৎ দলিল ছাড়া কিছু করা যাবে না)—যতক্ষণ না বিপরীত কোনো স্পষ্ট দলিল প্রমাণিত হয়।
প্রশ্নকারী যে হাদিসটির উল্লেখ করেছেন, সেটি ইমাম তিরমিজি বর্ণনা করেছেন এবং শায়খ আলবানি (রাহ.)সহ অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ সেটিকে দুর্বল সাব্যস্ত করেছেন, যা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
ইমাম তিরমিজি (রাহ.) বলেন:
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عُبَيْدٍ الْمُحَارِبِيُّ الْكُوفِيُّ، حَدَّثَنَا شَرِيكٌ عَنْ أَبِي الْحَسْنَاءِ، عَنِ الْحَكَمِ، عَنْ حَنَشٍ، عَنْ عَلِيٍّ: «أَنَّهُ كَانَ يُضَحِّي بِكَبْشَيْنِ أَحَدُهُمَا عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَالْآخَرُ عَنْ نَفْسِهِ، فَقِيلَ لَهُ، فَقَالَ: أَمَرَنِي بِهِ يَعْنِي النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَلَا أَدَعُهُ أَبَدًا»
“হানাশ বলেন, আলি (রা.) দুটি ভেড়া দিয়ে কুরবানি দিতেন—একটি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর পক্ষ থেকে, অপরটি নিজের পক্ষ থেকে। তাঁকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন: “নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে এটি করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তাই আমি এটি কখনো ছাড়ব না।” [তিরমিজি: ১৪৯৫]
হাদিসটি বর্ণনার পর ইমাম তিরমিজি বলেন: “এটি একটি গরিব (একক বর্ণনাকারী দ্বারা বর্ণিত) হাদিস। কেবল শারিকের সূত্রেই আমরা এটি জানি।”
ইমাম আহমদ ও আবু দাউদ, শারিক ইবনে আব্দুল্লাহ আল কাদি সূত্রে ‘অসিয়ত’ শব্দটি উল্লেখ করে বর্ণনা করেছেন:
حَدَّثَنَا عُثْمَانُ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا شَرِيكٌ، عَنْ أَبِي الْحَسْنَاءِ، عَنِ الْحَكَمِ، عَنْ حَنَشٍ، قَالَ: «رَأَيْتُ عَلِيًّا يُضَحِّي بِكَبْشَيْنِ، فَقُلْتُ لَهُ: مَا هَذَا؟ فَقَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَوْصَانِي أَنْ أُضَحِّيَ عَنْهُ، فَأَنَا أُضَحِّي عَنْهُ»
হানাশ রাহ. বলেন, আমি আলি (রা.)-কে দুটি ভেড়া দিয়ে কুরবানি করতে দেখলাম। আমি তাঁকে বললাম: এটি কী? তিনি বললেন: রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে তাঁর পক্ষ থেকে কুরবানি করার অসিয়ত করেছেন। তাই আমি তাঁর পক্ষ থেকে কুরবানি করি।” [আবু দাউদ: ২৭৯০, আহমদ: ১২১৯]
❑ হাদিসটির সনদ পর্যালোচনা:
◈ মোবারকপুরি (রাহ.) বলেন, মুনযিরি উল্লেখ করেছেন—হানাশ হলেন, আবুল মু’তামির আল কানানি আস সান’আনি (أَبُو الْمُعْتَمِرِ الْكِنَانِيُّ الصَّنْعَانِيُّ)। একাধিক মুহাদ্দিস তাঁর সমালোচনা করেছেন।
ইবনে হিব্বান আল বুস্তি বলেছেন:
وَكَانَ كَثِيرَ الْوَهْمِ فِي الْأَخْبَارِ، يَنْفَرِدُ عَنْ عَلِيٍّ بِأَشْيَاءَ لَا يُشْبِهُ حَدِيثَ الثِّقَاتِ، حَتَّى صَارَ مِمَّنْ لَا يُحْتَجُّ بِهِ
“তিনি বর্ণনায় বহু ওহাম বা ভুলের শিকার হতেন। আলি (রা.) থেকে এমন অনেক কিছু এককভাবে বর্ণনা করতেন যা নির্ভরযোগ্য রাবিদের হাদিসের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়, ফলে তিনি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছেন যে, তাঁর দ্বারা দলিল গ্রহণযোগ্য নয়।”
আর শারিক অর্থাৎ ইবনে আব্দুল্লাহ আল কাদি সম্পর্কেও সমালোচনা রয়েছে; যদিও ইমাম মুসলিম তাঁকে মুতাবা’আত হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
মোবারকপুরি আরও বলেন: আবুল হাসনা—যিনি আব্দুল্লাহর শায়খ। তিনি মাজহুল (অপরিচিত)। সুতরাং হাদিসটি দুর্বল। [তুহফাতুল আহওয়াযি]
◈ শায়খ আলবানি (রাহ.) বলেন:
إِسْنَادُهُ ضَعِيفٌ؛ لِسُوءِ حِفْظِ شَرِيكٍ -وَهُوَ ابْنُ عَبْدِ اللَّهِ الْقَاضِي- وَحَنَشٌ -وَهُوَ ابْنُ الْمُعْتَمِرِ الصَّنْعَانِيُّ- ضَعَّفَهُ الْجُمْهُورُ وَأَبُو الْحَسْنَاءِ مَجْهُولٌ
“এর সনদ দুর্বল। কারণ শারিক—অর্থাৎ ইবনে আব্দুল্লাহ আল কাদি-এর স্মৃতিশক্তি দুর্বল। আর হানাশ অর্থাৎ ইবনুল মু’তামির আস সান’আনি—কে জুমহুর (সংখ্যা গরিষ্ঠ) মুহাদ্দিসগণ দুর্বল বলেছেন। এবং আবুল হাসনা মাজহুল।” [যঈফ আবু দাউদ]
শায়খ আব্দুল মুহসিন আল আব্বাদ (হাফি.)ও উপরোক্ত একই কারণগুলোর ভিত্তিতে সুনানে আবু দাউদের ব্যাখ্যায় হাদিসটিকে দুর্বল বলেছেন।
❑ সিদ্ধান্ত:
হাদিসটির দুর্বলতা প্রমাণিত হওয়ার পর মূলের দিকে ফিরে যাওয়া আবশ্যক। আর শরিয়তের মূল হল, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পক্ষ থেকে কুরবানি দেওয়া জায়েজ নয়। (কেননা তা দলিল দ্বারা সাবস্ত নয়)।
➧ শায়খ আব্দুল মুহসিন আল আব্বাদ (হাফি.) বলেন:
اَلْإِنْسَانُ عِنْدَمَا يُضَحِّي، يُضَحِّي عَنْ نَفْسِهِ وَأَهْلِ بَيْتِهِ، وَلَهُ أَنْ يُضَحِّيَ عَنِ الْأَحْيَاءِ وَالْأَمْوَاتِ مِنْ أَهْلِ بَيْتِهِ، وَإِذَا أَوْصَى رَجُلٌ بِأَنْ يُضَحَّى عَنْهُ فَلْيُضَحَّ عَنْهُ.
وَأَمَّا الْأُضْحِيَّةُ عَنِ الْمَيِّتِ اسْتِقْلَالًا عَلَى سَبِيلِ الِانْفِرَادِ، فَلَا نَعْلَمُ شَيْئًا ثَابِتًا يَدُلُّ عَلَيْهِ، وَلَكِنْ كَوْنُهُ يُضَحِّي عَنْ نَفْسِهِ وَعَنْ أَهْلِ بَيْتِهِ أَوْ أَقَارِبِهِ، أَحْيَاءً وَأَمْوَاتًا، فَلَا بَأْسَ بِذَلِكَ، وَقَدْ جَاءَ فِي السُّنَّةِ مَا يَدُلُّ عَلَى ذَلِكَ، فَيَدْخُلُ الْأَمْوَاتُ تَبَعًا، وَأَمَّا أَنْ يُضَحَّى عَنْهُمْ اسْتِقْلَالًا وَانْفِرَادًا، وَأَنْ يَكُونَ ذَلِكَ مِنْ غَيْرِ وَصِيَّةٍ مِنْهُمْ، فَلَا أَعْلَمُ شَيْئًا يَدُلُّ عَلَيْهِ.
وَالْحَدِيثُ الَّذِي أَوْرَدَهُ أَبُو دَاوُدَ عَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ أَنَّهُ كَانَ يُضَحِّي بِكَبْشَيْنِ وَيَقُولُ: إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَوْصَاهُ بِذَلِكَ، غَيْرُ ثَابِتٍ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؛ لِأَنَّ فِي إِسْنَادِهِ مَنْ هُوَ مَجْهُولٌ، وَفِيهِ مَنْ هُوَ مُتَكَلَّمٌ فِيهِ غَيْرُ الْمَجْهُولِ، وَالْإِنْسَانُ إِذَا أَرَادَ أَنْ يَصِلَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِسَبَبِهِ شَيْءٌ مِنْ رِفْعَةِ الدَّرَجَةِ وَعُلُوِّ الْمَنْزِلَةِ فَإِنَّ عَلَيْهِ أَنْ يَجْتَهِدَ فِي الْأَعْمَالِ الصَّالِحَةِ لِنَفْسِهِ، فَإِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يُعْطِي نَبِيَّهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِثْلَمَا أَعْطَاهُ؛ لِأَنَّ النَّبِيَّ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ هُوَ الَّذِي دَلَّ النَّاسَ عَلَى الْخَيْرِ: (وَمَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ).
” কেউ যখন কুরবানি দিবে তখন নিজের ও পরিবারের পক্ষ থেকে দিবে। পরিবারের জীবিত ও মৃত সবার পক্ষ থেকে কুরবানি দেওয়া তার জন্য বৈধ। কেউ যদি কুরবানির অসিয়ত করে যান তবে তাঁর পক্ষ থেকেও কুরবানি দেওয়া যাবে।
তবে শুধু কোনো মৃত ব্যক্তির পক্ষে থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে আলাদা কুরবানি দেওয়ার পক্ষে আমাদের কাছে কোনো প্রমাণিত দলিল নেই। কিন্তু নিজের ও পরিবারের জীবিত-মৃত সকলের পক্ষ থেকে একসাথে কুরবানি দিলে—তাতে কোনো অসুবিধা নেই। সুন্নায় এর প্রমাণ রয়েছে। ফলে মৃতরাও এর মধ্যে শামিল হবে । কিন্তু শুধু মৃতের পক্ষ কোনো অসিয়ত ছাড়া স্বতন্ত্রভাবে কুরবানি করার ব্যাপারে আমার জানা মতে কোনো দলিল নেই।
আবু দাউদ বর্ণিত আলি (রা.)-এর হাদিসটি—যেখানে তিনি দুটি ভেড়া দিয়ে কুরবানি দিতেন এবং বলতেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে এই অসিয়ত করেছেন—তা রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত নয়। কারণ এর সনদে একজন মাজহুল রাবি (অজ্ঞাত পরিচয় বর্ণনাকারী) রয়েছেন এবং মাজহুল ছাড়াও আরেকজন সমালোচিত রাবি (বর্ণনাকারী) রয়েছেন।
মানুষ যদি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মর্যাদা ও উচ্চ মাকামের কারণে তাঁর প্রতি কোনো কল্যাণ পৌঁছাতে চায় তবে তার উচিত, নিজের নেক আমলের প্রতি মনোযোগ দেওয়া। কারণ আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে আমলকারীর সমপরিমাণ প্রতিদান দেবেন। কেননা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)ই মানুষকে কল্যাণের পথ দেখিয়েছেন।
আর তিনি হাদিসে বলেছেন,
«مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ»
“যে ব্যক্তি কোনো কল্যাণের দিকে পথ দেখায় তার জন্য সেই কাজ সম্পাদনকারীর অনুরূপ প্রতিদান রয়েছে।”” [শরহু সুনানি আবি দাউদ]
হাদিসটিকে যদি সাময়িকভাবে সহিহ ধরেও নেওয়া হয় তবুও এটি কেবল অসিয়তের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য—যেমনটি আবু দাউদের বর্ণনায় স্পষ্টভাবে এসেছে। আর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আলি (রা.) ছাড়া অন্য কাউকে এরূপ অসিয়ত করেননি। সুতরাং শরিয়তের সুনির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকা এবং সীমা লঙ্ঘন না করাই আমাদের জন্য আবশ্যক। আল্লাহু আলাম। আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন। [source: islamqa info]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।