দ্বীনের ক্ষেত্রে নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবা: অহংকার ও আত্মতুষ্টির ভয়াবহতা
প্রশ্ন: কোনো বেদ্বীন বা বিদআতিকে দেখে যদি মনে হয়, “আমি তার চেয়ে ভালো, কারণ আমি বিদআত করি না বা দ্বীনহীনভাবে চলি না”, কিন্তু আমি তার সাথে তুচ্ছ করে কথা বলি না তাহলে কি এটি আত্মতুষ্টি বা অহংকার হয়ে যাবে?
উত্তর: হ্যাঁ, কাউকে নিজের চেয়ে হীন মনে করা এবং নিজেকে তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ ভাবা অহংকার (কিবর) ও আত্মতুষ্টির (উজব) অন্তর্ভুক্ত কথাবার্তা বা আচরণে তার প্রতি চাচ্ছিল্যের ভাব প্রকাশ না করলেও।
✪ অহংকারের সংজ্ঞা:
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন,
«الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ وَغَمْطُ النَّاسِ»
“অহংকার হলো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছ জ্ঞান করা।” [সহিহ মুসলিম: ৯১]
খারাপ ব্যবহার বা মুখে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য না করলেও অন্তরে কাউকে নিকৃষ্ট বা নিজের থেকে অধম ভাবা তুচ্ছ জ্ঞান করারই একটি রূপ। আর নিজের ইবাদত ও দ্বীনদারি নিয়ে মুগ্ধ হয়ে থাকা হলো উজব। দুটাই ইসলামে নিষিদ্ধ।
আল্লাহ তাআলা আত্মপ্রশংসা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বলেন,
«فَلَا تُزَكُّوٓا۟ أَنفُسَكُمْ ۖ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ ٱتَّقَىٰٓ»
“সুতরাং তোমরা নিজেদের পবিত্র দাবি কোরো না। কে তাকওয়া-পরহেজগারিতা অবলম্বন করেছে, তিনিই ভালো জানেন।” [সুরা নাজম: ৩২]
✪ ধ্বংসাত্মক তিনটি বিষয়:
উজব বা আত্মমুগ্ধতা এমন একটি রোগ, যাকে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘ধ্বংসকারী’ বিষয়গুলোর একটি হিসেবে গণ্য করেছেন।
তিনি বলেছেন:
«ثَلَاثٌ مُهْلِكَاتٌ: شُحٌّ مُطَاعٌ، وَهَوًى مُتَّبَعٌ، وَإِعْجَابُ الْمَرْءِ بِنَفْسِهِ»
“তিনটি বিষয় ধ্বংসকারী: অনুসৃত কৃপণতা, অনুসৃত প্রবৃত্তি এবং মানুষের নিজেকে নিয়ে মুগ্ধ থাকা।” [মু’জামুল আওসাত, তাবারানি: ৫৭৫৪; আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত; হাসান, সহিহুল জামে: ৩০৪৫]
✪ কেন বিপজ্জনক?
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«وَإِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالْخَوَاتِيمِ»
“আমলের ফলাফল নির্ভর করে শেষ অবস্থার উপর।” [সহিহ বুখারি: ৬৪৯৩, সহিহ মুসলিম: ১১২; সাহল ইবনে সা’দ (রা.) থেকে বর্ণিত]
আপনি শিরক, বিদআত ও পাপাচার থেকে দূরে আছেন, এটি আপনার নিজস্ব ক্ষমতা বা যোগ্যতা নয়; এটি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। তাই এই নিয়ামত লাভ করার পরে অন্যকে ছোট বা আপনার থেকে নিম্নস্তরের ভাবা এক ধরনের অকৃতজ্ঞতা।
কুরআনে এসেছে,
«قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِّنْهُ ۖ خَلَقْتَنِي مِن نَّارٍ وَخَلَقْتَهُ مِن طِينٍ»
“সে (ইবলিস) বলল, আমি তার (আদম আলাইহিস সালাম) চেয়ে উত্তম। আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন আর তাকে সৃষ্টি করেছেন কাদামাটি থেকে।” [সুরা আরাফ: ১২]
আল্লাহ তাআলা অন্যকে উপহাস ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতেও নিষেধ করেছেন এবং মনে করিয়ে দিয়েছেন:
«عَسَىٰٓ أَن يَكُونُوا۟ خَيْرًا مِّنْهُمْ»
“হতে পারে তারা (যাদেরকে তুচ্ছ ও উপহাস করা হচ্ছে) তাদের চেয়ে উত্তম।” [সুরা হুজুরাত: ১১]
✪ মনের এই অবস্থা দূর করার উপায়:
কাউকে অন্যায় অপকর্ম পাপাচার শিরক-বিদআত ইত্যাদিতে লিপ্ত দেখলে
– প্রথমে আল্লাহর শোকর আদায় করুন যে, তিনি আপনাকে এই ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছেন।
– এরপর তার হেদায়েতের জন্য দোয়া করুন।
– নিজের ইমান নিয়ে ভয় রাখুন আর চিন্তা করুন যে, কারণ আল্লাহ আপনাকে হেদায়েত না দিলে আপনিও সেই অবস্থায় থাকতে পারতেন।
– নিজের দৃঢ়তার জন্য এই দোয়া করা উচিত:
«رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا»
“হে আমাদের রব, হিদায়াত দেওয়ার পর আপনি আমাদের অন্তরকে বক্র করে দেবেন না।” [সুরা আলে ইমরান: ৮]
– সেই সাথে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর শেখানো এই দোয়াটি অধিক পরিমাণে পাঠ করুন,
«يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ»
“হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী, আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর দৃঢ় রাখুন।” [জামে তিরমিজি: ২১৪০, হাসান; আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত]
মনে রাখতে হবে, শিরক, বিদআত, অন্যায় ও পাপাচারকে ঘৃণা করা এবং সঠিকভাবে তা সংশোধনের চেষ্টা করা অহংকার নয়, এটি ইসলামের নির্দেশ।
অহংকার হলো, কাউকে তার পাপের কারণে নিজের চেয়ে ছোট মনে করা। তাই অন্যায়ের প্রতিবাদ করুন কিন্তু মনকে অহংকার থেকে মুক্ত রাখুন। মুমিন পাপীকে দেখে নিজেকে বড় ভাবে না; সে তার জন্য ব্যথিত হয় এবং নিজের হেদায়েত ধরে রাখতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।