কুরবানির সংক্ষিপ্ত মাসায়েল

❑ কুরবানির শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ:
কুরবানি শব্দটি আরবি قُرْبَان (কুরবান) হতে উৎপন্ন, যার অর্থ হলো—নৈকট্য লাভ করা। শরিয়তের পরিভাষায় কুরবানি বলতে সেই পশুকে বোঝায় যা ঈদ ও কুরবানির দিন সমূহে জবাই করা হয়। একে আরবিতে أُضْحِيَّة (উযহিয়্যাহ) বলা হয়। ইমাম সানআনি বলেন, কুরবানিকে আরবি পরিভাষায় أَضَاحِي (আযাহী) বলা হয়। এটি যেন সেই সময়ের নাম থেকেই নেওয়া হয়েছে যে সময় কুরবানির পশুকে জবাই করা বিধেয় (অর্থাৎ অপরাহ্ণ)।
❑ কুরবানির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস:
কুরবানির বিধানটি অতি প্রাচীন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكًا
“আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কুরবানির ব্যবস্থা করেছি।” [সূরা হজ: ৩৪]
আদম (আলাইহিস সালাম)-এর দুই পুত্র হবিল ও কাবিলের দেওয়া কুরবানি থেকেই কুরবানির ইতিহাসের গোড়াপত্তন হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا فَتُقُبِّلَ مِنْ أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنَ الْآخَرِ قَالَ لَأَقْتُلَنَّكَ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ – لَئِنْ بَسَطْتَ إِلَيَّ يَدَكَ لتقتلَنِي مَا أَنَا بِبَاسِطٍ يَدِيَ إِلَيْكَ لِأَقْتُلَكَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ رَبَّ الْعَالَمِينَ – إِنِّي أُرِيدُ أَنْ تَبُوءَ بِإِثْمِي وَإِثْمِكَ فَتَكُونَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ
“(হে রসুল!) আপনি তাদেরকে সঠিক ভাবে পড়ে শুনিয়ে দিন আদমের পুত্রদ্বয়ের সংবাদ। যখন তারা কুরবানি দিল কিন্তু তাদের একজনেরটা গৃহীত হলো অপরেরটা গৃহীত হলো না। তখন (যার কুরবানি গৃহীত হলো না সে যার কুরবান গৃহীত হলো তাকে লক্ষ্য করে) বলল, আমি তোমাকে হত্যা করব। (উত্তরে) সে বলল, আল্লাহ তো শুধু পরহেজগারদের থেকেই (কুরবানি) কবুল করেন। আমাকে হত্যা করার জন্য তুমি হাত প্রসারিত করলেও আমি তোমাকে হত্যা করার জন্য আপন হাত প্রসার করব না। আমি রাব্বুল আলামীনকে ভয় করি। আমি চাই তুমি আমার গুনাহ এবং তোমার গুনাহ বহন করে জাহান্নামি-দের দলভুক্ত হও।” [সূরা মায়েদাহ: ২৭-২৯]
তবে বর্তমানে আমরা যেভাবে কুরবানি করি, তা ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর সুন্নাত থেকে এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ
“আমি তাঁর (ইসমাইল) পরিবর্তে দিলাম জবাই করার জন্য এক মহান জন্তু।” [সূরা সাফফাত: ১০৭]
❑ কুরবানি শরিয়তসম্মত হওয়ার দলিল:
আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
“অতএব আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় করুন এবং কুরবানি করুন।” [সূরা কাওসার: ২]
আনাস (রাদিআল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন:
ضَحَّى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِكَبْشَيْنِ أَمْلَحَيْنِ أَقْرَنَيْنِ ذَبَحَهُمَا بِيَدِهِ وَسَمَّى وَكَبَّرَ وَوَضَعَ رِجْلَهُ عَلَى صِفَاحِهِمَا
“নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাদা-কালো রং মিশ্রিত দুটি শিং বিশিষ্ট ভেড়া কুরবানি করেছিলেন। নিজ হাতে উভয়টিকে জবাই করেছিলেন এবং জবাই করার সময় আল্লাহর নাম এবং তাকবির বলেছিলেন। জবাই করার সময় তিনি পশুদ্বয়ের কাঁধে পা রেখেছিলেন।” [সহিহ বুখারি ও মুসলিম]
ইবনে কুদামা (রাহিমাহুল্লাহ) ‘আল মুগনী’ গ্রন্থে বলেন, “ইসলামি শরিয়তে কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমার মাধ্যমে কুরবানির বিধান সাব্যস্ত হয়েছে।”
❑ কুরবানির গুরুত্ব এবং এর ফজিলত বিষয়ে বর্ণিত হাদিসগুলোর অবস্থা:
কুরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা স্বয়ং নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আদায় করেছেন। সামর্থ্যবান ব্যক্তির কুরবানি ত্যাগ করার ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা এসেছে। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
مَنْ كَانَ لَهُ سَعَةٌ، وَلَمْ يُضَحِّ، فَلَا يَقْرَبَنَّ مُصَلَّانَا
“যার কুরবানি করার সামর্থ্য আছে অথচ সে কুরবানি দিল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।” [মুসনাদে আহমাদ, সুনানে ইবনে মাজাহ, আলবানি এটিকে হাসান বলেছেন]
তবে কুরবানির সুনির্দিষ্ট সওয়াব ও ফজিলত সংক্রান্ত প্রচলিত হাদিসগুলোর সত্যতা নিয়ে মুহাদ্দিসগণের ভিন্ন মূল্যায়ন রয়েছে।
– হাফেজ ইবনে হাজার বলেন, এই বিষয়ে বর্ণিত কোনো হাদিসই বিশুদ্ধ সনদে প্রমাণিত নয়।
– ইমাম ইবনুল আরাবি বলেন:
لَيْسَ فِي فَضْلِ الْأُضْحِيَّةِ حَدِيثٌ صَحِيحٌ، وَقَدْ رَوَى النَّاسُ فِيهَا عَجَائِبَ لَمْ تَصِحَّ مِنْهَا: إِنَّهَا مَطَايَاكُمْ إِلَى الْجَنَّةِ
“কুরবানির ফজিলতে একটিও সহিহ হাদিস নেই। মানুষ এ সম্পর্কে অনেক আজগুবি কথা বর্ণনা করে, যার মধ্যে অন্যতম হলো: ‘কুরবানির পশু জান্নাতে যাওয়ার বাহন স্বরূপ’—এটিও সহিহ নয়।” [আরেযাতুল আহওয়াযী: ৬/২৮৮]
❑ বহুল প্রচলিত কিছু জইফ হাদিসের উদাহরণ:
◈ ১. “পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর নিকট মর্যাদার স্থানে পতিত হয়…” — এই হাদিসটি জইফ। এর বর্ণনাকারী সুলাইমান বিন ইয়াজিদ অত্যন্ত দুর্বল।
◈ ২. “পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি…” — এই হাদিসটির বর্ণনাকারী নুফাই ইবনুল হারিস মুহাদ্দিসগণের নিকট পরিত্যক্ত।
◈ ৩. “কুরবানির পশু পুলসিরাত পার হওয়ার বাহন হবে…” — এটিও অত্যন্ত জইফ হাদিস।
তবে জিলহজ মাসের প্রথম দশদিনের সাধারণ ফজিলত সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, যার অন্তর্ভুক্ত কুরবানিও একটি শ্রেষ্ঠ নেক আমল।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
مَا مِنْ أَيَّامٍ الْعَمَلُ الصَّالِحُ فِيهَا أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ – يَعْنِي أَيَّامَ الْعَشْرِ
“জিলহজ মাসের প্রথম দশকের নেক আমলের চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিকতর প্রিয় কোনো আমল নেই।” [সহিহ বুখারি]
❑ কুরবানি করার বিধান:
কুরবানি করা ওয়াজিব নাকি সুন্নাত—এ বিষয়ে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে দুটি মত রয়েছে:
• ইমাম আবু হানিফা (রাহিমাহুল্লাহ): সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর কুরবানি করা ওয়াজিব। তার নিকট ধনী বলতে তাকে বুঝায়, যে জাকাতের নেসাবের মালিক।
• জমহুর বা সংখ্যা গরিষ্ট আলেমের মতে: কুরবানি করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ; ওয়াজিব নয়।
দলিল: উম্মে সালামা (রাদিআল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
إِذَا دَخَلَتِ الْعَشْرُ وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ فَلَا يَمَسَّ مِنْ شَعَرِهِ وَبَشَرِهِ شَيْئًا
“জিলহজের (প্রথম) দশক প্রবেশ করলে তোমাদের মধ্যে যে কুরবানি দিতে ইচ্ছুক, সে যেন তার চুল এবং নখ না কাটে।” [সহিহ মুসলিম]
ইমাম শাফেয়ী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, এই হাদিসে “ইচ্ছুক” শব্দটি প্রমাণ করে যে কুরবানি ওয়াজিব নয়; কারণ ওয়াজিব হলে সেটি ইচ্ছা বা অনিচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া হতো না।
আবু বকর (রা.), উমর (রা.), আবু সাঈদ (রা:), আবু মাসউদ বাদারি (রা.), বিলাল (রা.) প্রমুখ সাহাবিগণ এই মতই প্রকাশ করতেন। [তাফসির কুরতুব]
ইমাম তিরমিজি বলেন:
العمل على هذا من أهل العلم أن الأضحية ليست واجبة ولكنها سنة من سنن النبي صلى الله عليه وسلم يستحب أن يعمل بها وهو قول سفيان الثوري وابن المبارك
“এর উপরই আহলে ইলমদের আমল রয়েছে যে, কুরবানি দেয়া ওয়াজিব নয়। তবে উহা নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর অন্যতম সুন্নাত যার উপর আমল করা মুস্তাহাব। ইহা সুফিয়ান সাওরি ও আব্দুল্লাহ বিনুল মুবারক প্রমুখদের কথা অভিমত।” [সুনান তিরমিজি ৪/৯২]
❑ কুরবানিদাতার জন্য করণীয়:
জিলহজ মাসের চাঁদ দেখার পর থেকে কুরবানি সম্পন্ন করা পর্যন্ত কুরবানিদাতার জন্য নখ-চুল ইত্যাদি কাটা হারাম। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
إِذَا رَأَيْتُمْ هِلَالَ ذِي الْحِجَّةِ، وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ، فَلْيُمْسِكْ عَنْ شَعْرِهِ وَأَظْفَارِهِ
“যখন তোমরা জিলহজের চাঁদ দেখবে এবং তোমাদের কেউ কুরবানি করার ইচ্ছা করবে, সে যেন তার চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকে।” [সহিহ মুসলিম]
যে কুরবানি দিবে না তার জন্য এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজন্য নয়।
❑ যে ৮ প্রকার পশুর কুরবানি শুদ্ধ হবে:
কুরবানির জন্য শরিয়ত নির্ধারিত নির্দিষ্ট চতুষ্পদ জন্তু বা ‘বাহিমাতুল আনআম’ হওয়া আবশ্যক। পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ ও মুসলিম উম্মাহর ঐক্যমত্যের (ইজমা) ভিত্তিতে কেবল নির্দিষ্ট আট প্রকার পশু দ্বারাই কুরবানি করা বৈধ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُمْ مِنْ بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ
“তারা যেন আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে ওই সমস্ত চতুষ্পদ জন্তুর ওপর (জবাই করার সময়) যা আল্লাহ তাদেরকে রিজিক হিসেবে প্রদান করেছেন।” [সূরা হজ: ৩]
সূরা আল আনআমের ১৪৩ ও ১৪৪ নম্বর আয়াতে এই চতুষ্পদ জন্তুর আটটি প্রকার (নর ও মাদি মিলিয়ে) স্পষ্ট করা হয়েছে। সেই অনুযায়ী
❑ কুরবানির যোগ্য পশুগুলো হলো:
◈ ১. ভেড়া বা দুম্বা (নর ও মাদি)
◈ ২. ছাগল (নর ও মাদি)
◈ ৩. গরু (নর ও মাদি)
◈ ৪. উট (নর ও মাদি)
ইমাম ইবনে আব্দুল বার রাহ. বলেন: “মুসলিমদের ঐক্যমত্যে (ইজমা) কেবল আট প্রকার পশু দ্বারাই কুরবানি করা যাবে। তা হলো: ভেড়া বা দুম্বা, ছাগল, উট এবং গরু (এগুলোর নর ও মাদি)।” [তাফসিরে কুরতুবি]
ইমাম শিরাজি (রাহ.) বলেন: “নির্দিষ্ট চতুষ্পদ জন্তু (উট, গরু, ছাগল ও ভেড়া) ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে কুরবানি আদায় হবে না।” [আল মুহাযযাব: ৮/৩৯২]
দ্রষ্টব্য: ইমাম ইবনুল মুনযির উল্লেখ করেছেন যে, হাসান বিন সালেহ বন্য গাভী বা নীলগাই দ্বারাও সাতজনের পক্ষে কুরবানি জায়েজ হওয়ার মত দিয়েছেন। তবে জমহুর বা অধিকাংশ ওলামায়ে কেরামের নিকট গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তুই কুরবানির জন্য সুনির্দিষ্ট।
❑ কুরবানির পশুর বয়স:
কুরবানির পশু শরিয়ত নির্ধারিত বয়সের হওয়া আবশ্যক। জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাদিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
لَا تَذْبَحُوا إِلَّا مُسِنَّةً، إِلَّا أَنْ يَعْسُرَ عَلَيْكُمْ، فَتَذْبَحُوا جَذَعَةً مِنَ الضَّأْنِ
“তোমরা ‘মুসিন্নাহ’ (দুধের দাঁত ভেঙে নতুন স্থায়ী দাঁত ওঠা পশু) ছাড়া জবাই করবে না। তবে তা জোগাড় করা যদি তোমাদের জন্য কষ্টকর হয়, তাহলে ছয় মাস বয়সী মেষ বা ভেড়া জবাই করতে পারো।” [সহিহ মুসলিম]
❑ বয়সভেদে কুরবানির পশুর তালিকা:
উক্ত হাদিসের আলোকে বিভিন্ন পশুর জন্য সর্বনিম্ন বয়সের যে মাপকাঠি নির্ধারিত হয়েছে তা নিচে দেওয়া হলো:
◈ উট: ৫ বছর পূর্ণ হতে হবে।
◈ গরু: ২ বছর পূর্ণ হতে হবে।
◈ ছাগল ও দুম্বা: ১ বছর পূর্ণ হতে হবে।
◈ ভেড়া ও মেষ: ১ বছর পূর্ণ হওয়া উত্তম। তবে বিশেষ কারণে বা কষ্টকর হলে অন্তত ৬ মাস বা তদূর্ধ্ব (যা দেখতে এক বছর বয়সীর মতো মনে হয়) হতে হবে।
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম নওয়াবি (রাহ.) বলেন, “অত্র হাদিসে সুস্পষ্ট যে, ভেড়া বা মেষ ছাড়া অন্য কোনো পশুর ‘জাযআ’ (যেমন: ছয় মাসের ছাগল বা এক বছরের গরু) দিয়ে কুরবানি করা কোনো অবস্থাতেই জায়েজ হবে না।” [শরহু সহিহ মুসলিম]
(উপরোক্ত লেখাটি শাইখ আখতারুল আমান বিন আব্দুস সালাম মাদানি (হাফিযাহুল্লাহ) রচিত ‘কুরবানির মাসায়েল’ শীর্ষক প্রবন্ধ থেকে সংক্ষিপ্ত ও সামান্য পরিমার্জন সহকারে গ্রহণ করা হয়েছে)
❑ কুরবানির পশুতে যেসব ত্রুটি থাকলে কুরবানি শুদ্ধ হবে না:
কুরবানির পশু সুঠাম ও ত্রুটিমুক্ত হওয়া আবশ্যক। চারটি ত্রুটি থাকলে সেই পশু দিয়ে কুরবানি জায়েজ হবে না। হাদিসে এসেছে,
عَنْ بَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَامَ فِينَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «أَرْبَعٌ لَا تَجُوزُ فِي الْأَضَاحِيِّ: الْعَوْرَاءُ الْبَيِّنُ عَوَرُهَا، وَالْمَرِيضَةُ الْبَيِّنُ مَرَضُهَا، وَالْعَرْجَاءُ الْبَيِّنُ ظَلْعُهَا، وَالْكَسِيرَةُ الَّتِي لَا تُنْقِي»
প্রখ্যাত সাহাবি বারা ইবনে আযিব (রাদিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের মাঝে দাঁড়ালেন এবং বললেন,
“পশুতে চারটি ত্রুটি থাকলে তা দ্বারা কুরবানি করা জায়েজ নয়:
◈ ১. এমন স্পষ্ট অন্ধ, যার অন্ধত্ব প্রকাশ্য।
◈ ২. এমন স্পষ্ট রোগাক্রান্ত, যার অসুস্থতা প্রকাশ্য।
◈ ৩. এমন স্পষ্ট খোঁড়া, যার খোঁড়াত্ব প্রকাশ্য।
◈ ৪. এবং এমন হাড্ডিসার দুর্বল পশু, যার হাড়ে কোনও মজ্জা বা গোশত অবশিষ্ট নেই।” [সুনানে [তিরমিজি, হাদিস নং: ১৪৯৭, ইমাম তিরমিজি (রাহিমাহুল্লাহ): হাদিসটিকে “হাসান সহিহ” বলেছেন। মুহাদ্দিস আলবানি হাদিসটিকে “সহিহ” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন]
সুতরাং এ চারটি ত্রুটির বাইরে যদি পশুর শিং ভাঙ্গা, কানকাটা বা শরীর আহত হয় কিংবা সামান্য খোঁড়া বা সামান্য দোষত্রুটি থাকে তাতে কুরবানি শুদ্ধ হতে কোনও সমস্যা নেই। যদিও উত্তম হল, ত্রুটিমুক্ত সুস্থ ও সবল পশু কুরবানি দেওয়া।
❑ কুরবানির সময়:
ঈদের নামাজের পর থেকে কুরবানির সময় শুরু হয়। এর আগে জবাই করলে তা কুরবানি হিসেবে গণ্য হবে না বরং তা সাধারণ গোশত হিসেবে গণ্য হবে। জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কুরবানি করা যায়। তবে উত্তম হলো ১০ই জিলহজ জবাই করা।
❑ জবাই করার নিয়ম ও দোয়া:
জবাই করার সময় পশুকে কিবলা মুখী করে শোয়ানো সুন্নত। অতঃপর জবাই কারী পশুর গলার ছুটি চালানোর পূর্বে বলবেন:
بِسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُمَّ هَذَا مِنْكَ وَلَكَ، اللَّهُمَّ تَقَبَّلْ مِنِّي
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার, আল্ল-হুম্মা হাযা মিনকা ওয়া লাকা, আল্ল-হুম্মা তাক্বাব্বাল মিন্নী।
অর্থ: “আল্লাহর নামে এবং আল্লাহ সবচেয়ে বড়। হে আল্লাহ, এটি তোমার পক্ষ থেকেই এবং তোমারই জন্য। হে আল্লাহ, তুমি আমার পক্ষ থেকে এটি কবুল করো।”
◈ অথবা বলবেন:
بِسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُمَّ هَذَا عَنِّي وَعَنْ أَهْلِ بَيْتِي
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা হাযা ‘আন্নী ওয়া ‘আন আহলি বাইতী।
অর্থ: “হে আল্লাহ, এটি আমার পক্ষ থেকে এবং আমার পরিবারের পক্ষ থেকে।”
◈ অথবা শুধু بِسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ، (বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার) বলাও যথেষ্ট। [সহিহ মুসলিম, হা/১৯৬৬]
❑ গোশত বণ্টন ও চামড়া:
কুরবানির গোশত নিজে খাওয়া, আত্মীয়-স্বজনকে উপহার দেওয়া এবং অভাবগ্রস্তদের দান করা মুস্তাহাব। সাধারণ নিয়ম হলো গোশতকে তিন ভাগে ভাগ করা। তবে চামড়া বা গোশত কসাইকে তার পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েজ নয়।
চামড়া নিজে ব্যবহার করা যায় অথবা এর মূল্য সদকা করে দিতে হয়।
❑ অংশীদারিতে কুরবানি:
গরু, মহিষ বা উটের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাতজন মিলে একটি পশু কুরবানি দেওয়া যায়। জাবির (রাদিআল্লাহু আনহু) বলেন:
نَحَرْنَا مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْعَامَ الْحُدَيْبِيَةِ الْبَدَنَةَ عَنْ سَبْعَةٍ، وَالْبَقَرَةَ عَنْ سَبْعَةٍ
“আমরা হুদায়বিয়ার বছর রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে উট ও গরু সাতজনের পক্ষ থেকে জবাই করেছিলাম।” [সহিহ মুসলিম]
عَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: «الْبَقَرَةُ عَنْ سَبْعَةٍ». قُلْتُ: فَإِنْ وَلَدَتْ؟ قَالَ: «اذْبَحْ وَلَدَهَا مَعَهَا». قُلْتُ: فَالْعَرْجَاءُ؟ قَالَ: «إِذَا بَلَغَتِ الْمَنْسِكَ». قُلْتُ: فَمَكْسُورَةُ الْقَرْنِ؟ قَالَ: «لَا بَأْسَ، أُمِرْنَا – أَوْ أَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – أَنْ نَسْتَشْرِفَ الْعَيْنَيْنِ وَالْأُذُنَيْنِ».
আলি (রাদিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “একটি গরু সাতজনের পক্ষ থেকে যথেষ্ট।”
আমি (বর্ণনাকারী) জিজ্ঞেস করলাম, “যদি পশুটি বাচ্চা প্রসব করে (তাহলে কী করণীয়)?” তিনি বললেন, “তার বাচ্চাকেও তার সাথেই জবাই করো।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “যদি খোঁড়া হয়?”
তিনি বললেন, “যদি তা কুরবানির স্থান পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে (তবে জবাই করো)।”
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, “যদি শিং ভাঙা হয়?”
তিনি বললেন, “এতে কোনও অসুবিধা নেই। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন—কিংবা (তিনি বলেছেন) আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—আমরা যেন (কুরবানির পশুর) চোখ ও কান ভালোভাবে পরীক্ষা করে নিই।”
[সহিহ ইবনে খুযাইমাহ, খণ্ড/পৃষ্ঠা: ২৯১৫, সহিহ-শাইখ আলবানি এটিকে সহিহ বলেছেন]
মোটকথা, সফর হোক বা আবাস হোক গরু বা উটে সর্বোচ্চ সাতভাগে কুরবানি করা জায়েজ।
অনুরূপভাবে এক ব্যক্তি হোক বা এক পরিবার হোক সর্বাবস্থায় তা জায়েজ।
❑ জবাহ করার কতিপয় আদব:
১. পশুর সামনে ছুরি ধার না দেওয়া।
২. এক পশুর সামনে অন্য পশুকে জবাই না করা।
৩. পশুকে আরামদায়ক ভাবে শোয়ানো এবং দ্রুত জবাই সম্পন্ন করা যাতে পশু বেশিক্ষণ কষ্ট না পায়।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
إِنَّ اللهَ كَتَبَ الْإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ… وَإِذَا ذَبَحْتُمْ فَأَحْسِنُوا الذِّبْحَةَ، وَلْيُحِدَّ أَحَدُكُمْ شَفْرَتَهُ، وَلْيُرِحْ ذَبِيحَتَهُ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ে দয়া ও অনুগ্রহ (ইহসান) আবশ্যক করেছেন… সুতরাং যখন তোমরা জবাই করবে তখন উত্তম পদ্ধতিতে জবাই করো। তোমাদের প্রত্যেকে যেন তার ছুরি ধার করে নেয় এবং জবাইকৃত পশুকে আরাম দেয়।” [সহিহ মুসলিম]
❑ মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানি:
মৃত ব্যক্তির যদি কোনও অসিয়ত না থাকে তবে তার পক্ষ থেকে আলাদা কুরবানি করার চেয়ে জীবিত ব্যক্তি নিজের কুরবানির সওয়াবে তাকে শামিল করে নেওয়াই উত্তম। তবে অসিয়ত থাকলে বা বিশেষ প্রয়োজনে পৃথক কুরবানি করাও জায়েজ।
❑ পশুর গর্ভজাত বাচ্চা:
কুরবানির পশু জবাই করার পর যদি তার পেটে জীবিত বাচ্চা পাওয়া যায় তবে সেটিও জবাই করে খাওয়া যাবে। আর যদি মৃত পাওয়া যায় তবে সেটি ফেলে দিতে হবে। (পূর্বোল্লিখিত আলি (রা.)-এর হাদিস)
❑ কুরবানির গোশত ও কসাইয়ের পারিশ্রমিক:
কুরবানির পশুর কোনও অংশ—চাই তা গোশত হোক বা হাড় কিংবা চামড়া—কসাইকে তার কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েজ নাই।
আলি (রাদিআল্লাহু আনহু) বলেন:
أَمَرَنِي رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ… أَنْ لَا أُعْطِيَ فِي جِزَارَتِهَا مِنْهَا شَيْئًا
“রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন… আমি যেন কসাইকে কুরবানির পশুর কোনও অংশ পারিশ্রমিক হিসেবে না দিই।” [সহিহ বুখারি ও মুসলিম]
পারিশ্রমিক হিসেবে কসাইকে পৃথকভাবে টাকা বা অন্য কিছু দিতে হবে। তবে উপহার হিসেবে তাকে গোশত দেওয়া যাবে।
❑ বিবিধ মাসায়েল:
◈ ঋণ করে কুরবানি: যদি কারো ঋণ পরিশোধ করার পর কুরবানি করার সামর্থ্য থাকে তবেই সে কুরবানি করবে। তবে ঋণের দায়ভার থাকলে আগে ঋণ পরিশোধ করা জরুরি।
◈ বিদেশে কুরবানি: কোনও ব্যক্তি যদি প্রবাসে থাকেন তবে তিনি চাইলে সেখানেও কুরবানি দিতে পারেন অথবা দেশে টাকা পাঠিয়ে নিজের পক্ষ থেকে কুরবানি করাতে পারেন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সহিহ সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
Share: