রাদিয়াল্লাহু আনহু বলার বিধান কি কেবল সাহাবিদের জন্য নির্দিষ্ট

‘​’রাদিয়াল্লাহু আনহু’ (আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হন) বলার বিধান কি কেবল সাহাবিদের জন্য নির্দিষ্ট নাকি অন্যদের জন্যও তা বলা যাবে? বিজ্ঞ আলেমদের ফতোয়ার আলোকে এই বিষয়টি নিম্নে উপস্থাপন করা হলো। وبالله التوفيق
▪️১. আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন (রহ.):
​প্রশ্ন: ​”রাদিয়াল্লাহু আনহু” (رضي الله عنه ‘আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট হন’) বলা কি সবার জন্য প্রযোজ্য নাকি এটি বিশেষভাবে শুধু সাহাবিদের জন্য নির্দিষ্ট?
​উত্তর:
لا ، هي عامة لكل أحد نسأل الله له الرضا قال الله عز وجل: ﴿والسابقون الأولون من المهاجرين والأنصار والذين اتبعوهم بإحسان رضي الله عنهم ورضوا عنه﴾. لكن جرى الاصطلاح العرفي بين العلماء أن الترضي يكون على الصحابة فقط، والترحم على من بعدهم فيقال عن عمر: رضي الله عنه ويقال لعمر بن عبد العزيز: رحمه الله ولا يقال: رضي الله عنه، هذا في الاصطلاح بين العلماء، وهو اصطلاحٌ عرفي ليس اصطلاحاً شرعياً، بمعنى أنه ليس من إرشاد النبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم أن نقول للصحابة رضي الله عنهم ولغيرهم: رحمهم الله بل هذا شيء جرى عليه الناس فلا ينبغي أن يخرج الإنسان عن المألوف؛ لأنه لو قال مثلاً: عمر بن عبد العزيز رضي الله عنه لفهم السامع أنه صحابي بناءً على العرف المضطرد.
“​না, এটি বিশেষভাবে শুধু সাহাবিদের জন্য নির্দিষ্ট নয়। এটি সাধারণভাবে যেকোনো মুসলিমের জন্য বলা যেতে পারে। কারণ এর মাধ্যমে আমরা আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তির জন্য সন্তুষ্টি কামনা করি।
​আল্লাহ তাআলা বলেন:
​وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ
​”মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা অগ্রগামী এবং যারা সুন্দরভাবে তাদের অনুসরণ করেছে আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন।” [সূরা তাওবাহ: ১০০]
​তবে আলিমদের মাঝে প্রচলিত একটি সুন্দর রীতি হলো, “তারাযযি” (রাদিয়াল্লাহু আনহু বলা) সাধারণত সাহাবিদের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়। আর তাদের পরবর্তী যুগের সৎ ব্যক্তিদের জন্য “তারাহহুম” (রহিমাহুল্লাহ বা আল্লাহ তার উপর রহমত করুন) ব্যবহার করা হয়।
​উদাহরণস্বরূপ:
​সাহাবি উমর সম্পর্কে বলা হয়: উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু।
​কিন্তু পরবর্তী যুগের খলিফা উমর ইবন আব্দুল আজিজ সম্পর্কে বলা হয়: উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রাহিমাহুল্লাহ।
​এখানে সাধারণত ‘রাদিয়াল্লাহু আনহু’ বলা হয় না। তবে এটি আলিমদের মাঝে একটি প্রচলিত রীতি বা পরিভাষা মাত্র; শরিয়তের নির্ধারিত কোনো বাধ্যতামূলক বিধান নয়। অর্থাৎ এটি এমন কিছু নয় যে, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, সাহাবিদের জন্য “রাদিয়াল্লাহু আনহু” আর অন্যদের জন্য “রহিমাহুল্লাহ” বলতে হবে। বরং এটি মানুষের মাঝে প্রচলিত একটি পরিভাষা। তাই সাধারণত এই প্রচলিত পদ্ধতি থেকে ভিন্ন হওয়া ঠিক নয়। কারণ কেউ যদি বলেন “উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রাদিয়াল্লাহু আনহু”, তাহলে প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী শ্রোতার মনে হতে পারে যে, তিনি হয়তো একজন সাহাবি। কারণ সাধারণভাবে এই শব্দটি সাহাবিদের ক্ষেত্রেই সর্বপ্রথম মাথায় আসে। ​আল্লাহই সবচেয়ে বেশি জানেন।
▪️২. আল্লামা ইবনে বায (রহ.)-এর ফতোয়া (সৌদি আরবে ইসলামি প্রশ্ন-উত্তর মূলক রেডিও প্রোগ্রাম “নূরুন আলাদ দারব”):
সাহাবি ও তাবেয়িদের জন্য রাদিয়াল্লাহু আনহু বলার বৈধতা:
প্রশ্ন: পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ থেকে প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন: হে সম্মানিত শায়খ! আমাদের জানা মতে, যখনই সাহাবিদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) নাম আসে কিংবা পড়ার সময় তাদের উল্লেখ থাকে তখন আমাদের ‘রাদিয়াল্লাহু আনহুম’ বলা কর্তব্য। কিন্তু যদি কোনো তাবেয়ি কিংবা সালাফে-সালেহিনের কারও নাম আসে এবং আমরা তখনও ‘রাদিয়াল্লাহু আনহুম’ বলি তবে কি তাতে কোনো গুনাহ বা সমস্যা হবে?
উত্তর:
لَيْسَ فِي هَذَا حَرَجٌ إِذَا قَالَ:  عَنِ الْمُؤْمِنِينَ وَلَوْ كَانُوا مِنَ التَّابِعِينَ أَوْ أَتْبَاعِ التَّابِعِينَ، وَلَكِنِ اشْتَهَرَ الْعُرْفُ بَيْنَ أَهْلِ الْعِلْمِ التَّرَضِّي عَنِ الصَّحَابَةِ، وَالتَّرَحُّمُ عَلَى مَنْ بَعْدَهُمْ وَالْأَمْرُ فِي هَذَا وَاسِعٌ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، فَإِذَا ذُكِرَ الصَّحَابِيُّ قَالَ:  (رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ) وَإِذَا قِيلَ التَّابِعِيُّ وَغَيْرُهُ مِنْ أَهْلِ الْعِلْمِ وَالْأَخْيَارِ مِنَ الْمُسْلِمِينَ قِيلَ: رَحِمَهُ اللَّهُ، وَلَوْ قِيلَ:  فَلَا حَرَجَ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، كُلُّهُ طَيِّبٌ
“মুমিনদের ক্ষেত্রে এমনটি বলাতে কোনো সমস্যা নেই তারা তাবেয়ি কিংবা তাবে-তাবেয়ি যে-ই হোন না কেন। তবে আলেমদের মাঝে প্রচলিত রীতি হলো—সাহাবিদের জন্য ‘রাদিয়াল্লাহু আনহু’ বলা এবং তাদের পরবর্তী যুগের মানুষদের জন্য আল্লাহর রহমত কামনা করা (রহিমাহুল্লাহ বলা)। এই বিষয়টি বেশ প্রশস্ত, আলহামদুলিল্লাহ। তাই সাহাবিদের কথা উল্লেখ হলে বলা হবে ‘রাদিয়াল্লাহু আনহু’ এবং তাবেয়ি কিংবা অন্যান্য আলেম ও সৎ মুসলিমদের ক্ষেত্রে বলা হবে ‘রহিমাহুল্লাহ’। তবে যদি তাদের ক্ষেত্রেও ‘রাদিয়াল্লাহু আনহু’ বলা হয়, তাতে কোনো অসুবিধা নেই, আলহামদুলিল্লাহ, সবই উত্তম।
▪️ইসলাম ওয়েব:
​প্রশ্ন: আমরা সাহাবিদের ক্ষেত্রে কেন “রাদিয়াল্লাহু আনহুম (আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হন)” বলি?
উত্তর:
نَقُولُ: ذَلِكَ لِأَنَّ اللَّهَ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى أَخْبَرَنَا أَنَّهُ رَضِيَ عَنْهُمْ. قَالَ تَعَالَى: لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ [الفتح: ١٨]. وَكَانُوا أَلْفًا وَأَرْبَعَمِائَةٍ. وَقَالَ تَعَالَى: وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ [التوبة: ١٠٠].
​وَأَمَّا غَيْرُ الصَّحَابَةِ، فَهَلْ يَجُوزُ أَنْ يُقَالُ فِي حَقِّهِمْ “رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ”؟ فَقَدِ اخْتَلَفَ الْعُلَمَاءُ فِي ذَلِكَ، وَالَّذِي عَلَيْهِ الْجُمْهُورُ اسْتِحْبَابُ التَّرَضِّي عَنْ غَيْرِ الصَّحَابَةِ أَيْضًا مِنَ الْعُلَمَاءِ وَالْعُبَّادِ وَالصَّالِحِينَ، وَيَكُونُ هَذَا مِنْ بَابِ الدُّعَاءِ، وَهَذَا اخْتِيَارُ النَّوَوِيِّ رَحِمَهُ اللَّهُ.
​(يُسْتَحَبُّ التَّرَضِّي وَالتَّرَحُّمُ عَلَى الصَّحَابَةِ وَالتَّابِعِينَ فَمَنْ بَعْدَهُمْ مِنَ الْعُلَمَاءِ وَالْعُبَّادِ وَسَائِرِ الْأَخْيَارِ، فَيُقَالُ: رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَوْ رَحْمَةُ اللَّهِ عَلَيْهِ، أَوْ رَحِمَهُ اللَّهُ وَنَحْوُ ذَلِكَ. وَأَمَّا مَا قَالَهُ بَعْضُ الْعُلَمَاءِ: إِنَّ قَوْلَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ مَخْصُوصٌ بِالصَّحَابَةِ وَيُقَالُ فِي غَيْرِهِمْ رَحِمَهُ اللَّهُ فَقَطْ، فَلَيْسَ كَمَا قَالَ وَلَا يُوَافَقُ عَلَيْهِ، بَلِ الصَّحِيحُ الَّذِي عَلَيْهِ الْجُمْهُورُ اسْتِحْبَابُهُ، وَدَلَائِلُهُ أَكْثَرُ مِنْ أَنْ تُحْصَى).
“আমরা এটি বলি কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নিজেই আমাদের জানিয়েছেন যে, তিনি তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
​لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ
​”অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন যখন তারা গাছের নিচে আপনার কাছে বাইয়াত (শপথ) গ্রহণ করছিল।” [সূরা ফাতহ: ১৮] ​তারা সংখ্যায় ছিলেন চৌদ্দশত।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
​وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ
​”মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা অগ্রগামী এবং যারা সুন্দরভাবে তাদের অনুসরণ করেছে আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন।” [সূরা তাওবা: ১০০]
▪️সাহাবি ছাড়া অন্যান্যদের ক্ষেত্রে তা বলা জায়েজ কিনা?
​সাহাবি ছাড়া অন্যদের ক্ষেত্রে কি “রাদিয়াল্লাহু আনহুম” বলা জায়েজ? এ বিষয়ে ওলামাদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। তবে জুমহুর (অধিকাংশ) ওলামাদের মত হলো—সাহাবি ছাড়াও অন্যান্য আলেম, ইবাদতকারী ও নেককার বান্দাদের জন্য “তারাযযি” (রাদিয়াল্লাহু আনহু বলা) বলা মুস্তাহাব। এটি মূলত দোয়ার অংশ হিসেবে গণ্য হবে।” ইমাম নওয়াবি (রহ.) এই মতটিই পছন্দ করেছেন। তিনি বলেন:
সাহাবি, তাবেয়ি এবং তাদের পরবর্তী যুগের আলেম, ইবাদত গুজার ও অন্যান্য সৎ ব্যক্তিদের জন্য ‘রাদিয়াল্লাহু আনহু’ বলা এবং রহমত কামনা করা মুস্তাহাব।
সুতরাং বলা যাবে: ‘রাদিয়াল্লাহু আনহু’ বা ‘রহমাতুল্লাহি আলাইহি’ বা ‘রহিমাহুল্লাহ’ ইত্যাদি।
আর কোনো কোনো আলেম যে বলেছেন—’রাদিয়াল্লাহু আনহু’ বলাটা কেবল সাহাবিদের জন্যই নির্দিষ্ট এবং অন্যদের ক্ষেত্রে শুধু ‘রহিমাহুল্লাহ’ বলা যাবে—তাদের এই বক্তব্য সঠিক নয় এবং এর সাথে একমত হওয়া যায় না। বরং জুমহুর ওলামাদের সঠিক মত হলো এটি মুস্তাহাব, আর এর সপক্ষে এত প্রমাণ রয়েছে যা গণনা করে শেষ করা যাবে না।” [ইমাম নওয়াবির আল মাজমু ৬/১৭২]
মোটকথা, ‘রাদিয়াল্লাহু আনহু’ বলা কেবল সাহাবিদের জন্য নির্দিষ্ট নয় বরং যেকোনো সাধারণ মুসলিম বা সৎ ব্যক্তির জন্য দোয়ার উদ্দেশ্যে বলা জায়েজ। তবে আলেমদের প্রচলিত পরিভাষা ও সামাজিক রীতির কারণে সাহাবিদের জন্য ‘রাদিয়াল্লাহু আনহু’ এবং পরবর্তী যুগের আলেম ও নেককারদের জন্য ‘রহিমাহুল্লাহ’ বলাই উত্তম, যেন সাধারণ শ্রোতার মনে কোনো বিভ্রান্তি তৈরি না হয়। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
Share: