এখানে আকিদা বিশেষজ্ঞ আলেমদের ব্যাখ্যার আলোকে আকিদার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হাশরের ময়দান-সংশ্লিষ্ট ‘কানতারা’ ও ‘পুলসিরাত’-এর পরিচয় এবং এ দুটির পার্থক্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
❑ ১. কানতারা কী?
আরবিতে ‘কানতারা’ (القَنْطَرَة) শব্দটি সেতু (الجِسْر) অর্থে ব্যবহৃত হয়, যেমনটি সুপ্রসিদ্ধ আরবি অভিধান লিসানুল আরবে উল্লেখিত হয়েছে। ইমাম আইনি সহিহ বুখারির ব্যাখ্যাগ্রন্থে কানতারা সংক্রান্ত হাদিসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইবনুত-তীনের উক্তি উদ্ধৃত করে বলেন,
«اَلْقَنْطَرَةُ كُلُّ شَيْءٍ يُنْصَبُ عَلَى عَيْنٍ أَوْ وَادٍ»
“কানতারা বলতে বোঝায় এমন যেকোনো কিছু, যা কোনও ঝরনা বা উপত্যকার ওপর স্থাপিত হয়।” এ সংক্রান্ত হাদিস:
সহিহ বুখারির বিশুদ্ধ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আবু সাইদ খুদরি (রা.) হতে বর্ণিত। নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: (( يَخْلُصُ الْمُؤْمِنُونَ مِنَ النَّارِ، فَيُحْبَسُونَ عَلَى قَنْطَرَةٍ بَيْنَ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ، فَيُقَصُّ لِبَعْضِهِمْ مِنْ بَعْضٍ مَظَالِمُ كَانَتْ بَيْنَهُمْ فِي الدُّنْيَا، حَتَّى إِذَا هُذِّبُوا وَنُقُّوا أُذِنَ لَهُمْ فِي دُخُولِ الْجَنَّةِ، فَوَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَأَحَدُهُمْ أَهْدَى بِمَنْزِلِهِ فِي الْجَنَّةِ مِنْهُ بِمَنْزِلِهِ كَانَ فِي الدُّنْيَا ))
“মুমিনরা যখন জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে তখন তাদেরকে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী একটি কানতারায় (সেতুতে) আটকে দেওয়া হবে। সেখানে দুনিয়ায় তাদের মধ্যে যে পারস্পরিক জুলুম ও অন্যায়-অবিচার হয়েছিল তার কিসাস (বদলা) নেওয়া হবে। যখন তারা পবিত্র ও পরিশুদ্ধ হয়ে যাবে তখন তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। যাঁর হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, তাঁর কসম! জান্নাতে তাদের নিজেদের আবাসের পথ দুনিয়ার আবাসের চেয়েও অধিক পরিচিত হবে।” [সহিহ বুখারি, ২৪৪০]
❑ কানতারা: জান্নাতে প্রবেশের পূর্বে জান্নাতগামী সৌভাগ্যবান মুমিনদের আত্মিক পরিশুদ্ধির বিশেষ স্থান যেসব মুমিন পুলসিরাতের মতো ভয়াবহ সেতু অতিক্রম করে জান্নাতে প্রবেশের কাছাকাছি পৌঁছে যাবেন
তাদের পারস্পরিক মনের পরিচ্ছন্নতার জন্য কিসাসের ব্যবস্থা করা হবে। তার ধরন কী হবে, সে ব্যাপারে এই যুগের অন্যতম মহান ফকিহ ইমাম মুহাম্মদ বিন সালেহ ইবনে উসাইমিন (রাহ.) বলেন—
«هَذَا الْقِصَاصُ غَيْرُ الْقِصَاصِ الْأَوَّلِ الَّذِي فِي عَرَصَاتِ الْقِيَامَةِ، لِأَنَّ هَذَا قِصَاصٌ أَخَصُّ؛ لِأَجْلِ أَنْ يَذْهَبَ الْغِلُّ وَالْحِقْدُ وَالْبَغْضَاءُ الَّتِي فِي قُلُوبِ النَّاسِ، فَيَكُونُ هَذَا بِمَنْزِلَةِ التَّنْقِيَةِ وَالتَّطْهِيرِ، وَذَلِكَ لِأَنَّ مَا فِي الْقُلُوبِ لَا يَزُولُ بِمُجَرَّدِ الْقِصَاصِ.
فَهَذِهِ الْقَنْطَرَةُ الَّتِي بَيْنَ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ؛ لِأَجْلِ تَنْقِيَةِ مَا فِي الْقُلُوبِ، حَتَّى يَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَيْسَ فِي قُلُوبِهِمْ غِلٌّ؛ كَمَا قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: ﴿وَنَزَعْنَا مَا فِي صُدُورِهِمْ مِنْ غِلٍّ إِخْوَانًا عَلَى سُرُرٍ مُتَقَابِلِينَ»
“এই কিসাস বা বদলা গ্রহণ কিয়ামতের ময়দানের প্রথম কিসাসের চেয়ে ভিন্ন। কারণ এটি মানুষের অন্তরে থাকা হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা দূর করার জন্য এক বিশেষ ব্যবস্থা। এটি পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্র করনের মতো বিষয়। কারণ অন্তরের বিষয়গুলো নিছক কিসাস বা বদলা গ্রহণের মাধ্যমে দূর হয় না। সুতরাং জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী এই কানতারাটি অন্তরের ময়লা পরিষ্কার করার জন্য, যাতে তারা জান্নাতে প্রবেশের সময় তাদের অন্তরে কোনও হিংসা-বিদ্বেষ না থাকে; যেমনটি মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَنَزَعْنَا مَا فِي صُدُورِهِمْ مِنْ غِلٍّ إِخْوَانًا عَلَى سُرُرٍ مُتَقَابِلِينَ
‘আমি তাদের অন্তর থেকে হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে দেব, তারা ভাই ভাই হয়ে মুখোমুখি আসনে অবস্থান করবে।’ [সূরা হিজর: ৪৭]
✪ তিনি আরও বলেন—
«إِذَا عَبَرُوا عَلَى الصِّرَاطِ وُقِفُوا عَلَى قَنْطَرَةٍ بَيْنَ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ، فَيُقْتَصُّ مِنْ بَعْضِهِمْ لِبَعْضٍ، وَهَذَا الْقِصَاصُ غَيْرُ الْقِصَاصِ الَّذِي يَكُونُ فِي عَرَصَاتِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ، هَذَا الْقِصَاصُ -وَاللَّهُ أَعْلَمُ- يُرَادُ بِهِ أَنْ تَتَخَلَّى الْقُلُوبُ مِنَ الْأَضْغَانِ وَالْأَحْقَادِ وَالْغِلِّ، حَتَّى يَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَهُمْ عَلَى أَكْمَلِ حَالٍ، وَذَلِكَ أَنَّ الْإِنْسَانَ وَإِنِ اقْتُصَّ لَهُ مِمَّنِ اعْتَدَى عَلَيْهِ فَلَا بُدَّ أَنْ يَبْقَى فِي قَلْبِهِ شَيْءٌ مِنَ الْغِلِّ وَالْحِقْدِ عَلَى الَّذِي اعْتَدَى عَلَيْهِ، وَلَكِنَّ أَهْلَ الْجَنَّةِ لَا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى يُقْتَصَّ لَهُمُ اقْتِصَاصًا كَامِلًا، فَيَدْخُلُونَهَا عَلَى أَحْسَنِ وَجْهٍ، فَإِذَا هُذِّبُوا وَنُقُّوا أُذِنَ لَهُمْ فِي دُخُولِ الْجَنَّةِ»
“মুমিনরা যখন সিরাত পার হয়ে যাবে তখন জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী কানতারায় তাদের আটকে রাখা হবে। সেখানে একে অপরের মধ্যে পাওনা ও ক্ষোভের কিসাস বা হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করা হবে। এই কিসাস কিন্তু কেয়ামতের ময়দানের সাধারণ কিসাসের মতো নয়।—আল্লাহই ভালো জানেন—এই কিসাসের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের হৃদয় থেকে যাবতীয় শত্রুতা, ক্ষোভ আর হিংসা ধুয়ে মুছে সাফ করে দেওয়া; যেন সবাই সম্পূর্ণ নিখুঁত ও নির্মল মন নিয়ে জান্নাতে পা রাখতে পারেন। কারণ সাধারণ নিয়মে কারো থেকে জুলুমের প্রতিশোধ নেওয়ার পরও অন্তরে কিছুটা না পাওয়ার বেদনা বা বিদ্বেষের রেশ রয়েই যায়। কিন্তু জান্নাতবাসীরা পূর্ণাঙ্গভাবে পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত জান্নাতে ঢুকবেন না, যাতে তাদের প্রবেশটা হয় সবচেয়ে প্রফুল্ল ও সুন্দর অবস্থায়। অতএব, যখন তারা পুরোপুরি নিষ্কলুষ ও পরিশুদ্ধ হয়ে [শারহু রিয়াদুস সালিহিন, ১/৪৭০]
✪ শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন—
«اَلنُّفُوسُ الْخَبِيثَةُ لَا تَصْلُحُ أَنْ تَكُونَ فِي الْجَنَّةِ الطَّيِّبَةِ الَّتِي لَيْسَ فِيهَا مِنَ الْخَبَثِ شَيْءٌ، فَإِنَّ ذَلِكَ مُوجِبٌ لِلْفَسَادِ أَوْ غَيْرُ مُمْكِنٍ، بَلْ إِذَا كَانَ فِي النَّفْسِ خَبَثٌ طُهِّرَتْ، وَهُذِّبَتْ حَتَّى تَصْلُحَ لِسُكْنَى الْجَنَّةِ، وَالتَّهْذِيبُ التَّخْلِيصُ كَمَا يُهَذَّبُ الذَّهَبُ فَيُخَلَّصُ مِنَ الْغِشِّ، يُشِيرُ إِلَى قَوْلِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: “حَتَّى إِذَا هُذِّبُوا” فَتَبَيَّنَ أَنَّ الْجَنَّةَ إِنَّمَا يَدْخُلُهَا الْمُؤْمِنُونَ بَعْدَ التَّهْذِيبِ وَالتَّنْقِيَةِ مِنْ بَقَايَا الذُّنُوبِ، فَكَيْفَ بِمَنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ حَسَنَاتٌ يَعْبُرُ بِهَا الصِّرَاطَ»
“অপবিত্র আত্মাসমূহ পবিত্র জান্নাতে বসবাসের উপযোগী নয়, যেখানে কোনোপ্রকার কলুষতার অস্তিত্ব নেই। কেননা তা জান্নাতের পরিবেশকে ক্ষুণ্ণ করবে, যা মোটেও সম্ভব নয়। বরং আত্মায় কোনও মলিনতা থাকলে তা পরিশুদ্ধ ও পরিমার্জিত করা হবে যতক্ষণ না তা জান্নাতে বসবাসের যোগ্য হয়ে ওঠে। এই ‘তাহজিব’ বা পরিশোধন প্রক্রিয়ার অর্থ হলো খাদ মুক্ত করে খাঁটি করা—যেমন সোনাকে গলিয়ে তার ভেজাল দূর করা হয়। এটি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সেই বাণী ‘যতক্ষণ না তারা পরিশুদ্ধ হবে’-এর দিকেই ইঙ্গিত করে। অতএব এটি স্পষ্ট যে, মুমিনরা নিজেদের ছোটখাটো ভুলত্রুটি ও পাপের অবশিষ্টাংশ থেকে পুরোপুরি পরিচ্ছন্ন ও খাঁটি হওয়ার পরেই কেবল জান্নাতে পা রাখবেন। তাহলে যার কাছে পুলসিরাত পার হওয়ার মতোই পর্যাপ্ত নেকি নেই তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হবে!” [মাজমুউল ফাতাওয়া, ১৪/৩৪৫]
✪ তিনি আরও বলেন,
فَمَنْ مَرَّ عَلَى الصِّرَاطِ دَخَلَ الْجَنَّةَ فَإِذَا عَبَرُوا عَلَيْهِ وُقِفُوا عَلَى قَنْطَرَةٍ بَيْنَ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ فَيُقْتَصُّ لِبَعْضِهِمْ مِنْ بَعْضٍ فَإِذَا هُذِّبُوا وَنُقُّوا أُذِنَ لَهُمْ فِي دُخُولِ الْجَنَّةِ
“যারা পুলসিরাত অতিক্রম করতে সক্ষম হবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। তবে যখন তারা পুলসিরাত পার হবে তখন তাদেরকে জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝখানে একটি সেতুর উপর থামানো হবে। এখানে তাদের একজন থেকে অপরজনের কিসাস বা বদলা গ্রহণ করা হবে। অতঃপর যখন তাদেরকে পারস্পরিক জুলুম থেকে পরিশুদ্ধ ও পরিষ্কার করা হবে তখন তাদেরকে জান্নাতে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হবে।” [শরহুল আকিদাহ আল-ওয়াসেতিয়া] “অতঃপর তাদের একজনের জন্য অপরজন থেকে কিসাস বা বদলা গ্রহণ করা হবে”-একথার অর্থ: তাদের মধ্যকার পারস্পরিক জুলুমের বদলা নেওয়া হবে। জালেম থেকে মাজলুমের হক আদায় করে নেওয়া হবে। অতঃপর তাদেরকে যখন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হবে অর্থাৎ মাজলুমের হক আদায় এবং অন্যান্য দায়ভার হতে মুক্ত হবে তখন তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি প্রদান করা হবে। তখন তাদের কতকের অন্তরে অন্যদের প্রতি যেই হিংসা-বিদ্বেষ ছিল তা দূর হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَنَزَعْنَا مَا فِي صُدُورِهِم مِّنْ غِلٍّ إِخْوَانًا عَلَىٰ سُرُرٍ مُّتَقَابِلِينَ
‘‘তাদের মনে যে সামান্য কিছু মনোমালিন্য থাকবে তা আমি বের করে দেবো, তারা পরস্পর ভাই ভাইয়ে পরিণত হয়ে মুখোমুখি আসনে বসবে।” [সূরা হিজর: ৪৭] [শরহুল আকিদাহ আল-ওয়াসেতিয়া-এর কানতারা তথা জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝখানের সেতু-ড. সালেহ ফাওযান]
❑ ২. পুলসিরাত কী?
পুলসিরাত হলো জাহান্নামের ওপর স্থাপিত একটি সেতু, যা পার হওয়া ছাড়া জান্নাতে যাওয়ার বিকল্প কোন রাস্তা নেই। কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে বিচার-ফায়সালা শেষে সব মানুষকে এই পুল অতিক্রম করতে হবে।
প্রখ্যাত সাহাবি আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«ثُمَّ يُضْرَبُ الْجِسْرُ عَلَى جَهَنَّمَ، وَتَحِلُّ الشَّفَاعَةُ، وَيَقُولُونَ: اللَّهُمَّ سَلِّمْ سَلِّمْ. قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَمَا الْجِسْرُ؟ قَالَ: دَحْضٌ مَزِلَّةٌ، فِيهِ خَطَاطِيفُ وَكَلَالِيبُ وَحَسَكٌ — شَوْكَةٌ صَلْبَةٌ تَكُونُ بِنَجْدٍ، فِيهَا شُوَيْكَةٌ يُقَالُ لَهَا السَّعْدَانُ — فَيَمُرُّ الْمُؤْمِنُونَ كَطَرْفِ الْعَيْنِ، وَكَالْبَرْقِ، وَكَالرِّيحِ، وَكَالطَّيْرِ، وَكَأَجَاوِيدِ الْخَيْلِ وَالرِّكَابِ، فَنَاجٍ مُسَلَّمٌ، وَمَخْدُوشٌ مُرْسَلٌ، وَمَكْدُوسٌ فِي نَارِ جَهَنَّمَ»
“তারপর জাহান্নামের ওপর সেতু স্থাপন করা হবে এবং শাফায়াত (সুপারিশ):করার অনুমতি দেওয়া হবে। (তখন নবীগণ ও ফেরেশতাগণ) বলতে থাকবেন: ‘হে আল্লাহ! বাঁচান, বিপদ থেকে রক্ষা করুন।’
জিজ্ঞেস করা হলো: ‘হে আল্লাহর রসুল! সেতুটি কেমন?’ তিনি বললেন: ‘তা অত্যন্ত পিচ্ছিল। তাতে অনেক আংটা, কাঁটাযুক্ত হুক এবং শক্ত কাঁটা থাকবে—যেমন নজদ অঞ্চলে ‘সা’দান’ নামে একপ্রকার শক্ত কাঁটাগাছ দেখা যায়, ঠিক সে রকম কাঁটা। মুমিনগণ এর ওপর দিয়ে পার হবেন—কেউ চোখের পলকে, কেউ বিদ্যুতের বেগে, কেউ বাতাসের গতিতে, কেউ পাখির মতো, আবার কেউ দ্রুতগামী ঘোড়া বা উটের গতিতে। ফলে কেউ সম্পূর্ণ অক্ষত ও নিরাপদে পার হয়ে যাবেন, কেউ আঁচড় বা আঘাত পেয়ে কোনোমতে বেঁচে যাবেন, আর কেউ জাহান্নামের আগুনে তলিয়ে যাবেন।'” [সহিহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, পর্ব: শাফায়াতের বিবরণ ও পুলসিরাত স্থাপন, হাদিস: ১৮৩] তবে এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী (তাওহিদবাদী) এসব মুসলিমকে পরবর্তীতে শাফায়াত ও আল্লাহর বিশেষ রহমতে জাহান্নাম থেকে উদ্ধার করা হবে।
❑ ৩. পুলসিরাত ও কানতারা কি একই, নাকি ভিন্ন জিনিস?
✪ ইমাম কুরতুবি একে «الصِّرَاطُ الثَّانِي» (দ্বিতীয় পুলসিরাত) নামে অভিহিত করেছেন। এ প্রসঙ্গে ইমাম ইবনে কাসির রহ. বলেন—
«قَدْ تَكَلَّمَ الْقُرْطُبِيُّ عَلَى هَذَا الْحَدِيثِ فِي التَّذْكِرَةِ، وَجَعَلَ هَذِهِ الْقَنْطَرَةَ صِرَاطًا ثَانِيًا لِلْمُؤْمِنِينَ خَاصَّةً، وَلَيْسَ يَسْقُطُ مِنْهُ أَحَدٌ فِي النَّارِ. قُلْتُ: هَذِهِ الْقَنْطَرَةُ تَكُونُ بَعْدَ مُجَاوَزَةِ النَّارِ، فَقَدْ تَكُونُ هَذِهِ الْقَنْطَرَةُ مَنْصُوبَةً عَلَى هَوْلٍ آخَرَ مِمَّا يَعْلَمُهُ اللَّهُ، وَلَا نَعْلَمُهُ نَحْنُ. وَاللَّهُ أَعْلَمُ»
“কুরতুবি আত-তাজকিরাহ গ্রন্থে এই হাদিস নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং এই কানতারাকে বিশেষভাবে মুমিনদের জন্য একটি ‘দ্বিতীয় পুলসিরাত’ হিসেবে গণ্য করেছেন, যেখান থেকে কেউ জাহান্নামে পতিত হবে না।
আমি বলি: এই কানতারাটি জাহান্নাম অতিক্রম করার পর হবে। হতে পারে এই কানতারাটি ভয়াবহ অন্য কিছুর ওপর স্থাপিত হবে, যা আল্লাহই ভালো জানেন; আমরা জানি না। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।”
✪ ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি সহিহ বুখারির ভাষ্যগ্রন্থ আল-ফাতহুল বারি-তে বলেছেন—
«اَلَّذِي يَظْهَرُ أَنَّهَا طَرَفُ الصِّرَاطِ مِمَّا يَلِي الْجَنَّةَ، وَيَحْتَمِلُ أَنْ تَكُونَ فِي غَيْرِهِ بَيْنَ الصِّرَاطِ وَالْجَنَّةِ»
“যা স্পষ্ট বোঝা যায়, তা হলো—এটি পুলসিরাতের সেই প্রান্ত, যা জান্নাতের দিকে অবস্থিত। তবে এটাও সম্ভব যে এটি পুলসিরাত থেকে ভিন্ন; বরং পুলসিরাত ও জান্নাতের মাঝে অবস্থিত।”
✪ তবে আধুনিক যুগের প্রখ্যাত আকিদা বিশারদ ড. নাসের বিন আব্দুল করিম আল-আকল বলেন—
«اَلَّذِي ثَبَتَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّ الصِّرَاطَ وَاحِدٌ، وَلَمْ يَذْكُرْ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّ الصِّرَاطَ صِرَاطَانِ مَجَازًا أَوْ خَاصًّا كَمَا ذَكَرَ الْقُرْطُبِيُّ رَحِمَهُ اللَّهُ. وَالَّذِي يَقْتَضِي الدَّلِيلُ رُجْحَانَهُ أَنَّ الْقَنْطَرَةَ جِسْرٌ بَيْنَ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ لَا عَلَاقَةَ لَهُ بِالصِّرَاطِ، كَمَا هُوَ ظَاهِرُ حَدِيثِ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ»
“নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে যা প্রমাণিত, তা হলো—পুলসিরাত একটিই। নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দুটি সিরাতের (রূপক বা বিশেষ) কথা উল্লেখ করেননি, যেমনটি ইমাম কুরতুবি (রহ.) উল্লেখ করেছেন। দলিলের ভিত্তিতে যা প্রাধান্য পায়, তা হলো—কানতারা হলো জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যকার একটি সেতু, যার সঙ্গে পুলসিরাতের কোনও সম্পর্ক নেই; যেমনটি আবু সাইদ খুদরি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদিসের বাহ্যিক রূপ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়।”
মোটকথা, পুলসিরাত ও কানতারা মূলত দুটি ভিন্ন স্থান; পুলসিরাত হলো জাহান্নামের ওপর স্থাপিত সেতু যা পার হয়ে জান্নাতের দিকে যেতে হয় আর কানতারা হলো পুলসিরাত পার হওয়ার পর জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে অবস্থিত বিশেষ সেতু, যেখানে মুমিনদের নিজেদের মধ্যকার পারস্পরিক দাবি ও পাওনা মিটিয়ে নিষ্পাপ ও পূতপবিত্র অবস্থায় জান্নাতে প্রবেশের উপযুক্ত করা হয়।
❑ সারাংশ:
পুলসিরাত হলো জাহান্নামের ওপর স্থাপিত এক ভয়াবহ সেতু, যা অতিক্রম করার মাধ্যমেই মুমিনগণ জাহান্নামের আগুন থেকে চূড়ান্ত মুক্তি লাভ করবেন। অন্যদিকে কানতারা হলো পুলসিরাত পার হওয়ার পর জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী একটি বিশেষ স্থান, যা পুলসিরাত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে জান্নাতগামী মুমিনদের মধ্যে যদি একে অপরের প্রতি মনের মধ্যে সামান্য পরিমাণও ক্ষোভ, দুঃখ, কষ্ট, হিংসা-বিদ্বেষ ইত্যাদি জমা থাকে তাহলে সেগুলো মিটমাট করার ব্যবস্থা করা হবে। যেন তারা সকলেই নিখাদ, নির্মল, পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন মন নিয়ে ভাই ভাই হিসেবে তাঁদের জীবনের অভীষ্ট লক্ষ্য ও সাফল্যের ঠিকানা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারেন।
আল্লাহু আলাম। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। [উৎস: Islamweb, Alukah, Durar ইত্যাদি]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।