এক নজরে তাওহিদ

❑ তাওহিদ কী?
তাওহিদ হলো, আল্লাহকে তাঁর রুবুবিয়্যাত (প্রভুত্ব), উলুহিয়্যাত (ইবাদত-বন্দেগি) এবং নাম ও গুণাবলিতে একক ও অদ্বিতীয় হিসেবে স্বীকার করা।
❑ তাওহিদের গুরুত্ব:
আল্লাহ তাআলা মানুষ ও জিনকে কেবল তাওহিদ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
“আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।” [সূরা যারিয়াত: ৫৬]
এটি দ্বীনের মূল ভিত্তি এবং সকল নবি ও রসুলদের দাওয়াতের মূল কেন্দ্রবিন্দু। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ
“(হে নবি) তোমার পূর্বে আমি যে রসুলই পাঠিয়েছি তাকে এই মর্মে প্রত্যাদেশ করেছি যে, আমি ছাড়া অন্য কোনো মাবুদ বা উপাস্য নেই। সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত করো।”
[সূরা আম্বিয়া: ২৫]
❑ তাওহিদের প্রকারভেদ:
তাওহিদ তিন প্রকার। যথা:
◈ ১. তাওহিদুর রুবুবিয়্যাত (توحيد الربوبية):
আল্লাহকে একমাত্র রব অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা, রিজিক দাতা, জীবন-মৃত্যু দাতা এবং মহাবিশ্বের একমাত্র পরিচালক হিসেবে বিশ্বাস করা।
উদাহরণ: একমাত্র আল্লাহই আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই আমাদের একমাত্র অন্নদাতা। একমাত্র তিনি আসমান থেকে বৃষ্টি দান করেন এবং জমিন থেকে ফসল উদ্গত করেন। একমাত্র তিনিই জীবন ও মৃত্যু দান করেন। এই মহাবিশ্বের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা কেবল তাঁর হাতেই রয়েছে…ইত্যাদি।
◈ ২. তাওহিদুল উলুহিয়্যাত (توحيد الألوهية):
বাহ্যিক ভাবে এবং গোপনে তথা চিন্তা-চেতনা এবং মন ও মননে ছোট-বড় সকল প্রকার ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্য নিবেদন করা।
উদাহরণ: একমাত্র আল্লাহর জন্যই নামাজ, রোজা, দুআ, মানত, কুরবানি, সাহায্য প্রার্থনা ইত্যাদি সম্পাদন করা। অনুরূপভাবে মনের সবটুকু আকুতি ও আরাধনা, ভয় ও ভরসা, আশা-আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি কেবল তাঁর নিকট সমর্পণ করা।
◈ ৩. তাওহিদুল আসমা ওয়াস সিফাত (توحيد الأسماء و الصفات):
কুরআন ও সুন্নাহর বর্ণনা অনুযায়ী আল্লাহর সুন্দর নাম ও সুমহান গুণাবলিকে কোনও প্রকার বিকৃতি, অস্বীকার, অপব্যাখ্যা কিংবা সৃষ্টির সাথে তুলনা, সাদৃশ্য বা উপমা বর্ণনা ছাড়াই একমাত্র আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা।
উদাহরণ:
আল্লাহ সর্বশ্রোতা (السَّمِيعُ), সর্বদ্রষ্টা (الْبَصِيرُ) ও পরম দয়ালু (الرحمن), ইত্যাদি গুণবাচক সকল সুন্দর নাম একমাত্র আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা।
অনুরূপভাবে আল্লাহ তাআলার সত্তাগতভাবে সৃষ্টি জগতের সর্ব ঊর্ধ্বে অবস্থান, নিচের আসমানে অবতরণ, কথা বলা, আনন্দিত হওয়া, ক্রোধান্বিত হওয়া, তাঁর তার চেহারা, হাত, চোখ ইত্যাদি সিফত বা গুণ-বৈশিষ্ট্যগুলো তাঁর জন্য সাব্যস্ত করা যেভাবে তাঁর সুমহান মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। এগুলোকে অস্বীকার, বিকৃতি, অপব্যাখ্যা, রূপক অর্থে গ্রহণ থেকে বা সৃষ্টি জগতের কোনও কিছুর সাথে সাদৃশ্য ও উপমা বর্ণনা থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ ۖ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
“কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।”
[সূরা শূরা: ১১]
❑ তাওহিদের রোকন বা স্তম্ভ দুটি:
◈ ১. নাফি (النفي—অস্বীকার করা): ইবাদত-বন্দেগি, সার্বভৌমত্ব, নিয়ন্ত্রণ, পরিচালনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে কোনও মখলুক বা সৃষ্টির অংশীদারিত্বকে মনে-প্রাণে অস্বীকার করা।
◈ ২. ইসবাত (الإثبات—সাব্যস্ত করা): আল্লাহ নিজের জন্য যে সব কর্ম, নাম ও গুণাবলী সাব্যস্ত করেছেন এবং তাঁর রসুল যা বর্ণনা করেছেন সেগুলো কেবল একমাত্র আল্লাহর জন্যই সাব্যস্ত করা।
তাওহিদের দুটি রোকন রয়েছে, কালিমা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর মধ্যে। যেমন:
১) ‘লা ইলাহা’ (নেই কোনও সত্য উপাস্য) এটি হল, নাফি বা অস্বীকৃতি।
২) ‘ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া)। এটি হল, ইসবাত বা সাব্যস্ত করণ।
❑ তাওহিদ বিনষ্টকারী বিষয়: শিরক
◈ ১. শিরকে আকবর বা বড় শিরক: এটি মানুষকে ইসলাম থেকে সম্পূর্ণ বের করে দেয়।
– উদাহরণ: আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে প্রার্থনা করা, মাজারে মানত করা বা কাউকে আল্লাহর মতো ভয় করা বা ভালোবাসা, অলি-আউলিয়া বা নেককার কবর বাসীদের নিকট সন্তান চাওয়া, রোগ-ব্যাধি ও বিপদ মুক্তির জন্য প্রার্থনা করা কিংবা তাদের নিকট মনের ইচ্ছা ও কামনা-বাসনা পূরণের জন্য মানত করা, পশু জবাই করা বা দুআ-আরাধনায় প্রবৃত্ত হওয়া অথবা তাদেরকে ওসিলা বা মাধ্যম মনে করা ইত্যাদি।
– পরিণতি: এর মাধ্যমে একজন মানুষ ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত কাফের ও মুরতাদ হয়ে যায়। তওবা ছাড়া মৃত্যু হলে আখিরাতে চিরতরে জান্নাত হারাম হয়ে যায় এবং চিরস্থায়ী ভাবে জাহান্নাম অবধারিত হয়ে যায়। কেননা তা শিরকে আকবার বা বড় শিরক।
◈ ২. শিরকে আসগর বা ছোট শিরক:
এটি ইসলাম থেকে বের করে না দিলেও তাওহিদকে ক্ষুণ্ণ করে এবং এটি কবিরা গুনাহের থেকেও ভয়াবহ।
– উদাহরণ: মানুষের প্রশংসা বা সুনাম ও সুখ্যাতির মোহে ইবাদত করা (এটাকে রিয়া বলা হয়)।
অথবা ইবাদতের উদ্দেশ্য হওয়া একমাত্র দুনিয়ার স্বার্থ হাসিল করা, আল্লাহর ওপর ভরসার পরিবর্তে কেবল বৈষয়িক উপকরণের ওপর নির্ভর করা, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে কসম করা, তাবিজ-কবজ ব্যবহার করা ইত্যাদি।
– পরিণতি: যে আমলের মধ্যে এ ধরণের শিরক থাকে সে আমলটি বরবাদ হয়ে যায়। অর্থাৎ এর সওয়াব বাতিল হয়ে যায়।
আখেরাতে এর পরিণতি জাহান্নাম। তবে তা বড় শিরকের মত ইসলাম থেকে বহিষ্কার করে না, সকল আমলকে বরবাদ করে না এবং স্থায়ীভাবে জাহান্নামকে অবধারিত করে না।
এ বিষয়ে আমাদের সর্বদা সতর্ক থাকা আবশ্যক।
❑ তাওহিদের উপকারিতা (فوائد التوحيد):
১. তাওহিদের ওপর অটল থাকলে আল্লাহর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি অর্জন সহজ হয়।
২. আখেরাতে প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর শাফায়াত বা সুপারিশ লাভে ধন্য হওয়া যায়।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ خَالِصًا مِنْ قَلْبِهِ أَوْ نَفْسِهِ
“কিয়ামতের দিন আমার সুপারিশ লাভের মাধ্যমে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি হবে সেই, যে ব্যক্তি অন্তরের অন্তরস্থল থেকে একনিষ্ঠভাবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই) বলবে।”
[সহিহ বুখারি: ৯৯]
৩. তাওহিদ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই চির শান্তির নীড় জান্নাতে প্রবেশের নিশ্চয়তা লাভ করা যায়।
আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ
“যে ব্যক্তি এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল যে সে জানত ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই’, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
[সহীহ মুসলিম: ২৬]
৪. তাওহিদ বাস্তবায়ন করলে মানব জীবনের সকল পাপরাশি মোচন করা হয় তার পরিমাণ যাই হোক না কেন।
এক কথায় তাওহিদের বাস্তবায়নই, দুনিয়া ও আখেরাতে চূড়ান্ত সাফল্যের পথ প্রশস্ত করে।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে একনিষ্ঠ ভাবে তাওহিদ বাস্তবায়নের তাওফিক দান করুন এবং তাওহিদ পরিপন্থী সব ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
Share: