প্রশ্ন: এক মুসলিম যুবক অমুসলিম প্রধান একটি দেশে হিজরত করছেন যেখানে হিন্দু ও খ্রিস্টানদের সংখ্যা অনেক। তিনি দ্বীনের জন্য সামান্য কিছু কাজ করার অর্থাৎ তাদের ইসলামের দিকে দাওয়াত দেওয়ার নিয়ত করেছেন। তিনি প্রখ্যাত দাঈদের নিকট শুনেছেন যে, যদি কেউ নিজ ধর্মের ওপর দৃঢ় বিশ্বাসী হয় এবং কাফিরদের সাথে বিতর্ক করতে চায় তবে যেন তাদের কিতাব থেকেই বিতর্ক করে। প্রশ্ন হল—তিনি কি অমুসলিমদের কিতাবগুলো দেখতে পারেন? তাঁর উদ্দেশ্য সেই ধর্ম শেখা নয় বরং সেখানের ভুলগুলো খুঁজে বের করা এবং তারা যে বাতিলের ওপর আছে তা শনাক্ত করা। আলহামদুলিল্লাহ, তিনি নিজের দ্বীনের ওপর অটল এবং এই কিতাবগুলো তাঁর বিশ্বাস পরিবর্তন করতে পারবে না।
উত্তর: সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তাঁর পরিবার ও সঙ্গীদের ওপর। অতপর-
✪ ১. মুসলিম দেশ থেকে অমুসলিম দেশে হিজরত করা জায়েজ নয়। তবে ওই ব্যক্তির জন্য অনুমতি আছে যে, নিজের দ্বীনের আহকামগুলো পালন করতে সক্ষম হবে এবং ফিতনায় পড়ার ভয় থেকে নিরাপদ থাকে। যদিও সব অবস্থাতেই মুসলিমদের মাঝে বসবাস করা উত্তম। কারণ অমুসলিমদের দেশে বসবাস করার মাঝে অনেক ঝুঁকি ও সতর্কতা রয়েছে।
✪ ২. অমুসলিমদের ইসলামের দিকে দাওয়াত দেওয়া এবং তাদের ধর্মের অসারতা ও বাতুলতা প্রমাণের উদ্দেশ্যে তাদের ধর্মীয় কিতাব পাঠ করার বিষয়টি শরিয়তসম্মত। তবে এটি কেবল ওই ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য যিনি এ কাজের যোগ্য এবং যার ইলম ও ইমানের কারণে কোনও ধরনের সংশয় বা ফিতনায় পড়ার আশঙ্কা নেই।
◈ সৌদি আরবের ‘ফাতাওয়ায়ে লাজনা দায়িমাহ’ (স্থায়ী ফতোয়া বোর্ড)-এ বলা হয়েছে:
لَا يَجُوزُ لِمُسْلِمٍ أَنْ يَدْرُسَ الْفَلْسَفَةَ وَالْقَوَانِينَ الْوَضْعِيَّةَ وَنَحْوَهُمَا، إِذَا كَانَ لَا يَقْوَى عَلَى تَمْيِيزِ حَقِّهَا مِنْ بَاطِلِهَا؛ خَشْيَةَ الْفِتْنَةِ وَالِانْحِرَافِ عَنِ الصِّرَاطِ الْمُسْتَقِيمِ، وَيَجُوزُ لِمَنْ يَهْضَمُهَا وَيَقْوَى عَلَى فَهْمِهَا بَعْدَ دِرَاسَةِ الْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ، لِيُمَيِّزَ خَبِيثَهَا مِنْ طَيِّبِهَا، وَلِيُحِقَّ الْحَقَّ وَيُبْطِلَ الْبَاطِلَ، مَا لَمْ يَشْغَلْهُ ذَلِكَ عَمَّا هُوَ أَوْجَبُ مِنْهُ شَرْعًا.
“কোনও মুসলিমের জন্য দর্শন বা মানবরচিত আইন ও এই জাতীয় বিষয়গুলো পড়া জায়েজ নয় যদি তার সত্য-মিথ্যা পার্থক্য করার ক্ষমতা না থাকে; যাতে সে ফিতনা বা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে না পড়ে। তবে যারা কুরআন ও সুন্নাহ অধ্যয়নের পর এই বিষয়গুলো বোঝার ও আয়ত্ত করার ক্ষমতা রাখেন, তাদের জন্য এটি জায়েজ—যাতে তারা ভালো ও মন্দের পার্থক্য করতে পারেন এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত ও মিথ্যাকে বাতিল করতে পারেন। তবে শর্ত হল, এই কাজ যেন তাকে এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কোনও শারঈ দায়িত্ব থেকে বিমুখ না করে।” [ফাতাওয়ায়ে লাজনা দায়িমাহ]
✪ ৩. প্রশ্নকারীর জন্য আমাদের পরামর্শ হল—সরাসরি তাদের কিতাবগুলো না ধরে বরং মুসলিম আলেমদের লেখা ‘তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব’ (Comparative Religion) বিষয়ক বইগুলোর সাহায্য নেওয়া। এতে একদিকে যেমন সংশয় থেকে নিরাপদ থাকা যাবে, তেমনি সময় ও শ্রমের সাশ্রয় হবে এবং অভিজ্ঞ আলেমদের অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হওয়া সহজ হবে। আল্লাহই ভালো জানেন। ফতোয়া নং: ৩০৬৮৫০ | তারিখ: ২৩ জিলকদ ১৪৩৬ হিজরি (০৬-০৯-২০১৫ ইং)
❑ আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ. এর ফতওয়া: অন্য ধর্মের কিতাব পড়ার বিধান-
প্রশ্ন: এই প্রশ্নকারীর শেষ প্রশ্নটি হল— কৌতূহল বশত এবং অন্য ধর্ম সম্পর্কে জানার উদ্দেশ্যে ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্মের কিতাব পড়া কি জায়েজ?
উত্তর: না, এটা উচিত নয়। তাওরাত, ইনজিল বা অন্য কোনও ধর্মগ্রন্থ পড়া উচিত নয়। কারণ এগুলো পড়লে মনে সন্দেহ ও বিভ্রান্তি জন্ম নিতে পারে।
রসুলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি একবার উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে তাওরাতের কিছু অংশ পড়তে দেখে বললেন:
«أَفِي شَكٍّ يَا ابْنَ الْخَطَّابِ؟ لَقَدْ جِئْتُكُمْ بِهَا بَيْضَاءَ نَقِيَّةً، لَوْ كَانَ مُوسَى حَيًّا مَا وَسِعَهُ إِلَّا اتِّبَاعِي»
“হে ইবনুল খাত্তাব! তুমি কি সন্দেহে পড়ে গেছ? আমি তোমাদের কাছে একটি পরিষ্কার ও নির্ভেজাল দ্বীন নিয়ে এসেছি। মুসা (আলাইহিস সালাম) যদি আজ জীবিত থাকতেন তাহলে তাঁর জন্যও আমার অনুসরণ করা ছাড়া কোনও উপায় থাকত না।”
মোটকথা হল, একজন মুসলিমের জন্য তাওরাত, ইনজিল বা অন্য কোনও ধর্মগ্রন্থ পড়া উচিত নয়—তবে যাদের প্রয়োজন আছে তারা ব্যতিক্রম। যেমন: এমন আলেমগণ, যারা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের তাদের নিজেদের কিতাব থেকেই জবাব দিতে চান। এ ধরনের প্রয়োজনে, যে আলেম তাদের ভুল-ভ্রান্তি খণ্ডন করতে চান এবং তাদের কিতাব থেকেই দলিল দিতে চান, তাঁর জন্য প্রয়োজনের সময় এটি পড়তে কোনও অসুবিধা নেই — তবে এটি কেবল ইলম ও দূরদর্শিতা সম্পন্ন আলেমদের জন্য।” (শাইখ বিন বায রহ.) [binbaz org]
✪ হাফেজ ইবনে হাজার রহ. বলেন,
بِخِلَافِ الرَّاسِخِ؛ فَيَجُوزُ لَهُ النَّظَرُ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ، وَلَا سِيَّمَا عِنْدَ الِاحْتِيَاجِ إِلَى الرَّدِّ عَلَى الْمُخَالِفِ، وَيَدُلُّ عَلَى ذَلِكَ نَقْلُ الْأَئِمَّةِ قَدِيمًا وَحَدِيثًا مِنَ التَّوْرَاةِ، وَإِلْزَامُهُمُ الْيَهُودَ بِالتَّصْدِيقِ بِمُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمَا يَسْتَخْرِجُونَهُ مِنْ كِتَابِهِمْ، وَلَوْلَا اعْتِقَادُهُمْ جَوَازَ النَّظَرِ فِيهِ، لَمَا فَعَلُوهُ وَتَوَارَدُوا عَلَيْهِ.
“তবে যার জ্ঞান সুগভীর, তার জন্য তাওরাত ও ইঞ্জিল পাঠ করা জায়েজ। বিশেষ করে যখন বিরোধীদের জবাব দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ইমামগণের তাওরাত থেকে উদ্ধৃতি প্রদান এবং ইহুদিদের কিতাব থেকেই প্রমাণ বের করে তাদেরকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওয়তের সত্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করা—এ বিষয়টিকেই প্রমাণ করে। তারা যদি এটি দেখা বা পাঠ করাকে জায়েজ মনে না করতেন। তবে তারা এমনটি করতেন না এবং এ ব্যাপারে একমত হতেন না।” [ফাতহুল বারী: ১৩/৫২৫-৫২৬]
✪ শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন,
وَإِذَا حَصَلَ مِنْ مَسْلَمَةِ أَهْلِ الْكِتَابِ، الَّذِينَ عَلِمُوا مَا عِنْدَهُمْ بِلُغَتِهِمْ، وَتَرْجَمُوا لَنَا بِالْعَرَبِيَّةِ: انْتُفِعَ بِذَلِكَ فِي مُنَاظَرَتِهِمْ وَمُخَاطَبَتِهِمْ، كَمَا كَانَ عَبْدُ اللهِ بْنُ سَلَامٍ، وَسَلْمَانُ الْفَارِسِيُّ، وَكَعْبُ الْأَحْبَارِ، وَغَيْرُهُمْ، يُحَدِّثُونَ بِمَا عِنْدَهُمْ مِنَ الْعِلْمِ، وَحِينَئِذٍ يُسْتَشْهَدُ بِمَا عِنْدَهُمْ عَلَى مُوَافَقَةِ مَا جَاءَ بِهِ الرَّسُولُ، وَيَكُونُ حُجَّةً عَلَيْهِمْ مِنْ وَجْهٍ، وَعَلَى غَيْرِهِمْ مِنْ وَجْهٍ آخَرَ، كَمَا بَيَّنَّاهُ فِي مَوْضِعِهِ.
“আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং নিজেদের ভাষায় তাদের কিতাব সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন তারা যখন আমাদের জন্য আরবিতে অনুবাদ করে দেন তখন তাদের সাথে বিতর্ক ও আলোচনায় তা থেকে উপকার গ্রহণ করা যায়। যেমন: আব্দুল্লাহ বিন সালাম, সালমান ফারসি, কাব আল আহবার (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) এবং অন্যান্যরা তাদের কাছে থাকা জ্ঞান থেকে বর্ণনা করতেন। এমতাবস্থায় রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যা নিয়ে এসেছেন তার সত্যতার সপক্ষে তাদের কিতাবের উদ্ধৃতি সাক্ষ্য হিসেবে পেশ করা যায়। এটি একদিকে যেমন তাদের বিরুদ্ধে দলিল, তেমনি অন্য দিক থেকে অন্যদের জন্যও দলিল হিসেবে গণ্য হয় যা আমরা সংশ্লিষ্ট স্থানে বিস্তারিত বর্ণনা করেছি।” [মাজমুউল ফাতাওয়া: ৪/১০৯-১১০]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।