উইপোকায় কুরআন এর কিছু অংশ খেয়ে ফেললে তা কি কোনো অশুভ ইঙ্গিত

উইপোকায় মুসহাফ (কুরআন)-এর কিছু অংশ খেয়ে ফেললে তা কি কোনো অশুভ ইঙ্গিত? এই ক্ষেত্রে কী করণীয়?
প্রশ্ন: কুরআন মাজিদের পাতা উইপোকা খেয়ে ফেললে এর কোনো বিশেষ ব্যাখ্যা আছে কি? এটি কি কোনো অশুভ ইঙ্গিত বা বিপদের লক্ষণ? আর এ অবস্থায় করণীয় কী?
উত্তর: কুরআন মাজিদের পাতা উইপোকা খেয়ে ফেলা একটি সাধারণ প্রাকৃতিক ঘটনা। উইপোকা কাগজ, কাঠ ও অন্যান্য সেলুলোজজাতীয় পদার্থ খেয়ে বেঁচে থাকে। তাই কোনো মুসহাফ উইপোকায় আক্রান্ত হলে তা নিজের জন্য অশুভ লক্ষণ, দুর্ভাগ্যের ইঙ্গিত কিংবা আল্লাহর গজবের নিদর্শন মনে করার কোনো শরয়ি ভিত্তি নেই। ইসলামে ‘তিয়ারাহ’—অর্থাৎ যেকোনো ঘটনা থেকে কুসংস্কারবশত অশুভ লক্ষণ গ্রহণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সুতরাং এমন ঘটনা দেখে আতঙ্কিত হওয়া, ভবিষ্যতে কোনো বিপদ আসবে ভেবে ভয় পাওয়া কিংবা এটিকে অমঙ্গলের পূর্বাভাস মনে করা অনুচিত। তবে আল্লাহর কালামের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান ও যত্ন প্রদর্শন করা প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব। নিজের অসতর্কতায় দীর্ঘদিন মুসহাফ অবহেলায় ফেলে রাখার কারণে এমনটি হয়ে থাকলে আন্তরিকভাবে তাওবা-ইস্তিগফার করা এবং ভবিষ্যতে কুরআন মাজিদ পরম যত্নে সংরক্ষণ করা উচিত।
কুরআনে সুলাইমান (আ.)-এর লাঠি উইপোকা খেয়ে ফেলার ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
«فَلَمَّا قَضَيْنَا عَلَيْهِ الْمَوْتَ مَا دَلَّهُمْ عَلَىٰ مَوْتِهِ إِلَّا دَابَّةُ الْأَرْضِ تَأْكُلُ مِنْسَأَتَهُ»
“অতঃপর যখন আমি তার (সুলাইমানের) মৃত্যু নির্ধারণ করলাম তখন তার মৃত্যুর খবর জিনদের কাছে শুধু মাটির পোকাটিই প্রকাশ করল, যা তার লাঠি খেয়ে ফেলছিল…” [সূরা সাবা: ১৪]
এ আয়াতে উল্লিখিত ‘দাব্বাতুল আরদ’ (دَابَّةُ الْأَرْضِ) বলতে মুফাসসিরগণ উইপোকাকেই নির্দেশ করেছেন। সুলাইমান (আ.)-এর ওফাতের পর তিনি লাঠিতে ভর দিয়ে থাকা অবস্থায় উইপোকা তা খেয়ে ফেলে। ফলে তাঁর দেহ মোবারক মাটিতে ঢলে পড়ে এবং তখনই জিনেরা তাঁর ইন্তেকালের বিষয়টি জানতে পারে। এই ঘটনার মূল শিক্ষা হলো—জিনেরা অদৃশ্যের খবর (গায়েব) জানে না। জানলে তারা এতদিন এই কষ্টের কাজে লিপ্ত থাকত না অতএব কুরআনে উইপোকার আলোচনা থাকলেও মুসহাফ উইপোকায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সঙ্গে অশুভ কোনো ইঙ্গিতের দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই।
💢 উইপোকায় ক্ষতিগ্রস্ত মুসহাফের ক্ষেত্রে করণীয়:
ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও যদি কুরআন মাজিদ পাঠযোগ্য ও ব্যবহারোপযোগী থাকে তবে তা সম্মানের সঙ্গে সংরক্ষণ করতে হবে। আর যদি পাতা এতটাই জীর্ণ হয়ে যায় যে আর পড়া সম্ভব নয় তবে যেন সেগুলোর অমর্যাদা না ঘটে সে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রখ্যাত আলেমগণ দুটি পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছেন:
১. জীর্ণ ও অপ্রয়োগযোগ্য কুরআনের পাতা এমন কোনো পবিত্র ও নির্জন স্থানে দাফন করা যেখানে লোকজনের সচরাচর যাতায়াত নেই এবং পদদলিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে না।
২. কুরআনের সম্মান ও পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে জীর্ণ পাতাগুলো পুড়িয়ে ফেলাও বৈধ। সাহাবি উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর যুগে একক মুসহাফ প্রণয়নের পর অবশিষ্ট কপিগুলোর ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
🔹ফাতাওয়ায়ে বিন বায:
সৌদি আরবের প্রাক্তন প্রধান মুফতি আল্লামা শায়খ আবদুল আজিজ ইবনে বায (রহ.) কে পড়ার অযোগ্য ছেঁড়াফাটা ও জীর্ণ কুরআনের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন,
«نَعَمْ، السُّنَّةُ إِحْرَاقُهَا، أَوْ دَفْنُهَا فِي أَرْضٍ طَيِّبَةٍ، الْأَوْرَاقُ الَّتِي قَدْ بَلِيَتْ، أَوْ لَا يُنْتَفَعُ بِهَا، أَوِ الْمَصَاحِفُ الَّتِي بَلِيَتْ، أَوْ لَا يُنْتَفَعُ بِهَا؛ تُدْفَنُ فِي أَرْضٍ طَيِّبَةٍ، أَوْ تُحْرَقُ.»
“হ্যাঁ, সুন্নাহ হলো সেগুলো পুড়িয়ে ফেলা অথবা পবিত্র কোনো মাটিতে দাফন করা। যেসব পাতা জীর্ণ হয়ে গেছে কিংবা ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে অথবা যে মুসহাফগুলো পুরানো এবং উপকৃত হওয়ার অযোগ্য হয়ে গেছে—সেগুলো পবিত্র মাটিতে দাফন করা হবে অথবা পুড়িয়ে ফেলা হবে।” [নূর আলাদ-দারব] [Source: binbaz org]
মোটকথা, উইপোকা কুরআন মাজিদ খেলে তা কোনো অশুভ লক্ষণ বা অমঙ্গলের বার্তা বহন করে না; এটি নিছকই একটি প্রাকৃতিক বিষয়। তবে কুরআন মাজিদের যথাযথ হিফাজত ও সম্মান রক্ষা করা আমাদের ইমানি দায়িত্ব। কোনো মুসহাফ তিলাওয়াতের অযোগ্য হয়ে পড়লে তার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে দাফন করা কিংবা পুড়িয়ে ফেলাই সুন্নাহসম্মত সমাধান।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
Share: