প্রশ্ন: ইসলামি রাষ্ট্র তার কার্যক্রম কীভাবে পরিচালনা করত এবং প্রথম যুগে শাসনব্যবস্থা কেমন ছিল?
উত্তর: যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য, এবং সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর। এরপর—মুসলিম শাসকের দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া। পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শী ও বিশেষজ্ঞ আলেমদের সমন্বয়ে একটি পরামর্শ সভা (মজলিসে শূরা) গঠন করা। সাধারণ বা আমজনতার ওপর এই নির্বাচনের ভার ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়—যাতে প্রত্যেকে তার আত্মীয়কে, নিজ দলের কোনো সদস্যকে কিংবা যে বেশি টাকা দেবে তাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করার সুযোগ না পায়।
শাইখ সালেহ ইবন ফাওজান আল-ফাওজান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন:
“الْوِلَايَاتُ الَّتِي هِيَ دُونَ الْوِلَايَةِ الْعَامَّةِ : فَإِنَّ التَّعْيِينَ فِيهَا مِنْ صَلَاحِيَّاتِ وَلِيِّ الْأَمْرِ ، بِأَنْ يَخْتَارَ لَهَا الْأَكْفَاءَ الْأُمَنَاءَ ، وَيُعَيِّنَهُمْ فِيهَا ، قَالَ اللَّهُ تَعَالَى : ( إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ ) ، وَهَذَا خِطَابٌ لِوُلَاةِ الْأُمُورِ ، وَالْأَمَانَاتُ هِيَ الْوِلَايَاتُ ، وَالْمَنَاصِبُ فِي الدَّوْلَةِ ، جَعَلَهَا اللَّهُ أَمَانَةً فِي حَقِّ وَلِيِّ الْأَمْرِ ، وَأَدَاؤُهَا : اخْتِيَارُ الْكَفْءِ الْأَمِينِ لَهَا ، وَكَمَا كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَخُلَفَاؤُهُ وَوُلَاةُ أُمُورِ الْمُسْلِمِينَ مِنْ بَعْدِهِمْ يَخْتَارُونَ لِلْمَنَاصِبِ مَنْ يَصْلُحُ لَهَا ، وَيَقُومُ بِهَا عَلَى الْوَجْهِ الْمَشْرُوعِ . وَأَمَّا الِانْتِخَابَاتُ الْمَعْرُوفَةُ الْيَوْمَ عِنْدَ الدُّوَلِ : فَلَيْسَتْ مِنْ نِظَامِ الْإِسْلَامِ ، وَتَدْخُلُهَا الْفَوْضَى ، وَالرَّغَبَاتُ الشَّخْصِيَّةُ ، وَتَدْخُلُهَا الْمُحَابَاةُ ، وَالْأَطْمَاعُ ، وَيَحْصُلُ فِيهَا فِتَنٌ ، وَسَفْكُ دِمَاءٍ ، وَلَا يَتِمُّ بِهَا الْمَقْصُودُ ، بَلْ تَصْبَحُ مَجَالًا لِلْمُزَايَدَاتِ ، وَالْبَيْعِ وَالشِّرَاءِ ، وَالدِّعَايَاتِ الْكَاذِبَةِ”
“সাধারণ শাসনভারের নিচে থাকা পদগুলোতে নিয়োগদান রাষ্ট্রনায়কের (ওলিউল আমর) এখতিয়ারভুক্ত—তিনি সেসব পদের জন্য যোগ্য ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি বেছে নিয়ে নিয়োগ দেবেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যেন তোমরা আমানতসমূহ তার হকদারদের নিকট পৌঁছে দাও, আর যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে তখন ন্যায়সঙ্গতভাবে বিচার করবে।” [সূরা নিসা: ৫৮]
এটি শাসকদের প্রতি সম্বোধন; আর ‘আমানত’ বলতে বোঝানো হয়েছে বিভিন্ন পদ ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে, যেগুলোকে আল্লাহ শাসকের ওপর আমানত হিসেবে অর্পণ করেছেন। আর তা আদায় করার অর্থ হলো, সেই পদের উপযুক্ত ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে নির্বাচন করা। যেমনিভাবে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তাঁর পরবর্তী খলিফাগণ ও মুসলিম শাসকগণ পদের উপযুক্ত ব্যক্তিকে বেছে নিতেন এবং তা শরিয়তসম্মত পন্থায় পরিচালনা করতেন। পক্ষান্তরে আজকের দিনে বিভিন্ন দেশে প্রচলিত যে নির্বাচন পদ্ধতি দেখা যায়, তা ইসলামি শাসনব্যবস্থার অংশ নয়। এতে বিশৃঙ্খলা ও ব্যক্তিগত স্বার্থ প্রবেশ করে; স্থান পায় স্বজনপ্রীতি ও লোভ-লালসা। এর ফলে সৃষ্টি হয় গৃহবিবাদ (ফিতনা) ও রক্তপাত আর নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্যও অর্জিত হয় না। বরং তা পরিণত হয় দর-কষাকষি, ভোট কেনাবেচা আর মিথ্যা প্রচারণার এক প্রতিযোগিতায়।” [আল-জাজিরা পত্রিকা, সংখ্যা: ১১৩৫৮]
❑ ইসলামি রাষ্ট্র ইমাম বা খলিফা প্রধানত তিনটি উপায়ের যেকোনো একটির মাধ্যমে শাসনভার গ্রহণ করতেন:
◈ প্রথম পদ্ধতি: আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ (নীতি নির্ধারণী বিজ্ঞ অভিভাবক পরিষদ)-এর মাধ্যমে মনোনয়ন ও নির্বাচন:
উদাহরণস্বরূপ: আবু বকর সিদ্দিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফত লাভ। তাঁর খিলাফত আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ-এর মনোনয়ন ও নির্বাচনের মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়েছিল। এরপর সকল সাহাবি এতে ঐক্যমত পোষণ করেন তাঁর হাতে বায়আত গ্রহণ করেন এবং তাঁর খিলাফতকে সানন্দে মেনে নেন। একইভাবে উসমান ইবন আফফান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফতও এভাবে নির্ধারিত হয়। উমর ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের দায়িত্ব জ্যেষ্ঠ ছয়জন সাহাবির এক পরামর্শ সভার ওপর ন্যস্ত করেছিলেন। তখন আব্দুর রহমান ইবন আউফ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মুহাজির ও আনসার সাহাবিদের মতামত গ্রহণ করেন। যখন তিনি দেখলেন যে সবার ঝোঁক উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর দিকেই তখন তিনি প্রথমে তাঁর হাতে বায়আত নেন। এরপর বাকি পাঁচজন এবং পরবর্তীতে সকল মুহাজির ও আনসার সাহাবি বায়আত গ্রহণ করেন। এভাবে আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ-এর মনোনয়ন ও নির্বাচনের মাধ্যমে তাঁর খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়। ঠিক একইভাবে আলি ইবনে আবু তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফতও আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ-এর অধিকাংশের মনোনয়ন ও নির্বাচনের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
◈ দ্বিতীয় পদ্ধতি: পূর্ববর্তী খলিফা কর্তৃক পরবর্তী খলিফা মনোনয়ন (উত্তরাধিকার মনোনয়ন):
তা হলো, বিদ্যমান শাসক তাঁর পরে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে খলিফা হিসেবে মনোনীত করে যাবেন।
উদাহরণস্বরূপ: উমর ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফত লাভ। আবু বকর সিদ্দিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁকে পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনীত করে যাওয়ার মাধ্যমেই তাঁর খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
◈ তৃতীয় পদ্ধতি: জোরজবরদস্তি ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল:
তা হলো, কোনো খলিফা যদি তরবারি ও ক্ষমতাবলে জনগণের ওপর জয়ী হন এবং তাঁর শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তবে তাঁর কথা শোনা ও আনুগত্য করা ওয়াজিব হয়ে যায় এবং তিনি মুসলিমদের ইমাম হিসেবে গণ্য হন।
উদাহরণস্বরূপ: বনু উমাইয়া ও বনু আব্বাসের কিছু খলিফা এবং পরবর্তীকালের অনেক শাসকের ক্ষমতা গ্রহণ। যদিও এই পদ্ধতিটি শরিয়তবিরোধী। কেননা তা জবরদখল ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে গৃহীত হয়েছে। তবুও জাতির শাসক থাকার মহান কল্যাণের কথা বিবেচনা করে এবং দেশ থেকে নিরাপত্তা উঠে যাওয়ার বিশাল ক্ষতির কথা ভেবে—জোর ও তরবারির বলে ক্ষমতা দখলকারী ব্যক্তি যদি আল্লাহ তা’আলার শরিয়ত অনুযায়ী শাসন পরিচালনা করেন তাহলে তাঁর কথা শোনা ও আনুগত্য করা ওয়াজিব।
শাইখ মুহাম্মদ ইবন সালেহ আল-উসাইমিন (রাহ.) বলেন:
“لَوْ خَرَجَ رَجُلٌ وَاسْتَوْلَى عَلَى الْحُكْمِ : وَجَبَ عَلَى النَّاسِ أَنْ يَدِينُوا لَهُ ، حَتَّى وَلَوْ كَانَ قَهْرًا بِلَا رِضًى مِنْهُمْ ؛ لِأَنَّهُ اسْتَوْلَى عَلَى السُّلْطَةِ . وَوَجْهُ ذَلِكَ : أَنَّهُ لَوْ نُوزِعَ هَذَا الَّذِي وَصَلَ إِلَى سُدَّةِ الْحُكْمِ : لَحَصَلَ بِذَلِكَ شَرٌّ كَثِيرٌ ، وَهَذَا كَمَا جَرَى فِي دَوْلَةِ بَنِي أُمَيَّةَ ، فَإِنَّ مِنْهُمْ مَنْ اسْتَوْلَى بِالْقَهْرِ وَالْغَلَبَةِ وَصَارَ خَلِيفَةً يُنَادَى بِاسْمِ الْخَلِيفَةِ ، وَيُدَانُ لَهُ بِالطَّاعَةِ ، امْتِثَالًا لِأَمْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ”
“যদি কোনো ব্যক্তি শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ক্ষমতা দখল করে নেয় তবে জনগণের জন্য তার আনুগত্য করা ওয়াজিব হয়ে যায়—যদিও তা জনগণের সম্মতি ছাড়া জোরপূর্বক হয়ে থাকে। কেননা সে ইতোমধ্যে ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে। এর কারণ হলো, ক্ষমতার আসনে পৌঁছে যাওয়া এই ব্যক্তির সাথে যদি বিরোধ করা হয় তাহলে তাতে অনেক অকল্যাণ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। যেমনটি বনু উমাইয়ার শাসনামলে ঘটেছিল—তাদের মধ্যে কেউ কেউ জোরজবরদস্তি ও প্রবল ক্ষমতাবলে ক্ষমতা দখল করে খলিফা হয়ে যান।তাঁকে ‘খলিফা’ নামেই অভিহিত করা হতো এবং আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ পালনের অংশ হিসেবে তাঁর আনুগত্য করা হতো।” [শারহু আল-আকীদাহ আস-সাফফারীনিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৬৮৮] এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে এবং ইসলামি রাষ্ট্রের কার্যাবলি ও বিভিন্ন প্রশাসনিক বিভাগ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জনের জন্য আপনি আবু হাসান আল-মাওয়ার্দী শাফেঈ লিখিত “আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ”, আবু ইয়ালা আল-ফাররা হাম্বলী লিখিত “আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ” এবং আল-কাত্তানী লিখিত “আত-তারাতীবুল ইদারিয়্যাহ” বইগুলো পড়তে পারেন। এগুলোতে আরও প্রভূত জ্ঞান ও তথ্য রয়েছে। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন। [সোর্স: islamqa info]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।