ইমাম গাজালি এর কিতাবাদী পড়া এবং বিজ্ঞ আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি

ইমাম গাজালি (রহ.)-এর কিতাবাদী পড়া: বিজ্ঞ আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি
প্রশ্ন: ইমাম গাজালি তো সহিহ আকিদার ছিলেন না। তাঁর থেকে ইলম নেওয়ার বিধান কী?
উত্তর: আবু হামেদ আল-গাজালি (১০৫৮–১১১১ খ্রি.-খোরাসান) ইসলামি ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত একজন চিন্তাবিদ ও দার্শনিক। সাধারণ মানুষের মাঝে তাঁকে বিশাল ইসলামি পণ্ডিত ও মুসলিম দার্শনিক মনে করা হলেও বিশুদ্ধ আকিদা ও সুন্নাহর মানদণ্ডে তাঁর বহু দৃষ্টিভঙ্গি তীব্র সমালোচনার যোগ্য। বিশেষ করে তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহে আকিদা ও তাসাউফ-সংক্রান্ত আলোচনায় গ্রীক দর্শন, ইলমে কালাম ও সুফিবাদের বিভ্রান্তিকর তত্ত্বের সুস্পষ্ট প্রভাব রয়েছে যা সাধারণ মুসলিমদের আকিদা ও ইমানের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। আকিদার ক্ষেত্রে তিনি গোঁড়া আশআরি মতবাদের অনুসারী ছিলেন এবং সুফিবাদের নামে নানা বিদআতি ও জটিল দর্শন প্রচার করেছেন। ভারত উপমহাদেশেও তাঁর গ্রন্থাবলী ও চিন্তা-চেতনা ব্যাপকভাবে পঠিত হলেও, সহিহ সুন্নাহর অনুসারী উলামায়ে কেরাম তাঁর আকিদাগত বিভ্রান্তি, গ্রীক দর্শনের তোষণ এবং জইফ-জাল হাদিস নির্ভর আলোচনার কারণে তাঁকে অত্যন্ত কঠোরভাবে মূল্যায়ন ও সমালোচনা করেছেন। এর চেয়েও মারাত্মক বিষয় হলো, তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ ‘ইহয়াউ উলূমিদ্দীন’-এ ভুরি ভুরি দুর্বল (জইফ) এবং মনগড়া ও বানোয়াট (জাল) হাদিস রয়েছে। সঠিক আকিদার গভীর ইলম এবং সুন্নাহর বিশুদ্ধতা প্রমাণের যোগ্যতা না থাকলে এসব বিষাক্ত ও বিভ্রান্তিকর আলোচনা সাধারণ দ্বীনদারদের ইমানকে পথভ্রষ্ট করে তুলতে পারে। তাই পর্যাপ্ত জ্ঞান ও সহিহ সুন্নাহর শক্ত ভিত্তি ছাড়া তাঁর ‘ইহয়াউ উলূমিদ্দীন’ বা কালামশাস্ত্রের কিতাবসমূহ স্পর্শ করাও সাধারণ পাঠকের জন্য একেবারেই নিরাপদ নয়। কেবল সেই সব বিজ্ঞ আলেমে দ্বীনই তাঁর রচনা থেকে চরম সতর্কতা অবলম্বন করে জ্ঞান আহরণ করতে পারেন, যাঁদের সঠিক ও ভ্রান্ত চিন্তা আলাদা করার এবং সহিহ ও জাল হাদিসের সূক্ষ্ম পার্থক্য নিরূপণ করার পূর্ণ দক্ষতা রয়েছে। ‘ইহয়াউ উলূমিদ্দীন’ গ্রন্থে হাদিসের নামে যেসব বানোয়াট কথা স্থান পেয়েছে, তা থেকে উম্মাহকে সতর্ক করতে মুহাদ্দিসগণ যুগ যুগ ধরে কঠিন ভূমিকা পালন করেছেন। যেমন: হাফেজ ইরাকি (রহ.)-এর মতো প্রখ্যাত হাদিসবিশারদ এ গ্রন্থের হাদিসগুলোর তাখরিজ করে এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা দুর্বল ও জাল বর্ণনাগুলোকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত ও উন্মোচিত করেছেন। ইমাম ইবনুল জাওজি (রহ.)-ও এ গ্রন্থের বিভ্রান্তি ও হাদিস জালিয়াতির বিরুদ্ধে কড়া সমালোচনা উপস্থাপন করেছেন। পরবর্তীতে আধুনিক যুগের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা মুহাম্মদ নাসিরুদ্দিন আল-আলবানি (রহ.) এ গ্রন্থের হাদিসগুলোর বিস্তারিত তাহকিক ও তাখরিজ পেশ করে সত্য-মিথ্যাকে স্পষ্টভাবে পৃথক করে দিয়েছেন। অতএব, সুন্নাহর অনুসরণে সচেতন প্রতিটি মুসলিমের জন্য আবশ্যক হলো, এ ধরনের ভ্রষ্ট সুফিবাদ, ভ্রান্ত আকিদা ও জইফ-জাল হাদিসে ভরা কিতাব সরাসরি পাঠ করা থেকে বিরত থাকা। যদি কেউ পাঠ করতেই চায় তবে অবশ্যই হাফেজ আল-ইরাকি (রহ.) বা শায়খ আলবানি (রহ.)-এর তাহকিককৃত সংস্করণ কিংবা সুন্নাহর অনুসারী নির্ভরযোগ্য উলামায়ে কেরামের সতর্কতামূলক ব্যাখ্যা ও টীকা-সংবলিত সংস্করণই কেবল গ্রহণ করা উচিত।
❑ ইমাম গাজালি ও তাঁর লিখিত বই-পুস্তকের ব্যাপারে পূর্ববর্তী আলেমদের অবস্থান:
এ বিষয়ে যুগে যুগে বিজ্ঞ ও সচেতন আলেমগণ জাতিকে সতর্ক করে এসেছেন। তাঁদের মধ্য থেকে কয়েকজনের বক্তব্য নিচে তুলে ধরা হলো:
✪ ১. কাজি ইয়াজ (মৃত্যু: ৫৪৪ হি.) বলেন,
«وَالشَّيْخُ أَبُو حَامِدٍ ذُو الْأَنْبَاءِ الشَّنِيعَةِ، وَالتَّصَانِيفِ الْفَظِيعَةِ، غَلَا فِي طَرِيقَةِ التَّصَوُّفِ، وَتَجَرَّدَ لِنَصْرِ مَذَاهِبِهِمْ، وَصَارَ دَاعِيَةً فِي ذَلِكَ، وَأَلَّفَ فِيهِ تَوَالِيفَهُ الْمَشْهُورَةَ، أُخِذَ عَلَيْهِ فِيهَا مَوَاضِعُ، وَسَاءَتْ بِهِ ظُنُونُ أُمَّةٍ، وَاللهُ أَعْلَمُ بِسِرِّهِ، وَنَفَذَ أَمْرُ السُّلْطَانِ عِنْدَنَا بِالْمَغْرِبِ وَفَتْوَى الْفُقَهَاءِ بِإِحْرَاقِهَا وَالْبُعْدِ عَنْهَا، فَامْتُثِلَ ذَلِكَ».
[سِيَرُ أَعْلَامِ النُّبَلَاءِ، ١٩/٣٢٧]
“শায়খ আবু হামেদ (গাজালি) যাঁর সম্পর্কে নানাবিধ গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এবং যাঁর বেশ কিছু লেখালেখি তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, তিনি তাসাউফের পথে অতিমাত্রায় নিমগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। সুফিদের মতবাদ সমর্থনে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিয়ে তিনি এর একনিষ্ঠ প্রচারকে পরিণত হন এবং এ বিষয়ে তাঁর বিখ্যাত বইগুলো রচনা করেন। তবে এসব লেখার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলেমদের প্রবল আপত্তি ছিল, যা অনেক মানুষের মনে তাঁর সম্পর্কে চরম সংশয় ও নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে। অবশ্য তাঁর ভেতরের আসল নিয়ত আল্লাহই ভালো জানেন। আমাদের মাগরেব (পশ্চিম মুসলিম বিশ্ব) অঞ্চলে সুলতানের রাজকীয় ফরমান এবং ফকিহদের ফতোয়া অনুযায়ী তাঁর বইগুলো পুড়িয়ে ফেলার ও তা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ জারি করা হয়, আর আমলও করা হয় সেই নির্দেশ অনুসারেই।” [সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১৯/৩২৭]
✪ ২. ইমাম ইবনুল জাওজি (মৃত্যু: ৫৯৭ হি.) বলেন,
«اعْلَمْ أَنَّ فِي كِتَابِ الْإِحْيَاءِ آفَاتٍ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا الْعُلَمَاءُ، وَأَقَلُّهَا الْأَحَادِيثُ الْبَاطِلَةُ الْمَوْضُوعَةُ، وَإِنَّمَا نَقَلَهَا كَمَا اقْتَرَاهَا ـ جَمَعَهَا ـ لَا أَنَّهُ افْتَرَاهَا، وَلَا يَنْبَغِي التَّعَبُّدُ بِحَدِيثٍ مَوْضُوعٍ وَالِاغْتِرَارُ بِلَفْظٍ مَصْنُوعٍ، وَكَيْفَ أَرْتَضِي لَكَ أَنْ تُصَلِّيَ صَلَوَاتِ الْأَيَّامِ وَاللَّيَالِي، وَلَيْسَ فِيهَا كَلِمَةٌ قَالَهَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَكَيْفَ أُوثِرُ أَنْ يَطْرُقَ سَمْعَكَ مِنْ كَلَامِ الْمُتَصَوِّفَةِ الَّذِي جَمَعَهُ وَنَدَبَ إِلَى الْعَمَلِ بِهِ مَا لَا حَاصِلَ لَهُ مِنَ الْكَلَامِ فِي الْفَنَاءِ، وَالْبَقَاءِ، وَالْأَمْرِ بِشِدَّةِ الْجُوعِ، وَالْخُرُوجِ إِلَى السِّيَاحَةِ فِي غَيْرِ حَاجَةٍ، وَالدُّخُولِ فِي الْفَلَاةِ بِغَيْرِ زَادٍ، إِلَى غَيْرِ ذَلِكَ مِمَّا قَدْ كَشَفْتُ عَنْ عَوَارِهِ فِي كِتَابِي تَلْبِيسِ إِبْلِيسَ».
“জেনে রেখো, ‘এহইয়া’ গ্রন্থে এমন কিছু গুরুতর ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে, যা বিজ্ঞ আলেম ছাড়া সাধারণ মানুষের ধরা কঠিন। এর মধ্যে সবচেয়ে কম ক্ষতিকর বিষয় হলো বাতিল ও জাল হাদিসের সংযোজন। তবে তিনি এসব নিজে বানিয়ে লেখেননি, বরং বিভিন্ন সূত্রে যেভাবে পেয়েছেন সেভাবেই সংগ্রহ করে তুলে ধরেছেন। কিন্তু তাই বলে জাল হাদিসের ওপর ভিত্তি করে ইবাদত করা কিংবা মনগড়া কথার ফাঁদে পা দেওয়া তো মোটেও সংগত নয়।
আমি কীভাবে এটা মেনে নিই যে, তুমি দিন-রাতের বিশেষ কিছু নামাজ পড়ে কাটিয়ে দেবে অথচ তার এক বর্ণও রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মুখ নিঃসৃত নয়? আর কেনই-বা আমি চাইব যে, সুফিদের এমন সব অসার কথাবার্তা তোমার কান পর্যন্ত পৌঁছাক যা তিনি গ্রন্থে একত্র করে অনুসরণের তাগিদ দিয়েছেন? যেমন: ফানা ও বাকার অবাস্তব তত্ত্ব, প্রচণ্ড ক্ষুধা সহ্য করার সাধনা, অহেতুক দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ানো, কিংবা কোনও পাথেয় ছাড়া ভয়াল মরুভূমিতে নেমে পড়ার মতো নির্দেশসমূহ। এসব বিষয়ের অসারতা ও ক্ষতিকর রূপ আমি আমার ‘তালবিসু ইবলিস’ গ্রন্থে বিস্তারিত উন্মোচন করে দিয়েছি।” [মুখতাসারু মিনহাজিল কাসিদিন, পৃ. ১৬–১৭]
✪ ৩. ইমাম জাহাবি (মৃত্যু: ৭৪৮ হি.) বলেন,
«أَمَّا الْإِحْيَاءُ فَفِيهِ مِنَ الْأَحَادِيثِ الْبَاطِلَةِ جُمْلَةٌ، وَفِيهِ خَيْرٌ كَثِيرٌ لَوْلَا مَا فِيهِ مِنْ آدَابٍ وَرُسُومٍ وَزُهْدٍ مِنْ طَرَائِقِ الْحُكَمَاءِ، وَمُنْحَرِفِي الصُّوفِيَّةِ، نَسْأَلُ اللهَ عِلْمًا نَافِعًا. وَقَامَ الْمَلِكُ عَلِيُّ بْنُ يُوسُفَ بْنِ تَاشْفِينَ مَلِكُ الْمُرَابِطِينَ بِإِحْرَاقِ كِتَابِ الْإِحْيَاءِ. قَالَ الذَّهَبِيُّ: وَكَانَ شُجَاعًا مُجَاهِدًا عَادِلًا دَيِّنًا وَرِعًا صَالِحًا، مُعَظِّمًا لِلْعُلَمَاءِ مُشَاوِرًا لَهُمْ».
“‘ইহইয়া’ গ্রন্থে বেশ কিছু বাতিল ও বানোয়াট হাদিস রয়েছে। অবশ্য এতে প্রচুর কল্যাণকর আলোচনাও আছে যদি না এতে দার্শনিকদের ঢং এবং বিচ্যুত সুফিদের পথ থেকে নেওয়া কিছু আচার-অনুষ্ঠান ও সন্ন্যাসব্রতের অনুপ্রবেশ ঘটত। আমরা আল্লাহর কাছে উপকারী জ্ঞানের প্রার্থনা করি। আর মুরাবিতুন সাম্রাজ্য [Almoravid Dynasty-১০৪০-১১৪৭ খ্রিষ্টাব্দ] শাসক বাদশাহ আলি ইবনে ইউসুফ ইবনে তাশফিন ‘ইহইয়া’ গ্রন্থটি পুড়িয়ে ফেলার ব্যবস্থা করেছিলেন।” ইমাম জাহাবি আরও বলেন: “তিনি (আলি ইবনে ইউসুফ) ছিলেন অত্যন্ত বীর, মুজাহিদ, ন্যায়পরায়ণ, দ্বীনদার, পরহেজগার ও সৎ এক শাসক; তিনি আলেমদের গভীর শ্রদ্ধা করতেন এবং তাঁদের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিতেন।” [সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২০/১২৪] গাজালি ও তার রচিত কিতাবাদীর ব্যাপারে পূর্ববর্তী বিজ্ঞ আলেমদের পক্ষ থেকে সতর্কী করণ মূলক আরও অনেক বক্তব্য আছে। মহান আল্লাহ আমাদেরকে বিশুদ্ধ আকিদার ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন এবং প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সহিহ সুন্নাহ অনুসরণে জীবন পরিচালনা করার তৌফিক দান করুন। তৎসঙ্গে সব রকম ভ্রান্ত আকিদা-বিশ্বাস এবং বাতিল এবং ভিত্তিহীন কর্মকাণ্ড ও আচার-অনুষ্ঠান থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
Share: