মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে সাহাবিদের অবস্থান

সম্ভবত সাহাবি মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) হলেন ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম একজন ব্যক্তিত্ব, যাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয়েছে। তাঁকে নিয়ে মতামত ভিন্ন হয়েছে, তাঁর মূল্যায়ন নিয়ে তীব্র বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই চলেছে। দুটি চরম পক্ষ তৈরি হয়েছে। একটি পক্ষ তাঁর প্রতি ভালোবাসায় ও সমর্থনে বাড়াবাড়ি করেছে। অন্য পক্ষ তাঁর প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষে বাড়াবাড়ি করেছে। এমনকি তাঁকে কাফির ও মুনাফিক পর্যন্ত বলেছে! এই দুটি চরমপন্থী পক্ষ ইসলামি ইতিহাসের একেবারে প্রথম যুগ থেকেই বিদ্যমান ছিল। ইতিহাসবিদ ইমাম জাহাবি শান্ত ও বিচক্ষণভাবে এই দ্বন্দ্বের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে বলেন:
“وخلْفَ مُعاويةَ خَلْقٌ كثيرٌ يُحبِّونَه ويَتغالَوْن فيه ويُفضِّلونه، إمَّا قد ملَكَهم بالكَرَمِ والحِلمِ والعَطاءِ، وإمَّا قد وُلِدوا في الشَّامِ على حُبِّه، وتَربَّى أولادُهم على ذلك. وفيهم جَماعةٌ يَسيرةٌ من الصحابةِ، وعدَدٌ كثيرٌ من التابعين والفُضَلاءِ، وحارَبوا معه أهلَ العِراقِ، ونَشَؤوا على النَّصْبِ، نعوذُ باللهِ من الهَوى، كما قد نشَأَ جيشُ عليٍّ رضيَ اللهُ عنه ورعِيَّتُه -إلا الخَوارجَ منهم- على حُبِّه والقيامِ معه، وبُغضِ مَن بغى عليه والتبرِّي منهم، وغَلا خلقٌ منهم في التشيُّعِ”
“মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর পেছনেও এক বিশাল জনসমষ্টি ছিল যারা তাঁকে ভালোবাসত, তাঁর প্রতি গভীর ভক্তি রাখত এবং তাঁকে অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিত। এর কারণ ছিল, হয় তিনি তাঁর অসীম উদারতা, সহনশীলতা ও দানশীলতা দিয়ে তাদের মন জয় করেছিলেন অথবা তারা সিরিয়াতে তাঁর শাসনের ছায়াতলে তাঁর প্রতি ভালোবাসা নিয়েই জন্মগ্রহণ করেছিল এবং তাদের সন্তানরাও সেভাবেই বড় হয়েছিল। তাদের মধ্যে অল্প কিছু সাহাবি এবং বিপুল সংখ্যক তাবেয়ি ও পুণ্যবান ব্যক্তি ছিলেন। তাঁরা মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর পক্ষে থেকে ইরাকবাসীদের (আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পক্ষ) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। তাদের মধ্যে একদল মানুষ ‘নাসবি’ [আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী] হিসেবে গড়ে উঠেছিল। (আমরা প্রবৃত্তি বা আবেগের তাড়না থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই।) ঠিক একইভাবে আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর বাহিনী এবং তাঁর অনুসারীরাও—একমাত্র খারেজিরা ছাড়া—তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর সমর্থনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গড়ে উঠেছিল। যারা তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল তাঁদের প্রতি ঘৃণা ও সম্পর্কহীনতা ছিল তাঁদের বৈশিষ্ট্য। তবে তাঁদের মধ্য থেকে একদল মানুষ চরমপন্থী শিয়া (ভক্তি ও আনুগত্যে সীমা লঙ্ঘনকারী) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল।” [সিয়ারু আলামিন নুবালা, ইমাম যাহাবী, ৩/১২৮-১২৯] মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ব্যাপারে অতিভক্তিতে লিপ্ত পক্ষগুলোর অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, প্রতিটি পক্ষই নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নামে জাল হাদিস তৈরির চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এই নিকৃষ্ট অপকৌশল হাদিস বিশারদগণের চোখ এড়াতে পারেনি। তাঁরা এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন এবং অন্যদের সতর্ক করেছেন। তাঁরা মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর শানে বর্ণিত হাদিসগুলোর সত্যতা যাচাই করে সহিহ ও জইফ (দুর্বল) বর্ণনাগুলোকে পৃথক করে দিয়েছেন।
এই বিষয়ে সতর্ক করে ইবনুল জাওজি (রাহ.) বলেন:
“قد تعصَّبَ قومٌ ممَّن يَدَّعي السُّنَّةَ، فوضَعوا في فضلِه أحاديثَ ليُغضِبوا الرافضةَ، وتعصَّبَ قومٌ من الرافضةِ، فوضَعوا في ذَمِّه أحاديثَ، وكِلَا الفريقينِ على الخطَأِ القبيحِ”
“সুন্নাহর অনুসারী দাবিদার একদল লোক গোঁড়ামিতে লিপ্ত হয়ে তাঁর (মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু) প্রশংসায় কিছু হাদিস জাল করেছে, যাতে শিয়া-রাফেজিদের (চরমপন্থী শিয়া) ক্রোধান্বিত করা যায়। অন্যদিকে শিয়া-রাফেজিদের একটি দল তাঁর নিন্দায় কিছু হাদিস জাল করেছে। অথচ এই উভয় পক্ষই জঘন্য ভুলের ওপর রয়েছে।” [কিতাবুল মাওযুআত, ইবনুল জাওযী (২/২৪)] মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) সংক্রান্ত এই মিথ্যার জাল ও বিকৃতি কেবল হাদিসের কিতাবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং তা ইতিহাস, প্রাচীন নিদর্শন, গল্প এবং সাহিত্যের কিতাবগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে একজন পাঠক যখন এসব কিতাব পড়েন তখন তিনি মুয়াবিয়া (রা.) সম্পর্কে বিপুল পরিমাণ পরস্পরবিরোধী তথ্যের সম্মুখীন হন। এর একদিকে রয়েছে তাঁর অতিভক্তদের তৈরি করা অতিরঞ্জিত প্রশংসা, আর অন্যদিকে রয়েছে তাঁর চরম বিদ্বেষীদের উদ্ভাবিত নিন্দা ও কুৎসা।
❑ এ ধরনের পরিস্থিতিতে করণীয়:
একজন গবেষকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চরম সতর্কতার সাথে গবেষণায় নামা। এই মানসিকতা তাকে এমনভাবে তৈরি করবে যেন কোনো তথ্যই তিনি যাচাই না করে গ্রহণ করবেন না এবং সেই তথ্যের প্রাসঙ্গিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হবেন-যাতে বিতর্কিত কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে তিনি একটি স্বচ্ছ ও ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন। কোনো গবেষকের পক্ষেই সতর্কতা অবলম্বন না করে এবং তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে কোনো অবস্থান নেওয়া বুদ্ধিবৃত্তিক বা পদ্ধতিগত কোনোভাবেই সঠিক নয়। এই নীতি শুধু মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয় বরং এটি একটি সার্বজনীন বৈজ্ঞানিক নীতি যা অমুসলিমদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অ্যারিস্টটল—যাঁকে নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে বা মার্টিন লুথার—যাঁকে নিয়েও তীব্র মতভেদ রয়েছে—তাঁদের সম্পর্কে মতামত দেওয়ার আগেও একজন গবেষকের জন্য গবেষণায় সতর্ক থাকা, বর্ণনার সত্যতা ও সকল তথ্যের সঠিক অর্থ নিশ্চিত করা আবশ্যক—যাতে একটি ন্যায্য অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হয়।
যদিও এই নিয়মটি সবার জন্যই প্রযোজ্য তবে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। কারণ, তাঁদের রয়েছে বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান এবং তাঁরা নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাহচর্য ও সান্নিধ্য পেয়েছেন। এমন অনেক নসুস (দলিল), বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ এবং ঐতিহাসিক দলিল রয়েছে যা প্রমাণ করে যে—তাঁদের মূল বৈশিষ্ট্যই ছিল ন্যায়পরায়ণতা, সত্যবাদিতা, আমানতদারি এবং দৃঢ় বিশ্বাস। আমি এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি আমার একটি গবেষণাপত্রে, যা বিভিন্ন ওয়েবসাইটে “সাহাবি প্রজন্মের ইতিহাস পর্যালোচনার পদ্ধতিগত রূপরেখা” (المَدخلُ المنهجيُّ للتعاملِ مع جيلِ الصحابةِ) শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।” এসব শরয়ি প্রশংসা এবং যৌক্তিক ও ঐতিহাসিক এসব তথ্যের কারণেই মুমিনদের হৃদয়ে সাহাবায়ে কেরামের প্রতি এক বিশাল মর্যাদা রয়েছে। তাঁদের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মান অত্যন্ত গভীর। মুসলিম উম্মাহ সবসময় তাঁদের ব্যাপারে সুধারণা পোষণ এবং তাঁদের যাবতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে পবিত্র রাখার নীতি অনুসরণ করে থাকে—যতক্ষণ না এর বিপরীতে অত্যন্ত জোরালো ও অকাট্য কোনো দলিল পাওয়া যায়। এই কারণেই সাহাবিগণের জীবন ও তাঁদের পারস্পরিক বিবাদের বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। একজন মুসলিমের জন্য জ্ঞান, ইনসাফ, সতর্কতা, নিশ্চিত যাচাই-বাছাই এবং পরিষ্কার হৃদয় ছাড়া এই বিষয়ে কোনো ধরনের মন্তব্য বা আলোচনায় লিপ্ত হওয়া মোটেও বৈধ নয়। এই তথ্য ও উপাত্তগুলোই হলো সেই মূল ভিত্তি, যার ওপর ভিত্তি করে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের উলামায়ে কেরাম সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)এর মধ্যকার পারস্পরিক মতভেদ ও বিবাদ নিয়ে নীরবতা অবলম্বন করার (অর্থাৎ সমালোচনা না করার) মত প্রদান করেছেন। তাঁদের এই রায় কেবল যুক্তিহীন কোনো দাবি নয় বরং এটি শরয়ি, ঐতিহাসিক এবং যৌক্তিক দলিলের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ—যা সাহাবিগণের মর্যাদা, তাঁদের সুউচ্চ স্থান এবং তাঁদের অন্তরের পরিচ্ছন্নতা ও সততার প্রমাণ দেয়। পূর্বের আলোচনা এটিই নিশ্চিত করে যে, মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.)-এর ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন এবং তথ্য যাচাইয়ের বিষয়টি আরও জোরালো ও উচ্চতর হওয়া উচিত।
◈ এর প্রথম কারণ হলো—তিনি একজন সাহাবি (রা.)।
◈ দ্বিতীয়ত কারণ—তাঁকে নিয়ে বিতর্কের মাত্রা অত্যন্ত তীব্র।
এই পরিস্থিতিই তাঁর ক্ষেত্রে সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি ও কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করাকে অপরিহার্য করে তোলে। কিন্তু এমন কিছু মানুষ আছে, যারা সাহাবি মুয়াবিয়া (রা.)-এর ব্যাপারে সেই ‘চরম সতর্কতা’র নিয়মটি মেনে চলেনি। তাঁরা হয় তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখিয়েছে অথবা অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে ভুল করেছে। তাঁরা মুয়াবিয়া (রা.)-এর কুৎসা সম্বলিত বিভিন্ন গল্প ও সংবাদের ওপর নির্ভর করেছে এবং সেগুলোর ভিত্তিতে তাঁর ব্যাপারে অন্যায্য ও জুলুমপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
এর উদাহরণ হিসেবে বলা যায়: উসমান (রা.)-এর যুগে মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)ভারতে মূর্তি বিক্রি করতেন কিংবা তিনি মদ্যপান করতেন—এই জাতীয় বিভিন্ন অভিযোগ। এসব ক্ষেত্রে যুক্তি দেওয়া হয় যে, অনেক আলেম তাঁদের হাদিস বা ইতিহাসের কিতাবে এসব বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। অথচ আমরা সবাই জানি, ইতিহাস বা সংবাদের কিতাবে যা কিছু উল্লেখ করা হয় তার সবই সহিহ বা গ্রহণযোগ্য নয়; বরং তাতে প্রচুর দুর্বল ও ভিত্তিহীন বর্ণনা রয়েছে। [এই সংবাদগুলোর দুর্বলতা প্রমাণের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন: ‘সাল্লুস সিনান ফিয যাব্বি আন মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান’ (মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সপক্ষে বর্শা চালনা বা প্রতিরক্ষা” [অর্থাৎ তাঁর সম্মান রক্ষায় লেখনীর মাধ্যমে জোরালো প্রতিবাদ]। লেখক: সাদ আস সুবাইয়ী (পৃষ্ঠা: ১৯৭-ডিজিটাল সংস্করণ] এর বাইরেও আমরা যদি মুয়াবিয়া (রা.)-এর নিন্দায় বর্ণিত সংবাদগুলো পরীক্ষা করি তবে দেখতে পাব যে, এগুলোর সনদ বা সূত্রগুলো বাতিল এবং এগুলোতে এমন সব ‘ইলাল’ বা হাদিসতাত্ত্বিক ত্রুটি রয়েছে যা এগুলোর অসারতা প্রমাণ করে। উপরন্তু এই বর্ণনাগুলো মুয়াবিয়া (রা.)-এর ফজিলত বা মর্যাদা সম্পর্কে বর্ণিত সহিহ হাদিসগুলোর বিরোধী এবং সেইসব যৌক্তিক প্রমাণেরও পরিপন্থী যা এই গবেষণার সামনে আসবে। তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এই শিথিলতা আমাদের এমন সব ভুল পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে যা বৈজ্ঞানিক বা তাত্ত্বিক পদ্ধতির বিরোধী। কারণ, এই শিথিলতা একদিকে যেমন মুয়াবিয়া (রা.)-এর ব্যাপারে অতি ভক্তি পোষণকারীদের সামনে দুর্বল বর্ণনার মাধ্যমে এমন সব ফজিলত প্রমাণের পথ খুলে দেবে যা প্রকৃতপক্ষে প্রমাণিত নয়—যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, বিতর্কিত কোনো ব্যক্তির দোষ প্রমাণের ক্ষেত্রে যেমন শিথিলতা দেখানো সঠিক নয়। তেমনি তাঁর ফজিলত প্রমাণের ক্ষেত্রেও শিথিলতা দেখানো জায়েজ নয়।
অন্যদিকে, এটি আলি বিন আবু তালিব (রা.)বা অন্যান্য সাহাবিদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীদের জন্যও সুযোগ করে দেবে, যাতে তারা অনির্ভরযোগ্য ও অপ্রমাণিত বর্ণনা দিয়ে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহাবিদের নামে কুৎসা রটাতে পারে। সঠিক ও পদ্ধতিগত পথ হলো—সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর সাথে সম্পৃক্ত প্রতিটি বিষয়ে ‘চরম সতর্কতা’র নীতি বজায় রাখা, বিশেষ করে যাঁদের নিয়ে বিতর্ক বা মতভেদ রয়েছে। আমরা তাঁদের জন্য এমন কোনো ফজিলত প্রমাণ করব না যা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত নয়। আবার তাঁদের প্রতি এমন কোনো নিন্দাও আরোপ করব না যা অকাট্যভাবে প্রমাণিত নয়। এসব বিষয় এটাই প্রমাণ করে যে, মুয়াবিয়া (রা.)-এর নিন্দায় যারা শিথিলতা দেখায় বা বাড়াবাড়ি করে, তাদের মূল সমস্যা বিক্ষিপ্ত কোনো উদাহরণ বা তথ্যের মধ্যে নয়; বরং সমস্যাটি তাদের চিন্তাধারা ও ত্রুটিপূর্ণ গবেষণা পদ্ধতির মূলে। তাই মুয়াবিয়া (রা.)-এর ইতিহাস পর্যালোচনায় আমাদের কেবল তথ্যের পাহাড় জমানোর প্রয়োজন নেই বরং প্রয়োজন হলো কোনো বিষয়ে অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক মানদণ্ড বজায় রাখা। সেই সাথে যে ভুল পথগুলো মানুষকে ইতিহাস ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ভুল সিদ্ধান্ত, বিশৃঙ্খলা ও অন্যায়ের দিকে পরিচালিত করে, সেগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা।
❑ মুয়াবিয়া (রা.)-এর ব্যাপারে আমরা কীভাবে একটি ন্যায়নিষ্ঠ অবস্থান তৈরি করতে পারি?
সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর প্রজন্ম এমন এক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যা অন্য কারও মধ্যে নেই। তা হলো—তাঁরা নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহচর্য লাভ করেছেন, তাঁর সাথে জীবন অতিবাহিত করেছেন, তাঁর দেখা-সাথে সাক্ষাৎ ও কথোপকথন করেছেন। নবিজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁদের সাথে সফর করেছেন এবং তাঁরাও নবিজির সাথে সফর করেছেন। মক্কা বিজয়ের আগে বা পরে যারা ইমান এনেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের সাথেই নবিজির নানা ধরনের সম্পর্ক ছিল। দীর্ঘ সময় একসাথে বসবাসের এই প্রেক্ষাপটটি অবধারিতভাবেই দাবি করে যে, নবিজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পক্ষ থেকে তাঁদের সম্পর্কে বিভিন্ন বক্তব্য, সিদ্ধান্ত বা ঘটনার অবতারণা হবে। এ কারণেই সাহাবিদের সম্পর্কে একটি ন্যায়নিষ্ঠ ও সঠিক ধারণা গঠনের সর্বোত্তম এবং নিরাপদ পথ হলো:
➧ (ক) শরয়ি দলিলের (নুসুস) দিকে ফিরে যাওয়া। কারণ এটিই নিঃসন্দেহে সবচেয়ে সত্য ও জোরালো প্রমাণ।
এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে, মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.)-এর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে। যেমন:
◈ তিনি নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওহি লেখক (কাতিবে ওহি) ছিলেন।
◈ এছাড়া নবিজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সম্পর্কে দোয়া করে বলেছিলেন:
“اللهُمَّ اجعلْه هاديًا مَهديًّا
“হে আল্লাহ! তাঁকে আপনি সঠিক পথপ্রদর্শক ও সঠিক পথপ্রান্ত হিসেবে কবুল করুন।”
[ইমাম আহমদ তাঁর মুসনাদ-এ (১৭৯২৯), তিরমিজি তাঁর সুনান-এ (৩৮৪৩), ইবনে সাদ তাঁর তাবাকাত-এ (৭/৪১৭) এবং আজুররী তাঁর আশ শরীয়াহ-তে (১৯১৪) এটি বর্ণনা করেছেন। উলামায়ে কেরামের একটি বড় দল এই বর্ণনাটিকে সহিহ বলেছেন।]
◈ উম্মে হারাম বিনতে মিলহান (রা.)থেকে বর্ণিত, তিনি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছেন:
“أوَّلُ جيشٍ من أمَّتي يَغزون البحرَ قد أَوْجَبوا”
“আমার উম্মতের প্রথম যে বাহিনী সমুদ্র অভিযানে বের হবে তাঁরা নিজেদের জন্য (জান্নাত) অবধারিত করে নিয়েছে।”
উম্মে হারাম (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রসুল! আমি কি তাঁদের মধ্যে থাকব?” নবিজি বললেন, “أنتِ فيهم” “হ্যাঁ, তুমি তাঁদের মধ্যেই থাকবে।”
এরপর নবিজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
“أوَّلُ جيشٍ من أُمَّتي يَغزون مدينةَ قَيصَرَ مغفورٌ لهم”، فقلتُ: أنا فيهم يا رسولَ اللهِ؟ قال: لا
“আমার উম্মতের যে প্রথম বাহিনী কায়সারের শহর (কনস্টান্টিনোপল) আক্রমণ করবে তাঁদের ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে।”
আমি বললাম, “আমি কি তাঁদের মধ্যে থাকব হে আল্লাহর রসুল?” তিনি বললেন, “না।” [সহিহ বুখারি (২৭৬৬)] [উল্লেখ্য যে, প্রথম সমুদ্র অভিযান মুয়াবিয়া (রা.)-এর নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়েছিল।]
এই সকল সহিহ দলিল থেকে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের উলামায়ে কেরাম মুয়াবিয়া (রা.)-এর বহু মর্যাদা ও ফজিলত আহরণ করেছেন এবং তাঁদের হাদিস ও আকাইদের কিতাবসমূহে তা বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন।
➧ (খ) কোনও ব্যক্তি সম্পর্কে ন্যায়নিষ্ঠ অবস্থান তৈরির আরেকটি গভীর ও নিখুঁত পদ্ধতি হলো, তাঁর সঙ্গী-সাথী, সমসাময়িক ব্যক্তিবর্গ এবং যারা তার অবস্থা সম্পর্কে সরাসরি অবগত ছিলেন তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি পর্যবেক্ষণ করা। এই পদ্ধতিটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন সেই সঙ্গীরা হন স্বয়ং সাহাবায়ে কেরাম (রা.)। কারণ তাঁরা ছিলেন হৃদয়ের দিক থেকে সবচেয়ে আল্লাহ ভীরু, পবিত্র আত্মার অধিকারী, আল্লাহর দ্বীন সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী এবং চরিত্রে মহান। তাঁরা আল্লাহর শরিয়তের ব্যাপারে ছিলেন আপসহীন এবং সত্য প্রকাশে সবচেয়ে সাহসী। আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে তাঁরা কোনও নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় পেতেন না। ফলে কোনও ব্যক্তি সম্পর্কে তাঁদের অবস্থানই হবে অবধারিতভাবে সবচেয়ে ন্যায়সঙ্গত, সঠিক এবং নিখুঁত। তাই মুয়াবিয়া (রা.)-এর প্রকৃত অবস্থা জানার অন্যতম সেরা উপায় হলো, তাঁর সম্পর্কে অন্যান্য সাহাবিদের মনোভাব ও অবস্থান সম্পর্কে অবগত হওয়া।
❑ সাহাবিদের অবস্থান কী ছিল?
আমরা যদি সাহাবায়ে কেরামের সঠিক ও নির্ভরযোগ্য অবস্থানগুলোর দিকে ফিরে তাকাই তবে দেখব যে সেগুলো মুয়াবিয়া (রা.)-এর মর্যাদা, উদারতা এবং তাঁর সুন্দর জীবনচরিতেরই প্রমাণ দিচ্ছে। তাঁর এবং তাঁর শাসনের প্রতি তাঁদের সন্তুষ্টির বিষয়টিও সেখানে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। চরম বিদ্বেষীরা তাঁর প্রতি কুফরি, মুনাফেকি (কপটতা), ফাসেকি (পাপাচার) এবং প্রতারণার যে অভিযোগগুলো আরোপ করে বাস্তব চিত্র তার সম্পূর্ণ উল্টো। নিম্নে মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান (রা.)-এর ব্যাপারে কয়েকজন সাহাবির অবস্থান তুলে দরা হলো:
✪ উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর অবস্থান:
উমর (রা.) তাঁর ভাই ইয়াজিদের মৃত্যুর পর মুয়াবিয়াকে শামে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করেন—সেটি তখন মুসলমানদের একটি সামরিক সীমান্ত ঘাঁটি ছিল।
উমর (রা.) তাঁর মৃত্যুর আগে বিভিন্ন অঞ্চলের গভর্নরদের সম্পর্কে বলেছিলেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أُشْهِدُكَ عَلَى أُمَرَاءِ الْأَمْصَارِ، وَإِنِّي إِنَّمَا بَعَثْتُهُمْ عَلَيْهِمْ لِيَعْدِلُوا عَلَيْهِمْ، وَلِيُعَلِّمُوا النَّاسَ دِينَهُمْ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِمْ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَيَقْسِمُوا فِيهِمْ فَيْئَهُمْ، وَيَرْفَعُوا إِلَيَّ مَا أَشْكَلَ عَلَيْهِمْ مِنْ أَمْرِهِمْ
“হে আল্লাহ! আমি বিভিন্ন জনপদের শাসকদের ব্যাপারে আপনাকে সাক্ষী রাখছি। আমি তাঁদেরকে জনগণের কাছে এই উদ্দেশ্যেই পাঠিয়েছি, যেন তাঁরা তাঁদের প্রতি সুবিচার করেন, মানুষকে তাঁদের দ্বীন ও তাঁদের নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহ শিক্ষা দেন, তাঁদের মধ্যে রাষ্ট্রীয় সম্পদ (ফাই) বণ্টন করেন এবং তাঁদের যেসব বিষয় জটিল ও অমীমাংসিত থেকে যায় তা যেন আমার কাছে উত্থাপন করেন।” [সহিহ মুসলিম: ৫৬৭]
নিশ্চয়ই উমর (রা.) মুয়াবিয়া (রা.)-এর ওপর আস্থা রেখেছিলেন এবং মুসলিম সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলের শাসক হিসেবে তাকে পছন্দ করেছিলেন। এখন মুয়াবিয়া (রা.) যদি কাফির, মুনাফেক, ফাসেক কিংবা দ্বীনদারির দিক থেকে অবিশ্বস্ত হতেন তবে উমর (রা.) কি তাকে মুসলিমদের আমির হিসেবে গ্রহণ করতেন? উমর (রা.) যেখানে কোনও অমুসলিমকে তাঁর কোনও গভর্নরের অধীনে সামান্য লেখক বা কেরানি হিসেবে নিয়োগ দিতেও রাজি হননি সেখানে তিনি কীভাবে এমন কাউকে শাসক বানাবেন যে (নাউযুবিল্লাহ) কাফির কিংবা মুনাফিক?! উলামায়ে কেরামের একটি বড় দল উমর (রা.)-এর এই অবস্থানের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন এবং একে মুয়াবিয়া (রা.)-এর ইমান ও সুন্দর চরিত্রের এক সুস্পষ্ট দলিল হিসেবে গণ্য করেছেন।
এ প্রসঙ্গে ইমাম জাহাবি বলেন:
“حَسْبُكَ بِمَنْ يُؤَمِّرُهُ عُمَرُ ثُمَّ عُثْمَانُ عَلَى إِقْلِيمٍ -وَهُوَ ثَغْرٌ- فَيَضْبِطُهُ وَيَقُومُ بِهِ أَتَمَّ قِيَامٍ، وَيَرْضَى النَّاسُ بِسَخَائِهِ وَحِلْمِهِ، وَإِنْ كَانَ بَعْضُهُمْ تَأَلَّمَ مَرَّةً مِنْهُ، وَكَذَلِكَ فَلْيَكُنِ الْمُلْكُ”
“এমন একজন ব্যক্তির ব্যাপারে তোমার ধারণা কী হতে পারে, যাকে প্রথমে উমর (রা.) এবং পরে উসমান (রা.) একটি অঞ্চলের—যা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকা—গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন? তিনি অত্যন্ত নিপুণভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন এবং নিজের দায়িত্ব পূর্ণাঙ্গভাবে পালন করেছিলেন। তাঁর উদারতা এবং সহনশীলতায় জনগণ সন্তুষ্ট ছিল-যদিও মাঝেমধ্যে কেউ কেউ তাঁর কোনও কাজে কষ্ট পেয়ে থাকতে পারে। আর আদর্শ রাজত্ব বা শাসন এমনই হওয়া উচিত।” [সিয়ারু আলামিন নুবালা, ইমাম জাহাবি, ৩/১৩২-১৩৩]
ইবনে তাইমিয়া উমর (রা.)-এর কর্মের তাৎপর্য বিস্তারিত ভাবে ব্যাখ্যা করে বলেন:
لَمَّا مَاتَ يَزِيدُ بْنُ أَبِي سُفْيَانَ فِي خِلَافَةِ عُمَرَ؛ اسْتَعْمَلَ أَخَاهُ مُعَاوِيَةَ، وَكَانَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ مِنْ أَعْظَمِ النَّاسِ فِرَاسَةً، وَأَخْبَرِهِمْ بِالرِّجَالِ، وَأَقْوَمِهِمْ بِالْحَقِّ، وَأَعْلَمِهِمْ بِهِ… وَلَا اسْتَعْمَلَ عُمَرُ قَطُّ -بَلْ وَلَا أَبُو بَكْرٍ- عَلَى الْمُسْلِمِينَ مُنَافِقًا، وَلَا اسْتَعْمَلَا مِنْ أَقَارِبِهِمَا، وَلَا كَانَ تَأْخُذُهُمَا فِي اللهِ لَوْمَةُ لَائِمٍ، بَلْ لَمَّا قَاتَلَا أَهْلَ الرِّدَّةِ وَأَعَادُوهُمْ إِلَى الْإِسْلَامِ مَنَعُوهُمْ رُكُوبَ الْخَيْلِ وَحَمْلَ السِّلَاحِ، حَتَّى تَظْهَرَ صِحَّةُ تَوْبَتِهِمْ، وَكَانَ عُمَرُ يَقُولُ لِسَعْدِ بْنِ أَبِي وَقَّاصٍ وَهُوَ أَمِيرُ الْعِرَاقِ: لَا تَسْتَعْمَلْ أَحَدًا مِنْهُمْ، وَلَا تُشَاوِرْهُمْ فِي الْحَرْبِ، فَإِنَّهُمْ كَانُوا أُمَرَاءَ أَكَابِرَ مِثْلَ طُلَيْحَةَ الْأَسَدِيِّ، وَالْأَقْرَعِ بْنِ حَابِسٍ، وَعُيَيْنَةَ بْنِ حِصْنٍ، وَالْأَشْعَثِ بْنِ قَيْسٍ الْكِنْدِيِّ، وَأَمْثَالِهِمْ، فَهَؤُلَاءِ لَمَّا تَخَوَّفَ أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ مِنْهُمْ نَوْعَ نِفَاقٍ لَمْ يُوَلُّوهُمْ عَلَى الْمُسْلِمِينَ، فَلَوْ كَانَ عَمْرُو بْنُ الْعَاصِ وَمُعَاوِيَةُ بْنُ أَبِي سُفْيَانَ وَأَمْثَالُهُمَا مِمَّنْ يُتَخَوَّفُ مِنْهُمَا النِّفَاقُ لَمْ يُوَلُّوا عَلَى الْمُسْلِمِينَ”
“যখন উমর (রা.)-এর খিলাফতকালে ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান ইন্তেকাল করলেন তখন উমর তাঁর ভাই মুয়াবিয়াকে নিযুক্ত করলেন। আর উমর ইবনুল খাত্তাব ছিলেন, সবচেয়ে প্রখর অন্তর্দৃষ্টির অধিকারী, মানুষের স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কে সবচেয়ে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এবং হকের ওপর অটল-অবিচল এবং গভীর জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব।… উমর—এমনকি আবু বকরও—কখনো কোনও মুনাফিককে মুসলিমদের দায়িত্বশীল নিযুক্ত করেননি। তাঁরা নিজেদের কোনও আত্মীয়কেও দায়িত্ব দেননি এবং আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে কোনও নিন্দুকের নিন্দাকে তোয়াক্কা করতেন না। বরং তাঁরা যখন মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাদের পুনরায় ইসলামে ফিরিয়ে আনলেন তখন তাদের তওবা যে বিশুদ্ধ তা প্রকাশ না পাওয়া পর্যন্ত তাদের জন্য (জিহাদের উদ্দেশ্যে) ঘোড়ায় চড়া ও অস্ত্র বহন করা নিষিদ্ধ করেছিলেন। উমর (রা.) ইরাকের আমির সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা.)-কে বলতেন: ‘তুমি এদের কাউকে দায়িত্বশীল হিসেবে নিয়োগ দিও না এবং যুদ্ধের বিষয়ে তাদের সাথে পরামর্শ করো না।’
অথচ তারা ছিল বড় বড় গোত্রপ্রধান ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ—যেমন তুলাইহা আল আসাদি, আকরা ইবনে হাবিস, উয়াইনা ইবনে হিসন এবং আশআস ইবনে কাইস আল কিন্দি প্রমুখ। আবু বকর ও উমর তাঁদের মধ্যে মুনাফেকির আশঙ্কা করেছিলেন বলেই তাঁদেরকে মুসলিমদের নেতৃত্বের দায়িত্ব দেননি। সুতরাং আমর ইবনুল আস ও মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের মতো ব্যক্তিদের মাঝে যদি মুনাফিকির সামান্যতম আশঙ্কা থাকত তবে তাঁরা কখনোই মুসলিমদের ওপর দায়িত্ব পেতেন না।” [মাজমুউল ফাতাওয়া, ৩৫/৬৫]
✪ আলি ইবনে আবু তালিব (রা.)-এর অবস্থান:
আলি ইবনে আবু তালিব (রা.)-এর ব্যাপারে সঠিক বর্ণনা ও অবস্থানগুলো এটাই প্রমাণ করে যে, তিনি মুয়াবিয়া (রা.)কে কাফির বা মুনাফিক মনে করতেন না। বরং তিনি তাঁকে একজন ন্যায়পরায়ণ মুসলিম হিসেবেই গণ্য করতেন। আলি (রা.) নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহাবি হিসেবে মুয়াবিয়া (রা.)-এর মর্যাদাকে রক্ষা করতেন এবং তাঁর অবস্থানকে ‘ইজতিহাদ’ (ভুল হোক বা শুদ্ধ, গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত) হিসেবে বিবেচনা করতেন। তাঁদের মধ্যে দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে এক ভয়াবহ যুদ্ধ চলেছিল, যাতে অনেক মুসলিমের প্রাণহানি ঘটে এবং জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এখন মুয়াবিয়া (রা.)-এর মধ্যে যদি কুফরি, মুনাফেকি, পাপাচার কিংবা দ্বীনের প্রতি অবজ্ঞা, মূর্তিপূজা বা মদ্যপানের মতো কোনও দোষ থাকত তবে আলি (রা.) অবশ্যই তা মানুষের সামনে প্রকাশ করে দিতেন। তিনি তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতেন যাতে মানুষ যুদ্ধ থেকে সরে আসে এবং মুসলিমদের রক্ত রক্ষা পায়। কিন্তু তিনি এর কিছুই করেননি। বরং তাঁর থেকে দৃঢ়ভাবে প্রমাণিত যে, তিনি বলেছিলেন:
قَتْلايَ وقَتْلى معاويةَ في الجنةِ
“আমার পক্ষের নিহতরা এবং মুয়াবিয়ার পক্ষের নিহতরা জান্নাতি।” [মুসান্নাফ ইবনে আবু শাইবা, ১৫/৩০৩]
শুধু তাই নয় তিনি সিরিয়া বাসীদের (মুয়াবিয়া রা.-এর অনুসারীদের) জন্য ইস্তিগফারের দুআ করতেন। আমরা যদি খারেজিদের বিরুদ্ধে আলি (রা.)-এর অবস্থান এবং মুয়াবিয়া (রা.) ও সিরিয়াবাসীদের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থানের তুলনা করি তবে মুয়াবিয়া (রা.)-এর প্রতি তাঁর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির এক জোরালো প্রমাণ খুঁজে পাব। আলি (রা.) খারেজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আনন্দিত হয়েছিলেন। তিনি মানুষের সামনে খারেজিদের বিষয়ে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিত হাদিসগুলো বর্ণনা করতেন এবং সেগুলোর সত্যতার ওপর কসম খেতেন। কারণ তিনি খারেজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাকে শরিয়ত সম্মত মনে করতেন (যদিও তিনি তাদের কাফির বলতেন না)। কিন্তু সিরিয়াবাসীদের সাথে যুদ্ধের সময় তাঁর অবস্থা এমন ছিল না। তিনি এই যুদ্ধে কোনও আনন্দ প্রকাশ করেননি। বরং তিনি ছিলেন দ্বিধাগ্রস্ত এবং মুসলিমদের রক্তপাতের কারণে অত্যন্ত অনুতপ্ত ও শোকার্ত। [এই বর্ণনার বিস্তারিত জানতে দেখুন: মুসান্নাফ ইবনে আবু শায়বা (৩৯০০৭)] (১)
──────────────────────────────
(১) টিকা:
খারেজিদের বিরুদ্ধে আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর অবস্থান এবং সিরিয়াবাসীদের (সিফফিন ও জামাল যুদ্ধ) সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির বর্ণনাগুলো নিচে উপস্থাপন করা হলো:
◆ ১. খারেজিদের ব্যাপারে আলি (রা.)-এর কসম:
এই হাদিসে প্রমাণিত হয় যে, আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)খারেজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে নবিজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নির্দেশের বাস্তবায়ন মনে করতেন এবং এর সত্যতার ওপর কসম খেতেন।
فَلَمَّا قَتَلَهُمْ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: انْظُرُوا، فَنَظَرُوا فَلَمْ يَجِدُوا شَيْئًا، فَقَالَ: ارْجِعُوا، فَالْتَمِسُوا فَوَاللهِ مَا كَذَبْتُ وَلَا كُذِبْتُ – مَرَّتَيْنِ أَوْ ثَلَاثًا – ثُمَّ وَجَدُوهُ فِي خَرِبَةٍ، فَأَتَوْا بِهِ حَتَّى وَضَعُوهُ بَيْنَ يَدَيْهِ.
“যখন আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)তাদের (খারেজিদের) হত্যা করলেন তখন তিনি বললেন: তোমরা (চিহ্নিত ব্যক্তিকে) খোঁজো। তারা তাকে খুঁজল কিন্তু পেল না। তিনি বললেন: তোমরা ফিরে গিয়ে আবার তালাশ করো। আল্লাহর কসম! আমি মিথ্যা বলিনি এবং আমাকেও মিথ্যা বলা হয়নি। কথাটি তিনি দুই বা তিনবার বললেন। অবশেষে তারা তাকে একটি গর্তের মধ্যে (নিহত অবস্থায়) পেল এবং তাকে আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সামনে এনে রাখা হলো।” [সহিহ মুসলিম: ২৪৬৮]।
◆ ২. খারেজিদের কাফির না বলা সংক্রান্ত বর্ণনা:
তিনি খারেজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেও তাদের কাফির বা মুনাফিক বলেননি বরং ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে গণ্য করেছেন।
عَنْ طَارِقِ بْنِ شِهَابٍ، قَالَ: كُنْتُ عِنْدَ عَلِيٍّ، فَسُئِلَ عَنْ أَهْلِ النَّهْرِ، أَشِرْكٌ هُمْ؟ قَالَ: ” مِنَ الشِّرْكِ فَرُّوا “، قِيلَ: أَفَمُنَافِقُونَ هُمْ؟ قَالَ: ” إِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلًا “، قِيلَ لَهُ: فَمَا هُمْ؟ قَالَ: ” قَوْمٌ بَغَوْا عَلَيْنَا، فَقَاتَلْنَاهُمْ “.
“তারেক ইবনে শিহাব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট ছিলাম। তাঁকে খারেজিদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো—তারা কি মুশরিক? তিনি বললেন: তারা তো শিরক থেকেই পালিয়ে এসেছে। পুনরায় জিজ্ঞাসা করা হলো—তবে কি তারা মুনাফিক? তিনি বললেন: মুনাফিকরা তো আল্লাহকে খুব সামান্যই স্মরণ করে। বলা হলো—তবে তারা কারা? তিনি বললেন: তারা এমন এক সম্প্রদায় যারা আমাদের ওপর বিদ্রোহ করেছে। তাই আমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি।” [মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা: ৩৮৩৭১, ইমাম বায়হাকিও এটি বর্ণনা করেছেন এবং ইবনে হাজার আসকালানি ও আলবানি রহ. একে সহিহ বলেছেন]।
◆ ৩. সিরিয়াবাসীদের (সিফফিন ও জামাল) সম্পর্কে তাঁর অবস্থান:
সিরিয়াবাসীদের সাথে যুদ্ধের সময় তিনি ব্যথিত ছিলেন এবং তাদের সম্পর্কে কোনো কঠোর শব্দ ব্যবহার করতে নিষেধ করতেন।
عَنْ جَعْفَرِ بْنِ مُحَمَّدٍ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: سَمِعَ عَلِيٌّ يَوْمَ الْجَمَلِ، أَوْ يَوْمَ صِفِّينَ رَجُلًا يَغْلُو فِي الْقَوْلِ، فَقَالَ: ” لَا تَقُولُوا إِلَّا خَيْرًا، إِنَّمَا هُمْ قَوْمٌ زَعَمُوا أَنَّا بَغَيْنَا عَلَيْهِمْ، وَزَعَمْنَا أَنَّهُمْ بَغَوْا عَلَيْنَا، فَقَاتَلْنَاهُمْ عَلَى ذَلِكَ “
“জাফর ইবনে মুহাম্মদ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)জঙ্গে জামাল বা সিফফিনের দিন এক ব্যক্তিকে (বিপক্ষ দল সম্পর্কে) কঠোর কথা বলতে শুনলেন। তখন তিনি বললেন: তোমরা কেবল ভালো কথা বলো। তারা তো এমন এক সম্প্রদায় যারা ধারণা করেছে যে আমরা তাদের ওপর বিদ্রোহ করেছি, আর আমরা ধারণা করেছি যে তারা আমাদের ওপর বিদ্রোহ করেছে; মূলত এই কারণেই আমরা লড়াই করেছি।” [মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা: ৩৯০০৭। এটি একটি ‘মুরসাল’ বর্ণনা হলেও এর অর্থ সঠিক এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক বর্ণনার মাধ্যমে এটি সমর্থিত।]
◆ ৪. খারেজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ফজিলত:
قَالَ عَلِيٌّ: ” وَاللَّهِ مَا كَذَبْتُ، وَلَا كُذِبْتُ، لَوْلَا أَنْ تَنْكِلُوا عَنِ الْعَمَلِ لَأَنْبَأْتُكُمْ بِمَا أَعَدَّ اللَّهُ عَلَى لِسَانِ نَبِيِّهِ لِمَنْ قَتَلَ هَؤُلَاءِ “.
“আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন: আল্লাহর কসম! আমি মিথ্যা বলিনি এবং আমাকেও মিথ্যা বলা হয়নি। তোমরা যদি (নির্ভরশীল হয়ে) আমল ছেড়ে দেওয়ার ভয় না করতে তবে যারা এদের (খারেজিদের) হত্যা করবে তাদের জন্য আল্লাহ তাঁর নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মুখে কী (পুরস্কারের) ঘোষণা দিয়েছেন তা আমি তোমাদের জানিয়ে দিতাম।” [মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা: ৩৮৩৭১, মুসলিমের বর্ণনার সমার্থক, সহিহ]।
✪ হাসান ইবনে আলি (রা.)-এর অবস্থান:
আমরা যদি হাসান ইবনে আলি (রা.)-এর অবস্থানের দিকে তাকাই তবে দেখব তাঁর পদক্ষেপও তাঁর পিতার পদক্ষেপের মতোই একই সত্যের জানান দিচ্ছে। তিনি মুয়াবিয়া (রা.)-এর হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে তাঁর সাথে সন্ধি করেছিলেন। আর নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাসানের এই কাজটির প্রশংসা করেছিলেন এবং এর সুসংবাদ দিয়ে বলেছিলেন:
إِنَّ ابْنِي هَذَا سَيِّدٌ، وَلَعَلَّ اللهَ أَنْ يُصْلِحَ بِهِ بَيْنَ فِئَتَيْنِ عَظِيمَتَيْنِ مِنَ الْمُسْلِمِينَ
“নিশ্চয়ই আমার এই সন্তান একজন নেতা। সম্ভবত আল্লাহ তার মাধ্যমে মুসলিমদের দুটি বিশাল দলের মধ্যে সন্ধি ও শান্তি স্থাপন করবেন।” [সহিহ বুখারি: ২৭০৪]
হাসান (রা.)-এর এই সিদ্ধান্তে তাঁর সাথে থাকা অন্যান্য সাহাবিগণও একমত পোষণ করেছিলেন। যাঁদের মধ্যে তাঁর ভাই হুসাইন (রা.)সহ আরও অনেকে ছিলেন। এ বিষয়ে ইমাম আওযাঈ (রাহ.) বলেন:
أدركَتْ خلافةَ معاويةَ عِدَّةٌ من أصحابِ رسولِ اللهِ -صلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ- منهم: سَعدٌ وأسامةُ وجابرٌ وابنُ عَمرَ وزيدُ بنُ ثابتٍ ومَسلَمةُ بنُ مَخْلَدٍ وأبو سَعيدٍ ورافعُ بنُ خَديجٍ وأبو أُمامةَ وأنَسُ بنُ مالكٍ، ورجالٌ أكثرُ ممَّن سمَّيْنا بأضعافٍ مُضاعفةٍ، كانوا مصابيحَ الهُدى، وأوعيةَ العلمِ، حضَروا من الكِتابِ تَنزيلَه، وأخَذوا عن رسولِ اللهِ صلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ تأويلَه، ومن التابعينَ لهم بإحسانٍ -إن شاءَ اللهُ- منهم: المِسْوَرُ بنُ مَخْرَمةَ وعبدُ الرحمنِ بنُ الأسودِ بنِ عبدِ يَغوثَ وسعيدُ بنُ المُسيَّبِ وعُروةُ بنُ الزُّبَيرِ وعبدُ اللهِ بنُ مُحَيْريزٍ، في أشباهٍ لهم لم يَنزِعوا يَدًا عن مُجامعةٍ في أمَّةِ محمدٍ
“রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর একদল সাহাবি মুয়াবিয়া (রা.)-এর খিলাফতকাল পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন: সাদ, উসামা, জাবের, ইবনে ওমর, জায়েদ ইবনে সাবিত, মাসলামা ইবনে মাখলাদ, আবু সাঈদ, রাফে ইবনে খাদিজ, আবু উমামা এবং আনাস ইবনে মালিক (রা.)। এছাড়া আমরা যাদের নাম উল্লেখ করেছি, তাঁদের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি সাহাবি সেখানে ছিলেন। তাঁরা ছিলেন হেদায়েতের প্রদীপ ও ইলমের আধার। তাঁরা কুরআন নাজিল হতে দেখেছেন এবং রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছ থেকে এর ব্যাখ্যা শিখেছেন। আরও ছিলেন তাঁদের একনিষ্ঠ অনুসারী তাবেয়িগণ (ইনশাআল্লাহ)—যাঁদের মধ্যে মিসওয়ার ইবনে মাখরামা, আব্দুর রহমান ইবনে আসওয়াদ, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব, উরওয়া ইবনুয যুবাইর এবং আবদুল্লাহ ইবনে মুহাইরিজ-এর মতো ব্যক্তিরা রয়েছেন। তাঁরা উম্মতে মুহাম্মাদির ঐক্যবদ্ধ জামাত থেকে কখনো হাত গুটিয়ে নেননি (অর্থাৎ তাঁরা মুয়াবিয়ার আনুগত্য মেনে নিয়েছিলেন)।” [তারিখে আবু যুরআ আর রাযী, ১/১৮৯]
এখন প্রশ্ন হলো, মুয়াবিয়া (রা.) যদি কাফির, মুনাফিক কিংবা ফাসিক হতেন তবে হাসান (রা.) এবং তাঁর সাথে থাকা সাহাবিদের জন্য তাঁর হাতে ক্ষমতা অর্পণ করা কীভাবে বৈধ হতে পারে?!! নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কীভাবে এই কাজটির প্রশংসা করতে পারেন?!! আর সাহাবা ও তাবেয়িদের মতো এত মহান ব্যক্তিত্বরা কীভাবে কুফরি, নিফাক ও ফাসিকির সামনে চুপ থাকতে পারেন?!!
✪ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর অবস্থান:
ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বিষয়টি লক্ষ্য করুন। তাঁকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “আমিরুল মুমিনিন মুয়াবিয়া (রা.)-এর ব্যাপারে আপনার মতামত কী? তিনি তো বিতরের নামাজ মাত্র এক রাকাত পড়েন!”
জবাবে ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন:
إِنَّهُ فَقِيهٌ
“নিশ্চয়ই তিনি একজন ফকিহ (দ্বীনের গভীর সমঝদার)।” [সহিহ বুখারি: ৩৭৬৫]
তিনি মুয়াবিয়া (রা.) সম্পর্কে আরও বলতেন: “শাসন পরিচালনার জন্য মুয়াবিয়ার চেয়ে অধিক যোগ্য ও উপযুক্ত ব্যক্তি আমি আর কাউকে দেখিনি।” [ইমাম মা’মার তাঁর জামে-তে এটি বর্ণনা করেছেন (২০৯৮৫), যার সনদ সহিহ।] দেখুন, ইবনে আব্বাস (রা.) আহলে বাইতের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও এবং আলি (রা.)-এর পক্ষে থাকা সত্ত্বেও মুয়াবিয়া (রা.)-এর ব্যাপারে এমন প্রশংসা করেছেন। কোনও বিবেকবান মানুষ কি বিশ্বাস করবে যে, তিনি এমন একজনের প্রশংসা করছেন যাকে তিনি কাফির, ফাসিক বা মুনাফিক মনে করেন?
প্রকৃতপক্ষে, যারা মুয়াবিয়া (রা.)-এর শাসনকাল ও তাঁর প্রতি সাহাবায়ে কেরামের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে গবেষণা করেন, তাঁরা দেখবেন যে সর্বক্ষেত্রে তাঁর প্রতি এক ধরনের সন্তুষ্টি ও গ্রহণযোগ্যতা বিদ্যমান ছিল।
সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস, ইবনে ওমর, আবু হুরায়রা, আবু দারদা, আবু সাঈদ খুদরি এবং আয়েশা (রা.)-এর মতো প্রখ্যাত সাহাবিগণ তাঁর প্রশংসা করেছেন। এসব বর্ণনা অত্যন্ত বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ। এটি কি যুক্তিতে খাটবে যে, মুয়াবিয়া (রা.)-এর দ্বীনদারি বা আমানতদারিতা কোনও ঘাটতি থাকলে এই সকল সাহাবি সত্য গোপন করতেন এবং তাঁর আসল অবস্থা বর্ণনা করতেন না?! বরং ইবনে সাদ উম্মে আলকামা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন:
قَدِمَ معاويةُ بنُ أبي سُفيانَ المدينةَ، فأرسلَ إلى عائشةَ: أن أَرْسِلي إليَّ بأَنبِجانِيَّةِ رسولِ اللهِ صلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ، وشَعْرِه، فأَرْسَلَتْ به معي، حتى دخلْتُ به عليه، فأخذَ الأَنْبِجانيَّةَ فلَبِسَها، وأخَذَ شَعْرَه فدعا بماءٍ فغَسَلَه، فشَرِبَه وأفاضَ على جِلْدِه
“মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান যখন মদিনায় এলেন তখন তিনি আয়েশা (রা.)-এর কাছে লোক পাঠালেন যেন তিনি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর একটি চাদর (আনবিজানিয়্যাহ) এবং তাঁর কিছু চুল পাঠান। আয়েশা (রা.) আমার মাধ্যমেই সেগুলো তাঁর কাছে পাঠিয়ে দিলেন। মুয়াবিয়া (রা.) চাদরটি নিয়ে গায়ে জড়ালেন এবং চুলগুলো ধোয়া পানি পান করলেন ও নিজের শরীরে মাখলেন।” [তাবাকাতে ইবনে সাদ, ১/১১২; এর সনদ বেশ ভালো।] মুয়াবিয়া (রা.) যদি কাফির বা মুনাফিক হতেন তবে আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) কখনোই তাঁকে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এই পবিত্র স্মৃতিগুলো পাঠাতেন না; বরং তিনি তা দিতে কঠোরভাবে অস্বীকৃতি জানাতেন। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বহু সাহাবি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হাদিস বর্ণনা করার ক্ষেত্রে মুয়াবিয়া (রা.)-এর ওপর আস্থা রেখেছেন। আবু নুআইম আল আসফাহানি (রহ.) তাঁদের একটি তালিকা দিয়ে বলেছেন:
حدَّثَ عنه من الصحابةِ: عبدُ اللهِ بنُ عباسٍ وأبو سعيدٍ الخُدريُّ وأبو الدَّرداءِ وجَريرٌ والنعمانُ وعبدُ اللهِ بنُ عمرِو بنِ العاصِ ووائلُ بنُ حُجرٍ وعبدُ اللهِ بنُ الزبيرِ
“মুয়াবিয়া (রা.) থেকে যেসব সাহাবি হাদিস বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন: আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আবু সাঈদ খুদরি, আবু দারদা, জারির, নুমান, আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস, ওয়াইল ইবনে হুজর এবং আবদুল্লাহ ইবনুল জুবাইর (রা.)।” [মারেফাতুস সাহাবা, ৫/২৪৯৭]
গবেষকদের মতে, প্রায় তেইশ জন সাহাবি মুয়াবিয়া (রা.) থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর বর্ণিত কিছু হাদিস সহিহ বুখারি ও মুসলিমেও স্থান পেয়েছে। নিরপেক্ষ গবেষক ও আলেমগণ একমত যে, সাহাবি বা তাবেয়িদের মধ্যে কেউই মুয়াবিয়া (রা.)-কে মিথ্যাবাদী মনে করতেন না। এ প্রসঙ্গে ইবনে তাইমিয়া (রহ.) মুয়াবিয়া ও আমর ইবনুল আস (রা.) সম্পর্কে বলেন:
وَلَمْ يَتَّهِمْهُمْ أَحَدٌ مِنْ أَوْلِيَائِهِمْ -لَا مُحَارِبُوهُمْ، وَلَا غَيْرُ مُحَارِبِيهِمْ- بِالْكَذِبِ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، بَلْ جَمِيعُ عُلَمَاءِ الصَّحَابَةِ وَالتَّابِعِينَ بَعْدَهُمْ مُتَّفِقُونَ عَلَى أَنَّ هَؤُلَاءِ صَادِقُونَ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ، مَأْمُونُونَ عَلَيْهِ فِي الرِّوَايَةِ عَنْهُ
“যাঁরা তাঁদের বন্ধু ছিলেন কিংবা যাঁরা তাঁদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন—তাঁদের কেউই রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নামে মিথ্যা বলার অপবাদ তাঁদের দেননি। বরং সকল সাহাবি ও তাবেয়ি আলেম এ বিষয়ে একমত যে, তাঁরা রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ব্যাপারে সত্যবাদী এবং তাঁর হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিশ্বস্ত ও নিরাপদ।” [মাজমুউল ফাতাওয়া, ৩৫/৬৬]
এখন প্রশ্ন হলো, মুয়াবিয়া (রা.) যদি (নাউযুবিল্লাহ) কাফির, ফাসিক বা মুনাফিক হতেন তবে এত বিপুল সংখ্যক সাহাবি কীভাবে তাঁর কাছ থেকে হাদিস গ্রহণ করলেন? তাঁরা কীভাবে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বাণীর ক্ষেত্রে তাঁকে সত্যবাদী হিসেবে মেনে নিলেন?
সাহাবায়ে কেরামের স্বভাব ছিল এই যে, তাঁরা দ্বীনের কোনও বিচ্যুতি দেখলে কখনো চুপ থাকতেন না, সে অপরাধ যারই হোক। যেমন: আবু যার (রা.) সম্পদ জমা রাখা (اكْتِنَازُ الْمَالِ) নিয়ে মুয়াবিয়া (রা.)-এর সাথে দ্বিমত করেছিলেন এবং এ নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। এমনকি বিষয়টি উসমান (রা.) পর্যন্ত গড়িয়েছিল। এখন এটি কি কোনোভাবে যুক্তিসঙ্গত যে, মুয়াবিয়া (রা.) মূর্তির ব্যবসা করতেন (যেমনটি নিন্দুকেরা দাবি করে), কিংবা তিনি কাফির, মুনাফিক বা মদ্যপ ছিলেন—অথচ আবু যার (রা.)-এর মতো অকুতোভয় সাহাবি এসব বড় বড় বিষয় ছেড়ে দিয়ে কেবল সম্পদ জমানোর মতো একটি তুলনামূলক ছোট বিষয়ে তাঁর বিরোধিতা করবেন? তাঁদের এই মতপার্থক্যই প্রমাণ করে যে, আবু যার বা অন্য কোনও সাহাবি মুয়াবিয়া (রা.)-এর মাঝে কুফরি বা ফাসিকির মতো কিছুই পাননি। থাকলে তাঁরা অবশ্যই এর চেয়েও অনেক বেশি কঠোরভাবে প্রতিবাদ জানাতেন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
মূল: শাইখ ড. সুলতান ইবনে আবদুর রহমান আল উমাইরি।
(ডক্টরেট: উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়, মক্কা মুকাররামা, সৌদি আরব)।
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
Share: