কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর প্রচার করাই হল এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

নাস্তিকতা এবং নাস্তিক বন্ধুর প্রতি করণীয়

প্রশ্ন: আমার এক মুসলিম ফ্রেন্ড ক্লাস ১২ এ থাকা অবস্থায় নাস্তিক হয়ে যায়। সে আমার কাছ থেকে ওয়াদা নিয়েছিল যে, আমি যেন কাউকে না বলি যে, সে নাস্তিক হয়ে গেছে। আমি সেই ওয়াদা রক্ষা করেছি। প্রশ্ন হল, সে নাস্তিক হয়ে যাওয়ায় আমার কি কোন গুনাহ হবে?
বি.দ্র: সে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল।
উত্তর:
কোন ব্যক্তি মহান সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অথবা কোনও ধর্মকে অস্বীকার করে তাকেই নাস্তিক (Atheist ) বলা হয়। কিন্তু এরা বাস্তবে হয় প্রবৃত্তি পূজারী। অর্থাৎ আল্লাহর উপাসনাকে অস্বীকার করে কিন্তু নিজের প্রবৃত্তির পূজা করে। তার প্রবৃত্তি তাকে যা নির্দেশ দেয় সে তাই করে।
এদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَٰهَهُ هَوَاهُ أَفَأَنتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا
“আপনি কি তাকে দেখেন না, যে তারা প্রবৃত্তিকে উপাস্য রূপে গ্রহণ করে? তবুও কি আপনি তার জিম্মাদার হবেন?” [সূরা ফুরকান: ৪৩]
তিনি আরও বলেন,
فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُونَ أَهْوَاءَهُمْ ۚ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ
“অত:এব জেনে নিন, তারা শুধু নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে। আল্লাহর দিক নির্দেশনার পরিবর্তে যে ব্যক্তি নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তার চাইতে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে?” [সূরা কাসাস: ৫০]
এরা অন্য দিকে শয়তানের অনুসারীও। কারণ শয়তান তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে তারা শয়তানের পথে জীবন পরিচালনা করে।
বলা হয়, তারা কোনও ধর্মকে স্বীকার করে না। এটাও ভুল। ধর্ম তো সেটাই যা মানুষ অন্তরে ধারণ বা বিশ্বাস করে। পৃথিবীতে ধর্মহীন কোনও মানুষ নাই। এমনকি প্রতিটি জীব-জন্তু এবং জড় পদার্থের একেকটি ধর্ম আছে। সুতরাং এ অর্থে নাস্তিকতাও একটি ধর্ম। ওরা নাস্তিকতা নামক ধর্মের অনুসারী। কিছু নাস্তিক ব্যক্তিগত ভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা, হিন্দু ধর্মের দর্শন, যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ, প্রকৃতিবাদ, বস্তুবাদ ইত্যাদি দর্শনে বিশ্বাস করে। সুতরাং তাদেরকে ‘ধর্মহীন’ বলা সমীচীন নয়।
যাহোক, এটি নিশ্চিতভাবেই শয়তানের একটি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। এটাই জাহান্নামে যাওয়ার সহজ-সরল পথ। এই পথের উপর কেউ জীবন অতিবাহিত করলে নিশ্চিতভাবেই তা তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করবে। (আল্লাহ আমাদেরকে রক্ষা করুন। আমিন)
অত:এব কোন বন্ধু বা আত্মীয় যদি জাহান্নামে দিকে এগিয়ে যায় তাহলে কল্যাণকামী বন্ধুর করণীয় হল, তাকে বাঁচানোর জন্য ছুটে আসা, তার পথ আগলে দাঁড়ানো। কিন্তু কেউ তার বন্ধুর নিশ্চিত ধ্বংসাত্মক পরিণতি দেখেও চুপ থাকলে বা তা গোপন করলে তা তার বন্ধুত্বের পরিচায়ক নয়।
বরং তার কর্তব্য, তাকে দীনের দাওয়াত দেয়া, বুঝানো, সংশোধন করা, তার সংশয়-সন্দেহগুলো দূর করা এবং তার নিকট ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরা। নিজে না পারলে বিজ্ঞ আলেমের সাথে যোগাযোগ করে তার প্রশ্ন ও সংশয়ের জবাব দেয়া। নাস্তিকতার জবাবে লিখিত বই-পুস্তক, Video clips ইত্যাদি প্রদান করা। তার মূল সমস্যাগুলো কী তা চিহ্নিত করে সে আলোকে সমাধানের চেষ্টা করা। এটা ওয়াজিব।
ঐ ব্যক্তির নাস্তিকতার বিষয়টি গোপন রাখার ওয়াদা করা এবং এ বিষয়ে নীরব থাকা কোনটাই আপনার ঠিক হয় নি। এজন্য আপনার উচিৎ আল্লাহ কাছে তওবা করা।
কারণ সাধ্যানুযায়ী দাওয়াতি কাজ করা এবং অন্যায়ে বাধা দেয়া প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ওয়াজিব। কেউ তা না করলে গুনাহগার হবে।
❑ ইসলামের প্রতি মানুষকে আহ্বান, সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎকাজে বাধা প্রসঙ্গে কতিপয় আয়াত ও হাদিস তুলে ধরা হল:
✪ ১) আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
“তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা (লোককে) কল্যাণের দিকে আহবান করবে এবং সৎকার্যের নির্দেশ দেবে ও অসৎ কার্য থেকে নিষেধ করবে। আর এ সকল লোকই হবে সফলকাম। [সূরা আলে ইমরান: ১০৪]
✪ ২. তিনি আরও বলেন,
كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَر
“তোমরাই শ্রেষ্ঠতম জাতি। মানবমণ্ডলীর জন্য তোমাদের অভ্যুত্থান হয়েছে, তোমরা সৎকার্যের নির্দেশ দান কর, আর অসৎ কার্য (করা থেকে) নিষেধ কর, আর আল্লাহতে বিশ্বাস কর।” [সূরা আলে ইমরান ১১০]
✪ ৩. তিনি আরও বলেন,
خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ
“তুমি ক্ষমাশীলতার নীতি অবলম্বন কর, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খদেরকে এড়িয়ে চল।” [সূরা আ’রাফ: ১৯৯]
✪ ৪) তিনি অন্যত্রে বলেছেন,
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ
“আর বিশ্বাসী পুরুষরা ও বিশ্বাসী নারীরা হচ্ছে পরস্পর একে অন্যের বন্ধু, তারা সৎ কাজের আদেশ দেয় এবং অসৎ কাজে নিষেধ করে।” [সূরা তওবা: ৭১]
✪ ৫) তিনি আরও বলেছেন,
وَقُلِ الْحَقُّ مِنْ رَبِّكُمْ فَمَنْ شَاءَ فَلْيُؤْمِنْ وَمَنْ شَاءَ فَلْيَكْفُرْ
“আর বলে দাও, সত্য তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে সমাগত; সুতরাং যার ইচ্ছা বিশ্বাস করুক ও যার ইচ্ছা প্রত্যাখ্যান করুক।” [সূরা কাহফ: ২৯]
✪ ৬) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ.
“তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কোনও অন্যায় দেখে, তাহলে সে যেন তা হাতের দ্বারা বন্ধ করে। যদি এতে সমর্থ না হয়, তাহলে যেন জিহ্বার দ্বারা বন্ধ করে। যদি এতেও সমর্থ না হয়, তাহলে যেন অন্তর দ্বারা প্রতিহত করে।“ [সহিহ মুসলিম-আবু সাঈদ খুদরি রা. হতে বর্ণিত।]
আল্লাহু আলাম।
– আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল-
Share This Post