তোমার দীনকে খাঁটি করো তাহলে তা তোমার জন্য অল্প আমলই (মুক্তির জন্য) যথেষ্ট হবে। একটি জঈফ বা দুর্বল হাদিস

প্রশ্ন: “তোমার ঈমানকে খাঁটি কর তাহলে অল্প আমলই নাজাতের জন্য যথেষ্ট হইবে।” এটা কি সহিহ হাদিস?

উত্তর:
এ বিষয়ে একটি হাদিস ওয়েজিনদের মুখে প্রায় শোনা যায় এবং বিভিন্ন ইসলামি বই-পুস্তক ও ফেসবুক বা নেট জগতে ইসলামি লেখার মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে। কিন্তু হাদিস বিশারদগণের দৃষ্টিতে তা সহিহ নয়।

নিম্নে এ সংক্রান্ত হাদিসটির মূল ভাষ্য, রেফারেন্স এবং সে সম্পর্ক সম্মানিত মুহাদ্দিসগণের মতামত সংক্ষেপে তুলে ধরা হল:

❑ হাদিসটি হল,

মুয়ায বিন জাবাল রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ইয়েমেন সফরের প্রাক্কালে উপদেশ দিয়ে বলেন,
أَخْلِصْ دِينَكَ، يَكْفِكَ القليلَ من العملِ
“তোমার দীনকে খাঁটি করো তাহলে তা তোমার জন্য অল্প আমলই (মুক্তির জন্য) যথেষ্ট হবে।”

❑ হাদিসটির উৎস এবং হাদিসের মান সম্পর্কে বিজ্ঞ মুহাদ্দিসগনের অভিমত:

হাদিসটি ইবনে আবিদ দুনিয়া রহঃ তার ‘ইখলাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। এছাড়াও হাকিম তার মুসতাদরাক কিতাবে উল্লেখ করে বলেন,
هذا حديث صحيح الإسناد و لم يخرجاه
“এটি সহিহ। কিন্তু ইমাম বুখারি-মুসলিম তা তাদের কিতাবে উল্লেখ করেন নি।” (৪/৩৪১।
◈ ইমাম যাহাবি এ হাদিস সম্পর্কে ইমাম হাকিমের মন্তব্যের বিরোধিতা করে বলেন, এ হাদিসটি غير صحيح “সহিহ নয়।”

ইমাম যাহাবি ছাড়াও অন্যান্য মুহাদ্দিসদের দৃষ্টিতেও হাদিসটি সহিহ নয়। যেমন:

◈ বায়হাকি বলেন,
[فيه] عمرو بن مرة الجملي ليست له صحبة، ولم يدرك معاذاً
“(এর সনদে) আমর বিন মুররা আল জমালি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সহবত (সঙ্গ) লাভ করেন নি। (অর্থাৎ তিনি সাহাবি নন) এমনকি সাহাবি মুয়ায রা. কেও পান নি।” [বায়হাকি শুআবুল ঈমান ৫/২৩৩৭] অর্থাৎ হাদিসটি ‘মুরসাল’ হওয়ার কারণে যাইফ (দুর্বল)।
উল্লেখ্য, তার মৃত্যু সন: ১১৬ বা ১১৮ হিজরিে। তিনি কুফার অধিবাসী একজন তাবেঈ ছিলেন।

◈ ইরাকি বলেন, إسناده منقطع এর সনদ বিচ্ছিন্ন। [তাখরিজুল এহিয়া ৫/১০৪]
◈ শাইখ আলবানি বলেন, যাইফ (দুর্বল)। [যাঈফুত তারগীব/২, যাঈফুল জামে/১২০]
◈ শুআইব আরনাবুত বলেন, যাইফ (দুর্বল)। [মিনহাজুল কাসেদিন/৩৬৪]

যাহোক, ইখলাস এবং সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করার গুরুত্ব কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা সু প্রমাণিত। সুতরাং সেগুলোই আমাদের জন্য যথেষ্ট; জঈফ হাদিসের আশ্রয় নেয়ার আদৌ কোনও প্রয়োজন নাই।

❑ ইবাদতে ইখলাস ও সুন্নাহর অনুসরণের গুরুত্ব:

আমল কবুলের জন্য ইখলাস তথা একমাত্র আল্লার সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত করা পূর্বশর্ত। তা না থাকলে কোনও আমল আল্লাহর নিকট গৃহীত হবে না। সুতরাং এর গুরুত্ব সীমাহীন।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সকল প্রকার ইবাদত কেবল নিরঙ্কুশ ভাবে কেবল তার জন্য নির্ধারণ করার নির্দেশে দিয়েছেন। যেমন:

◾আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّـهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ
“তাদেরকে এছাড়া কোন নির্দেশ করা হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠ ভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে।” (সূরা আল বাইয়েনাত: ৫)

◾তিনি আরও বলেন,
فَمَن كَانَ يَرۡجُواْ لِقَآءَ رَبِّهِۦ فَلۡيَعۡمَلۡ عَمَلٗا صَٰلِحٗا وَلَا يُشۡرِكۡ بِعِبَادَةِ رَبِّهِۦٓ أَحَدَاً
“সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ আশা‌ করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।” (সূরা কাহাফ: ১১০)

◾রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন (হাদিসে কুদসি):
«من عمل عملا و أشرك فيه غيري تركته و شركه»
“যে ব্যক্তি কোন একটি আমল করল এবং তাতে সে আমার সাথে অন্য কাউকে শরিক করল (অর্থাৎ কাউকে খুশি করার, প্রশংসা করার বা দুনিয়ার কোনও স্বার্থ লোভে তা সম্পাদন করল) আমি তাকে ও তার আমলকে প্রত্যাখ্যান করি।” (সহিহ মুসলিম)

অনুরূপভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শিখানো পদ্ধতির বাইরে ইবাদত করলেও তা আল্লাহর দবারে গৃহীত হবে না। এ কারণে আলেমগণ, ইবাদতে ইখলাস এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহর অনুসরণকে ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

সুতরাং আমরা যতটুকু ইবাদত করবো তার মধ্যে অবশ্যই ইখলাস তথা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়ত এবং তাঁর রাসূলের শিখানো পদ্ধতির অনুসরণ থাকা অপরিহার্য।অন্যথায় সব আমল হবে পণ্ডশ্রম ও অর্থহীন। সুন্নাহ বহির্ভূত-বিদআতি আমল বেশি বেশি করার চেয়ে সুন্নতি পন্থায় পরিমিত আমলই আমাদের মুক্তির জন্য যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ। তাই তো আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেছেন,
الِاقْتِصَادُ فِي السُّنَّةِ أَحْسَنُ مِنَ الِاجْتِهَادِ فِي الْبِدْعَةِ
“বিদআতি কাজে কষ্ট-পরিশ্রম করার চেয়ে মধ্যম পন্থায় সুন্নতের উপর আমল করা অতীব উত্তম।” (আত-তারগিব হা/৬৩-সহিহ)।
আল্লাহ আমাদেরকে ইখলাস ও সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করার এবং শিরক ও বিদআত থেকে বেঁচে থাকার তওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬◍❂◍▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
জুবাইল, সৌদি আরব।