কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর প্রচার করাই হল এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

ইসলামে ব্যবসার গুরুত্ব এবং ব্যবসায় সফল হওয়ার ১৩টি দিক নির্দেশনা

নি:সন্দেহে ব্যবসা হল, হালাল উপার্জনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপায়। তাই তো আল্লাহ তাআলা কুরআনে ব্যবসাকে হালাল ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন,
أَحَلَّ اللهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
“আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল এবং সুদকে হারাম করেছেন।” (বাকারা: ২৭৫)

তিনি আরও বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُواْ لاَ تَأْكُلُواْ أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلاَّ أَن تَكُوْنَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مِّنْكُمْ

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না তবে কেবলমাত্র পারষ্পারিক সম্মতিক্রমে ব্যবসা করা হলে তাতে কোন আপত্তি নাই।” (নিসা: ২৯)

রাসূল সাল্লাল্লাহু সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও যৌবন বয়সে ব্যবসা করেছেন। মক্কার সাহাবিগণ অধিকাংশই ব্যবসায়ী ছিলেন। তারা বছরে দু বার শীত ও গ্রীষ্মকালে শাম ও ইয়েমেন দেশ থেকে পণ্য আমদানি-রপ্তানি করতেন-যা সূরা কুরায়শে বর্ণিত হয়েছে।
বড় বড় সম্পদশালী ব্যবসায়ী সাহাবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, আবু বকর সিদ্দিক রা., উমর ইবনুল খাত্তাব রা. উসমান বিন আফফান রা., আব্দুর রহমান বিন আউফ, তালহা বিন উবাইদিল্লাহ, তালহা বিন যুবাইর, যুবাইর ইবনুল আওয়াম প্রমুখ সাহাবিগণ।

আমাদের পূর্বসূরি মহামতি ইমামগণও ব্যবসা করতেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, ইমাম আবু হানিফা রহ., ইমাম মালেক বিন আনাস রহ., ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ., ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মোবারক রহ. প্রমুখ।

তৎকালীন জাহেলি যুগ থেকে আরবে ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রাণ কেন্দ্র ছিলে উকাজ, মিজান্না, যুল মাজায, বনু কাইনুকা প্রভৃতি। সেখানে সাহাবিগণ ব্যবসা-বাণিজ্য করাকে গুনাহের কারণ মনে করলে আল্লাহ তাআলা কুরআনের আয়াত নাজিল করে তাদের সেই সংকোচ উঠিয়ে নিয়ে সেগুলো ব্যবসা করতে উৎসাহ দিলেন। এ প্রসঙ্গে আয়াত নাজিল হল,
لَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَن تَبْتَغُوا فَضْلًا مِّن رَّبِّكُمْ ۚ فَإِذَا أَفَضْتُم
“তোমাদের উপর তোমাদের পালনকর্তার অনুগ্রহ অন্বেষণ করায় কোন গুনাহ নেই।” (সূরা বাকারা: ১৯৮) এটা ছিল হজ্জের মৌসুমে। (সহিহ বুখারি-ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যবসায় বরকতের জন্য দুআ করেছেন।

তাছাড়া প্রায় সকল হাদিস ও ফিকহ এর কিতাবে কিতাবুল বুয়ু বা বেচাকেনা অধ্যায় রয়েছে। যেখানে মুহাদ্দিসগণ এ সংক্রান্ত অনেক হাদিস উল্লেখ করেছেন এবং ফকীহগণ ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যবসার বিভিন্ন দিক সবিস্তারে আলোচনা করেছেন। ‌
এখান থেকেই ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্ব সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়।

যাহোক, ব্যবসায় সফলতা অর্জনের জন্য একজন ঈমানদার ব্যবসায়ীর মধ্যে কতিপয় গুণ-বৈশিষ্ট্য থাকা জরুরি। নিম্নে এ সংক্রান্ত ১৩টি পয়েন্ট উপস্থাপন করা হল:

◈১) ব্যবসা শেখা এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করা:

ব্যবসা করতে শেখা এবং এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞা অর্জনের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য হয়ত কিছুটা সময় লাগবে। ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতার ঝুড়ি ভরতে হয়। তাই এক লাফে বড়লোক হওয়ার চিন্তা মাথা থেকে সরাতে হবে। অভিজ্ঞতা অর্জন করা ব্যতীত কখনোই সমস্ত মূলধন প্রাথমিক অবস্থায় বিনিয়োগ করা উচিৎ নয়। প্রাথমিকভাবে অল্প পরিসরে কাজ শুরু করতে হবে। তারপর যখন অভিজ্ঞতা বাড়তে থাকবে, তখন ধীরে ধীরে মূলধনের পরিমাণও বৃদ্ধি করতে হবে।
অনেকেরই সুন্দর সুন্দর বিজনেস আইডিয়া থাকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অর্জন ছাড়াই তারা বিশাল অংকের অর্থ ইনভেস্ট করে ফেলে। অবশেষে বড় ধরণের ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে নিজে মরে, পরিবারকেও মারে। যেমন কেউ ড্রাইভিং না শিখে গাড়িয়ে নিয়ে রাস্তায় বের হয়ে এক্সিডেন্ট করে নিজে মরে-অন্যকেও মারে। (আল্লাহ হেফাজত করুন। আমিন)

মোটকথা, ব্যবসার ক্ষেত্রে সুন্দর পরিকল্পনার পাশাপাশি ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয়াদি সম্পর্কে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

◈ ২) পরিকল্পনা: নিজস্ব আর্থিক অবস্থা, ব্যবসার জন্য সঠিক স্থান নির্বাচন, জনবল ও মান সম্মত পণ্যের সহজলভ্যতা ইত্যাদি দিক বিবেচনা করে সুন্দরভাবে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা সাজাতে হবে। এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয়া যেতে পারে, ব্যবসায়িক সফলতা বিষয়ে গবেষকদের লিখিত বই পড়া যেতে পারে, ইউটিউবে বিজনেস প্ল্যান, বিজনেস আইডিয়া, অ্যাডভার্টাইজমেন্ট, ব্যবসায় সফলতা সংক্রান্ত বিভিন্ন ভিডিও দেখা বা এ সংক্রান্ত কোন কর্মশালায় অংশ নেয়া যেতে পারে।

◈ ৩) সততা ও সত্যবাদিতা: সত্যবাদিতা তথা কথা-কাজে মিল রাখা প্রতিটি মুসলিমের জন্য আবশ্যিক গুণ তো বটেই তবে ব্যবসায় সাফল্যের ক্ষেত্রে তা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এটি ব্যসায়িকের প্রতি গ্রাহকের আস্থা এনে দেয়।

◈ ৪) আমানতদারিতা (বিশ্বস্ততা): আমানতদারিতা না থাকা মুনাফেকের আলামত। সুতরাং চোরাকারবারি, মুনাফাখোরি, মজুদদারি, কালোবাজারি, পণ্যে ভেজাল দেওয়া, ওজনে কারচুপি করা, নকল করা; ধোঁকা, প্রতারণা ও ঠকবাজির আশ্রয় নেওয়া, দামে হেরফের করা প্রভৃতি অসাধুতা ইত্যাদি একজন মুসলিম হিসেবে তো অবশ্যই পরিত্যাজ্য একজন সৎ ব্যবসায়ী হিসেবেও পরিত্যাজ্য।

সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততা এ দুটি গুণ কেবল দুনিয়ায় সম্মান ও সফলতা অর্জনের কারণ নয় বরং আখিরাতেও বিশাল মর্যাদা লাভের কারণ। যেমন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আবু সাঈদ খুদরি রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
التَّاجِرُ الصَّدُوقُ الأَمِينُ مع النَّبيِّينَ والصِّدِّيقِينَ والشُّهداءِ
“সত্যবাদী ও আমানতদার (বিশ্বস্ত) ব্যবসায়ী (আখিরাতে) নবী, সিদ্দিক এবং শহিদগণের সঙ্গে অবস্থান করবে।”
(জামে তিরমিযী: ৩/৫১৫ (১২০৯), সহিহ তারগিব-সহিহ লি গাইরিহ ১৭৮২)
সুবহানাল্লাহ! একজন সৎ ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ীর জন্য এর চেয়ে বড় মর্যাদার বিষয় আর কী হতে পারে!

◈ ৫) গ্রাহকের সাথে হাসিমুখে কথা ও সুন্দর আচরণ: হাদিসে হাসি মুখে কথা বলাকে সদকার সমপরিমাণ সওয়াব এবং সুন্দর আচরণকে জান্নাতে প্রবেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে যার আচরণ যত বেশি সুন্দর সবাই তাকে তত বেশি ভালোবাসে, সম্মান ও শ্রদ্ধা করে। দোকানের সেলস ম্যান যদি গ্রাহকদের সাথে হাসিমুখে কথা না বলে এবং ভদ্র ব্যবহার না করে তাহলে কেউ তার কাছে আসবে না।

◈৬) ধৈর্য ও কঠোর পরিশ্রম (অলসতাকে বিদায় জানানো)। বিল গেটস বলেন, “সাফল্যের জন্য কখনই দ্রুত পদক্ষেপ নিবেন না। সাফল্যের একটি মূল উপাদান হল ধৈর্য।”

◈ ৭) ব্যবসায় উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও সৃজনশীলতা: ব্যবসায় এ দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায় সফলতা পেতে সব সময় কিছু নতুনত্ব থাকা প্রয়োজন। যেমন: নতুন কালেকশন, বিশেষ ছাড়, হোম ডেলিভারি, ফ্রি সার্ভিস, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, অনলাইন ওয়ার্ডার ইত্যাদি। বিভিন্ন উপলক্ষে গ্রাহক আকৃষ্ট করার জন্য কিছু কৌশল প্রয়োগ করতে হবে। তাহলে তা গ্রাহকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।

◈ ৮) গ্রাহকদের উন্নতমানের সেবা ও তাদের সন্তুষ্টি অর্জন: গ্রহককে কোন কিছুর প্রতিশ্রুতি দিলে তা রক্ষা করা, পণ্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে বা কোন কিছু খুঁজে পেতে ক্রেতাকে সাহায্য করা, তার কথা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করা, তাকে কেয়ার করা ইত্যাদি ব্যবসায়িক সাফল্য এনে দিতে বিরাট সাহায্য করে।

◈ ৯) গ্রাহকদের সমালোচনাকে ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করা: গ্রাহকদের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত সমালোচনা এবং খারাপ প্রতিক্রিয়াগুলোকে ইতিবাচক ভাবে গ্রহণ করে সেগুলোকে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের প্রভাবক হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

◈ ১০) বাজারের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে যথাসময়ে যথোপযুক্ত পণ্য সরবরাহ করা: ব্যবসায়িক সাফল্যের জন্য বাজারের হালচাল বুঝে সঠিক সময়ে সঠিক মানের পণ্য বা সেবা সঠিক সময়ে ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেয়া অত্যন্ত জরুরি।

◈ ১১) মান সম্মত পণ্য (Best Products): মানুষের চাহিদার দিকে লক্ষ রেখে মান সম্মত পণ্য আমদানি করতে হবে। তবে অবশ্যই ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম কোন পণ্য ক্রয় বা বিক্রয় করা জায়েজ নাই।

◈ ১২) প্রতিযোগিতা মূলক মূল্যে পণ্য বিক্রয় করা: গ্রাহকদের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে যথাসম্ভব প্রতিযোগিতা মূলক মূল্যে পণ্য বিক্রয় করার চেষ্টা করতে হবে।

◈ ১৩) দুআ: সর্বোপরি আল্লাহর নিকট হালাল রিজিক ও ব্যবসায়িক সাফল্যের জন্য দুআ করা জরুরি। কেননা ব্যবসায় সব সময় লাভ হবে এমনটা আশা করা ঠিক নয় বরং এখানে লোকসানের ঝুঁকিও আছে। সে মানসিক প্রস্তুতি রাখতে হবে।
আর মনে রাখতে হবে, আমাদের দেহে রূহ ফুঁকার আগেই মহান আল্লাহ আমাদের রিজিকের ফয়সালা করে রেখেছেন। কিন্তু আমাদের কর্তব্য, যথানিয়মে কাজ করা এবং প্রয়োজনীয় চেষ্টা ও পরিশ্রম করা। সফলতা দেয়ার মালিক মহান আল্লাহ। তিনি না দিলে আমরা শত চেষ্টা করেও একটা কানাকড়িও অর্জন করতে পারব না। এই বিশ্বাস মাথায় রেখেই আমাদেরকে কাজ করতে হবে।

আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।

▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Share This Post