আল্লাহ নিজে জান্নাতবাসীদের সূরা আর রহমান তিলাওয়াত করে শুনাবেন এ কথা কি সঠিক?

প্রশ্ন: মহান আল্লাহ নিজে জান্নাতবাসীদের সূরা আর রহমান তিলাওয়াত করে শুনাবেন অথবা “সূরা রহমান হবে জান্নাতবাসীদের জাতীয় সংগীত” এসব কথা কি সঠিক?
উত্তর:
আমাদের দেশের একশ্রেণীর মূর্খ ওয়েজিন ও বাজারি বক্তাদের মুখে শোনা যায় এবং দীন সম্পর্কে অজ্ঞ লোকেরা সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপকভাবে প্রচার করে থাকে যে, আল্লাহ তাআলা নিজে জান্নাতবাসীদেরকে নিজে সুরা আর রাহমান তিলাওয়াত করে শুনাবেন অথবা বলা হয় যে, “সূরা রহমান হবে জান্নাতবাসীদের জাতীয় সংগীত” (নাউযুবিল্লাহ)। কিন্তু বিজ্ঞ আলেমগণ এ সব কথাবার্তাকে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলে আখ্যায়িত করেছেন।

◈ সৌদি আরবের ইলমি গবেষণা ও ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটির কাছে প্রশ্ন করা হয় যে, আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে জান্নাতে সূরা আর রহমান তিলাওয়াত করে শুনাবেন ইনশাআল্লাহ – এ কথা কি সঠিক?

তারা জবাবে বলেন,
ليس ذلك بصحيح فيما نعلم‏.‏ وبالله التوفيق
‏ وصلى الله على نبينا محمد، وآله وصحبه وسلم‏.‏

“আমাদের জানামতে, এ কথা সঠিক নয়।” [ফতোয়া নং ৭৪৫৮]
ফতোয়া প্রদানে:
কমিটি প্রধান: আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ বিন বাজ
উপ প্রধান: আব্দুর রাজ্জাক আফিফি
সদস্য: আব্দুল্লাহ বিন গুদাইয়ান।

◈ মিসরের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস, ফকিহ ও আলেম, শাইখ মোস্তফা আল আদাভী-কে প্রশ্নোত্তর বিষয়ক এক টিভি প্রোগ্রাম এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে, তিনি বলেন,

“আল্লাহ জান্নাতবাসীদের উদ্দেশ্যে নিজে সূরা রহমান তিলাওয়াত করবেন-এ কথার কোনও ভিত্তি নাই।” [সূত্র: ইউটিউব চ্যানেল: فتاوى الشيخ مصطفى العدوي
মোস্তফা আল আদাভী-এর ফতোয়াবলী]

❑ অনুরূপভাবে আল্লাহ তাআলা আদম আ. কে সৃষ্টির দু হাজার পূর্বে সূরা, মুলক, ইয়াসিন ও ত্বা-হা সূরা পাঠ করেছেন-মর্মে বর্ণিত কোনও হাদিসই সহিহ নয়। বরং সেগুলো অত্যাধিক দুর্বল কিংবা মুনকার।

এমনকি আল্লাহ তাআলা কুরআন তিলাওয়াত করেছেন বা করবেন-মর্মে বর্ণিত কোনও হাদিসই সহিহ নয়।

আর গায়েব বা অদৃশ্য বিষয় প্রমাণের জন্য অবশ্যই বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হাদিস থাকা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে কারও মতামত, ইজতিহাদ ও জাল-জইফ হাদিসের কোনও স্থান নেই।

সুতরাং এ বিশুদ্ধ সনদ বিহীন এ সব হাদিস প্রচার, বর্ণনা এবং বিশ্বাস করা উচিৎ নয়।

➤ মহান আল্লাহ তাআলা কর্তৃক বিভিন্ন সূরা বা কুরআন তিলাওয়াত সংক্রান্ত বর্ণিত হাদিসগুলোর মান ও অবস্থা সম্পর্কে মুহাদ্দিসগণের অভিমত নিম্নরূপ:

ما رواه أبو نعيم في ” صفة الجنة ” (270) من طريق الْمُسَيَّبِ بْنِ شَرِيكٍ ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ الْبَكْرِيِّ ، عَنْ صَالِحِ بْنِ حَيَّانَ , ثنا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ بُرَيْدَةَ ، قَالَ : ” إِنَّ أَهْلَ الْجَنَّةِ يَدْخُلُونَ كُلَّ يَوْمٍ مَرَّتَيْنِ عَلَى الْجَبَّارِ تَعَالَى فَيَقْرَأُ عَلَيْهِمُ الْقُرْآنَ ، وَقَدْ جَلَسَ كُلَّ امْرِئٍ مِنْهُمْ مَجْلِسَهُ عَلَى مَنَابِرِ الدُّرِّ وَالْيَاقُوتِ ، وَالزَّبَرْجَدِ ، وَالذَّهَبِ وَالزُّمُرُّدِ كُلًّا بِأَعْمَالِهِمْ ، فَلَمْ تَقَرَّ أَعْيُنُهُمْ بِذَلِكَ ، وَلَمْ يَسْمَعُوا شَيْئًا قَطُّ أَعْظَمَ , وَلَا أَحْسَنَ مِنْهُ ، ثُمَّ يَنْصَرِفُونَ إِلَى رِحَالِهِمْ نَاعِمِينَ قَرِيرَةً أَعْيُنُهُمْ إِلَى مِثْلِهَا مِنَ الْغَدِ ” .
وهذا إسناد ضعيف جدا ، صالح بن حيان ضعيف ، والمسيب بن شريك متروك .
وقد ذكره الحكيم الترمذي في “نوادر الأصول” (2/90) مرفوعا ، ولا يصح .
وأورده الألباني في “ضعيف الجامع” (1834) وضعفه .

روى ابن خزيمة في “التوحيد” (1/402) من طريق إِبْرَاهِيم بْن الْمُهَاجِرِ بْنِ مِسْمَارٍ ، قَالَ : ثنا عُمَرُ بْنُ حَفْصِ بْنِ ذَكْوَانَ ، عَنْ مَوْلَى الْحُرَقَةِ ، وَهُوَ عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ يَعْقُوبَ بْنِ الْعَلَاءِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ( إِنَّ اللَّهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى قَرَأَ طه وَيس ، قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ آدَمَ بِأَلْفَيْ عَامٍ ، فَلَمَّا سَمِعَتِ الْمَلَائِكَةُ الْقُرْآنَ قَالَتْ : طُوبَى لِأُمَّةٍ يَنْزِلُ هَذَا عَلَيْهِمْ ، طُوبَى لِأَلْسُنٍ تَتَكَلَّمُ بِهَذَا ، وَطُوبَى لِأَجْوَافٍ تَحْمِلُ هَذَا ) .

وهذا إسناد ضعيف جدا ، عمر بن حفص ، وإبراهيم بن المهاجر متروكان .
وأورد هذا الحديث الألباني في “الضعيفة” (1248) وقال : ” منكر ” .
– وروى السجزي في “الإبانة” – كما في “الفتح الكبير” للنبهاني (2 /296) –
عن أنس مرفوعا : ( كَأَنَّ النَّاسَ لَمْ يَسْمَعُوا الْقُرْآن حِينَ يَتْلوهُ الله عَلَيْهِمْ في الجَنَّةِ ) .
وضعفه الألباني في “ضعيف الجامع” (4158) .
– ورواه الرافعي في “تاريخه” (2/403) عن أبي هريرة مرفوعا ولفظه : ( كأن الخلق لم يسمعوا القرآن حين يسمعونه من الرحمن يتلوه عليهم ) .
أورده الألباني في “الضعيفة” (3282) وقال : ” منكر ”

روى أبو الفضل الرازي في “فضائل القرآن” (ص 162) من طريق محمد بْن يونس الْقُرَشِيّ ، نا عباد بْن واقد مولى بني هاشم ، نا عبد الله بْن جراد ، نا أشعث الحداني ، عَن شهر بْن حوشب عن أَبِي هريرة ، قال : قال رسول الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ( إذا كَانَ يوم القيامة ، قرأ الله تبارك وَتَعَالَى القرآن
عَلَى النَّاس كأنهم لم يسمعوه ، فيحفظ المؤمنون وينساه المنافقون)

وهذا إسناد واه جدا ، شهر بن حوشب ضعيف ، وعبد الله بن جراد مجهول ، ومحمد بن يونس القرشي هو الكديمي مشهور بالوضع ، قال ابن حبان : لعله قد وضع أكثر من ألف حديث.
انظر : “ميزان الاعتدال” (4/ 74)
[হাদিসগুলোর তাহকীক নেওয়া হয়েছে islamqa থেকে]
মহান আল্লাহ আমাদেরকে ইসলামের নামে বিভ্রান্তিকর সকল কিছু থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
▬▬▬◄❖►▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
(লিসান্স, মদীনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়)
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সউদি আরব।