কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর প্রচার করাই হল এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

অমুসলিমদের সাথে কেনাবেচা, শরিকানায় ব্যবসা এবং তাদের ঘর-বাড়ি, দোকান ইত্যাদিতে কাজ করার বিধান

প্রশ্ন: বিধর্মীদের সাথে কেনাবেচা ও শরিকানায় ব্যবসা করা কি জায়েজ? তাদের প্রতিষ্ঠানে চাকরি/অর্থের বিনিময় তাদের কাজ করে দেয়া কি জায়েজ?

উত্তর:

ইসলাম একটি অত্যন্ত সামাজিক, ভারসাম্যপূর্ণ ও কল্যাণমুখী জীবনাদর্শের নাম। সমাজে যদি অমুসলিম বসবাস করে তাহলে ইসলাম তাদের সাথে শান্তিপূর্ণ বসবাস, সুসম্পর্ক, সামাজিক যোগাযাগ ইত্যাদিতে বাধা দেয় না। তারা যদি বিপদগ্রস্ত হয় মুসলিমরা তাদে সাহায্যে ছুটে যাবে, অভাবীকে ঋণ দিবে, কেউ অভুক্ত থাকলে তার খাবার ব্যবস্থা করবে, আচার-আচরণে মানবিক ও চারিত্রিক সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে, তাদের প্রতি কোন ধরণের জুলুম-অবিচার করবে না, তাদেরকে কথা ও কাজে কষ্ট দিবে না, প্রতিবেশী সুলভ ভদ্রতা রক্ষা করবে ইত্যাদি-যদি তারা প্রকাশ্যে মুসলিমদের সাথে শত্রুতা, যুদ্ধ ও হানাহানিতে লিপ্ত না হয়। এটাই ইসলামের শিক্ষা ও সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্যের মাধ্যমেই যুগে যুগে ইসলাম পৃথিবীর দিকে দিকে অমুসলিমদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলো।
মোটকথা ইসলামের দৃষ্টিতে অমুসলিমদের সাথে ক্রয়-বিক্রয় এবং দুনিয়াবি লেনদেন করায় শরিয়তে কোন আপত্তি নাই।

যাহোক নিম্নে অমুসলিমদের সাথে কেনাবেচা, শরিকানায় ব্যবসা, অর্থের বিনিময়ে শ্রমিক হিসেবে তাদের কাজ করা ও সাধারণ দুনিয়াবি সম্পর্ক রাখার ব্যাপারে কুরআনের আয়াত, হাদিস এবং আলেমদের উক্তি তুলে ধরা হল:

◍ আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَأَحَلَّ اللَّـهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
“আল্লাহ তাআলা ক্রয়-বিক্রয় বৈধ করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।” (সূরা বাকারা: ২৭৫)
এখানে মহান আল্লাহ ব্যবসা করার জন্য মুসলিম ও কাফির আলাদা করেন নি বরং সাধারণভাবে ব্যবসাকে বৈধতা দিয়েছেন। সুতরাং তা জায়েজ মুসলিম-অমুসলিম সবার সাথে যদি এ ক্ষেত্রে অন্য কোন হারাম বিষয় জড়িত না হয়।

◍ হাদিসে এসেছে,
عَنْ أَنَسٍ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ وَلَقَدْ رَهَنَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم دِرْعَهُ بِشَعِيرٍ
আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যবের বিনিময়ে তাঁর বর্ম বন্ধক রেখেছিলেন।” সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ৪০/ বন্ধক, হা/১৫৭৬]

◍ হাদিসে আরও এসেছে, আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
اشْتَرَى رَسُولُ اللَّه صلى الله عليه وسلم مِنْ يَهُودِيٍّ طَعَامًا بِنَسِيئَةٍ، وَرَهَنَهُ دِرْعَهُ
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ইহুদির কাছ হতে নির্দিষ্ট মেয়াদে খাদ্য শস্য খরিদ করেন এবং নিজের বর্ম তার কাছে বন্ধক রাখেন।” [সহীহ বুখারী (তাওহীদ) ৪৮/ বন্ধক (كتاب الرهن), পরিচ্ছেদ: ৪৮/২. যে ব্যক্তি নিজ বর্ম বন্ধক রাখে। হা/২৫০৯]

ইমাম নওবী এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন
أجمع المسلمون على جواز معاملة أهل الذمة وغيرهم من الكفار إذا لم يتحقق تحريم ما معه لكن لا يجوز للمسلم أن يبيع أهل الحرب سلاحاً أو آلة حرب
“মুসলিমগণ এ ব্যাপারে একমত যে, জিম্মি (মুসলিম দেশে মুসলিম সরকারের জিম্মা বা নিরাপত্তায় থাকা অমুসলিম) এবং অন্যান্য কাফেরের সাথে পারস্পারিক লেনদেন ও আদান-প্রদান বৈধ-যদি এর সাথে সাথে এমন কিছু না থাকে যা হারাম হওয়া সুনিশ্চিত। কিন্তু হারবি (মুসলিমদের সাথে যুদ্ধরত কাফির) এর নিকট অস্ত্র এবং যুদ্ধের সরঞ্জাম বিক্রয় করা নাজায়েজ।”

◍ হাদিসে আরও বর্ণিত হয়েছে,
جَاءَ رَجُلٌ مُشْرِكٌ مُشْعَانٌّ طَوِيْلٌ بِغَنَمٍ يَسُوقُهَا فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم بَيْعًا أَمْ عَطِيَّةً أَوْ قَالَ أَمْ هِبَةً قَالَ لَا بَلْ بَيْعٌ فَاشْتَرَى مِنْهُ شَاةً
অতঃপর দীর্ঘ দেহী এলোমেলো চুল ওয়ালা এক মুশরিক এক পাল বকরী হাঁকিয়ে নিয়ে এলো। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন: বিক্রি করবে, না উপহার দিবে?
সে বলল, না, বরং বিক্রি করব।
অত:পর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার নিকট হতে একটা বকরী কিনে নিলেন।” [সহীহ বুখারী (তাওহীদ) ৫১/ হিবা ও এর ফযীলত৫,পরিচ্ছেদ: ৫১/২৮। মুশরিকদের দেয়া উপহার গ্রহণ করা। হা/১২৬১৮] হিবা ও এর ফযিলত]

◍ তাছাড়া রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাহাবিগণ ব্যবসার উদ্দেশ্যে বছরে দু বার (শীত ও গ্রীষ্মকালে) দামেস্ক (সিরিয়া) যেতেন যা সূরা কুরাইশে উল্লেখিত হয়েছে। সেখানে তারা অবশ্যই মুসলিম-অমুসলিম সবার সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন।

❑ অমুসলিমদের সাথে শরিকানায় ব্যবসা করা:

কোন অমুসলিমকে বিশ্বস্ত, আমানতদার ও অভিজ্ঞ মনে হলে তার সাথে শরিকানায় ব্যবসা করায়ও কোন আপত্তি নাই-যদি শরিয়া বিরোধী কার্যক্রম যেমন: অবৈধ ব্যবসা, হারাম পণ্য বিক্রয়, মানুষের সাথে প্রতারণা ইত্যাদির সাথে সম্পৃক্ততা না থাকে।
তাদের সাথে ধর্মীয় দিক দিয়ে আন্তরিক ভালবাসা রাখা হারাম হলেও কিন্তু দুনিয়াবি সম্পর্ক ও লেনদেনে কোন বাধা নেই ইনশাআল্লাহ।

❑ অমুসলিমদের ঘর-বাড়ি, কল-কারখানা ও দোকানে কাজ করার বিধান:

মুসলিমদের জন্য অমুসলিমদের ঘর-বাড়ি বা তাদের পরিচালিত কল-কারখানা ও দোকানে চাকুরী করাও দোষণীয় নয়। তবে শর্ত হল, কোন হারাম কাজে যুক্ত হওয়া যাবে না বা হারাম কাজে সহায়তা করা যাবে না। যেমন: মদ, শুকুরের গোস্ত, বিড়ি-সিগারেট, বাদ্যযন্ত্র, বিধর্মীদের ধর্মীয় উপকরণ, বেপর্দা নারীদের সংশ্রব, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা নির্মাণ বা সংস্কার ইত্যাদি।
কেননা, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহায়তা করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন,
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
“সৎকর্ম ও আল্লাহ ভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না।” (সূরা মায়িদা: ২)

◯ সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া এবং গবেষণা বিষয়ক স্থায়ী কমিটি ফতোয়া:
تجوز مشاركتهم في الأعمال التجارية المباحة إذا أمن من يشاركهم من المسلمين غشهم وتعاملهم بما حرم الله من الربا، والقمار، والغرر ونحو ذلك، ولكن ترك مشاركتهم في التجارة خير وأولى، بعداً عن موارد الريبة ومواقع التهم والظنون والخطر
“বৈধ ব্যবসায়িক কাজে কাফেরদের সাথে অংশগ্রহণ করা জায়েজ আছে মুসলিমদের মধ্যে যে অংশগ্রহণ করবে সে যদি মানুষকে ঠকানো বা নিজে প্রতারিত হওয়া অথবা আল্লাহর হারাম কৃত যে সকল কার্যক্রম রয়েছে যেমন: সুদ, জুয়া, ধোঁকা ইত্যাদি থেকে নিরাপদে থাকে। তবে সংশয়-সন্দেহ, মানুষের অভিযোগ-আপত্তি এবং বিভিন্ন ধরণের ক্ষয়-ক্ষতির আশঙ্কা থেকে দূরে থাকার স্বার্থে তাদের সাথে অংশ গ্রহণ না করাই ভালো।” (ফাতাওয়া লাজনাহ দায়েমা, পৃষ্ঠা নং ৬৫)

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ইসলামের চিত্তাকর্ষক ও সৌন্দর্যময় বৈশিষ্ট্যগুলো আত্মস্থ এবং অনুশীলণ করার মাধ্যমে ইসলামের সুমহান বার্তাকে অমুসলিমদের নিকট পৌঁছিয়ে দেয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬◆◯◆▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড সেন্টার, সৌদি আরব।

Share This Post