সালাতে রফউল ইয়াদাইন বা দু হাত উত্তোলনের ব্যাপারে সম্মানিত সাহাবি-তাবেয়ি ও ইমামগণের অবস্থান এবং দৃঢ়তা

সালাতে ‘রফউল ইয়াদাইন’ না করার সপক্ষে যেসব বর্ণনা পাওয়া যায় মুহাদ্দিসগণের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে সেগুলো ‘জয়িফ’ বা দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত। এমনকি একজন সাহাবি থেকেও এই মর্মে কোনো বিশুদ্ধ বর্ণনা পাওয়া যায় না। এর বিপরীতে, সহিহ বুখারি ও মুসলিমসহ হাদিসের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থগুলোতে রফউল ইয়াদাইন সম্পর্কে অজস্র সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে—যা মূলত ‘মুতাওয়াতির’ বা অকাট্য পর্যায়ের। অর্থাৎ এত বিপুল সংখ্যক বর্ণনাকারী এটি বর্ণনা করেছেন যে, এর সত্যতা নিয়ে ন্যূনতম সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। এ পর্যায়ে সম্মানিত সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িগণের অভিমত এবং এ বিষয়ে তাঁদের সুদৃঢ় অবস্থান সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি তুলে ধরা হলো।
✪ ইবনে কুদামা আল মাকদেসি (রাহ.) বলেন, সালাতে রফউল ইয়াদাইন বা দু হাত উত্তোলন সম্পর্কে বলেন,
“وَبِهَذَا قَالَ ابْنُ عُمَرَ، وَابْنُ عَبَّاسٍ، وَجَابِرٌ، وَأَبُو هُرَيْرَةَ، وَابْنُ الزُّبَيْرِ، وَأَنَسٌ، وَالْحَسَنُ وَعَطَاءٌ، وَطَاوُسٌ، وَمُجَاهِدٌ، وَسَالِمٌ، وَسَعِيدُ بْنُ جُبَيْرٍ، وَغَيْرُهُمْ مِنَ التَّابِعِينَ، وَهُوَ مَذْهَبُ ابْنِ الْمُبَارَكِ، وَالشَّافِعِيِّ، وَإِسْحَاقَ، وَمَالِكٍ فِي إِحْدَى الرِّوايتَيْنِ عَنْه وَقَالَ الثَّوْرِيُّ، وَأَبُو حَنِيفَةَ: لَا يَرْفَعُ يَدَيْهِ إِلَّا فِي الِافْتِتَاحِ. وَهُوَ قَوْلُ إِبْرَاهِيمَ النَّخَعِيِّ.
“এবং এই মতই ব্যক্ত করেছেন (সাহাবিদের মধ্যে) ইবনে উমর, ইবনে আব্বাস, জাবির, আবু হুরায়রা, ইবনুয যুবাইর ও আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)। আর তাবেয়িদের মধ্যে হাসান (বসরি), আতা, তাউস, মুজাহিদ, সালিম, সাঈদ ইবনে জুবায়ের ও অন্যান্যগণ (রহ.)একই মত দিয়েছেন। আর এটিই হচ্ছে, ইমামদের মধ্যে ইবনুল মুবারক, শাফেয়ি, ইসহাক এবং (ইমাম) মালিকের এক বর্ণনা অনুযায়ী তাঁর মাজহাব।
এর বিপরীতে(সুফিয়ান) সাওরি এবং আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন: (সালাত) শুরু করার সময় ছাড়া আর হাত তুলবে না। আর এটিই ইব্রাহিম নাখয়ি (রাহ.)-এর অভিমত।” [আল মুগনি: ১/২৯৫]
তিনি আরও বলেন,
قَالَ الْبُخَارِيُّ: قَالَ عَلِيُّ بْنُ الْمَدِينِيِّ – وَكَانَ أَعْلَمَ أَهْلِ زَمَانِهِ -: حَقٌّ عَلَى الْمُسْلِمِينَ أَنْ يَرْفَعُوا أَيْدِيَهُمْ لِهَذَا الْحَدِيثِ. وَحَدِيثُ أَبِي حُمَيْدٍ، الَّذِي ذَكَرْنَا فِي أَوَّلِ الْبَابِ وَقَدْ رَوَاهُ، فِي عَشَرَةٍ مِنَ الصَّحَابَةِ، مِنْهُمْ أَبُو قَتَادَةَ، فَصَدَّقُوهُ، وَقَالُوا: هَكَذَا كَانَ يُصَلِّي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
وَرَوَاهُ سِوَى هَذَيْنِ عُمَرُ، وَعَلِيٌّ، وَوَائِلُ بْنُ حُجْرٍ، وَمَالِكُ بْنُ الْحُوَيْرِثِ، وَأَنَسٌ، وَأَبُو هُرَيْرَةَ، وَأَبُو أُسَيْدٍ، وَسَهْلُ بْنُ سَعْدٍ، وَمُحَمَّدُ بْنُ مَسْلَمَةَ، وَأَبُو مُوسَى، وَجَابِرُ بْنُ عُمَيْرٍ اللَّيْثِيُّ، فَصَارَ كَالْمُتَوَاتِرِ الَّذِي لَا يَتَطَرَّقُ إِلَيْهِ شَكٌّ مَعَ كَثْرَةِ رُوَاتِهِ، وَصِحَّةِ سَنَدِهِ، وَعَمِلَ بِهِ الصَّحَابَةُ وَالتَّابِعُونَ، وَأَنْكَرُوا عَلَى مَنْ لَمْ يَعْمَلْ بِهِ.
قَالَ الْحَسَنُ: رَأَيْتُ أَصْحَابَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَرْفَعُونَ أَيْدِيَهُمْ إِذَا كَبَّرُوا، وَإِذَا رَكَعُوا، وَإِذَا رَفَعُوا رُءُوسَهُمْ كَأَنَّهَا الْمَرَاوِحُ.
قَالَ أَحْمَدُ، وَقَدْ سُئِلَ عَنِ الرَّفْعِ فَقَالَ: إِي لَعَمْرِي. وَمَنْ يَشُكُّ فِي هَذَا، كَانَ ابْنُ عُمَرَ إِذَا رَأَى مَنْ لَا يَرْفَعُ، حَصَبَهُ وَأَمَرَهُ أَنْ يَرْفَعَ. فَأَمَّا حَدِيثَاهُمْ فَضَعِيفَانِ. فَأَمَّا حَدِيثُ ابْنِ مَسْعُودٍ، فَقَالَ ابْنُ الْمُبَارَكِ: لَمْ يَثْبُتْ.”
✪ “ইমাম বুখারি (রহ.)বলেন, আলি ইবনুল মাদিনি—যিনি তাঁর সময়ের সবচেয়ে বড় আলেম ছিলেন—বলেছেন: “এই হাদিসের ভিত্তিতে মুসলমানদের ওপর কর্তব্য হল, (সালাতে) হাত তোলা (রফউল ইয়াদাইন করা)।”
✪ আর আবু হুমাইদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদিসটি, যা আমরা এই অধ্যায়ের শুরুতে উল্লেখ করেছি, দশজন সাহাবির উপস্থিতিতে বর্ণিত হয়েছে—যাদের মধ্যে আবু কাতাদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)ও ছিলেন। তাঁরা সকলে এটিকে সমর্থন করেছেন এবং বলেছেন, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এভাবেই সালাত আদায় করতেন।
✪ এই দু জন (ইবনে উমর ও আবু হুমাইদ) ছাড়াও উমর, আলি, ওয়ায়েল ইবনে হুজর, মালিক ইবনুল হুওয়াইরিস, আনাস, আবু হুরায়রা, আবু উসাইদ, সাহল ইবনে সাদ, মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা, আবু মুসা এবং জাবির ইবনে উমাইর আল লাইসি (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) এটি বর্ণনা করেছেন। ফলে এটি ‘মুতাওয়াতির’ (অকাট্য ভাবে প্রমাণিত) পর্যায়ের হয়ে গেছে, যার বর্ণনাকারীদের আধিক্য এবং সনদের বিশুদ্ধতার কারণে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই।
✪ সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িগণ এর ওপর আমল করতেন এবং যারা আমল করত না তাদের প্রতিবাদ জানাতেন।
✪ হাসান বসরি (রহ.) বলেন: “আমি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহাবিদের দেখেছি, তাঁরা তাকবির বলার সময়, রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু থেকে মাথা তোলার সময় হাত তুলতেন; যেন তাঁদের হাতগুলো ছিল হাতপাখা। (অর্থাৎ রুকু থেকে ওঠার সময় সাহাবিগণ অত্যন্ত তৎপরতা ও প্রাণচাঞ্চল্যের সাথে হাত তুলতেন। তাঁদের হাতের এই দ্রুত ও সাবলীল ভঙ্গিটি ছিল অনেকটা আগের যুগের হাতপাখার মতো গতিশীল। এটি মূলত নামাজে তাঁদের গভীর আগ্রহ, উদ্যম এবং সুন্নাহ পালনে তাঁদের চপলতা ও একাগ্রতাকেই ফুটিয়ে তোলে।)
✪ ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)-কে সালাতে রফউল ইয়াদাইন বা দু হাত উত্তলোন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন: “হ্যাঁ, অবশ্যই! এ ব্যাপারে আবার সন্দেহ পোষণ করে কে!”
✪ প্রখ্যাত সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) যখন সালাতে কাউকে রফউল ইয়াদাইন করতে তথা রুকুতে যাওয়া এবং রুকু হতে মাথা উঠানোর সময় হাত তুলতে দেখতেন না তখন তাকে ছোট পাথর ছুড়ে মারতেন এবং হাত তোলার নির্দেশ দিতেন।
যারা হাত তোলার বিপক্ষে তাদের পেশ কৃত দুটি হাদিসই দুর্বল। বিশেষ করে ইবনে মাসউদ (রা.)-এর হাদিস সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.) বলেছেন: “এটি প্রমাণিত নয়।” [আল মুগনি: ২/১২৩-১২৪]
ইমাম বায়হাকি এই বিষয়ের আলোচনা সমাপ্ত করেছেন ইমাম আবু বকর ইবনে ইসহাক আল ফকিহ-এর একটি উক্তি দিয়ে তিনি বলেন:
قد صح رفع اليدين عن النبي صلى الله عليه وسلم ثم عن الخلفاء الراشدين ، ثم عن الصحابة والتابعين
“নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে (এই স্থানগুলোতে) হাত তোলা সহিহভাবে প্রমাণিত, অতঃপর খোলাফায়ে রাশেদিন থেকে, এরপর সাহাবি ও তাবেয়িগণের থেকেও তা প্রমাণিত।” [সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকি: ২/৭৭]
[আল আওসাত: ৩/২৯৯ ৩০৮, আল মাজমু’: ৩/৩৬৭ ৩৭৬, আল মুগনী: ২/১৭১ ১৭৪]
সারাংশ:
◆ ১. রুকুতে যাওয়া এবং ওঠার সময় হাত তোলা সংক্রান্ত হাদিসগুলো বুখারি ও মুসলিমসহ প্রায় সকল বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। এর বর্ণনাকারী সাহাবির সংখ্যা দশজনেরও বেশি।
◆ ২. হাত না তোলা সংক্রান্ত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর বর্ণনাটি প্রায় সকল মুহাদ্দিসের নিকট জঈফ বা ত্রুটিপূর্ণ। অন্যদিকে হাত তোলার হাদিসগুলো সর্বসম্মতিক্রমে সহিহ।
◆ ৩. অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও ফকিহগণের মতে, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর শেষ আমল পর্যন্ত এই রাফউল ইয়াদাইন বা হাত তোলার বিধান বলবত ছিল। এবং রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইন্তেকালের পরে সাহাবি ও তাবেয়িগণ আমল করেছেন। সুতরাং তা মনসুখ বা রহিত হওয়ার দাবী গ্রহণযোগ্য নয়।
➧ পরিশেষে বলা যায়, সালাতে রুকুতে যাওয়া এবং রুকু থেকে ওঠার সময় হাত তোলা বা রফউল ইয়াদাইন করা কেবল একটি সাধারণ আমল নয় বরং এটি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহর প্রতি ভালোবাসার একটি অনন্য নিদর্শন। বিশুদ্ধ হাদিসসমূহ এবং সালাফে সালেহিনের আমল এই পদ্ধতির সত্যতাকে দিবালোকের মতো স্পষ্ট করে দেয়। তাই আমলটির বিশুদ্ধতা নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ইমানের পরে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত সালাতকে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর তরিকায় তথা সহিহ সুন্নাহ মোতাবেক আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
Share: