বিভিন্ন তামাকজাত দ্রব্য সেবনের বিধান বিজ্ঞ আলেমদের ফতওয়া সহ

বিড়ি, সিগারেট, গুল, জর্দা, শীশা, হুক্কা ইত্যাদি সেবনের বিধান (বিজ্ঞ আলেমদের ফতওয়া সহ):
প্রশ্ন: বিড়ি, সিগারেট, গুল, জর্দা, শীশা, হুক্কা ইত্যাদি গ্রহণের বিধান কী?
উত্তর: আমাদের সমাজে ধূমপানের বিভিন্ন পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে, যেমন: বিড়ি, সিগারেট, শীশা, হুক্কা ইত্যাদি। অনুরূপভাবে মানুষ বিভিন্নভাবে গুল, জর্দা ও তামাক সেবন করে থাকে। এগুলো সবই ক্ষতিকর ও নেশাজাতীয় বস্তুর অন্তর্ভুক্ত। নিম্নে এসব বস্তুর ক্ষতিকর দিক সমূত তুলে ধরার পর কুরআন-সুন্নাহ দলিল ও বিজ্ঞ আলেমদের ফতওয়ার আলোকে এ বিষয়টি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হল:
❑ ধূমপানের ক্ষতিকর দিক সমূহ:
বৈজ্ঞানিকভাবে এগুলো মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক হিসেবে প্রমাণিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, একবার শীশা সেবন করলে তা প্রায় ২০০টি সিগারেট পানের সমান ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীদের মতে ”ধূমপান মানে বিষপান।” —এ কথাটি সম্পূর্ণ সত্য। কারণ তামাকের ধোঁয়ায় থাকা ক্ষতিকর উপাদান ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, এবং শ্বাসকষ্টের (COPD) মতো মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করে। এটি শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গের ক্ষতি করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমায় এবং অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়, যা Better Health Channel ও Cleveland Clinic এর মতো স্বাস্থ্যবিষয়ক সাইটগুলো নিশ্চিত করেছে।
❑ ধূমপানের ফলে সৃষ্ট প্রধান শারীরিক সমস্যা ও রোগসমূহ:
✦ ক্যানসার: ফুসফুস, মুখ, গলা, খাদ্যনালী, অগ্ন্যাশয়, মূত্রাশয় এবং কিডনিসহ শরীরের প্রায় সব অঙ্গের ক্যানসারের মূল কারণ ধূমপান।
✦ শ্বাসতন্ত্রের রোগ: ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস এবং এমফিসেমা (COPD), যক্ষ্মা, এবং হাঁপানি বা অ্যাজমা।
✦ হৃদরোগ ও রক্ত সঞ্চালন: হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ, এবং রক্তনালীতে ব্লক।
✦ ডায়াবেটিস: টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি।
✦ অন্যান্য সমস্যা: চোখের সমস্যা (ছানি, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া), দাঁত ও মাড়ির রোগ, হাড় ক্ষয় (অস্টিওপোরোসিস), এবং প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস।
✦ পরোক্ষ ধূমপান (Second-hand smoke): যারা ধূমপান করেন না কিন্তু ধূমপায়ীর আশেপাশে থাকেন, তাদেরও ফুসফুসের ক্যানসার ও হৃদরোগের ঝুঁকি থাকে।
ধূমপান ত্যাগ করলে এই মারাত্মক রোগগুলোর ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায় এবং শরীর সুস্থ হতে শুরু করে।
❑ যে সব কারণে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য হারাম:
ইসলামে ধূমপান ও সকল প্রকার নেশাজাতীয় দ্রব্য হারাম। কারণ
১. ধূমপান মানে বিষপান। এটি মানুষের শরীরে নানা ধরণের রোগব্যাধী সৃষ্টি করে। সুতরাং ধূমপান মানে নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার নামান্তর। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ
“আর তোমরা নিজেদেরকে নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।” [সূরা বাকারা: ১৯৫]
২. অন্যের ক্ষতির কারণ। কারণ যারা ধূমপান করেন না কিন্তু ধূমপায়ীর আশেপাশে থাকেন, তাদেরও ফুসফুসের ক্যানসার ও হৃদরোগের ঝুঁকি থাকে। রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ
“নিজের ক্ষতি করা যাবে না এবং অন্যের ক্ষতিও করা যাবে না।” [মুয়াত্তা মালিক, হাদিসটি সহিহ]
৩. ধূমপান যেভাবে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর তেমনি এর উৎকট দুর্গন্ধে মানুষের জন্য কষ্টদায়ক। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا
“যারা ঈমানদার পুরুষ ও নারীদেরকে তাদের কৃত কোনো কাজ ছাড়াই কষ্ট দেয় তারা অবশ্যই অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে।” [সূরা আহযাব: ৫৮]
৪. অর্থের অপচয়: আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ
“নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।” [সূরা ইসরা: ২৭]
৫. অপবিত্র বস্তু সেবন: আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ
“তিনি তাদের জন্য অপবিত্র বস্তুসমূহ হারাম করেন।” [সূরা আরাফ: ১৫৭]
৬. পবিত্র বস্তু গ্রহণের নির্দেশ: আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ
“হে মুমিনগণ! আমি তোমাদেরকে যে পবিত্র রিজিক দিয়েছি তা থেকে আহার করো।” [সূরা বাকারা: ১৭২]
৭. নেশাজাতীয় দ্রব্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়া: রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
مَا أَسْكَرَ كثيرُهُ فَقَلِيلُهُ حَرَامٌ
“যে জিনিসের বেশি পরিমাণ নেশা সৃষ্টি করে, তার কম পরিমাণও হারাম।” [তিরমিজি, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ। হাদিসটি সহিহ]
সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ.
❑ শীশা ও ধূমপানের বিধান:
প্রশ্ন: শীশা পান করার বিধান কী? এর বিধান কি ধূমপানের মতোই? আর শীশা ধূমপান কি হারাম মাদকদ্রব্যের অন্তর্ভুক্ত?
উত্তর: শীশা এবং সব ধরনের ধূমপান হারামের অন্তর্ভুক্ত। কারণ এগুলোতে প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিকর দিক রয়েছে। অভিজ্ঞ চিকিৎসকগণ এর বহুমুখী ক্ষতির কথা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। আর আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের জন্য এমন সব বস্তু ব্যবহার করা হারাম করেছেন যা তাদের ক্ষতি করে। তাই যারা এসব গ্রহণ করে, তাদের ওপর ওয়াজিব হলো এগুলো বর্জন করা এবং এ থেকে সতর্ক থাকা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সূরা মায়িদায় তাঁর নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্বোধন করে বলেন:
يَسْأَلُونَكَ مَاذَا أُحِلَّ لَهُمْ قُلْ أُحِلَّ لَكُمُ الطَّيِّبَاتُ
“তারা আপনাকে জিজ্ঞাসা করে যে, তাদের জন্য কী কী বস্তু হালাল করা হয়েছে? আপনি বলে দিন, তোমাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করা হয়েছে।” [সূরা মায়িদা: ৪]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সূরা আ’রাফে তাঁর নবি মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:
وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَآئِثَ
“তিনি তাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করেন এবং অপবিত্র ও ক্ষতিকর বস্তুসমূহ হারাম করেন।” [সূরা আ’রাফ: ১৫৭]
ধূমপানের সকল মাধ্যম এবং শীশা—এগুলো মানুষের জন্য ক্ষতিকর ও অপবিত্র (খবাইস) জিনিসের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং এই দুই আয়াতের নস (সুস্পষ্ট বিধান) এবং এই অর্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অন্যান্য দলিলের ভিত্তিতে এগুলো হারাম।
আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন মুসলিমদেরকে তাদের কল্যাণ ও নাজাতের পথে পরিচালিত করেন এবং দুনিয়া ও আখেরাতে যা তাদের ক্ষতি করে তা থেকে রক্ষা করেন। নিশ্চয়ই তিনি উত্তম প্রার্থিত সত্তা।
[সূত্র: ফাতাওয়া ইসলামিয়া, সংকলন: মুহাম্মদ মুসনাদ, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৪৪৩; মাজমু ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত আশ শাইখ ইবনে বায: ২৩/৫২]
❑ শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ.-এর আরেকটি ফতওয়া:
প্রশ্ন: লিবিয়া থেকে মোস্তফা সাওয়াম নামক একজন শ্রোতা জানতে চেয়েছেন, ইসলামে ধূমপানকারীর বিধান কী? এই সমস্যাটি যেহেতু ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই এ বিষয়ে আমাদের দিকনির্দেশনা দিন। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
উত্তর: সব ধরনের ধূমপানই নাজায়েজ। কারণ এতে মারাত্মক ক্ষতি রয়েছে। অনেক আলেম এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা ধূমপানের অসংখ্য ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। তাই এটি নিঃসন্দেহে হারাম। ধূমপান করা, এটি কেনা-বেচা করা বা এর ব্যবসা করা—কোনোটিই বৈধ নয়। ঠিক যেমন মদ্যপান এবং মদের ব্যবসা হারাম, তেমনি ধূমপান, তামাক বা এ জাতীয় ক্ষতিকর বস্তু যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তা বর্জন করা ওয়াজিব। একজন মুসলিমের উচিত এগুলো থেকে অত্যন্ত সতর্ক থাকা এবং মদের মতোই তা পরিহার করা।
সুতরাং ধূমপান বা তামাকজাতীয় দ্রব্য সেবন করা যেমন নাজায়েজ, তেমনি এগুলোর ব্যবসা করাও হারাম। এসবের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতে আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।
[ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব]
❑ ধূমপান করা এবং এর ব্যবসা করা বিষয়ে শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ.-এর আরেকটি ফতওয়া:
প্রশ্ন: লিবিয়া থেকে মোস্তফা সাওয়াম নামক একজন শ্রোতা জানতে চেয়েছেন, ইসলামে ধূমপানকারীর বিধান কী? এই সমস্যাটি যেহেতু ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই এ বিষয়ে আমাদের দিকনির্দেশনা দিন। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
উত্তর:
التَّدْخِينُ بِأَنْوَاعِهِ لَا يَجُوزُ لِمَا فِيهِ مِنَ الْمَضَارِّ الْعَظِيمَةِ، وَقَدْ نَصَّ جَمْعٌ مِنْ أَهْلِ الْعِلْمِ الَّذِينَ أَلَّفُوا فِي ذَلِكَ عَلَى مَضَارِّهِ الْكَثِيرَةِ، وَنَصَّ عَلَيْهَا الْأَطِبَّاءُ الْعَارِفُونَ بِهِ، فَهُوَ مُحَرَّمٌ بِلَا شَكٍّ، وَلَا يَجُوزُ تَعَاطِيهِ، وَلَا بَيْعُهُ، وَلَا شِرَاؤُهُ، وَلَا التِّجَارَةُ فِيهِ، كَالْخَمْرِ كَمَا يَحْرُمُ بَيْعُ الْخَمْرِ وَالتِّجَارَةُ فِيهَا، فَهَكَذَا التَّدْخِينُ وَالْقَاتُ وَأَشْبَاهُهَا مِنَ الْمُضِرَّاتِ بِالْمُسْلِمِينَ وَبِالْعِبَادِ، الْوَاجِبُ الْحَذَرُ مِنْ ذَلِكَ، وَأَلَّا يُتَّجَرَ فِيهَا، وَأَلَّا يَتَعَاطَاهَا الْمُسْلِمُ، بَلْ يَحْذَرُهَا غَايَةَ الْحَذَرِ، كَمَا يَحْذَرُ الْخَمْرَ، وَيَبْتَعِدُ عَنْهَا، وَكَمَا أَنَّهُ لَا يَجُوزُ بَيْعُهَا وَلَا شِرَاؤُهَا وَلَا شُرْبُهَا كَذَا التَّدْخِينُ، وَهَكَذَا الْقَاتُ يَجِبُ الْحَذَرُ مِنْ هَاتَيْنِ الْمَادَّتَيْنِ لِمَا فِيهِمَا مِنَ الْمَضَارِّ الْعَظِيمَةِ.
“সব ধরনের ধূমপানই নাজায়েজ। কারণ এতে মারাত্মক ক্ষতি রয়েছে। অনেক আলেম এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা ধূমপানের অসংখ্য ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। তাই এটি নিঃসন্দেহে হারাম। ধূমপান করা, এটি কেনা-বেচা করা বা এর ব্যবসা করা—কোনোটিই বৈধ নয়। ঠিক যেমন মদ্যপান এবং মদের ব্যবসা হারাম, তেমনি ধূমপান, তামাক বা এ জাতীয় ক্ষতিকর বস্তু যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তা বর্জন করা ওয়াজিব। একজন মুসলিমের উচিত, এগুলো থেকে অত্যন্ত সতর্ক থাকা এবং মদের মতোই তা পরিহার করা।
সুতরাং ধূমপান বা তামাকজাতীয় দ্রব্য সেবন করা যেমন নাজায়েজ, তেমনি এগুলোর ব্যবসা করাও হারাম। এসবের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতে আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।”
[ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব]
✪ জর্দানের সাবেক প্রধান মুফতি ডা. শাইখ নূহ আলি সালমান (রাহ.)
প্রশ্ন: ধূমপান কি হারাম না কি হালাল?
উত্তর: তামাক গাছ পুড়িয়ে যে ধোঁয়া তৈরি হয়—যাকে সিগারেট বা আর্গিলা (শীশা বা হুক্কা) বলা হয়—তা ইচ্ছাকৃতভাবে শ্বাস ও খাবারের সাথে গ্রহণ করা হারাম হওয়ার পেছনে অনেক দলিল রয়েছে। নিচে তার কয়েকটি উল্লেখ করা হলো:
◈ ১. আল্লাহ তাআলার বাণী:
الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوباً عِندَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالإِنْجِيلِ يَأْمُرُهُم بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنكَرِ
وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ
“যারা অনুসরণ করে এই রসুলের, যিনি উম্মি (নিরক্ষর) নবি, যার সম্পর্কে তারা নিজেদের কাছে রক্ষিত তওরাত ও ইঞ্জিলে লিখিত পায়। তিনি তাদেরকে সৎকাজের নির্দেশ দেন ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করেন এবং তাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করেন আর অপবিত্র ও ক্ষতিকর বস্তুসমূহ (খবাইস) তাদের জন্য হারাম করেন।” [সূরা আ’রাফ: ১৫৭]
নিঃসন্দেহে ধূমপান স্বাদ, গন্ধ এবং শরীরের ওপর এর প্রভাবের দিক থেকে অপবিত্র ও ক্ষতিকর (খবাইস) জিনিসের অন্তর্ভুক্ত; পবিত্র জিনিসের অন্তর্ভুক্ত নয়।
◈ ২. উম্মে সালামাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত হাদিসে তিনি বলেন:
نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَنْ كُلِّ مُسْكِرٍ وَمُفَتِّرٍ
“রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রত্যেক নেশাজাতীয় এবং শরীর অবসাদগ্রস্তকারী বস্তু সেবন করতে নিষেধ করেছেন।” [ইমাম আহমদ ও আবু দাউদ। এই হাদিসটিকে সুয়ূতি সহিহ বলেছেন। পক্ষান্তরে শাইখ আলবানি জয়িফ বলেছেন। অনুবাদ]
ধূমপান যে শরীরকে অবসাদগ্রস্ত ও দুর্বল করে দেয়-এ নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই।
◈ ৩. সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ حَرَّمَ عَلَيْكُمْ عُقُوقَ الأُمَّهَاتِ، وَوَأْدَ الْبَنَاتِ، وَمَنْعًا وَهَاتِ، وَكَرِهَ لَكُمْ ثَلاَثًا: قِيلَ وَقَالَ، وَكَثْرَةَ السُّؤَالِ، وَإِضَاعَةَ الْمَالِ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য মায়েদের অবাধ্য হওয়া, কন্যা সন্তানদের জীবন্ত কবর দেওয়া এবং (পরের হক) না দেওয়া ও (নিজের যা প্রাপ্য নয় তা) চাওয়া হারাম করেছেন। আর তিনি তোমাদের জন্য তিনটি বিষয় অপছন্দ করেছেন: অনর্থক কথা বলা, অধিক প্রশ্ন করা এবং সম্পদ অপচয় করা।” [বুখারী ও মুসলিম]
ধূমপানের মাধ্যমে কোনো উপকার ছাড়াই প্রচুর অর্থ অপচয় ও ধ্বংস করা হয়।
◈ ৪. রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
لاَ ضَرَرَ وَلاَ ضِرَارَ
“ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াও যাবে না।” [ইমাম আহমদ ও ইবনে মাজাহ-হাসান]
নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে কোনো ধরনের ক্ষতি করতে নিষেধ করেছেন—তা শারীরিক, আর্থিক বা মানসিক যাই হোক না কেন। ধূমপান এই সবকিছুর জন্যই ক্ষতিকর।
◈ ৫. সহিহ বুখারি ও মুসলিমে জাবির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত হয়েছে:
فَإِنَّ الْمَلاَئِكَةَ تَتَأَذَّى مِمَّا يَتَأَذَّى مِنْهُ بَنُو آدَمَ
“নিশ্চয়ই ফেরেশতারা সেই জিনিসে কষ্ট পায়, যা থেকে মানুষ কষ্ট পায়।” [মুসলিম]
অন্য হাদিসে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
من آذى مسلما فقد آذاني ومن آذاني فقد آذى الله
“যে কোনো মুসলিমকে কষ্ট দিল, সে যেন আমাকেই কষ্ট দিল। আর যে আমাকে কষ্ট দিল, সে যেন আল্লাহকেই কষ্ট দিল।” [তবারানী ফিল আওসাত-হাসান ]
একজন ধূমপায়ী তার দুর্গন্ধের মাধ্যমে মানুষকে কষ্ট দেয় তা ধূমপানের সময় হোক বা পরবর্তী সময়ে।
◈ ৬. যদি কেউ ধূমপানকে কেবল ছোট গুনাহ (সগিরা গুনাহ) মনে করে তবে তার উত্তর হলো—নিচের বিষয়গুলোর কারণে ছোট গুনাহও বড় গুনাহে (কবিরা গুনাহ) পরিণত হয়:
ক. সেই গুনাহের ওপর অটল থাকা বা বারবার করা।
খ. গুনাহকে তুচ্ছ মনে করা এবং অবহেলার সাথে তা করা।
গ. গুনাহ করে আনন্দিত হওয়া।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে ধূমপান হারাম। যে ব্যক্তি এতে লিপ্ত হয়েছে, তার উচিত তা বর্জন করা এবং তওবা করা। নিজের ভুল স্বীকার করলে হয়তো আল্লাহ তওবার তৌফিক দেবেন। নিজের ভুলের সপক্ষে দলিলে প্রমাণিত হারামের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়। আমাদের এক ভাই এতে লিপ্ত ছিলেন, তাকে যখনই এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হতো তিনি বলতেন: “এটি হারাম”। পরবর্তীতে আল্লাহ তাকে এটি ছেড়ে দেওয়ার তাওফিক দান করেছেন। [“ফাতাওয়া শাইখ নূহ আলী সালমান” (ফাতাওয়া আত’ইমাহ ওয়ায যাবায়িহ / ফতোয়া নং: ৯)]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
Share: