কঠিন বাস্তবতার এই কন্টকময় জীবনে মানুষ একটু প্রশান্তি কিংবা এক চিলতে সুখের খোঁজে কত কিছুই না করে। কিন্তু প্রকৃত সুখ কি কেবল বাহ্যিক প্রাপ্তিতে? নাকি তা হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক পরম অনুভূতির নাম? এই প্রশ্নের উত্তর না জানার কারণে অধিকাংশ মানুষের কাছে সে প্রত্যাশিত সুখ যেন এক সোনার হরিণ। এই প্রেক্ষাপটে সৌভাগ্যমণ্ডিত ও আনন্দমুখর জীবন যাপনের অত্যন্ত শৈল্পিক ও দিকনির্দেশনামূলক রূপরেখা এঁকেছেন সৌদি আরবের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন আল্লামা শাইখ আব্দুর রাহমান ইবনে নাসের আস সাদী (রাহ.)। তাঁর কালজয়ী পুস্তিকা ‘আল ওয়াসাইলুল মুফিদাহ লিল হায়াতিস সাঈদাহ’ (সৌভাগ্যময় জীবনের জন্য উপকারী উপায়সমূহ) থেকে আহরিত সেই অমূল্য রত্নগুলোকে এখানে ভিন্ন আঙ্গিকে সাজিয়ে তুলে ধরা হলো।
চলুন, শাইখের এই প্রজ্ঞাময় উপদেশগুলো হৃদয়ে ধারণ করি এবং নিজের জীবনকে প্রশান্তির নীড় হিসেবে গড়ে তুলি। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন। আমিন। সুখ সমৃদ্ধ ও আনন্দমুখর জীবনের জন্য যে বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেগুলো হল:
১. দৃঢ় ইমান: সুখী জীবনের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর প্রতি অবিচল ও খাঁটি বিশ্বাস। মনে প্রশান্তি আনার এটিই প্রথম ধাপ।
২. সৎকর্ম: ইমানের সাথে সৎ কাজের সমন্বয় ঘটান। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যারা সৎ কাজ করবে তাদের জীবন তিনি আনন্দময় করে তুলবেন।
৩. সবার প্রতি দয়া: মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করুন এবং পরোপকারে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। অন্যের উপকার করলে নিজের মনের দুশ্চিন্তা ও অস্বস্তি অনেকখানি কমে যায়।
৪. কাজে ডুবে থাকা: অলস সময় কাটাবেন না। জ্ঞান অর্জন ও গঠনমূলক কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন, এতে মন খারাপ করা চিন্তাগুলো দূরে থাকবে।
৫. বর্তমানকে গুরুত্ব দেওয়া: অতীত নিয়ে আক্ষেপ আর ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাদ দিন। বর্তমান দিনটি কীভাবে ভালোভাবে কাটানো যায়, সেই লক্ষ্যেই আপনার সবটুকু মনোযোগ দিন।
৬. আল্লাহর জিকির: নিয়মিত আল্লাহর স্মরণে থাকুন। জিকির বা তার নাম উচ্চারণ হৃদয়ে প্রশান্তি ও এক অদ্ভুত প্রফুল্লতা আনে।
৭. কৃতজ্ঞ থাকা: আল্লাহর দেওয়া অগণিত নেয়ামত নিয়ে চিন্তা করুন। যখনই কোনো বিপদে পড়বেন, আল্লাহর নিয়ামতগুলোর কথা স্মরণ করবেন, দেখবেন মনের ভার অনেকটা হালকা হয়ে গেছে।
৮. নিজের অবস্থার দিকে তাকানো: জীবনের প্রাপ্তিগুলো নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে শিখুন। আপনার চেয়ে যাদের জীবনযাত্রার মান নিম্নতর, তাদের দিকে তাকালে আপনি নিজের অবস্থা নিয়ে কৃতজ্ঞ হওয়ার উপলক্ষ খুঁজে পাবেন।
৯. সক্রিয় হওয়া: কোনো কিছু নিয়ে শুধু দুশ্চিন্তা না করে, সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজে বের করুন এবং তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হোন।
১০. দোয়ায় অভ্যস্ত হওয়া: নিয়মিত আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। নিজের দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণের জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া প্রশান্তির বড় মাধ্যম।
১১. মনকে প্রস্তুত রাখা: কঠিন পরিস্থিতির কথা আগে থেকেই মাথায় রাখুন, এতে যেকোনো বিপদে আপনি ভেঙে না পড়ে ধৈর্য ধরতে পারবেন।
১২. ধৈর্য ও মনোবল: রাগ, অস্থিরতা বা অহেতুক আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখুন। মনোবল অটুট থাকলে যেকোনো কঠিন সময় পার করা সহজ হয়।
১৩. আল্লাহর ওপর ভরসা: যেকোনো কাজে নিজের সর্বাত্মক চেষ্টার পর আল্লাহর ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) করুন। এটিই মানসিক শক্তির আসল উৎস।
১৪. সহনশীল হওয়া: মানুষের খুঁত ধরা বন্ধ করুন। সম্পর্কের ইতিবাচক দিকগুলো দেখুন এবং অন্যের ছোটখাটো ভুলগুলোকে ক্ষমা করতে শিখুন।
১৫. জীবনকে ছোট ভাবা: আমাদের এই সংক্ষিপ্ত জীবন দুশ্চিন্তা করে নষ্ট করার মতো নয়। তাই মনকে অহেতুক চিন্তার ভার থেকে মুক্ত রাখুন।
১৬. তুলনামূলক চিন্তা করা: আপনার জীবনে যা কিছু আছে, তা দুঃখ-কষ্টের চেয়ে অনেক বেশি—এই হিসাবটি মাঝে মাঝে মনে করাবেন। কৃতজ্ঞ হওয়ার মতো অনেক কিছুই আপনার চারপাশে আছে।
১৭. উপেক্ষা করা: মানুষ আপনার সম্পর্কে কী বলল বা কী আচরণ করল, তা নিয়ে অতিরিক্ত ভাববেন না। গুরুত্ব না দিলে সেগুলো আপনার মনে কোনো আঁচড় কাটতে পারবে না।
১৮. ইতিবাচক চিন্তা: আপনার চিন্তাই আপনার জীবনের গতিপথ ঠিক করে দেয়। তাই সব সময় ইতিবাচক ও গঠনমূলক ভাবনায় মনকে রাঙিয়ে তুলুন।
১৯. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করা: মানুষ আপনার কাজের প্রশংসা করল কি করল না, সেটা মুখ্য নয়। প্রতিটি কাজ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করুন। এতে মানুষের কাছ থেকে পাওয়া না পাওয়ার বেদনা আপনাকে স্পর্শ করবে না।
২০. উপকারী কাজে মনোনিবেশ: জীবন থেকে ক্ষতিকর ও অপ্রয়োজনীয় অভ্যাস ঝেড়ে ফেলুন এবং উপকারী কাজের দিকে এগিয়ে যান।
২১. কাজ জমিয়ে না রাখা: সময়মতো কাজ শেষ করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। কাজ জমিয়ে রাখলে মনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
২২. পরামর্শ ও অগ্রাধিকার: যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অভিজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করুন। কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করুন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে এগিয়ে যান।
আপনার জীবন সুন্দর ও প্রশান্তিময় হোক, এই কামনাই করি। আল্লাহ তৌফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আল্লামা শাইখ আব্দুর রাহমান ইবনে নাসের আস সাদী (রাহ.) রচিত الوسائل المفيدة للحياة السعيدة (বা সৌভাগ্যময় জীবনের জন্য উপকারী উপায় সমূহ) গ্রন্থের ছায়া অবলম্বনে প্রস্তুতকৃত)।
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।