সংকলন: মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ আল কাফী (রহ.)।
সম্পাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সউদি আরব।
হজ হলো ইসলামের ৫টি রোকনের মধ্যে সর্বশেষ তথা পঞ্চম রোকন। এটি এমন একটি ইবাদত যাতে রয়েছে আত্মিক, মৌখিক, দৈহিক ও আর্থিক ত্যাগের সমন্বয়। প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের উপর তা জীবনে একবার সম্পাদন করা ফরজ।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا
“মানুষের উপর আল্লাহর অধিকার এই যে, যারা এই ঘর পর্যন্ত আসার সামর্থ্য রাখে তারা ইহার হজ পালন করবে।” [আলে ইমরান: ৯৭]
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
مَنْ حَجَّ لِلَّهِ فَلَمْ يَرْفُثْ وَلَمْ يَفْسُقْ رَجَعَ كَيَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ
“যে ব্যক্তি (হজ ওমরা করার জন্য) এ ঘরে আসবে, অতঃপর স্ত্রী সহবাসে লিপ্ত হবে না এবং পাপাচারে লিপ্ত হবে না, সে এমন (নিষ্পাপ) অবস্থায় ফিরে আসবে যেমন তার মাতা তাকে ভূমিষ্ঠ করেছিল।” [মুসলিম]
তিনি আরও বলেন:
صَلَاةٌ فِي مَسْجِدِي هَذَا أَفْضَلُ مِنْ أَلْفِ صَلَاةٍ فِيمَا سِوَاهُ إِلَّا الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ
“মসজিদে হারামে এক সালাত অন্য মসজিদে এক লক্ষ সালাতের চাইতে বেশি উত্তম।” [বুখারি ও মুসলিম]। এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতটি বিশুদ্ধভাবে আদায়ের চেষ্টা করা একান্তভাবে অপরিহার্য। এ লক্ষ্যে কুরআন-হাদিসের নির্যাস থেকে হজের কার্যাবলী ধারাবাহিকভাবে অতি সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপন করা হল। যেগুলো সকল হজ সম্পাদনকারীর জন্য অনুসরণীয়।
◆ ১. একনিষ্ঠতার সাথে শুধুমাত্র আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্য হজ পালন করা।
◆ ২. সেটি পালনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর তরিকা ও পদ্ধতি অনুসরণ করা।
◆ ৩. হালাল বা বৈধ উপার্জন থেকে হজ পালন করা।
◆ ৪. হজের বিধান সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞানার্জন করা।
◆ ৫. যাবতীয় শিরক, বিদআত ও পাপাচার থেকে বিরত থাকা।
❑ হজ ফরজ হওয়ার শর্তাবলি (৬টি):
হজ ফরজ হওয়ার জন্য কিছু মৌলিক শর্ত পূরণ হওয়া আবশ্যক। নিম্নে সেগুলো উল্লেখ করা হল:
❖ ১. ইসলাম: কেবল মুসলিমদের ওপর হজ ফরজ। অমুসলিমদের ওপর ইসলামের কোনও বিধানই প্রযোজ্য নয়। [সূরা তওবা: ৫৪]
❖ ২. জ্ঞান সম্পন্ন হওয়া: হজ পালনের জন্য মানসিকভাবে সুস্থ হওয়া আবশ্যক। কোনও অপ্রকৃতিস্থ বা পাগল ব্যক্তির ওপর হজ ফরজ নয়। কারণ তার ভালো-মন্দের বোধ শক্তি নেই। [আহমদ, আবু দাউদ, নাসায়ী]
❖ ৩. স্বাধীন হওয়া: হজ কেবল স্বাধীন ব্যক্তির ওপর ফরজ; দাস-দাসীর উপর নয়। [আহমদ, আবু দাউদ, নাসায়ী]
❖ ৪. বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া: ছোট শিশু যদি তার বাবা-মার সাথে হজ করে তবে তা নফল হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সামর্থ্য থাকলে তাকে পুনরায় ফরজ হজ আদায় করতে হবে। [আহমদ, আবু দাউদ, নাসায়ী]
❖ ৫. আর্থিক ও শারীরিক ক্ষমতা সম্পন্ন হওয়া: এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। এতটা আর্থিক সক্ষমতা থাকা আবশ্যক যে, সে ব্যক্তি হজে যাতায়াত সহ সব আনুষঙ্গিক খরচ বহনের পাশাপাশি তার অনুপস্থিত কালীন তার পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি শারীরিকভাবেও এই দীর্ঘ সফর করার সক্ষমতা থাকতে হবে। অনুরূপভাবে রাস্তার নিরাপত্তা থাকাও অপরিহার্য শর্ত। [আলে ইমরান: ৯৭]
❖ ৬. মহিলার জন্য মাহরাম থাকা: অধিক বিশুদ্ধ মতে, একজন মহিলার জন্য হজে যাওয়ার ক্ষেত্রে তার স্বামী অথবা এমন কোনও পুরুষ আত্মীয় (মাহরাম) থাকা শর্ত, যার সাথে তার বিয়ে চিরস্থায়ীভাবে হারাম (যেমন: বাবা, ভাই, ছেলে প্রমুখ)। মাহরাম ছাড়া মহিলাদের জন্য হজের দীর্ঘ সফর করা বৈধ নয়। [বুখারী ও মুসলিম]
এই শর্তগুলো পূরণ হলে একজন ব্যক্তির ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ বা আবশ্যক হয়ে যায়।
হজ ও উমরার কাজগুলো ধারাবাহিকভাবে নিম্নরূপ:
❑ মিকাতে করণীয়:
১. ইহরামের পূর্বে শারীরিকভাবে পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা তথা—নাভিমূল, বগলের লোম পরিষ্কার করা, নখ কাটা।
২. মিকাত থেকে ইহরাম বাঁধা (ওয়াজিব)।
৩. মিকাতে গিয়ে ইহরামের উদ্দেশ্যে প্রথমে গোসল করা।
৪. মাথা, দাড়ি বা শরীরে আতর-সুগন্ধি ব্যবহার করা।
৫. সেলাইবিহীন দুটি কাপড়ে ইহরাম বাঁধা (শুধু পুরুষদের জন্য)। মহিলাগণ তাদের স্বাভাবিক পোশাকেই থাকবে।
৬. কাপড় দুটি সাদা হওয়া উত্তম।
৭. হজ বা উমরার উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট মিকাত অতিক্রমের পূর্বে (অন্তরে) নিয়ত করত: ইহরাম বাঁধা (রোকন)।
৮. তামাত্তু হজের জন্য প্রথমে উমরা আদায় করা।
৯. উমরার ইহরাম বাঁধার সময় বলা: ‘আল্ল-হুম্মা লাব্বাইকা উমরাতান’।
১০. কিরান হজের ইহরাম বাঁধার সময় বলা: ‘আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা হাজ্জান ওয়া উমরাতান’
১১. ইফরাদ হজের ইহরাম বাঁধার সময় বলা: ‘আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা হাজ্জান’ (হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে হাজের জন্য উপস্থিত)”
❑ মিকাত থেকে ইহরাম সম্পন্ন করে মক্কায় পৌঁছা পর্যন্ত করণীয়:
১২. রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পঠিত তালবিয়া জোরে জোরে পাঠ করা:
لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ
“আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা, লাব্বাইকা লা-শারিকা লাকা লাব্বাইকা, ইন্নাল হামদা ওয়ানি’য়মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা-শারিকা লাকা”।
অর্থ: “আমি হাজির। হে আল্লাহ, আমি হাজির। আপনার কোনো শরিক নেই। আমি হাজির। নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা, নেয়ামত এবং রাজত্ব কেবল আপনারই। আপনার কোনো শরিক নেই।” [সহিহ বুখারি, ১৫৪৯]
১৩. পবিত্র অবস্থায় মসজিদুল হারামে প্রবেশ করা।
১৪. মসজিদে হারামে প্রবেশের পূর্বে তালবিয়া বলা বন্ধ করা।
১৫. তওয়াফের জন্য সরাসরি হাজরে আসওয়াদের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
❑ কাবা ঘরে তওয়াফ:
১৬. তওয়াফ শুরুর পূর্বে ইযতিবা করা (শুধু পুরুষের জন্য)। (ইহরামের কাপড় ডান বগলের নিচ দিয়ে নিয়ে বাম কাঁধের উপর রাখাকে ইযতিবাহ বলা হয়)। তবে নামাজের সময় উভয় কাঁধ ঢেকে রাখা জরুরি।
১৭. ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ (بِسْمِ اللهِ، اللهُ أَكْبَرُ) বলে হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথরে চুমু দিয়ে কিংবা ডান হাত তুলে এক বার ইশারা করে তওয়াফ শুরু করা।
১৮. প্রথম তিন চক্করে রমল করা (দ্রুতবেগে চলা)।
১৯. আল্লাহর ঘর বাম দিকে রেখে তওয়াফ করা।
২০. হাতিমে কাবার বাহির দিয়ে তওয়াফ করা।
২১. রোকনে ইয়েমেনি (হাজরে আসওয়াদ কাবা ঘরের যে কোণায় রয়েছে তার আগের কোণা) স্পর্শ করা। তা সম্ভব না হলে স্বাভাবিকভাবেই চলতে থাকব। এখানে চুমু খাওয়া বা হাত দ্বারা ইশারা করার প্রয়োজন নাই।
২২. তওয়াফ অবস্থায় রোকনে ইয়েমেনি ও হাজরে আসওয়াদের মাঝখানে বিশেষ একটি দুআ ছাড়া অন্য কোনো দুআ সাব্যস্ত নেই। তাই এ ক্ষেত্রে যে কোনও দুআ-জিকির পাঠ করা যায়।
২৩. রোকনে ইয়েমেনি এবং হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানে এই দোয়া পড়া:
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
উচ্চারণ: “রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাওঁ ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাওঁ ওয়া ক্বিনা আযাবান্নার”।
অর্থ: “হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের দুনিয়াতেও কল্যাণ দান করো এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান করো এবং আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করো।” [সূরা বাকারা: ২০১]
২৪. একাধারে সাত চক্কর পূর্ণ করা (রোকন)।
২৫. মাকামে ইবরাহিমের পিছনে দু রাকাত নামাজ পড়া। (সেখানে সম্ভব না হলে মসজিদুল হারামের যে কোনও স্থানে তা আদায় করা। আর বর্তমানে হাজিদের ভিড়ের কারণে আদৌ তা সম্ভব নয়)।
২৬. সূরা ফাতিহার পর প্রথম রাকাতে সূরা কাফিরূন এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস পড়া।
২৭. জমজমের পানি পান করা এবং সম্ভব হলে কিছু মাথায় ঢালা।
২৮. পুনরায় হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথরে চুমু দেওয়া বা সে দিকে হাত দ্বারা ইশারা করা।
❑ সাফ-মারওয়ার মাঝে সাঈ:
২৯. إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ “ইন্নাস সাফা ওয়াল মারওয়াতা মিন শাআইরিল্লাহ” (সাফা ও মারওয়াহ (পাহাড় দ্বয়) আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মধ্যে অন্যতম) [সূরা বাকারা: ১৫৯] বলতে বলতে সাফা পাহাড়ে আরোহণ করা।
৩০. কিবলার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে পাঠ করা: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার, আল হামদুলিল্লাহ ইত্যাদি।
অতঃপর তিনবার বলবে:
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْيِي وَيُمِيتُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ. لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ أَنْجَزَ وَعْدَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ইউহয়ি ওয়া ইয়ুমিতু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বদীর। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু আনজাযা ওয়া’দাহু ওয়া নাসারা আবদাহু ওয়া হাযামাল আহযাবা ওয়াহদাহ।
অর্থ: “আল্লাহ ছাড়া কোনও সত্য ইলাহ নেই। তিনি একক, তাঁর কোনও শরিক নেই। রাজত্ব তাঁরই এবং প্রশংসা মাত্রই তাঁর। তিনিই জীবিত করেন এবং মৃত্যু দান করেন। আর তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাশালী। আল্লাহ ছাড়া কোনও সত্য ইলাহ নেই। তিনি একক। তিনি তাঁর ওয়াদা পূর্ণ করেছেন, তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং তিনি একাই সকল সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করেছেন।”
এরপর যে কোনও দুআ-তাসবিহ ও জিকির-আজকার পাঠ করা যাবে।
৩১. সবুজ বাতি দ্বারা চিহ্নিত স্থানে (যে স্থানটার নাম বাতনে ওয়াদি) দৌড়ানো। তবে মহিলাগণ স্বাভাবিক গতিতে চলবে।
৩২. সাফা-মারওয়া পাহাড় দ্বয়ের মধ্যে সাঈ করার সময় বিশেষ কোনও দুআ-তাসবিহ নেই। তবে এ ক্ষেত্রে যে কোনও দুআ-তাসবিহ, জিকির-আজকার ইত্যাদি পাঠ করা যায়।
৩৩. মারওয়া পাহাড়ে আরোহণ করা।
৩৪. সেখানেও সাফা পাহাড়ের ন্যায় দুআ ও জিকিরগুলো পাঠ করা।
৩৫. সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাত চক্করে সাঈ সম্পাদন করা। (রোকন)।
৩৬. সাফা থেকে মারওয়া গমন করলে তা হবে ১ম চক্কর, মারওয়া থেকে সাফা ফিরে আসলে তা হবে ২য় চক্কর। এভাবে ৭ম চক্কর মারওয়ায় গিয়ে শেষ হবে।
৩৭. তামাত্তু কারীদের জন্য মাথার চুল মুড়িয়ে বা খাটো করে হালাল হয়ে যাওয়া। (মহিলাগণ চুলের শেষ প্রান্ত থেকে আঙ্গুলের এক গিরা পরিমাণ কাটবে)।
এর মাধ্যমে ইহরাম অবস্থায় বিশেষভাবে যেসব বিষয় নিষিদ্ধ ছিল (যেমন: সেলাই যুক্ত কাপড় পরিধান করা, আতর-সুগন্ধি ব্যবহার করা, পুরুষদের জন্য মুখমণ্ডল ঢাকা ইত্যাদি) সেগুলোর নিষিদ্ধতা উঠে যাবে শুধু স্ত্রী সহবাস ছাড়া।
৩৮. কিরান ও ইফরাদ কারী হাজিগণ ইহরাম অবস্থাতেই থাকবে। (তারা তামাত্তু কারীর মত ইহরাম থেকে হালাল হবে না)।
❑ ৮ই জিলহজ (ইয়াউমুত তারবিয়াহ)-এর কার্যাবলী:
৩৯. এদিন সকাল বেলা তামাত্তুকারী তার নিজ অবস্থান থেকেই আগের নিয়মে (সম্ভব হলে গোসল করে) হজের জন্য ইহরাম বাঁধবে। এ সময় বলবে ‘আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা হাজ্জান’। (এই এহরাম বাধাটা হজের একটি রোকন।)
৪০. মিনায় গমন করে জোহর থেকে ফজর এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কসর করে (৪ রাকাত বিশিষ্ট ফরজ নামাজ দু রাকাত) আদায় করা। (এ ক্ষেত্রে দু ওয়াক্তের নামাজ জমা করা সুন্নাহ দ্বারা সাব্যস্ত নয়।)
৪১. সেখানে রাত যাপন করা।
❑ ৯ই জিলহজ (আরাফাত দিবস)-এর কার্যাবলী:
৪২. এদিন সূর্যোদয়ের পর আরাফাতের উদ্দেশ্যে গমন করা। এসময় অধিক পরিমাণে তালবিয়া (লাব্বাইক) ও তাকবির (আল্লাহু আকবার) পাঠ করা।
৪৩. সম্ভব হলে দুপুর পর্যন্ত আরাফাতের সীমানার বাইরে ‘নামেরা’ নামক স্থানে অবস্থান করা।
৪৪. সেখানে অবস্থান করে মসজিদে নামিরায় প্রদত্ত আরাফার খুতবা শোনা।
৪৫. জোহর ও আসরের নামাজ জোহরের সময়েই এক আজান ও দুই ইকামতের মাধ্যমে জমা ও কসর করা। (অর্থাৎ প্রথমে ইকামত দিয়ে দু রাকাত জোহর নামাজ আদায় করা। অতঃপর পূনরায় ইকামত দিয়ে দু রাকাত আসর নামাজ আদায় করা। জামাতের সাথে পড়ার চেষ্টা করতে হবে। কোনও সুন্নত ও নফল নামাজ পড়বে না।)
৪৬. এই দুই নামাজের মাঝে সুন্নত বা কোনও নফল নামাজ না পড়া।
৪৭. আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা।(রোকন)
এ ক্ষেত্রে সুন্নত হল, সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে যাওয়ার পরে আরাফাত ময়দানে প্রবেশ করা।
৪৮. আরাফাত ময়দানে অবস্থানকালে বেশি বেশি তালবিয়া (লাব্বাইক) ও তাকবির (আল্লাহু আকবার) পাঠ করা এবং কিবলা মুখী হয়ে হাত তুলে দুআয় মশগুল থাকা।
বিশেষ করে এই দুআটি অধিক পরিমাণে পাঠ করা:
لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
উচ্চারণ: “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর।”
অর্থ: “আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তাঁরই এবং প্রশংসা মাত্রই তাঁর। তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাশীল।” [তিরমিজি: ৩৫৮৫]
৪৯. সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাত ময়দানে অবস্থান করা (ওয়াজিব)।
৫০. আরাফাত ময়দানে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থানের পর মুজদালিফার উদ্দেশ্যে গমন করা। এ ক্ষেত্রে ধীর স্থিরতা বজায় রাখবে।
❑ মুজদালিফায় করণীয়:
৫১. ৯ম জিলহজের দিবাগত রাতে মুজদালিফায় পৌঁছে সেখানে সর্বপ্রথম মাগরিব ও ইশার নামাজ এক আজানে ও দুই ইকামতে জমা ও কসর সহকারে আদায় করা। অর্থাৎ মাগরিব নামাজ যথারীতি তিন রাকাত এবং ইশার নামাজ শুধু দু রাকাত আদায় করবে। এর আগে-পরে কোনও সুন্নত বা নফল নামাজ আদায় করবে না। (তবে কিছু আলেমের মতে, ইশার পরে বিতর এবং ফজরের দু রাকাত সুন্নত পড়া যায়)।
৫২. মুজদালিফায় রাত যাপন করা (ওয়াজিব)।
৫৩. এ রাতে কোনও প্রকার ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল না হয়ে সরাসরি ঘুমিয়ে পড়া।
৫৪. ফজর দু রাকাত ফরজ নামাজ আদায় করে মাশআরুল হারাম নামক স্থানে কিবলা মুখী হয়ে দু হাত উত্তোলন করে প্রত্যেকেই নিজে নিজে দুআ করা।
❑ ১০ জিলহজের কার্যাবলী: (মুজদালিফা থেকে মিনার গমন এবং সেখানে করণীয়সমূহ)
৫৫. সূর্যোদয়ের পূর্বে মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করা।
৫৬. ‘বাতনে মুহাসসার’ বা মুহাসসার উপত্যকায় (যা মুজদালিফা ও মিনার মাঝামাঝিতে অবস্থিত) দ্রুত গতিতে চলা।
১০ই জিলহজের কার্যাবলী:
৫৭. মুজদালিফা বা মিনার যে কোনও স্থান থেকে ৭টি কঙ্কর সংগ্রহ করা।
৫৮. বড় জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপের পূর্বে তালবিয়া পাঠ বন্ধ করা।
৫৯. সূর্যোদয়ের পর বড় জামরায় (যেটাকে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ অজ্ঞতা বশত: ‘বড় শয়তান’ বলে থাকে) একে একে ৭টি কঙ্কর নিক্ষেপ করা (ওয়াজিব)।
পাথর মারার সময় পুরুষগণ উচ্চস্বরে আর মহিলাগণ নিম্নস্বরে ‘আল্লাহু আকবার’ বলবে।
৬০. মিনা বা হারামের সীমানার মধ্যে যে কোনও স্থানে হাদি জাবাই করা (কুরবানি করা)। এটা তামাত্তু এবং কিরান কারীর জন্য ওয়াজিব।
৬১. নিজ হাতে কুরবানি করা। (কুরবানির টাকা নির্ধারিত ব্যাংকে দেওয়াও বৈধ)। সম্ভব হলে কুরবানি কিছু মাংস ভক্ষণ করা।
৬২. জিলহজের ১০ তারিখ এবং তার পরবর্তী আরও তিন দিন তথা ১১, ১২, ১৩ তারিখেও কুরবানি করাও বৈধ।
৬৩. মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করে হালাল হওয়া (মহিলাগণ চুলের শেষ প্রান্ত থেকে আঙ্গুলের এক গিরা সমপরিমাণ কাটবে) (ওয়াজিব)।
৬৪. মক্কায় গমন করে তওয়াফে ইফাযাহ করা। (রোকন)
এ ক্ষেত্রে রমল করার প্রয়োজন নাই।
৬৫. তওয়াফের পর দু রাকাত নামাজ পড়া।
৬৬. তামাত্তুকারীর জন্য সাফা-মারওয়া সাঈ করা (রোকন)। আর কিরানকারী জন্য তার আগের সাঈই যথেষ্ট হবে। ১০ তারিখে তার জন্য পুনরায় সাঈ করা আবশ্যক নয়। আর ইফরাদকারী যদি মক্কায় এসে তওয়াফে কুদুম করার পর সাঈ করে থাকে তাহলে ১০ তারিখে তার জন্য পুনরায় সাঈ করা আবশ্যক নয়। কিন্তু আগে তা না করে থাকলে তখন করা আবশ্যক।
বিশেষ দ্রষ্টব্য, অধিক বিশুদ্ধ মতে, ১০ তারিখের চারটি কাজ তথা বড় জমরায় কঙ্কর নিক্ষেপ, কুরবানির পশু (হাদি) জবাই, মাথা মুণ্ডন এবং তওয়াফে ইফাযাহ আদায়ের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা ভালো। কিন্তু ধারাবাহিকতা ঠিক না থাকলেও অর্থাৎ এগুলোর আগে-পিছে হয়ে গেলেও তাতে হজের কোনও ক্ষতি হবে না ইনশাআল্লাহ।
❑ ১১, ১২ ও ১৩ই জিলহজের কার্যাবলী:
৬৭. মক্কা থেকে প্রত্যাবর্তন করে মিনায় ১০, ১১ তারিখের দিবাগত দু রাত অতিবাহিত করা (ওয়াজিব)। [১২ তারিখের দিবাগত অতিবাহিত করা ওয়াজিব নয়]।
৬৮. জিলহজের ১১ ও ১২ তারিখে পশ্চিমাকাশে সূর্য ঢলার পর (জোহর নামাজের পর) বড়, মধ্যম ও ছোট জামরার প্রতিটিতে তাকবির (আল্লাহু আকবার) সহ একে একে সাতটি করে (মোট ২১টি) কঙ্কর নিক্ষেপ করা। (ওয়াজিব)।
৬৯. তিনটি জামরায় পাথর মারার ক্ষেত্রে ছোট ও মধ্যম জামরার পর একটু সামনে এগিয়ে কিবলার দিকে মুখ করে দু হাত উঠিয়ে দুআ করা।
৭০. কিন্তু বড় জামরাতে পাথর মেরে দাঁড়াবে না এবং দুআও করবে না।
৭১. ১২ তারিখে মিনা ত্যাগ করার ইচ্ছা করলে সূর্যাস্তের পূর্বেই তা করতে হবে।
৭২. সূর্য ডোবার পর মিনায় থেকে গেলে সেই রাত (মিনায়) যাপন করা ওয়াজিব এবং পরবর্তী ১৩ তারিখ পশ্চিমাকাশে সূর্য ঢলার পর তিনটি জামরায় পাথর মারাও ওয়াজিব।
৭৩. মক্কায় এসে বিদায়ী তওয়াফ করা (ওয়াজিব)। এ ক্ষেত্রে রমল (দৌড়ানো) নেই।
✪ কতিপয় জরুরি বিষয়:
◈ ক. অনেকে ইহরাম বাঁধার সময় থেকেই ইযতিবা করে অর্থাৎ ইহরামের কাপড় ডান বগলের নিচ দিয়ে নিয়ে বাম কাঁধের উপর রেখে দেয়। এমনকি সালাতের সময়ও সেভাবেই থাকে। এরূপ করা সুন্নতের পরিপন্থী। ইযতিবা শুধু তওয়াফের সময় করা সুন্নত; অন্য সময় নয়।
◈ খ. কাবা ঘরের তওয়াফ এবং সাফা-মারওয়া সাঈ করার জন্য নির্দিষ্ট কোনও দুআ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। তবে কতিপয় সালাফ থেকে নিম্নোক্ত দুআটি প্রমাণিত আছে।
رَبِّ اغْفِرْ وَارْحَمْ، إِنَّكَ أَنْتَ الْأَعَزُّ الْأَكْرَمُ
উচ্চারণ: রব্বিগফির ওয়ারহাম, ইন্নাকা আনতাল আ’আযযুল আকরাম।
অর্থ: “হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন এবং দয়া করুন। নিশ্চয়ই আপনিই সবচেয়ে সম্মানিত ও মর্যাদাবান।”
সুতরাং কেউ চাইলে এই দুআটা পাঠ করতে পারে। এ ছাড়া যে কোনও দুআ নিজ ভাষায় করা যাবে বা যে কোনও দুআ, জিকির-তাসবিহ, ইস্তিগফার ইত্যাদি পাঠ করা যাবে ইনশাআল্লাহ।
তবে কেবল রোকনে ইয়েমেনি এবং হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানে নিম্নোক্ত দোয়াটি পড়া সুন্নত:
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
উচ্চারণ: “রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাওঁ ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাওঁ ওয়া ক্বিনা আযাবান্নার”।
সতর্কতা: হজ-উমরা সংক্রান্ত বিভিন্ন কিতাবে তওয়াফের সময় পড়ার জন্য যে সকল দুআ লেখা আছে নির্দিষ্ট ভাবে সেগুলো পড়া সঠিক নয়। কেননা এভাবে প্রতিটি চক্করের জন্য বিশেষ কোনও দুআ না রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পড়েছেন, না তিনি পড়তে বলেছেন, না কোনও সাহাবি এরূপ করেছেন। তাই এগুলো পড়া সুন্নত মনে করা হলে তা বিদআত হিসেবে গণ্য হবে।
◈ গ. অনেকে ইহরাম বাঁধার উদ্দেশ্যে দু রাকাত সালাত আদায় করে থাকে। এটি সুন্নাহ দ্বারা সাব্যস্ত নয়। কারণ ইহরামের বিশেষ কোনও সালাত নেই। তবে কোনও ফরজ সালাতের সময় হয়ে গেলে উক্ত সালাত আদায়ের পর কিংবা মসজিদে প্রবেশ করলে তাহিয়াতুল মসজিদ হিসেবে দু রাকাত সালাত আদায়ের পর ইহরাম বাঁধবে।
◈ ঘ. ১০ তারিখে তওয়াফে ইফাযাহ করতে না পারলে পরবর্তীতে যে কোনও সময় তা করতে পারবে। তবে ১৩ তারিখের মধ্যে আদায় করা উত্তম। প্রয়োজনে তওয়াফে ইফাযাহর সাথে বিদায়ী তওয়াফের নিয়ত করলে উভয়টিই আদায় হয়ে যাবে।
◈ ঙ. কোনও অবস্থাতেই আরাফাতের ময়দান থেকে সূর্য ডোবার পূর্বে ময়দান ছেড়ে যাওয়া জায়েজ নয়। (এটিই অধিক বিশুদ্ধ মত)।
◈ চ. তামাত্তুকারীর জন্য কোনও অবস্থাতেই এক সাঈ যথেষ্ট নয়। বরং তার জন্য উমরার সাঈ এবং হজের সাঈ দু বার সাঈ করা আবশ্যক।
◈ ছ. ১০ তারিখের পূর্বে তওয়াফে ইফাযাহ করলে তা আদায় হবে না। বরং তা ১০, ১১, ১২, ১৩ বা তারপরে যে কোনও সময় আদায় করা যাবে। তবে উত্তম হলো, ১৩ তারিখের মধ্যে আদায় করা।
◈ জ. তানঈম (যাকে মসজিদে আয়েশা বা ওমরা মসজিদ বলা হয়) থেকে ইহরাম বেঁধে এসে নিজের জন্য বা আত্মীয়স্বজনের পক্ষ থেকে একাধিক ওমরা পালন করা শরিয়ত সম্মত নয়। কেননা একই সফরে একাধিক ওমরা করা রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তাঁর সাহাবায়ে কেরাম (রা.) ও তাবেঈদের কারো থেকেই সাব্যস্ত নেই। [বিস্তারিত দেখুন: আল মুগনী, ৫/১৭]
❑ মসজিদে নববীরর উদ্দেশ্যে সফর এবং রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর করব জিয়ারত:
মসজিদে নববীতে সালাত আদায়ের সওয়াব লাভের উদ্দেশ্যে মদিনা মুনাওয়ারার সফর করা জায়েজ ও বরকতময়। কিন্তু মদিনা সফর বা জিয়ারত করা হজ বা ওমরার সাথে সম্পর্কিত নয়। বরং এটি একটি স্বতন্ত্র আমল, যা বছরের যেকোনো সময় করা যায়। মসজিদে নববী জিয়ারতে গেলে করণীয় হল, মসজিদে প্রবেশ করে প্রথমে দুই রাকাত ‘তাহিয়্যাতুল মসজিদ’ আদায় করা অথবা নামাজের সময় হয়ে গেলে তা আদায় করা। সম্ভব হলে রিয়াজুল জান্নাতে এই সালাত আদায় করা উত্তম। অতঃপর, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কবর মোবারক জিয়ারত করা মুস্তাহাব। কবরের সামনে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত নিচু স্বরে ও ভাবগাম্ভীর্যের সাথে সালাত ও সালাম পেশ করতে হয়। বলবে:
الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَيْكَ يَا رَسُولَ اللهِ
“আসসালাতু ওয়াসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ।”
“হে আল্লাহর রসুল! আপনার ওপর সালাত ও সালাম (শান্তি) বর্ষিত হোক।”
রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সালামের পর ডানে সরে গিয়ে আবু বকর সিদ্দিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কবরে সালাত ও সালাম পেশ করবে। বলবে:
السَّلَامُ عَلَيْكَ يَا أَبَا بَكْرٍ الصِّدِّيقَ خَلِيْفَةَ رَسُوْلِ اللهِ
উচ্চারণ: “আসসালামু আলাইকা ইয়া আবা বাকরিনিস সিদ্দীক খালীফাতা রাসূলিল্লাহ।”
অর্থ: “হে আবু বকর সিদ্দিক, আল্লাহর রসুলের খলিফা! আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।”
এবং এরপর উমর ফারুক (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কবরের সামনে দাঁড়িয়ে সালাম পেশ করবে। বলবে,
السَّلَامُ عَلَيْكَ يَا عُمَرَ الْفَارُوْقَ خَلِيْفَةَ خَلِيْفَةِ رَسُوْلِ اللهِ
উচ্চারণ: “আসসালামু আলাইকা ইয়া উমারাল ফারূক খালীফাতা খালীফাতি রাসূলিল্লাহ।”
অর্থ: “হে উমর ফারুক, আল্লাহর রাসুলের খলিফার খলিফা! আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।”
এগুলোই সহজ ও সক্ষিপ্ত সালামের শব্দ। তবে আরও বিভিন্ন সালাম পেশ করা যায়।
❑ হজের রোকন ৪টি:
১. ইহরাম বাঁধা।
২. আরাফায় অবস্থান করা।
৩. তওয়াফে ইফাযাহ করা।
৪. সাঈ করা।
❑ হজের ওয়াজিব ৮টি:
১) মিকাত হতে ইহরাম বাঁধা।
২) সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফায় অবস্থান করা।
৩) মুজদালিফায় রাত যাপন করা।
৪) ১১ ও ১২ জিলহজের দু রাত মিনায় যাপন করা।
৫) জামরায় পাথর মারা।
৬) কুরবানি করা। (তামাত্তু ও কিরান কারীদের জন্য)।
৭) চুল কামানো বা ছোট করা।
৮) বিদায়ী তওয়াফ করা। (তবে ঋতুমতী ও প্রসূতি নারীদের জন্য তা আবশ্যক নয়)।
❑ কোনও রোকন বা ওয়াজিব ছুটে গেলে কী করণীয়?
হজের কার্যাবলী মূলত দুই ভাগে বিভক্ত: রোকন (মৌলিক স্তম্ভ) এবং ওয়াজিব (অপরিহার্য কাজ)।
✪ ১. রোকন হলো হজের এমন কাজ যা পালন না করলে হজ সম্পন্ন হয় না। (যেমন: ইহরাম বাঁধা, আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা, তওয়াফে ইফাযাহ এবং সাঈ করা।) কোনও রোকন বাদ পড়লে শুধু পশু কুরবানি (দম) দিলেই হবে না বরং সেই কাজটি অবশ্যই পূর্ণ করতে হবে। যদি সেই কাজ করার সময় পার হয়ে যায় (যেমন: আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত হতে না পারা) তবে সেই বছরের হজ বাতিল হয়ে যাবে এবং ভবিষ্যতে তা পুনরায় কাজা করতে হবে।
✪ ২. ওয়াজিব হলো হজের সেই কাজগুলো যা পালন করা আবশ্যক। কিন্তু কোনও কারণে বাদ পড়লে হজ বাতিল হয় না। (যেমন: মিকাত থেকে ইহরাম বাঁধা, মুজদালিফায় রাত কাটানো বা জামরায় পাথর মারা) ইচ্ছা করে হোক বা ভুলে হোক, কোনও ওয়াজিব বাদ পড়লে তার বদলে একটি দম বা পশু কুরবানি (ছাগল বা দুম্বা) জবাই করে তার গোশত অথবা গরু বা উটের এক সপ্তমাংশ হারাম এলাকার দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হবে। নিজে খাওয়া যাবে না এবং পরিবার কিংবা কোনও ধনী মানুষকে তা খাওয়ানো যাবে না। কেননা এটি সম্পূর্ণরূপে সদকা হিসেবে গণ্য।
যদি কেউ পশু পশু জবাই করতে অক্ষম হয় তবে তাকে ১০টি রোজা রাখতে হবে। ৩টি রোজা হজের সময় (মক্কায়) এবং বাকি ৭টি রোজা বাড়িতে ফিরে এসে।
বর্তমান যুগে সরকারীভাবে নির্বাচিত কিছু ব্যাংক এই দায়িত্ব পালন করে থাকে। সুতরাং এসব ব্যাংকে ‘দম’ হিসেবে একটি ছাগল/ভেড়া/দুম্বার টাকা জমা দিলেও তা যথেষ্ট হবে।
❑ ইহরাম অবস্থায় যে সব কাজ করা হারাম: (১০টি)
১) পুরুষদের জন্য সেলাইকৃত পোশাক পরিধান করা। যেমন: জুব্বা, পাঞ্জাবি, পায়জামা, প্যান্ট, গেঞ্জি, হাফপ্যান্ট (আন্ডার ওয়্যার), টুপি, মোজা ইত্যাদি। মহিলাগণ তাদের স্বাভাবিক পোশাকে থাকবে।
২) পুরুষদের জন্য মুখ ঢাকা। তবে মহিলাগণ পরপুরুষের সামনে মাথার উপর থেকে ওড়না ফেলে মুখমণ্ডল ঢাকবে। (নিকাব পরবে না)।
৩) পুরুষদের মাথা ঢাকা।
৪) হাতমোজা পরিধান করা। তবে মহিলাগণ পরপুরুষের সামনে বোরকার লম্বা আস্তিন দ্বারা তাদের হস্ত দ্বয় ঢাকবে। অনুরূপভাবে তারা পা মোজাও পরিধান করতে পারে। (পুরুষদের জন্য পা মোজা পরিধান করা জায়েজ নাই)
৫) নখ, চুল ইত্যাদি কাটা।
৬) স্থলচর প্রাণী শিকার করা বা সেটি শিকার করার জন্য ইঙ্গিত করা।
৭) বিয়ে করা বা বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া।
৮) স্বামী-স্ত্রী সহবাস করা।
৯) কোনও জিনিস কুড়ানো (হারাম এলাকায়)। তবে মূল্যবান কোনও বস্তু মালিকের নিকটে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে কর্তৃপক্ষের নিকট হস্তান্তর করতে পারে।
১০) সুগন্ধি ব্যবহার করা।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে কেবল মাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পবিত্র কুরআন এবং সহিহ সুন্নাহ অনুযায়ী হজ পালন করে সৌভাগ্যশালীদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন!! (সমাপ্ত)
[এটি মূলতঃ শাইখ আব্দুল্লাহ আল কাফী (রাহ.) কর্তৃক রচিত জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন (সৌদি আরব)-এর হজ কোর্সের সংক্ষিপ্ত সিলেবাস। তবে তাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ও পরিমার্জন করা হয়।-সম্পাদক]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
সম্পাদনা ও পরিমার্জনা:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।