পহেলা এপ্রিল বা এপ্রিল ফুল ইসলামি শরিয়তের কঠোর হুঁশিয়ারি

এপ্রিল ফুল (April Fool) বা ‘অল ফুলস ডে’ (All Fools’ Day) হলো, প্রতি বছর ১লা এপ্রিল তারিখে পালিত একটি পশ্চিমা অপসংস্কৃতি। অন্যকে বোকা বানিয়ে বা মিথ্যা বলে আনন্দ উপভোগ করাই এই দিনটির মূল উপজীব্য। কিন্তু “পহেলা এপ্রিল” উপলক্ষে কাউকে মিথ্যা বলে ধোঁকা দেওয়া বা প্রতারণা করা ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম, কবিরা গুনাহ এবং ঈমানি মূল্যবোধের পরিপন্থী। একজন আত্মমর্যাদা সচেতন মুমিন কখনোই রসিকতার ছলেও মিথ্যা কথা বলতে পারে না বা কারও সাথে ফান করতে পারে না। অমুসলিমদের অন্ধ অনুকরণে এসব অপসংস্কৃতির সয়লাবে হাবুডুবু খাওয়া মুসলিম ব্যক্তিত্বের সাথে সম্পূর্ণ সাংঙ্ঘর্ষিক। নিম্নে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করা হলো:
✪ ১. হাসানোর জন্য বা মজার ছলেও মিথ্যা বলা নিষিদ্ধ:
ইসলামে কাউকে মিথ্যার ফাঁদে ফেলে হাসানো বা আনন্দ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন:
عَنْ بَهْزِ بْنِ حَكِيمٍ، قَالَ حَدَّثَنِي أَبِي، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ: “وَيْلٌ لِلَّذِي يُحَدِّثُ فَيَكْذِبُ لِيُضْحِكَ بِهِ الْقَوْمَ وَيْلٌ لَهُ وَيْلٌ لَهُ”
“যে ব্যক্তি মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা বলে, তার জন্য ধ্বংস অনিবার্য, তার জন্য ধ্বংস অনিবার্য, তার জন্য ধ্বংস অনিবার্য।” [সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৯০, সুনানে তিরমিজি: ২৩১৫। হাদিসটি হাসান (আলবানি)]
হাদিসে আরও এসেছে,
“وَيْلٌ لِلَّذِي يُحَدِّثُ فَيَكْذِبُ لِيُضْحِكَ بِهِ الْقَوْمَ وَيْلٌ لَهُ وَيْلٌ لَهُ”
“যে ব্যক্তি মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা বলে, তার জন্য ধ্বংস অনিবার্য, তার জন্য ধ্বংস অনিবার্য, তার জন্য ধ্বংস অনিবার্য।” [সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৯০, সুনানে তিরমিজি: ২৩১৫। হাদিসটি হাসান (আলবানি)]
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও ইরশাদ করেছেন:
..وَبِبَيْتٍ فِي وَسَطِ الْجَنَّةِ لِمَنْ تَرَكَ الْكَذِبَ وَإِنْ كَانَ مَازِحًا”
“আমি ওই ব্যক্তির জন্য জান্নাতের কেন্দ্রস্থলে একটি প্রাসাদের দায়িত্ব নিচ্ছি, যে ব্যক্তি রসিকতার ছলেও মিথ্যা বলে না।” [সুনানে আবু দাউদ: ৪৮০০। হাদিসটি হাসান-আলবানি]
✪ ২. মিথ্যা কথা বলা মুনাফেকের অন্যতম আলামত:
ইসলামে মিথ্যা কথা বলা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।মিথ্যা বলাকে মুনাফিকের অন্যতম আলামত বলা হয়েছে। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
“آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلَاثٌ: إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ”
“মুনাফিকের চিহ্ন তিনটি: যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে এবং যখন তার কাছে আমানত রাখা হয় সে তার খেয়ানত করে।” [সহিহ বুখারি: ৩৩, সহিহ মুসলিম: ৫৯]
“মুনাফিকের চিহ্ন তিনটি: কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং আমানত রাখা হলে তার খেয়ানত করে।” [সহিহ বুখারি: ৩৩, সহিহ মুসলিম: ৫৯]
✪ ৩. ধোঁকা ও প্রতারণা:
কাউকে ভয় দেখানো বা মিথ্যা সংবাদ দিয়ে বিভ্রান্ত করে মানসিকভাবে আতঙ্কিত করা ইসলামে জায়েজ নেই। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
لَا يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يُرَوِّعَ مُسْلِمًا
“কোনও মুসলিমের জন্য অন্য কোনও মুসলিমকে আতঙ্কিত করা বৈধ নয়।” [সুনানে আবু দাউদ: ৫০০৪। হাদিসটি সহিহ (আলবানি)]
সম্পর্কে তিনি আরও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন:
مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا
“যে ব্যক্তি আমাদের (মুসলমানদের) সাথে প্রতারণা করবে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” [সহিহ মুসলিম: ১০১]
✪ ৪. বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুকরণ ও ব্যক্তিত্ব হীনতা:
এপ্রিল ফুল মূলত একটি বিজাতীয় ও পশ্চিমা সংস্কৃতি। ইসলামে অমুসলিমদের ধর্মীয় বা আদর্শিক সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন:
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوة مِنْهُمْ
“যে ব্যক্তি অন্য কোনও জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে।” [সুনানে আবু দাউদ: ৪০৩১। হাদিসটি সহিহ (আলবানি)]
❑ শায়খ সালিহ বিন ফাওজান আল-ফাওজান (হাফিজাহুল্লাহ)-এর ফতোয়া:
সৌদি আরবের সিনিয়র উলামা পরিষদের সদস্য (বর্তমান সৌদি আরবের প্রধান মুফতি) আল্লামা প্রফেসর শায়খ সালিহ বিন ফাওজান আল ফাওজান (হাফিযাহুল্লাহ) কে এপ্রিল ফুল সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন:
هَذِهِ مُسْتَوْرَدَةٌ مِنْ جُمْلَةِ الْعَادَاتِ الْبَاطِلَةِ، وَلَيْسَتْ مِنْ أَعْمَالِ الْمُسْلِمِينَ، وَالْكَذِبُ لَا يَجُوزُ لَا فِي إِبْرِيلَ، وَلَا فِي غَيْرِهِ، فَالْكَذِبُ حَرَامٌ، الْكَذِبُ عَلَى اللهِ، الْكَذِبُ عَلَى رَسُولِهِ، الْكَذِبُ عَلَى النَّاسِ، حَرَامٌ كَبِيرَةٌ مِنْ كَبَائِرِ الذُّنُوبِ، اللهُ حَرَّمَ الْكَذِبَ وَنَهَى عَنْهُ، وَتَوَعَّدَ الْكَاذِبِينَ، فَلَا يَجُوزُ الْكَذِبُ فِي أَيِّ وَقْتٍ.
“এটি আমদানি করা বাতিল প্রথাগুলোর একটি অংশ এবং এটি মুসলমানদের কাজ নয়। মিথ্যা বলা কোনোভাবেই জায়েজ নয়—এপ্রিলে হোক বা অন্য কোনও সময়ে। মিথ্যা বলা হারাম। আল্লাহর ওপর মিথ্যা বলা, তাঁর রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর মিথ্যা বলা এবং মানুষের সাথে মিথ্যা বলা হারাম এবং এটি কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা মিথ্যাকে হারাম করেছেন, এ থেকে নিষেধ করেছেন এবং মিথ্যাবাদীদের কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সুতরাং কোনও সময়েই মিথ্যা বলা জায়েজ নয়।” [ফতোয়া নম্বর: ৭৩৪৩]
❑ শায়খ আব্দুল আজিজ ফারহান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন:
«الكَذِبُ أَسْوَدُ. لَيْسَ لَدَيْنَا شَيْءٌ اسْمُهُ الكِذْبَةُ البَيْضَاءُ وَالكِذْبَةُ السَّوْدَاءُ. الكَذِبُ كُلُّهُ قَبِيحٌ وَكُلُّهَا سَيِّئَةٌ. وَلَا يَجُوزُ لِلْإِنْسَانِ أَنْ يَلْجَأَ إِلَى مِثْلِ هَذِهِ الأُمُورِ. خُصُوصًا أَنَّهُ، وَللهِ الحَمْدُ، بِفَضْلِ اللهِ، تُسَمَّى هَذِهِ الكِذْبَةُ كِذْبَةً. هَذَا ذَنْبٌ، لَا سَمَحَ اللهُ، لِأَنَّهَا كَذِبٌ. الأَمْرُ الثَّانِي هُوَ أَنَّهُ تَمْثِيلٌ. لَيْسَ لِأَهْلِ الإِسْلَامِ شَيْءٌ يُسَمَّى كِذْبَةَ إِبْرِيلَ. إِنَّهَا تَمْثِيلٌ مَعَ الآخَرِينَ. يَجُوبُ أَنْ يَكُونَ لِلْمُسْلِمِ شَخْصِيَّةٌ مُسْتَقِلَّةٌ، خَاصَّةً فِي مَا يَتَعَلَّقُ بِدِينِهِ وَإِيمَانِهِ. لَا يَجُوزُ لَهُ أَنْ يَكُونَ إِمَّعَةً. فَالْوَاجِبُ عَلَى النَّاسِ أَنْ يَتَّقُوا اللهَ وَيَتَّقُوا اللهَ.»
“মিথ্যা সবসময়ই কালো। আমাদের কাছে ‘সাদা মিথ্যা’ বা ‘কালো মিথ্যা’ বলে কিছু নেই। সব মিথ্যাই কুৎসিত এবং মন্দ। মানুষের জন্য এ জাতীয় বিষয়ের আশ্রয় নেওয়া বৈধ নয়। বিশেষ করে, আল্লাহর শোকর যে মানুষ একে ‘মিথ্যা’ (এপ্রিল ফুল বা এপ্রিলের মিথ্যা) বলেই ডাকছে। এটি একটি গুনাহ, কারণ এটি শেষ পর্যন্ত মিথ্যাই। দ্বিতীয় বিষয় হলো, এটি অন্যদের অন্ধ অনুকরণ। ইসলাম অনুসারীদের জন্য ‘এপ্রিল ফুল’ বলতে কিছু নেই। এটি অন্যদের দেখাদেখি একটি অভিনয় (অনুকরণ) মাত্র। একজন মুসলিমের নিজস্ব স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব থাকা উচিত━বিশেষ করে তার দ্বীন ও ঈমানের ক্ষেত্রে। তার জন্য ব্যক্তিত্বহীন বা পরানুকরণকারী হওয়া জায়েজ নয়। মানুষের উচিত আল্লাহকে ভয় করা।”
মোটকথা, পশ্চিমা সংস্কৃতিতে গা ভাসিয়ে দেওয়া কোনও আত্মমর্যাদবান মুমিনের জন্য বৈধ নয়। এবং এপ্রিল ফুল উপলক্ষে “প্র্যাঙ্ক” করা, মানুষকে বোকা বানানো, মিথ্যা বলে হাসানো বা ফান করা থেকে বিরত থাকাই ঈমানের দাবি। আল্লাহ আমাদের সর্বদা সত্য বলার এবং অনর্থক কাজ থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
লিখনি: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়া অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
Share: