ন্যায়পরায়ণ শাসকের গুণাবলি

ন্যায়পরায়ণ ইমাম (শাসক): তাঁর গুণাবলি, দায়িত্ব ও মর্যাদা।
প্রশ্ন: ইসলামে ন্যায়পরায়ণ শাসকের গুণাবলি কী কী?
উত্তর: আল্লাহর প্রশংসা এবং তাঁর রসুলের প্রতি দরুদ ও সালামের পর ন্যায়পরায়ণ ইমাম হলেন সেই ব্যক্তি, যাকে মুসলিমরা নেতৃত্বের জন্য মনোনীত করেছে এবং তাঁর হাতে বাইয়াত দিয়েছে। তিনি আল্লাহর শরিয়ত অনুযায়ী উম্মতের যাবতীয় বিষয় পরিচালনা করেন। এটি ফিকহি বিশ্বকোষে উল্লিখিত হয়েছে।
শাইখ ইবনে উসাইমিন রাহ. রিয়াদুস সালিহিন-এর ব্যাখ্যায় বলেন:
الْإِمَامُ الْعَادِلُ: هُوَ الَّذِي عَدَلَ فِي رَعِيَّتِهِ، وَلَا عَدْلَ أَقْوَمُ وَلَا أَوْجَبُ مِنْ أَنْ يَحْكُمَ فِيهِمْ شَرِيعَةَ اللهِ، هَذَا رَأْسُ الْعَدْلِ؛ لِأَنَّ اللهَ يَقُولُ: {إِنَّ اللهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ} [النَّحْلِ: 90] فَمَنْ حَكَمَ شَعْبَهُ بِغَيْرِ شَرِيعَةِ اللهِ فَإِنَّهُ مَا عَدَلَ. اهـ.
“ন্যায়পরায়ণ ইমাম হলেন তিনি, যিনি তাঁর প্রজাসাধারণের মধ্যে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করেন। আর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও অপরিহার্য ন্যায় হলো তাদের মধ্যে আল্লাহর শরিয়ত প্রতিষ্ঠা করা — এটিই ন্যায়ের মূল ভিত্তি।” কারণ আল্লাহ বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার ও সদাচারের আদেশ দেন।” [সুরা নাহল: ৯০] সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর শরিয়ত ছাড়া জনগণকে শাসন করেন তিনি ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেননি।”
❑ হাসান বসরির ঐতিহাসিক পত্র:
ইবনে আবদি রব্বিহ আল আন্দালুসি তাঁর ‘আল আকদুল ফারিদ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রাহ.) খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর হাসান বসরি (রাহিমাহুল্লাহ)-কে চিঠি লিখে ন্যায়পরায়ণ ইমামের গুণাবলি জানতে চান।
জবাবে হাসান বসরি লিখেন:
“اِعْلَمْ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ، أَنَّ اللهَ جَعَلَ الْإِمَامَ الْعَادِلَ قِوَامَ كُلِّ مَائِلٍ، وَقَصْدَ كُلِّ جَائِرٍ، وَصَلَاحَ كُلِّ فَاسِدٍ، وَقُوَّةَ كُلِّ ضَعِيفٍ، وَنَصَفَةَ كُلِّ مَظْلُومٍ، وَمَفْزَعَ كُلِّ مَلْهُوفٍ.”
“হে আমিরুল মুমিনিন, জেনে রাখুন — আল্লাহ ন্যায়পরায়ণ ইমামকে করেছেন: প্রতিটি বিচ্যুতির সংশোধক, প্রতিটি জালিমের প্রতিরোধক, প্রতিটি বিপথগামীর সংস্কারক, প্রতিটি দুর্বলের শক্তি, প্রতিটি মজলুমের ন্যায়বিচারক এবং প্রতিটি বিপদগ্রস্তের আশ্রয়।
“وَالْإِمَامُ الْعَادِلُ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ كَالرَّاعِي الشَّفِيقِ عَلَى إِبِلِهِ الرَّفِيقِ بِهَا، الَّذِي يَرْتَادُ لَهَا أَطْيَبَ الْمَرْعَى، وَيَذُودُهَا عَنْ مَرَاتِعِ الْهَلَكَةِ، وَيَحْمِيهَا مِنَ السِّبَاعِ، وَيَكُنُّهَا مِنْ أَذَى الْحَرِّ وَالْقَرِّ.”
হে আমিরুল মুমিনিন! ন্যায়পরায়ণ শাসক তো তার উটের প্রতি দয়ালু ও কোমল মেষপালকের মতো, যে তার পালের জন্য সর্বোত্তম চারণভূমি খুঁজে বের করে, তাদেরকে ধ্বংসাত্মক চারণভূমি থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, হিংস্র পশুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করে এবং প্রচণ্ড গরম ও শীতের কষ্ট থেকে ছায়ায় বা আশ্রয়ে আগলে রাখে।”
“وَالْإِمَامُ الْعَادِلُ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ كَالْأَبِ الْحَانِي عَلَى وَلَدِهِ، يَسْعَى لَهُمْ صِغَارًا، وَيُعَلِّمُهُمْ كِبَارًا، يَكْتَسِبُ لَهُمْ فِي حَيَاتِهِ، وَيَدَّخِرُ لَهُمْ بَعْدَ مَمَاتِهِ.”
হে আমিরুল মুমিনিন!, ন্যায়পরায়ণ ইমাম সেই স্নেহময় পিতার মতো, যিনি ছোটবেলায় সন্তানের জন্য পরিশ্রম করেন, বড় হলে তাদের শিক্ষিত করেন, জীবদ্দশায় তাদের জন্য উপার্জন করেন এবং মৃত্যুর পরও তাদের জন্য সঞ্চয় রেখে যান।
“وَالْإِمَامُ الْعَادِلُ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ كَالْأُمِّ الشَّفِيقَةِ الْبَرَّةِ الرَّفِيقَةِ بِوَلَدِهَا، حَمَلَتْهُ كَرْهًا وَوَضَعَتْهُ كَرْهًا، وَرَبَّتْهُ طِفْلًا، تَسْهَرُ بِسَهَرِهِ، وَتَسْكُنُ بِسُكُونِهِ، تُرْضِعُهُ تَارَةً وَتَفْطِمُهُ أُخْرَى، وَتَفْرَحُ بِعَافِيَتِهِ وَتَغْتَمُّ بِشَكَايَتِهِ.”
হে আমিরুল মুমিনিন! ন্যায়পরায়ণ ইমাম সেই দয়ালু, সদয় ও কোমল মায়ের মতো — যিনি কষ্ট সহ্য করে সন্তান গর্ভে ধারণ করেন, কষ্ট করে প্রসব করেন, শিশুকালে লালন-পালন করেন। সন্তান জাগলে তিনি জাগেন, সন্তান ঘুমালে তিনি ঘুমান। কখনো দুধ পান করান, কখনো দুধ ছাড়ান। সন্তানের সুস্থতায় আনন্দিত হন, অসুস্থতায় উদ্বিগ্ন হন।
“وَالْإِمَامُ الْعَادِلُ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ وَصِيُّ الْيَتَامَى، وَخَازِنُ الْمَسَاكِينِ، يُرَبِّي صَغِيرَهُمْ، وَيَمُونُ كَبِيرَهُمْ.”
“হে আমিরুল মুমিনিন! ন্যায়পরায়ণ শাসক তো এতিমদের অভিভাবক এবং মিসকিনদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। তিনি ছোটদের লালন-পালন করেন এবং বড়দের জীবিকার ব্যবস্থা করেন।”
“وَالْإِمَامُ الْعَادِلُ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ كَالْقَلْبِ بَيْنَ الْجَوَارِحِ، تَصْلُحُ الْجَوَارِحُ بِصَلَاحِهِ، وَتَفْسُدُ بِفَسَادِهِ.”
হে আমিরুল মুমিনিন! ন্যায়পরায়ণ ইমাম শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে হৃদয়ের মতো — হৃদয় সুস্থ থাকলে সব অঙ্গ সুস্থ থাকে, হৃদয় নষ্ট হলে সব অঙ্গ নষ্ট হয়।
“وَالْإِمَامُ الْعَادِلُ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ هُوَ الْقَائِمُ بَيْنَ اللهِ وَبَيْنَ عِبَادِهِ، يَسْمَعُ كَلَامَ اللهِ وَيُسْمِعُهُمْ، وَيَنْظُرُ إِلَى اللهِ وَيُرِيهِمْ، وَيَنْقَادُ إِلَى اللهِ وَيَقُودُهُمْ.”
হে আমিরুল মুমিনিন! ন্যায়পরায়ণ ইমাম আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের মাঝে সেতুবন্ধন কারী — তিনি আল্লাহর কালাম শোনেন এবং জনগণকে শোনান, আল্লাহর দিকে দৃষ্টি রাখেন এবং জনগণকে পথ দেখান, আল্লাহর অনুগত হন এবং জনগণকে অনুগত করেন।
فَلَا تَكُنْ – يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ – فِيمَا مَلَّكَكَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ، كَعَبْدٍ ائْتَمَنَهُ سَيِّدُهُ، وَاسْتَحْفَظَهُ مَالَهُ وَعِيَالَهُ، فَبَدَّدَ الْمَالَ، وَشَرَّدَ الْعِيَالَ، فَأَفْقَرَ أَهْلَهُ، وَفَرَّقَ مَالَهُ.
হে আমিরুল মুমিনিন, আল্লাহ আপনাকে যে ক্ষমতা দিয়েছেন তাতে সেই অবিশ্বস্ত দাসের মতো হবেন না — যাকে মনিব তার সম্পদ ও পরিবারের তত্ত্বাবধায়ক বানিয়েছিলেন অথচ সে সম্পদ নষ্ট করল এবং পরিবারকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলল।
وَاعْلَمْ – يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ – أَنَّ اللهَ أَنْزَلَ الْحُدُودَ لِيَزْجُرَ بِهَا عَنِ الْخَبَائِثِ وَالْفَوَاحِشِ، فَكَيْفَ إِذَا أَتَاهَا مَنْ يَلِيهَا؟ وَأَنَّ اللهَ أَنْزَلَ الْقِصَاصَ حَيَاةً لِعِبَادِهِ، فَكَيْفَ إِذَا قَتَلَهُمْ مَنْ يَقْتَصُّ لَهُمْ.
হে আমিরুল মুমিনিন! জেনে রাখুন, আল্লাহ তাআলা মন্দ কাজ ও অশ্লীলতা থেকে বিরত রাখার জন্য দণ্ডবিধি (হুদুদ) অবতীর্ণ করেছেন। সুতরাং যার ওপর এই দণ্ডবিধি কার্যকর করার দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে, সে নিজেই যদি তাতে লিপ্ত হয় তবে অবস্থা কেমন হবে?
আল্লাহ তাআলা বান্দাদের জীবনের নিরাপত্তা হিসেবে কিসাস অবতীর্ণ করেছেন; সুতরাং যার কিসাস কার্যকর করে নিরাপত্তা দেওয়ার কথা সে-ই যদি তাদের হত্যা করে তবে অবস্থা কেমন হবে?” [আল আদাবুল শারইয়্যাহ, ইবনুল মুফলিহ: ১/১৮৪]
❑ ন্যায়পরায়ণ ইমামের মর্যাদা:
ন্যায়পরায়ণ ইমাম সেই সাত শ্রেণির মানুষের মধ্যে প্রথম, যাদেরকে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাঁর আরশের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন — যেদিন আরশের ছায়া ছাড়া আর কোনও ছায়া থাকবে না।
◆ হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি সহিহ বুখারির ভাষ্যগ্রন্থ ফাতহুল বারি-তে বলেন:
“أَحْسَنُ مَا فُسِّرَ بِهِ الْعَادِلُ أَنَّهُ الَّذِي يَتَّبِعُ أَمْرَ اللهِ بِوَضْعِ كُلِّ شَيْءٍ فِي مَوْضِعِهِ مِنْ غَيْرِ إِفْرَاطٍ وَلَا تَفْرِيطٍ.”
“ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির সবচেয়ে উত্তম ব্যাখ্যা এই যে, তিনি এমন এক ব্যক্তি যিনি প্রতিটি বিষয়কে তার সঠিক স্থানে রাখার মাধ্যমে আল্লাহর আদেশ অনুসরণ করেন, যেখানে কোনো অতিরঞ্জন নেই এবং কোনো শৈথিল্যও নেই।” [ফাতহুল বারি, ইবনে হাজার: ১৩/১১৩]
◆ যুরকানি শরহুল মুয়াত্তা-তে আরও যোগ করেন:
أَوِ الْجَامِعُ لِلْكَمَالَاتِ الثَّلَاثَةِ: الْحِكْمَةِ، وَالشَّجَاعَةِ، وَالْعِفَّةِ، الَّتِي هِيَ أَوْسَاطُ الْقُوَى الثَّلَاثَةِ: الْعَقْلِيَّةِ، وَالْغَضَبِيَّةِ، وَالشَّهْوَانِيَّةِ.
“অথবা (ন্যায়পরায়ণ শাসক হলেন তিনি) যিনি তিনটি গুণের অধিকারী: প্রজ্ঞা, বীরত্ব এবং পবিত্রতা; যা মূলত তিনটি শক্তির ভারসাম্যপূর্ণ রূপ: জ্ঞানশক্তি, ক্রোধশক্তি এবং কামশক্তি।” [মিরকাতুল মাফাতীহ, মোল্লা আলী কারী: ৭/২৪১০]
❑ ইমাম বা শাসকের দায়িত্বসমূহ:
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে শাসককে উম্মতের প্রতি যেসব দায়িত্ব পালন করতে হয়, ফিকহি বিশ্বকোষে সেগুলোকে সংক্ষেপে দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে:
✪ ক. কুরআন, সুন্নাহ এবং উম্মতের সালাফে সালেহিনের ইজমার ভিত্তিতে দ্বীনকে তার সুপ্রতিষ্ঠিত মূলনীতির ওপর হিফাজত করা এবং দ্বীনের নিদর্শনসমূহ (শাআইর) কায়েম করা। (যেমন: আজান দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা, নামাজ কায়েম করা ও জামাতের ব্যবস্থা করা, জুমার নামাজ ও ঈদের নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা করা, রমজানের রোজা, পালনের পরিবেশ তৈরি করা, হজ পালনের সুযোগ করে দেওয়া, জিহাদ পরিচালনা করা ইত্যাদি)।
✪ খ. মুসলিমদের সর্বপ্রকার স্বার্থ ও কল্যাণসমূহ দেখাশোনা করা। [আল মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ আল কুয়েতিয়্যাহ, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ২১৮]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
Share: