ধর্ষণ ও ব্যভিচারের বিধানের মধ্যে পার্থক্য এবং আধুনিক উপায়ে ধর্ষণ প্রমাণ

▪️প্রথমত: ধর্ষণ ও ব্যভিচারের বিধান: মূলগতভাবে ধর্ষণ এক প্রকার ব্যভিচার (জিনা)। তাই সাধারণ অবস্থায় এটি প্রমাণিত হওয়ার জন্য ব্যভিচার প্রমাণের পদ্ধতিই প্রযোজ্য অর্থাৎ চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী। ধর্ষণের অপরাধে অপরাধী ব্যক্তি অবিবাহিত হলে তার শাস্তি একশত বেত্রাঘাত এবং বিবাহিত হলে রজম বা পাথর ছুড়ে মৃত্যুদণ্ড। তবে ধর্ষণ যদি অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ভয়ভীতি দেখিয়ে কিংবা কোনো নারীকে জোরপূর্বক অপহরণ করে করা হয় তখন এই অপরাধটি ‘হিরাবাহ’ বা দস্যুতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে অপরাধ প্রমাণের জন্য মাত্র দুজন সাক্ষীই যথেষ্ট। এই অপরাধের শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন:
إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِنْ خِلَافٍ أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ
“যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং জমিনে ফাসাদ (সমাজে সন্ত্রাসী কার্যক্রম এবং বিশৃঙ্খলা) সৃষ্টি করে বেড়ায় তাদের শাস্তি কেবল এটাই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে কিংবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদেরকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। এটি তাদের জন্য দুনিয়ায় লাঞ্ছনা এবং আখিরাতে তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।” [সূরা মায়িদাহ: ৩৩]
এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, কোনো নারীকে জোরপূর্বক অপহরণ করার সঙ্গে সঙ্গেই পুরুষের ওপর ‘হিরাবাহ’ বা দস্যুতার এই শাস্তি কার্যকর হওয়া আবশ্যক হয়ে যায়, চাই সে ধর্ষণের উদ্দেশ্য সফল করতে পারুক বা না পারুক। কারণ জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমেই সে ‘সন্ত্রাসী বা পথচারীর নিরাপত্তা বিনষ্টকারী’ হিসেবে গণ্য হয়েছে। আর যদি সে অপহরণের পর ধর্ষণও করে, তবে তার অপরাধের মাত্রা তীব্রতর হবে; কেননা সে তখন দুটি বড় অপরাধ একত্রে করল—ব্যভিচার এবং দস্যুতা।
▪️দ্বিতীয়ত: অমুসলিমদের অপবাদের জবাব: ইসলামের বিরুদ্ধে অমুসলিমদের এই অভিযোগ যে, মুসলিম সমাজে কেবল পুরুষের কথাই চূড়ান্ত, নারী নিজেকে ধর্ষিতা প্রমাণ করতে পারে না এবং পুরুষ অপরাধ করে অনায়াসে পার পেয়ে যায়—তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য। শরিয়ত ও প্রচলিত আইন উভয়ের একটি মৌলিক নীতি হলো: “অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ।” কোনো পক্ষ দাবি করলেই—তিনি পুরুষ হোন বা নারী—তা উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া গ্রহণ করা যায় না। এ প্রসঙ্গে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন:
لَوْ يُعْطَى النَّاسُ بِدَعْوَاهُمْ لَادَّعَى نَاسٌ دِمَاءَ رِجَالٍ وَأَمْوَالَهُمْ وَلَكِنَّ الْيَمِينَ عَلَى الْمُدَّعَى عَلَيْهِ
“মানুষকে যদি কেবল তাদের দাবির ভিত্তিতেই সবকিছু দিয়ে দেওয়া হতো, তবে কিছু মানুষ অন্য মানুষের রক্ত ও সম্পদের ওপর দাবি বসিয়ে দিত। তবে নিয়ম হলো, যার বিরুদ্ধে দাবি করা হয়েছে তার ওপর কসম করা আবশ্যক।” [সহিহ বুখারি: ৪২৭৭, সহিহ মুসলিম: ১৭১১]
ইমাম নওয়াবি (রাহিমাহুল্লাহ) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন:
هَذَا الْحَدِيثُ قَاعِدَةٌ كَبِيرَةٌ مِنْ قَوَاعِدِ أَحْكَامِ الشَّرْعِ ؛ فَفِيهِ : أَنَّهُ لَا يُقْبَلُ قَوْلُ الْإِنْسَانِ فِيمَا يَدَّعِيهِ بِمُجَرَّدِ دَعْوَاهُ ، بَلْ يَحْتَاجُ إِلَى بَيِّنَةٍ أَوْ تَصْدِيقِ الْمُدَّعَى عَلَيْهِ
“এই হাদিসটি শরিয়তের বিচারব্যবস্থার একটি অন্যতম মূলনীতি। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কোনো মানুষের দাবি কেবল মুখের কথার ওপর ভিত্তি করে গ্রহণ করা যাবে না বরং এর জন্য অকাট্য প্রমাণ (বাইয়্যিনাহ) লাগবে অথবা অভিযুক্ত ব্যক্তির স্বীকারোক্তি লাগবে।” [শারহ মুসলিম: ১২/৩]
যদি প্রমাণ ছাড়া কেবল কোনো নারীর মৌখিক দাবিতেই ধর্ষণের রায় দেওয়া হতো তবে কারাগারগুলো মানুষের শত্রুদের দ্বারা পূর্ণ হয়ে যেত, যেখানে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করার কোনো সুযোগ থাকত না। সমাজ কোনো বিশৃঙ্খল জায়গা নয় যে কেবল নারীর বক্তব্যকেই পরম সত্য ধরে নেওয়া হবে। অন্যথায়, কোনো নারী তার প্রাক্তন প্রেমিকের ওপর প্রতিশোধ নিতে, কোনো ধনী বা বিখ্যাত ব্যক্তিকে ব্ল্যাকমেইল করতে কিংবা নিজের বাবা বা ভাইয়ের অভিভাবকত্ব ও শাসন থেকে মুক্ত হতেও এমন মিথ্যা অভিযোগ তুলতে পারত, যা পুরো সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিত।
▪️তৃতীয়ত: নারীর জোরপূর্বক আক্রান্ত হওয়ার প্রমাণ: অকাট্য প্রমাণ বা জোরালো কোনো পারিপার্শ্বিক আলামত ছাড়া কেবল নারীর এই দাবি মেনে নেওয়া যায় না যে, তাকে বাধ্য করা হয়েছে। উপযুক্ত প্রমাণ না থাকলে তার ওপরও ব্যভিচারের শাস্তি প্রযোজ্য হতে পারে। ইমাম ইবনে আবদিল বার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:
وَلَا عُقُوبَةَ عَلَيْهَا إِذَا صَحَّ أَنَّهُ اسْتُكْرَهَهَا وَغَلَبَهَا عَلَى نَفْسِهَا ، وَذَلِكَ يُعْلَمُ بِصُرَاخِهَا ، وَاسْتِغَاثَتِهَا، وَصِيَاحِهَا
“নারীর ওপর কোনো শাস্তি থাকবে না যদি এটি সত্য প্রমাণিত হয় যে তাকে বাধ্য করা হয়েছে এবং তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর খাটানো হয়েছে। আর এটি প্রকাশ পায় সাধারণত নারীর চিৎকার, আর্তনাদ এবং সাহায্য প্রার্থনার মাধ্যমে।” [আল ইস্তিযকার: ৭/১৪৬]
▪️চতুর্থত: আধুনিক প্রযুক্তির ভূমিকা ও ডিএনএ (DNA) টেস্টের কার্যকারিতা: নারীর শরীরে পুরুষের বীর্যের উপস্থিতি সরাসরি ধর্ষণের প্রমাণ বহন করে না। কারণ এমনটি নারীর সম্মতিতে পারস্পরিক ব্যভিচারের ফলেও হতে পারে—যে ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ উভয়ই সমান শাস্তির যোগ্য। আবার এমনও হতে পারে যে, কোনো বিরোধের জেরে পুরুষকে শাস্তি দেওয়া বা ব্ল্যাকমেইল করার জন্য নারী এই অভিযোগ তুলেছে। এমনকি এটি সরাসরি জিনা বা মিলনের প্রমাণও নাও হতে পারে; কারণ প্রকৃত মিলন ছাড়াই বীর্য নারীর জরায়ুতে প্রবেশ করানো বা করা সম্ভব। যেখানে এত রকমের সংশয় ও সম্ভাবনা থাকে, সেখানে শরিয়ত নিশ্চিত প্রমাণ ছাড়া হদ (নির্ধারিত শাস্তি) কায়েম করে না। তদুপরি, ডিএনএ টেস্টের ফলাফলে ভুল হওয়া, ল্যাবরেটরিতে নমুনা অদলবদল হওয়া বা জালিয়াতির সুযোগ থাকে। তাই একে শরিয়তের প্রধান ‘বাইয়্যিনাহ’ বা অকাট্য প্রমাণ হিসেবে গণ্য করে সরাসরি হদ বা রজম কার্যকর করা যায় না। ইসলামি ফিকহ একাডেমি (রাবেতাতুল আলাম আল ইসলামি)-এর সভায় ডিএনএ-এর ব্যবহারের পরিধি নিয়ে প্রদত্ত সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে:
أَوَّلًا : لَا مَانِعَ شَرْعًا مِنَ الِاعْتِمَادِ عَلَى الْبَصْمَةِ الْوِرَاثِيَّةِ فِي التَّحْقِيقِ الْجِنَائِيِّ ، وَاعْتِبَارِهَا وَسِيلَةَ إِثْبَاتٍ فِي الْجَرَائِمِ الَّتِي لَيْسَ فِيهَا حَدٌّ شَرْعِيٌّ وَلَا قِصَاصٌ ؛ لِخَبَرِ : ( ادْرَؤُوا الحُدُودَ بالشُّبُهاتِ ) وَذَلِكَ يُحَقِّقُ الْعَدَالَةَ وَالأَمْنِ لِلْمُجْتَمَعِ ، وَيُؤَدِّي إِلَى نَيْلِ الْمُجْرِمِ عِقَابَهُ وَتَبْرِئَةِ الْمُتَّهَمِ ، وَهَذَا مَقْصِدٌ مُهِمٌّ مِنْ مَقَاصِدِ الشَّرِيعَةِ
অপরাধবিজ্ঞানের তদন্তে ডিএনএর ওপর নির্ভর করায় শরিয়তের কোনো বাধা নেই। যেসব অপরাধে শরিয়ত নির্ধারিত হদ বা কিসাস নেই, সেগুলোতে একে প্রমাণের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা যাবে। কারণ হাদিসে এসেছে: ‘তোমরা সংশয়ের মাধ্যমে হদ বা নির্ধারিত শাস্তিগুলো মওকুফ করো।’ এর ফলে সমাজে ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, প্রকৃত অপরাধী শাস্তি পায় এবং নির্দোষ ব্যক্তি মুক্তি পায় — যা শরিয়তের অন্যতম প্রধান একটি উদ্দেশ্য।” এই সিদ্ধান্ত থেকে স্পষ্ট যে, শরিয়ত নির্ধারিত অকাট্য প্রমাণের অভাবে যদি অভিযুক্তের ওপর প্রধান হদ বা নির্ধারিত শাস্তি প্রয়োগ করা সম্ভব নাও হয় তবুও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত জোরালো পারিপার্শ্বিক আলামতের (Circumstantial Evidence) ভিত্তিতে বিচারক তার বিবেচনা অনুযায়ী অপরাধীকে ‘তাযির’ বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দিতে পারেন।
অতএব, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে অপরাধীকে শনাক্ত করে অবশ্যই বিচারের আওতায় আনা সম্ভব এবং সে শাস্তি থেকে পার পাবে না। আর কোনো অপরাধী যদি দুনিয়ার আইনের ফাঁকফোকর গলে বা প্রমাণের অভাবে পার পেয়েও যায়, তবে তা শরিয়তের কোনো ত্রুটি নয়; বরং তা মানুষের সীমাবদ্ধতা বা প্রমাণের অভাবের কারণে ঘটে থাকে।
পরিশেষে, দুনিয়ার শাস্তি থেকে বাঁচলেও আখিরাতের কঠিন শাস্তি তার জন্য অপেক্ষা করছে, যদি না সে খাঁটি তাওবা করে কিংবা মজলুম নারী তাকে ক্ষমা করে দেয়। আল্লাহু আলাম (আল্লাহই সবচেয়ে বেশি জানেন)।

[উৎস: Islamqa info]

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬

অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

Share: