চোখে পানি আসা কি দোয়া কবুলের আলামত? আমরা কীভাবে বুঝব যে, দোয়া কবুল হয়েছে? আল্লাহর ভয়ে কান্না করার ফজিলত কী?
প্রশ্ন: নিচের এ লেখাটি কি সঠিক?
“দোয়ার সময় চোখে পানি আসাটা দোয়া কবুল হওয়ার আলামত। যদি দোয়া করার সময় কান্না আসে তাহলে বুঝে নিও দোয়া কবুল হয়ে গেছে! কারণ দোকান থেকে কিছু কিনলে যেমন রসিদ দেওয়া হয় ক্রেতাকে। এই চোখের পানিও হচ্ছে দোয়া কবুলের রসিদ!”
— মালফুজাতে ফুলপুরী (রাহ.)।
আমরা কীভাবে বুঝব যে, দোয়া কবুল হয়েছে? আল্লাহর ভয়ে কান্না করার ফজিলত কী?
উত্তর: “দোয়ার সময় চোখে পানি আসাটা দোয়া কবুলের আলামত অথবা দোয়া করার সময় চোখে পানি আসলে বুঝে নিও যে, দোয়া কবুল হয়ে গেছে….”—এই ধরনের বক্তব্য সরাসরি সঠিক নয়। কেননা আমার জানামতে, কুরআন-সুন্নাহ কিংবা সালাফদের থেকে এমন কথা প্রমাণিত নয় যে, চোখের পানি আসা মানেই নিশ্চিতভাবে দোয়া কবুল হয়ে যাওয়া যদিও কিছু আলেম এমন কথা বলেছেন। হয়ত তারা তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে এমনটি বলেছেন। কিন্তু দোয়া কবুল হওয়ার বিষয়টি যেহেতু গায়েবি বা অদৃশ্য বিষয় তাই সবার ক্ষেত্রে তা আবশ্যক নয়। অর্থাৎ দোয়া করার সময় চোখে পানি আসলেই নিশ্চিত হওয়া যাবে না যে, দোয়া কবুল হয়ে গেছে!!
তবে হ্যাঁ, এ কথা সঠিক যে, কেউ যদি দোয়া করার সময় আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে, কবরের ভয়াবহ নিঃসঙ্গতা ও হাশরের ময়দানের বিভীষিকাময় পরিস্থিতি, জাহান্নামের কঠিন শাস্তি ইত্যাদির কথা স্মরণ করে এবং নিজের অন্যায় কৃতকর্ম ও পাপাচারের অপরাধ বোধ থেকে ক্রন্দন করে তাহলে নিঃসন্দেহে তাতে দোয়া কবুলের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা এটি তার অন্তরের একনিষ্ঠতা, একাগ্রতা, আল্লাহভীতি, জাহান্নামের শাস্তির ভয় এবং অসহায়ত্বের প্রমাণ বহন করে। দোয়া কবুলের জন্য এই বিষয়গুলো অত্যন্ত কার্যকর।
❑ দোয়া কবুলের বাহ্যিক কিছু আলামত:
আমরা নিচের বিষয়গুলো দেখে ধারণা করতে পারি যে, হয়ত মহান আল্লাহ দোয়া কবুল করেছেন।
✪ ১. দোয়া করার বান্দা যখন দুনিয়াতেই তার প্রত্যাশিত জিনিসটি লাভ করে বা তার মনের আশা পূরণ হয়ে যায়।
✪ ২. অনেক সময় মানুষ হয়তো দোয়ার আশানুরূপ বাহ্যিক ফল দেখে না। কিন্তু যখন তার জীবনের বড় কোনও বিপদ-মসিবত, কষ্ট বা অনিষ্ট দূর হয়ে যায় তখন মনে করতে হবে, হয়ত এটাই ছিল তার সেই দোয়ার ফলাফল। অর্থাৎ অনেক সময় বান্দা চায় একটা কিন্তু মহান আল্লাহর তাঁর হেকমত অনুযায়ী অন্য দিকে তার থেকে উত্তম ফলাফল দান করে থাকেন। তবে যদি দুনিয়ায় দোয়ার কোনও প্রতিফল পরিলক্ষিত না হয় তাহলে নিশ্চিত থাকতে হবে যে, মহান আল্লাহর এগুলোর চেয়ে আরও দামি ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদান তার জন্য আখিরাতে জমা রেখেছেন যা তিনি সেদিন তাকে দান করবেন। এতে সে আরও বেশি খুশি হবে। তবে শর্ত হল, দোয়া কবুলের শর্তাবলী ঠিক রেখে দোয়া করতে হবে এবং এমন দোয়া করা যাবে না যাতে আল্লাহর নাফরমানি বা আত্মীয়তা সম্পর্কচ্ছেদের মত বিষয় আছে। যেমন: হাদিসে এসেছে,
আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَدْعُو بِدَعْوَةٍ لَيْسَ فِيهَا إِثْمٌ وَلَا قَطِيعَةُ رَحِمٍ إِلَّا أَعْطَاهُ اللَّهُ بِهَا إِحْدَى ثَلَاثٍ: إِمَّا أَنْ تُعَجَّلَ لَهُ دَعْوَتُهُ، وَإِمَّا أَنْ يَدَّخِرَهَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ، وَإِمَّا أَنْ يَصْرِفَ عَنْهُ مِنَ السُّوءِ مِثْلَهَا
“যে মুসলিম গুনাহ বা আত্মীয়তা ছিন্নের বিষয় নয় এমন কোনও দোয়া করে আল্লাহ তাকে তিনটি জিনিসের একটি দান করেন— হয় দুনিয়াতেই তার দোয়া তাড়াতাড়ি কবুল করে দেন (অর্থাৎ সে তার প্রত্যাশিত বিষয়টি লাভ করে), অথবা তা আখিরাতের জন্য সঞ্চিত রাখেন, অথবা তার সমপরিমাণ কোনও অনিষ্ট তার থেকে দূর করে দেন।” [মুসনাদ আহমদ, হাদিস নং ১১১৩৩; আদাবুল মুফরাদ, হাদিস নং ৭১০, সহিহ তারগিব, হাদিস নং ১৬৩৩]
✪ ৩. দোয়ার পর যদি বান্দার অন্তর আরও বেশি আল্লাহর দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে, ইবাদত-বন্দেগির প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পায়, পাপের প্রতি ঘৃণাবোধ তৈরি হয়, পাপ-পঙ্কিলতা ছেড়ে দ্বীন ও আখিরাতমূখী হয় তাহলে এটি দোয়া কবুলের অন্যতম বড় নিদর্শন।
✪ ৪. দোয়া শেষে অন্তরে অভূতপূর্ব স্বস্তি ও প্রশান্তি অনুভূত হওয়া। এটি দোয়া কবুলের সুনিশ্চিত প্রমাণ না হলেও দোয়ার সুপ্রভাব।
✪ ৫. দোয়া করার পর যদি অন্তরে মহান আল্লাহর প্রতি আরও বেশি ইমানি দৃঢ়তা, গভীর আস্থা ও সুধারণা তৈরি হয় এবং বারবার দোয়া করার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তাহলে বুঝতে হবে, এটা আল্লাহর বিশেষ তাওফিক যেটা হয়ত দোয়ার প্রতিদান।
এই লক্ষণগুলোর কোনটিই দলিলে কাতঈ বা সুনিশ্চিত প্রমাণ নয় — এগুলো নিছক বুশরা বা সুসংবাদ, যা বান্দাকে আশাবাদী রাখার জন্য যথেষ্ট। বাহ্যিক ফল না দেখে কেউ যেন মনে না করে যে, তার দোয়া প্রত্যাখ্যাত হয়ে গেছে। কেননা প্রকৃত ফলাফল আল্লাহর ইলমেই সংরক্ষিত।
❑ যে অশ্রু কখনো বিফলে যায় না:
বান্দা যখন অবুঝ শিশুর মত মহান রবের সামনে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে, যখন আকুতি ভরা হৃদয়ে তার দুচোখ বেয়ে কান্নার লোনাজল ঝরে পড়ে তখন তিনি বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান এবং তাকে বিশাল পুরস্কারে ভূষিত করেন। যেমন: হাদিসে এসেছে,
◈ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
لَا يَلِجُ النَّارَ رَجُلٌ بَكَى مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ حَتَّى يَعُودَ اللَّبَنُ فِي الضَّرْعِ
“আল্লাহর ভয়ে কান্নাকারী ব্যক্তি জাহান্নামে প্রবেশ করবে না, যে পর্যন্ত না দুধ আবার ওলানে ফিরে যায়।” [সহিহ সুনানে নাসাঈ, হাদিস: ৩১০৮, সহিহ]
◈ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেছেন:
عَيْنَانِ لَا تَمَسُّهُمَا النَّارُ: عَيْنٌ بَكَتْ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ، وَعَيْنٌ بَاتَتْ تَحْرُسُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
“দুই চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না—এক চোখ, যা আল্লাহর ভয়ে কেঁদেছে এবং এক চোখ, যা আল্লাহর পথে (জিহাদের ময়দানে) প্রহরায় রাত জেগে কাটিয়েছে।” [সুনানে তিরমিজি, অধ্যায়: ২০/ জিহাদের ফজিলত, পরিচ্ছেদ: ১২. আল্লাহর রাস্তায় (জিহাদের ময়দানে) প্রহরার সওয়াব-সহিহ]
◈ এছাড়াও হাদিসে এসেছে:
لَيْسَ شَيْءٌ أَحَبَّ إِلَى اللَّهِ مِنْ قَطْرَتَيْنِ وَأَثَرَيْنِ: قَطْرَةِ دُمُوعٍ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ، وَقَطْرَةِ دَمٍ تُهْرَاقُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
“আল্লাহর নিকট দুটি ফোঁটা ও দুটি চিহ্নের চেয়ে অধিক প্রিয় আর কিছু নেই। আল্লাহর ভয়ে নির্গত অশ্রুফোঁটা এবং আল্লাহর পথে প্রবাহিত রক্তফোঁটা।” [সহিহ তিরমিজি, হাদিস: ১৬৬৯]
এ বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহয় আরও কিছু বক্তব্য এসেছে।
মহান আল্লাহর নিকট দোয়া করি, তিনি যেন আমাদেরকে তার অনুগত বান্দা বানিয়ে দেন, আমাদের দোয়াগুলো কবুল করেন, আমাদেরকে ক্ষমা করেন এবং আমাদের উপর সন্তুষ্ট হোন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।