কালো জাদুর প্রভাবে মানসিক ভারসাম্যহীনতা ঘটলে বা সব কিছু ভুলে গেলে সে ব্যাপারে ইসলামের বিধান

কালো জাদুর প্রভাবে মানসিক ভারসাম্যহীনতা ঘটলে বা সব কিছু ভুলে গেলে সে ব্যাপারে ইসলামের বিধান এবং ভুৃলে যাওয়ার চিকিৎসা ও কিছু পরামর্শ:
প্রশ্ন: কোনও মানুষের ওপর যদি কালো জাদু করা হয়ে থাকে এবং সেই মানুষের স্মৃতিশক্তি লোপ পায় তাহলে তার সালাত-রোজার বিধান কী? আর তার যেন আগের সবকিছু মনে পড়ে, সেজন্য কি তার কোনও আমল রয়েছে? এমন অবস্থায় সে মারা গেলে তার পরিণতি কী হবে?
উত্তর: আল্লাহর নিকট তার সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। অতঃপর— কালো জাদু দ্বারা আক্রান্ত হয়ে যদি কেউ মানসিক ভারসাম্যহীন বা উন্মাদ হয়ে যায় তাহলে ইসলামের দৃষ্টিতে তার ওপর সালাত, সিয়াম ইত্যাদি ইসলামি বিধিবিধান প্রযোজ্য হবে না, যতদিন না সে সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। কারণ পাগল বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির ব্যাপারে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةٍ: عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ، وَعَنِ الصَّبِيِّ حَتَّى يَحْتَلِمَ، وَعَنِ الْمَجْنُونِ حَتَّى يَعْقِلَ
“তিন শ্রেণির মানুষের ওপর থেকে কলম তুলে নেওয়া হয়েছে: ঘুমন্ত ব্যক্তি, যতক্ষণ না সে জাগ্রত হয়; শিশু, যতক্ষণ না সে প্রাপ্তবয়স্ক হয়; এবং পাগল, যতক্ষণ না সে সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন হয়।” [সহিহ আবু দাউদ, হাদিস নং: ৪৩৯৯]
তবে যদি মানসিক দিক থেকে সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকে কিন্তু পেছনের কথাবার্তা ভুলে যাওয়ার কারণে সালাত বা সিয়াম আদায় করেছে কি না তা স্মরণ করতে না পারে তাহলে ইনশাআল্লাহ এতে গুনাহ হবে না—কারণ সে মা’যুর (ওজর গ্রস্ত)। তবে যখনই স্মরণ হবে তখনই তা কাজা আদায় করে নেবে। কিন্তু তার নিকটে যারা থাকে তাদের কর্তব্য তাকে সালাত/সিয়ামের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া।
এই সমস্যার সমাধানে দ্রুত শরিয়তসম্মত রুকইয়ার পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
🔹সবকিছু ভুলে যাওয়ার প্রবণতা ও এর চিকিৎসা:
সবকিছু ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বা অতিরিক্ত মাত্রায় স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় অ্যামনেসিয়া (Amnesia) বা সাধারণ ভাষায় স্মৃতিভ্রংশ বলা হয়। তবে এটি নিজে কোনও একক রোগ নয়, বরং অন্য কোনও শারীরিক বা মানসিক সমস্যার একটি বড় লক্ষণ।
বয়সের কারণে কিছুটা ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু কেউ যদি সবকিছু বা দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পূর্ণ ভুলে যেতে শুরু করে, তবে সেটিকে গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত।
🔹 এটি কি রোগ?
চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত ভুলে যাওয়া মূলত একটি বড় উপসর্গ বা লক্ষণ। এর পেছনে বিভিন্ন কারণ বা রোগ দায়ী থাকতে পারে:
– সাধারণত বয়স্কদের ক্ষেত্রে (৬০ বছরের ঊর্ধ্বে) মস্তিষ্কের কোষ ক্ষয়ের কারণে এটি বেশি দেখা যায়। আলঝেইমার্স হলো ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে সাধারণ রূপ।
– অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ, অবসাদ বা পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব সাময়িকভাবে মানুষের মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তিকে মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়।
– মাথায় বড় কোনও আঘাত লাগলে বা স্ট্রোকের কারণে মস্তিষ্কে রক্তসঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হলে মানুষ স্মৃতিশক্তি হারাতে পারে।
– শরীরে ভিটামিন বি-১২ (Vitamin B12)-এর ঘাটতি হলে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার সমস্যা তৈরি হয়।
– থাইরয়েড গ্রন্থি ঠিকমতো কাজ না করলে (হাইপোথাইরয়েডিজম) অলসতা ও ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে।
🔹 এর চিকিৎসা ও করণীয় কী?
ভুলে যাওয়ার সঠিক চিকিৎসা নির্ভর করে এর পেছনের মূল কারণের ওপর। তাই এ ধরনের সমস্যায় অবহেলা না করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
১. সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো একজন নিউরোলজিস্ট (Neurologist) বা সাইকিয়াট্রিস্ট (Psychiatrist) দেখানো। চিকিৎসক কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা (যেমন রক্ত পরীক্ষা, এমআরআই বা সিটি স্ক্যান) এবং কিছু মানসিক দক্ষতার পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হবেন সমস্যাটি কেন হচ্ছে। কারণ অনুযায়ী তারা ওষুধ বা থেরাপি নির্ধারণ করবেন।
২. পর্যাপ্ত ঘুম—মস্তিষ্ককে সতেজ রাখতে ও স্মৃতি ধরে রাখতে দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম অত্যন্ত জরুরি। পুষ্টিকর খাবার—খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফলমূল, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার (যেমন সামুদ্রিক মাছ বা বাদাম) ও ভিটামিন যুক্ত খাবার রাখা প্রয়োজন। শারীরিক ব্যায়াম—নিয়মিত হাঁটাহাঁটি বা হালকা ব্যায়াম মস্তিষ্কে রক্তসঞ্চালন বাড়ায়, যা স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে।
৩. মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করা যেতে পারে। যেমন নিয়মিত বই পড়া, ধাঁধা বা সুডোকু মেলানো, ডায়েরি লেখার অভ্যাস করা এবং নতুন কোনও দক্ষতা শেখার চেষ্টা করা।
৪. জরুরি কাজ, নাম বা অ্যাপয়েন্টমেন্ট মনে রাখার জন্য নোটবুক, মোবাইল রিমাইন্ডার বা ক্যালেন্ডার ব্যবহার করা যেতে পারে।
সবকিছু ভুলে যাওয়ার এই সমস্যা যদি হঠাৎ শুরু হয় কিংবা সময়ের সাথে সাথে বাড়তে থাকে তবে ঘরোয়া উপায়ের ওপর নির্ভর না করে যত দ্রুত সম্ভব একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
🔹আখিরাতে জাদুগ্রস্থ ব্যক্তির পরিণতি:
কোনও জাদুগ্রস্থ ব্যক্তি যদি মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় মৃত্যু বরণ করে অথবা ভুলে যাওয়ার কারণে তার নামাজ-রোজা ইত্যাদি কোনও ফরজ ইবাদত ছুটে যায় এবং এ অবস্থায় মৃত্যু বরণ করে তাহলে আশা করা যায়, মহান আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন। কারণ আল্লাহ মানুষের ওপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত কোনও ভার চাপিয়ে দেন না। কুরআন ও হাদিসে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা সূরা বাকারায় বলেন,
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
“আল্লাহ কোনও আত্মাকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না।” [সূরা বাকারা: ২৮৬]
সূরা আরাফেও একই মর্মে বলা হয়েছে,
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَا نُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا أُولَٰئِكَ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ ۖ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
“আর যারা ইমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে—আমরা কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিই না—তারাই জান্নাতের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে।” [সূরা আরাফ: ৪২]
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ الدِّينَ يُسْرٌ
“নিশ্চয়ই দ্বীন অত্যন্ত সহজ।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯]
আবু হুরায়রা (রা.)-এর বর্ণনায় আরও এসেছে, সূরা বাকারার ২৮৬ নম্বর আয়াত নাজিলের পর মুমিনগণ যখন দোয়া হিসেবে তা পাঠ করেন তখন আল্লাহ তায়ালা জবাবে বলেন,
نَعَمْ
“হ্যাঁ (আমি তোমাদের দোয়া কবুল করলাম এবং সাধ্যের অতিরিক্ত কোনও দায়িত্ব তোমাদের ওপর চাপালাম না)।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২৫]
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
Share: