ইসলামের ইতিহাসে আজানের সূচনা কীভাবে হল

আজান (أَذَان) একটি আরবি শব্দ, যার শাব্দিক অর্থ হলো ঘোষণা করা, জানিয়ে দেওয়া বা আহ্বান করা। ইসলামি ইবাদত ও সংস্কৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হলো আজান। মদিনায় হিজরতের পর যখন মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে শুরু করল তখন নামাজের সময় হলে মানুষকে একত্রিত করার কোনও নির্দিষ্ট পদ্ধতি ছিল না। সাহাবিগণ প্রায়ই অনুমানের ভিত্তিতে মসজিদে একত্রিত হতেন। এক পর্যায়ে আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ নিয়ে সাহাবিগণের সাথে পরামর্শে বসলেন যে, কীভাবে মানুষকে নামাজের জন্য ডাকা যায়। পরামর্শ সভায় কেউ কেউ প্রস্তাব করলেন, খ্রিস্টানদের মতো ‘নাকুস’ (ঘণ্টা) বাজাতে, আবার কেউ বললেন ইহুদিদের মতো ‘বুক’ বা শিঙা ফুঁকতে। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই প্রস্তাবগুলো অপছন্দ করলেন। কারণ এগুলো অন্যান্য ধর্মের ঐতিহ্যের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল।
❑ আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা.)-এর স্বপ্ন:
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন এ নিয়ে চিন্তিত, ঠিক সেই সময়ে আনসারি সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ ইবনে আবদ রাব্বিহি (রা.) একটি স্বপ্ন দেখেন। তিনি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এসে বললেন:
“হে আল্লাহর রসুল! আমি স্বপ্নে দেখলাম, এক ব্যক্তি সবুজ রঙের দুটি কাপড় পরে একটি ঘণ্টা হাতে নিয়ে যাচ্ছে।
আমি তাকে বললাম: হে আল্লাহর বান্দা! তুমি কি এই ঘণ্টাটি বিক্রি করবে?
সে বলল: তুমি এটি দিয়ে কী করবে?
আমি বললাম: আমরা এর মাধ্যমে নামাজের জন্য মানুষকে ডাকব।
তখন সে ব্যক্তি বলল: আমি কি তোমাকে এর চেয়ে উত্তম কোনও পদ্ধতির কথা বলব না?
আমি বললাম: অবশ্যই।
তখন সে আমাকে আজানের শব্দগুলো শিখিয়ে দিল।
অতপর তিনি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে আজানের শব্দগুলো পাঠ করলেন। সেগুলো হল:
اللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ
(আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার)
“আল্লাহ সবচেয়ে মহান, আল্লাহ সবচেয়ে মহান।”
اللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ
(আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার)
“আল্লাহ সবচেয়ে মহান, আল্লাহ সবচেয়ে মহান।”
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ
(আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ)
“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।”
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ
(আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ)
“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।”
أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ
(আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ)
“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল।”
أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ
(আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ)
“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল।”
حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ
(হায়্যা আলাছ ছলাহ)
“নামাজের জন্য এসো।”
حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ
(হায়্যা আলাছ ছলাহ)
“নামাজের জন্য এসো।”
حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ
(হায়্যা আলাল ফালাহ)
“সাফল্যের জন্য এসো।”
حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ
(হায়্যা আলাল ফালাহ)
“সাফল্যের জন্য এসো।”
اللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ
(আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার)
“আল্লাহ সবচেয়ে মহান, আল্লাহ সবচেয়ে মহান।”
لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ
(লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ)
“আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।” [সহীহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৩৭৯]
✪ ফজরের আজানে অতিরিক্ত বাক্য: ‘আস-সালাতু খাইরুম মিনান নাউম’ (ঘুম থেকে সালাত উত্তম):
عن أَبِي مَحْذُورَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: كُنْتُ أُؤَذِّنُ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَكُنْتُ أَقُولُ فِي أَذَانِ الْفَجْرِ الْأَوَّلِ: حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ، الصَّلَاةُ خَيْرٌ مِنَ النَّوْمِ، الصَّلَاةُ خَيْرٌ مِنَ النَّوْمِ، اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ.
“আবু মাহজুরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জন্য আজান দিতাম। আমি ফজরের প্রথম আজানে (অর্থাৎ ফজরের ওয়াক্তের আজানে) বলতাম: ‘হাইয়্যা আলাল ফালাহ’ এর পর ‘আস-সালাতু খাইরুম মিনান নাউম, আস-সালাতু খাইরুম মিনান নাউম (ঘুম থেকে সালাত উত্তম), আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’।” [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নম্বর: ৫০০; সুনানে নাসায়ি, হাদিস নম্বর: ৬৪৭-সহিহ]
▪️একামতের শব্দাবলী:
অন্য বর্ণনায় এসেছে, অতপর তিনি তারপর তিনি অল্প একটু পিছিয়ে দাঁড়ালেন। অতপর বললেন, যখন ইকামত হবে তখন বলবে:
اللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ
(আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার)
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ
(আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ)
أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ
(আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ)
حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ
(হাইয়্যা আলাস সলাহ)
حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ
(হাইয়্যা আলাল ফালাহ)
قَدْ قَامَتِ الصَّلَاةُ، قَدْ قَامَتِ الصَّلَاةُ
(ক্বাদ ক্বামাতিস সলাহ, ক্বাদ ক্বামাতিস সালাহ-)
اللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ
(আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার)
لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ
(লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নম্বর: ৪৯৯-সহিহ]
❑ প্রথম আজান:
এরপর রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা.)-কে নির্দেশ দিলেন যেন তিনি এই শব্দগুলো বেলাল (রা.)-কে শিখিয়ে দেন। তিনি বললেন:
فَقُمْ مَعَ بِلَالٍ فَأَلْقِ عَلَيْهِ مَا رَأَيْتَ، فَلْيُؤَذِّنْ بِهِ، فَإِنَّهُ أَنْدَى صَوْتًا مِنْكَ
“তুমি বেলালের সাথে দাঁড়াও এবং যা দেখেছ তা তাকে বলে দাও, সে যেন এই শব্দগুলো দিয়ে আজান দেয়। কারণ তার কণ্ঠস্বর তোমার চেয়ে অনেক বেশি উচ্চ ও সুমধুর।”
বেলাল (রা.) যখন উচ্চস্বরে এই আজান দিতে শুরু করলেন তখন ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) নিজ ঘর থেকে দ্রুত বের হয়ে আসলেন। তিনি চাদর টেনে টেনে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এসে বললেন:
وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ لَقَدْ رَأَيْتُ مِثْلَ مَا رَأَى
“সেই সত্তার শপথ যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন! আমি নিজেও স্বপ্নে অবিকল এমনটিই দেখেছি।” [আবু দাউদ, ৪৯০ সুনানে ইবনে মাজাহ, ৭০৬-সহিহ]
এভাবেই হিজরতের প্রথম বা দ্বিতীয় বছরে ইসলামের ইতিহাসে আজানের মহান এই পদ্ধতির সূচনা হয়। [ইসলামকিউএ, ফাতাওয়া নং-৯৪৭৬]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
Share: