অজ্ঞতাবশত বা ভুলক্রমে নাপাক পোশাকে নামাজ আদায়ের বিধান
শাইখ আব্দুল আজিয বিন বায (রহ.) ও শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল উসাইমিন (রহ.)
────────
অনেক সময় একজন মুসলিম অজ্ঞতাবশত নাপাক কাপড় পরেই নামাজ আদায় করে ফেলেন। আবার কখনো তিনি জানেন যে, কাপড়ে নাপাকি রয়েছে। কিন্তু নামাজের পূর্বে কাপড় পরিবর্তন করতে বা নাপাক অংশ ধুয়ে ফেলতে ভুলে যান। পরে নামাজ শেষ হওয়ার পর তার বিষয়টি স্মরণে আসে। এমন অবস্থায় তার করণীয় কী? তিনি যে নামাজ আদায় করেছেন, তা কি শুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হবে, নাকি কাপড় পরিবর্তন করে বা নাপাক অংশ ধুয়ে পুনরায় সেই নামাজ আদায় করতে হবে? এ বিষয়ের সঠিক সমাধান জানতে বর্তমান যুগের অন্যতম দুই শ্রেষ্ঠ আলেম, শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায (রহ.) এবং শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল উসাইমিন (রহ.)-এর দলিলভিত্তিক দুটি ফতওয়া নিচে উপস্থাপন করা হলো:
প্রশ্ন: কোনো মুসলিম যদি ভুলবশত নাপাক কাপড় বা জামা পরে নামাজ আদায় করে তবে এই নামাজ পুনরায় পড়া আবশ্যক কি না? এর বিধান কী?
উত্তর: কোনো মুসলিম পুরুষ বা মহিলা যদি এমন কাপড়ে নামাজ আদায় করে যাতে নাপাকি লেগে আছে—তা প্যান্ট হোক, জামা হোক, লুঙ্গি হোক, গেঞ্জি হোক বা অন্য কিছু—আর নামাজ শেষ হওয়ার পরই তা স্মরণ হয় তবে অধিক গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী তার নামাজ বিশুদ্ধ হবে। একইভাবে কেউ যদি নাপাক কাপড়ে নামাজ আদায় করে এবং নামাজ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত তা জানতে না পারে তবে তার এই অজ্ঞতা ভুলে যাওয়ার মতোই একটি ওজর হিসেবে গণ্য হবে।
সুতরাং কেউ যদি নাপাক কাপড়ে, ভুলক্রমে বা অজ্ঞতাবশত নামাজ আদায় করে নামাজ সম্পূর্ণ করে ফেলে তবে তার নামাজ বিশুদ্ধ হবে। কারণ নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদিন এমন জুতা পরে নামাজ আদায় করছিলেন যাতে নাপাকি ছিল। জিবরিল (আলাইহিস সালাম) তাঁকে এ বিষয়ে অবগত করলে তিনি নামাজরত অবস্থাতেই জুতা খুলে ফেলেন। কিন্তু নামাজের শুরু থেকে পুনরায় শুরু করেননি; বরং নামাজ চালিয়ে যান। এটি প্রমাণ করে যে, নামাজের শুরুর অংশটুকু বিশুদ্ধ ছিল।
তদ্রূপ, নামাজ শেষ হওয়ার পরই যদি জানা যায় তবুও নামাজ বিশুদ্ধ হবে—এই হাদিসের ভিত্তিতে অর্থাৎ “তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর দুই জুতা পরে নামাজ আদায় করছিলেন, যাতে নাপাকি ছিল। জিবরিল তাঁকে এ বিষয়ে অবগত করলে তিনি তা খুলে ফেললেন, অতঃপর নামাজ চালিয়ে যান” —
এই হাদিস প্রমাণ করে যে, অজ্ঞতার কারণে নামাজের শুরুর অংশটুকু বিশুদ্ধ ছিল। ভুলে যাওয়া ব্যক্তির বিধানও তেমনই। এমনকি যে ব্যক্তি নাপাকির কথা না জেনে বা ভুলে গিয়ে গোটা নামাজ সম্পন্ন করে ফেলেছে, তার নামাজও বিশুদ্ধ।
তবে নামাজের মাঝখানে যদি স্মরণ হয় এবং সে তা খুলে ফেলে, তাহলেও তার নামাজ যথেষ্ট হবে—যেমন নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর জুতা খুলে ফেলে নামাজ চালিয়ে গিয়েছিলেন।
সুতরাং কারো পোশাকে নাপাকি থাকলে বা মাথার রুমালে নাপাকি থাকলে বা লুঙ্গিতে নাপাকি থাকলে—সে যদি তা খুলে ফেলে আর তার শরীরে এমন কাপড় থাকে যা সতর ঢেকে রাখে (যেমন জামা যা সতর ঢাকে), তাহলে নাপাক লুঙ্গি বা প্যান্ট তৎক্ষণাৎ খুলে ফেললে তার নামাজ যথেষ্ট হবে।
– উপস্থাপক: কিন্তু যদি নামাজের আগেই সে নাপাকির ব্যাপারে জানত আর এই ত্রুটি তারই ছিল?
শাইখ: তারপর ভুলে গিয়েছে-এই কথা বলছেন?
উপস্থাপক: জি, হ্যাঁ।
শাইখ: তবুও। যদি সে জানত, তারপর ভুলে গিয়েছিল তার নামাজ বিশুদ্ধ হবে। তবে যদি ইচ্ছাকৃতভাবে (নাপাকি জেনেও) নামাজ আদায় করে তাহলে তার নামাজ বাতিল হয়ে যাবে।
[Binbaz org]
[অনুবাদ: আব্দুল্লাহিল হাদি বিন আব্দুল জলীল মাদানি]
প্রশ্ন: না জেনে কাপড়ে নাপাকি নিয়ে নামাজ আদায় করলে তার বিধান কী?
উত্তর: নামাজ সম্পন্ন করার পর জানা গেল যে, কাপড়ে নাপাকি ছিল। অথবা কাপড়ে নাপাকি থাকার কথা আগে থেকেই জানত কিন্তু ভুলে গিয়েছিল। নামাজ শেষ হওয়ার পর সে কথা স্মরণ হলো। এ অবস্থায় তাদের নামাজ বিশুদ্ধ হবে, পুনরায় নামাজ ফিরিয়ে পড়ার প্রয়োজন নেই। কেননা সে তো এই নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হয়েছে না জেনে অথবা ভুলক্রমে। আর আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
﴿رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا﴾
“হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা
যদি ভুলে যাই বা ভুলক্রমে কোনো কিছু করে ফেলি তবে আমাদেরকে পাকড়াও করবেন না।” ]সুরা বাকারা: ২৮৬]
আল্লাহ বলেন, “আমি তা-ই করলাম”, অর্থাৎ পাকড়াও করলাম না। [সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১২৬]
একবার রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুতা পরে নামাজ আদায় করছিলেন। কিন্তু তাতে নাপাকি ছিল। তিনি তা জানতেন না। জিবরিল (আলাইহিস সালাম) সে ব্যাপারে তাঁকে অবহিত করলে নামাজ চলাকালীন অবস্থাতেই তিনি তা খুলে ফেললেন। [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৬৫০]
এক্ষেত্রে তিনি নতুন করে নামাজ আদায় করেননি। এ থেকে প্রমাণিত হয়, নামাজরত অবস্থায় যদি নাপাকির ব্যাপারে জানতে পারে তবে নামাজের মধ্যেই তা দূর করার চেষ্টা করবে—যদি তা দূর করতে গিয়ে সতর ঢেকে রাখার ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা না হয়।
অনুরূপভাবে যদি ভুলে যায় আর নামাজরত অবস্থায় তা স্মরণ হয়, তবে সতরের ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা না হলে নামাজ না ভেঙেই উক্ত কাপড় খুলে ফেলবে। কিন্তু যদি নামাজ শেষ হওয়ার পর স্মরণ হয় বা নাপাকি সম্পর্কে জানতে পারে তবে নামাজ বিশুদ্ধ হবে; ফিরিয়ে পড়ার প্রয়োজন হবে না। তবে কেউ যদি ভুলক্রমে অজু না করে নামাজ আদায় করে, তারপর নামাজ শেষে স্মরণ হয় যে, সে বিনা অজুতে নামাজ আদায় করেছে তবে তার ওপর ওয়াজিব হচ্ছে, অজু সম্পাদন করে নামাজ ফিরিয়ে পড়া।
অনুরূপভাবে কেউ যদি অজ্ঞতাবশত বা ভুলক্রমে শরীরে নাপাকি নিয়ে নামাজ আদায় করে। অতঃপর কাপড়ে বীর্য দেখে জানতে পারে বা নাপাকির কথা স্মরণ হয় তবে যতগুলো নামাজ সে অপবিত্র অবস্থায় আদায় করেছিল সবগুলোই ফিরিয়ে পড়বে।
উভয় মাসয়ালার মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে—প্রথম মাসয়ালাটি অর্থাৎ কাপড়ে নাপাকি নিয়ে নামাজ আদায় করা, হচ্ছে নিষিদ্ধ বিষয় পরিত্যাগ করার বিষয়। আর দ্বিতীয়টি অর্থাৎ বিনা অজুতে বা শরীর নাপাক অবস্থায় নামাজ আদায় করা, হচ্ছে নির্দেশিত বিষয়, যা অজু-গোসলের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হয়। আর নির্দেশিত বিষয় অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে; তার উপস্থিতি ছাড়া ইবাদত বিশুদ্ধ হবে না। কিন্তু কাপড়ে নাপাকির বিষয়টি হচ্ছে অনুপস্থিতির বিষয়, অর্থাৎ তার অনুপস্থিতি ছাড়া নামাজ বিশুদ্ধ হবে না। অতএব অজ্ঞতাবশত বা ভুলক্রমে যদি তা উপস্থিত থাকে তবে কোনো অসুবিধা নেই। কেননা নামাজের আবশ্যক কোনো কিছু এখানে ছুটে যায়নি।
আল্লাহু আলাম-আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।
[উৎস: শাইখ আল্লামা মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল উসাইমিন (রহ.)-এর ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম।
অধ্যায়: সালাত
ফতওয়া নং: ২১৩
শায়খ আব্দুল্লাহ আল কাফী (রহ.) ও শাইখ আব্দুল্লাহ শাহেদ মাদানি কর্তৃক অনূদিত]
গ্রন্থনায়:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।