কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর প্রচার করাই হল এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

সালাত সম্পর্কিত একটি বহুল প্রচলিত জাল হাদিস

ক. নিম্নোক্ত হাদিসটি কি সহিহ?
● যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ ছেড়ে দিবে তার চেহারার উজ্জ্বলতা নষ্ট হয়ে যাবে।
● যে ব্যক্তি যোহরের নামাজ ছেড়ে দিবে তার রুজির বরকত কমে যাবে।
● যে ব্যক্তি আছরের নামাজ ছেড়ে দিবে তার শরীরের শক্তি কমে যাবে।
● যে ব্যক্তি মাগরিবের নামাজ ছেড়ে দিবে তার সন্তানাদি কোনও কাজে আসবে না।
● যে ব্যক্তি এশার নামাজ ছেড়ে দিবে তার নিদ্রার পরিতৃপ্তি নষ্ট হয়ে যাবে।
খ. ইসলামে সালাতের গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাই।

উত্তর:

❑ ক. উক্ত হাদিসটি সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। অর্থাৎ হাদিসের নামে মিথ্যাচার (fake hadith)। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হল:

এই কথিত হাদিসটির আরবি টেক্সট নিম্নরূপ:
من ترك صلاة الصبح فليس في وجهه نور، ومن ترك صلاة الظهر فليس في رزقه بركة، ومن ترك صلاة العصر فليس في جسمه قوة، ومن ترك صلاة المغرب فليس في أولاده ثمرة، ومن ترك صلاة العشاء فليس في نومه راحة

হাদিসের নামে উক্ত বাক্যটি রাস্তায় চলার পথে, বিভিন্ন স্কুল-কলেজ বা বিল্ডিং এ দেয়াল লিখন হিসেবে চোখে পড়ে। শুধু তাই নয় বরং নামাজের ফজিলত সংক্রান্ত বিভিন্ন চটি বইয়েও এর উল্লেখ পাওয়া যায়। আর বর্তমান যুগে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদি সোশ্যাল মিডিয়ায় এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইটে এমন চটকদার হাদিস ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে। অনেক মানুষ বুঝে-না বুঝে এজাতীয় হাদিস ছবি বানিয়ে বা টেক্সট আকারে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিচ্ছে আর ভাবছে দীনের অনেক কাজ করে ফেলল! কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিসের নামে মিথ্যাচার। আর ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহর রাসূল সাল্লাহু সাল্লাম এর মিথ্যাচার করার ভয়াবহতা অনেক বেশি। (আল্লাহ ক্ষমা করুন)
মিথ্যা হাদিস প্রচারের ভয়াবহতা সম্পর্কে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সতর্ক করে দিয়ে বলেন,
مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّداً فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ
“যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত ভাবে আমার উপর মিথ্যা রোপ করল (মিথ্যা হাদিস বর্ণনা করল), সে যেন জাহান্নামে নিজের ঠিকানা করে নিলো।” (সহিহ বুখারি, অনুচ্ছেদ: আম্বিয়াদের হাদিস, হাদিস নং ৩২৭৪)

❑ উক্ত হাদিস সম্পর্কে বড় আলেমদের অভিমত:

নিম্নে এ হাদিসটি সম্পর্কে বড় আলেমদের মতামত তুলে ধরা হল:

◈ সৌদি স্থায়ী ফতোয়া কমিটি (লাজনাহ দায়েমাহ) কে উপরোক্ত এবং আরও কয়েকটি হাদিস সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তারা বলেন,
” هذه الأحاديث لم تُعزَ إلى كتاب من كتب السنة ، ولا نعلم لها أصلا بعد البحث عنها ، فالواجب منع توزيعها ونشرها
“কোন হাদিস গ্রন্থের সাথে এ সব হাদিসের সম্বন্ধ নাই। অনুসন্ধান করেও এগুলোর কোন ভিত্তি জানতে পারি নি। অত:এব এগুলো প্রচার-প্রসার ও বিতরণ করা বন্ধ করা আবশ্যক।”
[ফাতাওয়া লাজনাহ দায়েমা-মাজমুআহ-২, ৩/২৯৫]

◈ বর্তমান যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ শাইখ সালিহ আল ফাউজান (হাফিযাহুল্লাহ) কে সৌদি আরবের জনপ্রিয় ইসলামি প্রশ্ন-উত্তর মূলক রেডিও অনুষ্ঠান ‘নুরুন আলাদ দারব’ (পথের আলো) এ উক্ত হাদিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন,
هذا لا أصل له فيما أعلم ، وجاء الوعيد فيمن ترك الصلاة من القرآن ومن السنة النبوية الصحيحة ، فيُكتَفى بما جاء
“আমার জানা মতে, এর কোন ভিত্তি নাই। কুরআন ও সহিহ হাদিসে সালাত ত্যাগ কারীর ব্যাপারে কঠোর শাস্তির হুমকি এসেছে। সুতরাং এগুলোই যথেষ্ট।
(এরপর তিনি সালাত পরিত্যাগ সংক্রান্ত কয়েকটি হাদিস ও আয়াত উল্লেখ করেন)।
[নূরুন আলাদ দারব, ২২/১/১৪২৭ হিজরি, অডিও ক্যাসেট ১৭-১৯ মিনিট]

❑ খ. সালাতের গুরুত্ব এবং সালাত পরিত্যাগের ভয়াবহতা সংক্রান্ত কতিপয় আয়াত ও হাদিস:

১) তাওহীদ ও রিসালাতে স্বীকৃতির পরই ইসলামের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হল, সালাত। যা ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে দ্বিতীয়। (হাদিসে জিবরিল)
২) আল্লাহ তাআলা সালাতকে মুমিনের জন্য অপরিহার্য গুণ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন গায়েব (অদৃশ্য) এর প্রতি বিশ্বাসের পর। তিনি বলেন,
الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ
“যারা গায়েব (অদৃশ্য) এর প্রতি ঈমান এনেছে এবং সালাত কায়েম করে।” [সূরা বাকারা: ৩১]
৩) সফল মুমিনদের গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা সালাত দ্বারা শুরু করে সালাত দ্বারাই শেষ করেছেন। তিনি বলেন,
قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ. الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ
“ওই সকল মুমিন সফল যারা তাদের সালাতে বিনম্র থাকে…. ” [সূরা মুমিনূন: ১-২]
পরিশেষ বলেন,
وَالَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَوَاتِهِمْ يُحَافِظُونَ
“যারা তাদের সালাতের প্রতি যত্নশীল হয়।” [সূরা মুমিনূন: ৯]
৪) আবাসে-সফরে, নিরাপদে-ভয়ে, শান্তিতে-যুদ্ধ, সুস্থ-অসুস্থ সর্বাবস্থায়ই এর প্রতি যত্নবান হওয়ার তাকিদ সংক্রান্ত বহু হাদিস এসেছে।
৫) সালাত একমাত্র ইবাদত যা আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবীকে মিরাজের মাধ্যমে সাত আসমানের উপর নিয়ে তারপর ফরজ করেছেন। (যা প্রথম পর্যায়ে ৫০ ওয়াক্ত ছিলো। পরে তা কমিয়ে ৫ ওয়াক্ত অবশিষ্ট রাখেন কিন্তু ৫ ওয়াক্তের বিনিময়ে ৫০ ওয়াক্তের সমপরিমাণ সওয়াব দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন-আল হামদুলিল্লাহ)।
৬) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতকে ঈমানের উপর চলার প্রথম প্রমাণ এবং কাফির-মুসলিম পৃথক করার বা (চেনার) উপায় হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।
জাবের রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি:
إنَّ بيْنَ الرَّجُلِ وبيْنَ الشِّرْكِ والْكُفْرِ تَرْكَ الصَّلاةِ
“ব্যক্তির মাঝে ও শিরক-কুফরের মাঝে পার্থক্যকারী বিষয় হল, সালাত ত্যাগ করা”। [সহিহ মুসলিম]
৭) বুরাইদা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
العَهدُ الذي بَينَنا وبَينَهُم الصلاةُ، فمن تَرَكَها فَقَد كَفَرَ
“আমাদের আর তাদের মাঝে মূল অঙ্গীকার হল সালাত, যে ব্যক্তি তা তরক করল সে কুফরি করল।” [আহমদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ-সহিহ]
৮) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,
مَنْ فَاتَتْهُ صلاةٌ فَكأنَّما وُتِرَ أَهْلهُ و مالهُ
“যে ব্যক্তির সালাত ছুটে গেল তার পরিবার-পরিজন ও মাল-সম্পদ যেন ধ্বংস হয়ে গেলো।” [বুখারি ও মুসলিম]

মোটকথা, কুরআন ও হাদিসে সালাত আদায়ের গুরুত্ব, মর্যাদা ও তা পরিত্যাগের ভয়াবহতার ব্যাপারে এত বেশি আলোচনা এসেছে যে, এক কথায় তা তুলনাহীন।

সুতরাং এত এত কুরআনের আয়াত ও সহিহ হাদিস থাকার পরে সালাতের দিকে মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য এসব উদ্ভট জাল হাদিস বর্ণনা করা, প্রচার-প্রসার করা, এগুলো দ্বারা ওয়াজ করা, ফেসবুকে আপলোড বা শেয়ার দেয়া কোনভাবেই বৈধ হতে পারে না। কেউ অজ্ঞতা বশত: এগুলো ফেসবুকে প্রচার করে থাকলে অনতিবিলম্বে তো ডিলিট করা আবশ্যক।
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Share This Post