রাস্তার ১৫টি হক এবং নিরাপদ সড়কের জন্য ইসলামের চমৎকার দিক-নির্দেশনা

প্রশ্ন: ইসলামের দৃষ্টিতে রাস্তার হক সমূহ কি? নিরাপদ সড়কের জন্য ইসলামের দিক-নির্দেশনা কী?
উত্তর:
ইসলাম একটি অত্যন্ত উন্নত ও সুসভ্য জীবনাদর্শের নাম। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের রয়েছে চমৎকার সব দিক-নির্দেশনা। তাইতো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাস্তার হক এবং রাস্তা চলাচলের ক্ষেত্রে বিভিন্ন শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে আমাদের সমাজে “নিরাপদ সড়ক চাই” বলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করা হচ্ছে, কত মিছিল-মিটিং, সভা-সমাবেশ, সেমিনার-সেম্পোজিয়াম, পোস্টার, ব্যানার, গণমাধ্যমে প্রচারণা ইত্যাদি অনেক কিছু করা হচ্ছে। কিন্তু নিরাপদ সড়কের দাবীতে এমন কিছু করা হচ্ছে যা এই দাবীর সাথে সাংঘর্ষিক। যেমন: নিরাপদ রাস্তার দাবীতে গাড়ি ভাঙচুর, রাস্তা অবরোধ, রাস্তা আটকিয়ে সভা-সমাবেশ, বিক্ষোভ, মিছিল-মিটিং এবং রাস্তায় কাঠ, টায়ার ইত্যাদি পুড়িয়ে এক ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা এবং গাড়ি দুর্ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত এবং সঠিক বিচার ও ক্ষতিপূরণের পরিবর্তে বহু নিরপরাধ মানুষের গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নি সংযোগ, বাছ-বিচার ছাড়া সন্দেহভাজনকে গণধোলাই ইত্যাদি। অর্থাৎ নিরাপদ সড়কের দাবীদাররাই সড়ককে অনিরাপদ করে তুলছে।
অথচ ইসলাম আমাদেরকে নিরাপদ সড়ক এবং পথিকের নির্বিঘ্নে পথ চলার স্বার্থে বেশি কিছু রাস্তার হক এবং পথিকের আচরণ বিধি দিয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, প্রকৃত ইসলামের আলো থেকে আমাদের সমাজ ব্যবস্থা অনেক দূরে অবস্থানের ফলে সেগুলো অধিকাংশই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। অথচ ইসলাম নির্দেশিত এ সকল রাস্তার হক ও পথিকের আচরণ বিধি মেনে চললে এ সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর সুন্দর সমাধান করা সম্ভব।

তাহলে আমরা জেনে নেই, ইসলাম নির্দেশিত রাস্তার হক এবং পথিকের আচরণবিধি সমূহ। নিচে এ বিষয়গুলো পয়েন্ট ভিত্তিক সংক্ষেপে আলোচনা করা হল: وبالله التوفيق

রাস্তার হক সমূহ: (১৫টি)

১. রাস্তায় না বসা।
২. দৃষ্টি অবনমিত রাখা।
৩. মানুষকে কষ্ট দেওয়া হতে বিরত থাকা।
৪. পথ চলার ক্ষেত্রে সালাম লেনদেন করা।
৫. সৎকাজের আদেশ দেওয়া এবং অসৎ কাজে নিষেধ করা।
৬. রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস অপসারণ করা।
৭. রাস্তায় মল-মূত্র ত্যাগ করা থেকে বিরত থাকা।
৮. গতি নিয়ন্ত্রণ করা।
৯. দম্ভভরে না চলা (বিনয় অবলম্বন করা)।
১০. পথহারাকে পথ দেখিয়ে দেওয়া।
১১. মজলুম ও বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করা।
১২. বোঝা বহনকারীকে (বোঝা উঠানো বা নামানোর ক্ষেত্রে) সহযোগিতা করা।
১৩. ভালো কথা বলা।
১৪. হাঁচির জবাব দেয়া।
১৫. অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির করা।

◯ নিম্নে কুরআন ও হাদিসের আলোকে উপরোক্ত বিষয় সমূহ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হল:

আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমরা রাস্তার উপর বসা থেকে দূরে থাকো।”
লোকজন বলল, এ ছাড়া তো আমাদের কোন উপায় নেই। কেননা, এটাই আমাদের উঠাবসার জায়গা এবং এখানে বসেই আমরা কথাবার্তা বলে থাকি।
তিনি বলেন, “যদি তোমাদের সেখানে বসতেই হয়, তবে রাস্তার হক আদায় করবে।”
তারা প্রশ্ন করলেন: রাস্তার হক কি?

তিনি বললেন,
غَضُّ الْبَصَرِ، وَكَفُّ الأَذَى، وَرَدُّ السَّلاَمِ، وَأَمْرٌ بِالْمَعْرُوفِ، وَنَهْىٌ عَنِ الْمُنْكَرِ
১. “দৃষ্টি অবনমিত রাখা,
২. মানুষকে কষ্ট দেওয়া হতে বিরত থাকা,
৩. সালামের উত্তর দেওয়া,
৪. সৎকাজের আদেশ দেওয়া
৫. এবং অসৎ কাজে নিষেধ করা।”
[সহিহ বুখারি (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ৩৮/ জুলুম ও কিসাস, পরিচ্ছেদ: ১৫৪৬. ঘরের আঙ্গিনা ও তাতে বসা এবং রাস্তার উপর বসা]

আর এটা বাস্তব যে, ইসলাম নির্দেশিত রাস্তার আদব সমূহ রক্ষা এবং রাস্তার হক সমূহ বাস্তবায়ন আদায় না করার কারণে প্রচুর পরিমাণে রোড এক্সিডেন্ট ও নানা দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।

❑ ১. রাস্তায় বসা নিষেধ:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাস্তায় বসতে নিষেধ করেছেন। অথচ কিছু মানুষ রাস্তায় এমনভাবে দাঁড়ায় বা বসে আড্ডা মারে যে, তাতে যাতায়াতকারীর কষ্ট হয়। অনেক সময় গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয়। এছাড়াও রাস্তায় ক্রিকেট-ফুটবল খেলা, রাস্তা দখল করে গাড়ির অবৈধ পার্কিং, দোকানপাটে ফুটপাথ একাকার, হাঁটার পথ বেদখল ইত্যাদি কারণে প্রতিদিন যানজটে নগরবাসীর ত্রাহি দশা অবস্থার সৃষ্টি হয়।

❑ ২. দৃষ্টি অবনত রাখা:

আল্লাহ তাআলা পুরুষদের উদ্দেশ্যে বলেছেন,
قُلْ لِّلْمُؤْمِنِیْنَ یَغُضُّوْا مِنْ اَبْصَارِهِمْ وَ یَحْفَظُوْا فُرُوْجَهُم ذٰلِكَ اَزْكٰی لَهُمْ اِنَّ الله خَبِیْرٌۢ بِمَا یَصْنَعُوْنَ .
“মুমিন পুরুষদের বলে দিন, তারা যেন দৃষ্টি অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য উৎকৃষ্ট পন্থা। তারা যা কিছু করে আল্লাহ সে সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবগত।” [সূরা নূর: ৩০]
আর নারীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন,
وَ قُلْ لِّلْمُؤْمِنٰتِ یَغْضُضْنَ مِنْ اَبْصَارِهِنَّ وَ یَحْفَظْنَ فُرُوْجَهُنَّ وَ لَا یُبْدِیْنَ زِیْنَتَهُنَّ
“এবং মুমিন নারীদের বলে দিন, তারা যেন দৃষ্টি অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে এবং নিজেদের ভূষণ প্রকাশ না করে।” [সূরা নূর: ৩১]

আর ইসলামের দৃষ্টিতে রাস্তা অন্যতম একটি হক হল, দৃষ্টি অবনত রাখা।

এ বিধানটির প্রতি আমাদের অবহেলার কারণে প্রচুর পরিমাণ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। রাস্তায় চলার সময় বিপরীত লিঙ্গের দিকে তাকাতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে বাইক বা গাড়ি এক্সিডেন্ট ঘটে, চলার পথে রাস্তার খাম্বার সাথে ধাক্কা লেগে বা গর্তে পতিত হয়ে আহত-নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। কিছু বখাটে যুবক রাস্তায় দাঁড়িয়ে নারীদেরকে ইভ টিজিং করে-যা শুধু ইসলামের দৃষ্টিতে গুনাহের কারণ নয় বরং প্রচলিত আইনেও দণ্ডনীয় অপরাধ।

❑ ৩. মানুষকে কষ্ট দেওয়া হতে বিরত থাকা:

রাস্তার অন্যতম হক হল, পথিক, যাত্রী সাধারণ বা কোনও মানুষকে কষ্ট না দেয়া। অথচ আমরা মানুষকে কতভাবে যে কষ্ট দেই তার কোনও ইয়ত্তা নাই।

কষ্ট দেওয়ার বিভিন্ন পদ্ধতি:

◈ রাস্তায় গাছের গুড়ি ফেলা, টায়ার জ্বালানো, অহেতুক রাস্তা বন্ধ করা, রাস্তা কেটে রাখা, ফলের খোসা-ময়লা-আবর্জনা ও উচ্ছিষ্ট খাবার ফেলা, পানের পিক ফেলা, দুর্গন্ধ ছড়ায় এমন কোনও জিনিস ফেলে রাখা, ছাদ থেকে পানি নিষ্কাশনের পাইপ রাস্তায় দেওয়া। এসব কষ্ট দেওয়ার নানা উপায়।

◈ ফুটপাতে বা রাস্তায় দোকান বসানো। যার কারণে চলাচলের পথ সংকীর্ণ হয়। এটাও কষ্ট দেওয়ার অন্তর্ভুক্ত। দোকানের সীমানা বাড়াতে বাড়াতে রাস্তার মধ্যে চলে যাওয়া, অথবা বাড়ির প্রাচীর বাড়িয়ে দেওয়া; যে কারণে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় বা সংকীর্ণ হয়ে যায়। এগুলোও কষ্টের কারণ।

◈ যত্রতত্র সাইকেল, মোটরসাইকেল, গাড়ি পার্ক করে রাখা। নিষিদ্ধ জায়গায় গাড়ি পার্ক করাও রাস্তার হক নষ্ট করার শামিল।

◈ ফুটপাথ দখল করে ক্রয়-বিক্রয় করা, দোকান ঘর তৈরি করা বা দোকানের মালামাল রাখা। এতে মানুষের পথ চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। নিঃসন্দেহে তা রাস্তার হক নষ্ট করার শামিল।

◈ অনেক মানুষ গাড়ি চালানোর সময় অকারণে ভেঁপু বাজিয়ে শব্দ দূষণ করে এবং ইচ্ছাকৃত ভাবে রাস্তায় ধুলো ও কাদা-পানি ছিটিয়ে মানুষকে কষ্ট দেয়।

◈ কিছু উঠতি বয়সের বখাটে যুবক জনবহুল রাস্তায় গাড়ি ড্রিফটিং করে এবং ওভারটেকিং এর অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে বড় বড় দুর্ঘটনার শিকার হয়।

◈ কিছু চালক বেপরোয়া গাড়ি চালায়, কেউ বা মদ ও নেশা দ্রব্য পান করে ড্রাইভিং করে। অনেকে ফাসেক ও আত্মমর্যাদা হীন মানুষ গাড়িতে উচ্চ আওয়াজে মিউজিক চালিয়ে শব্দ দূষণের পাশাপাশি মানুষকে বিরক্ত করে।

এ সবই শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে গুনাহের কাজ এবং দেশীয় আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। ট্রাফিক পুলিশের উচিৎ, এসকল অপরাধীদেরকে ছাড় না দেয়া।

❑ ৪. পথ চলার ক্ষেত্রে সালাম লেনদেন করা:

হাদিসে আছে, আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
يُسَلِّمُ الصَّغِيرُ علَى الكَبِيرِ، والمارُّ علَى القاعِدِ، والقَلِيلُ علَى الكَثِيرِ
“ছোট বা কম বয়সী বয়োজ্যেষ্ঠকে, গমনকারী ব্যক্তি বসে থাকা ব্যক্তিকে ও কম সংখ্যক মানুষ বেশি সংখ্যক মানুষকে সালাম দিবে। [বুখারি ও মুসলিম)]

অন্য হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
يُسَلِّمُ الرَّاكِبُ عَلَى الْمَاشِي وَالْمَاشِي عَلَى الْقَاعِدِ وَالْقَلِيلُ عَلَى الْكَثِيرِ ‏
“আরোহী ব্যক্তি পথচারীকে, পথচারী ব্যক্তি বসে থাকা ব্যক্তিকে এবং অল্প সংখ্যক লোক অধিক সংখ্যককে সালাম করবে।” [সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ৪০/ সালাম পরিচ্ছেদ: ১. আরোহী পথচারীকে এবং অল্প সংখ্যক অধিক সংখ্যককে সালাম করবে]
অনুরূপভাবে সালামের উত্তর দেয়া মুসলিমদের পাঁচটি হকের অন্তর্ভুক্ত।

চলার পথে সালাম আদান-প্রদান করা উত্তম চরিত্র, অন্যের সম্মান প্রদর্শন, শালীনতা, ভদ্রতা ও উত্তম চরিত্রের প্রমাণ। পথিক বা যাত্রাপথে থাকা ব্যক্তি পথের ধারে অবস্থানরত লোকজনকে সালাম দিবেন। আর কেউ সালাম দিলে সুন্দরভাবে তার উত্তর দিতে হবে। এটি এক মুসলিমের উপর আরেক মুসলিমের অন্যতম হক। এটি রাস্তার অন্যতম হক।

সুতরাং আমাদের কর্তব্য, রাস্তায় চলার সময় ইসলামি সংস্কৃতির এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি চর্চা ও সম্প্রসারণ করার মাধ্যমে ইসলামি শিষ্টাচার ও সম্মানজনক পরিবেশ বজায় রাখা।

❑ ৫ . সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজ বাধা প্রদান করা:

সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজ বাধা প্রদান করা রাস্তার অন্যতম হক। মানুষকে কল্যাণের পথে আহ্বান করা, ইসলামি রীতি-নীতি ও বিধিবিধান মেনে চলার ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করা, সবধরণের শরিয়া ও আইন বিরুদ্ধ অন্যায় ও ক্ষতিকর কার্যক্রম সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করা। বিশেষ করে উঠতি যুবক এবং তরুণ প্রজন্মকে ইসলামের শিক্ষার আলোকে গড়ে তোলা। এগুলো সবই এর অন্তর্ভুক্ত।

ইসলাম নির্দেশিত এসব হক বাস্তবায়ন করা হলে নি:সন্দেহে ট্রাফিক দুর্ঘটনা কমবে আর আমরা পাব নিরাপদ সড়ক এবং শান্তিপূর্ণ সুন্দর সামাজিক জীবন।

❑ ৬. রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস অপসারণ করা:

❂ ক. রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস অপসারণ করা ঈমানের অন্যতম একটি শাখা:

রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস অপসারণ করা শুধু রাস্তার একটি হক নয় বরং তা ঈমানের অন্যতম একটি শাখা। যেমন:

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
الإِيمَانُ بِضْعٌ وَسَبْعُونَ أَوْ بِضْعٌ وَسِتُّونَ شُعْبَةً فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ
“ঈমানের শাখা সত্তরটিরও কিছু বেশি। অথবা ষাটটিরও কিছু বেশি। এর সর্বোচ্চ শাখা হল, লা ইলা হা ইল্লাল্লাহ তথা “আল্লাহ ব্যতীত সত্য উপাস্য নেই” এ কথার স্বীকৃতি দেয়াা আর এর সর্বনিম্ন শাখা হল, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা।”
[সহিহ মুসলিম, অধ্যায়: ১/ কিতাবুল ঈমান, পরিচ্ছেদ: ১২. ঈমানের শাখা-প্রশাখার সংখ্যা, তার সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন শাখার বর্ণনা, লজ্জাশীলতার ফযিলত এবং তা ঈমানের শাখা হওয়ার বর্ণনা]

❂ খ. রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস অপসারণ করার সওয়াব সদকার সমতুল্য:

আবু হুরায়রা রা. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন,
يُمِيطُ الأَذَى عَنْ الطَّرِيقِ صَدَقَةٌ
“রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করা সদকাস্বরূপ।” [সহিহ বুখারি]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু যর গিফারি রা.-কে বেশ কিছু উপদেশ দেন। সেগুলো মধ্যে একটি ছিল:
وَإِمَاطَتُكَ الحَجَرَ وَالشَّوْكَةَ وَالعَظْمَ عَنِ الطَّرِيقِ لَكَ صَدَقَةٌ.
“রাস্তা থেকে পাথর, কাঁটা, হাড্ডি সরানোও তোমার জন্য একটি সদকা।” [জামে তিরমিযী, হাদিস ১৯৫৬]

❂ গ. রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস অপসারণ করা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রাপ্তির অন্যতম একটি কারণ:

আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
بيْنَمَا رَجُلٌ يَمْشِي بِطَرِيقٍ وَجَدَ غُصْنَ شَوْكٍ عَلَى الطَّرِيقِ فَأَخَذَهُ فَشَكَرَ اللهُ لَهُ فَغَفَرَ لَهُ
“এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে চলার সময় রাস্তায় কাঁটাদার গাছের একটি ডাল পেল। তখন সেটাকে রাস্তা হতে অপসারণ করলে আল্লাহ তার এ কাজকে কবুল করে নিলেন ফলে তাকে ক্ষমা করে দিলেন।” [সহিহ বুখারি, অধ্যায়: ৪৬/ অত্যাচার, কিসাস ও লুণ্ঠন, পরিচ্ছেদ: ৪৬/২৮. যে ব্যক্তি ডালপালা ও কষ্টদায়ক দ্রব্য রাস্তা থেকে তুলে দূরে নিক্ষেপ করে]

❂ রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস অপসারণ করা নেকির কাজ-যা জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম কারণ:

– মুয়াবিয়া ইবনে কুররা রা. বলেন, আমি মাকিল আল-মুযানী রা. এর সাথে ছিলাম। তিনি রাস্তা থেকে একটা কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করলেন। অতঃপর আমিও রাস্তায় কিছু একটা দেখে তা সরালাম। তিনি বলেন, হে ভ্রাতুষ্পুত্র! তোমাকে কিসে এই কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে?
আমি বললাম, আপনাকে এরূপ করতে দেখে আমিও তাই করলাম। তিনি বলেন, হে ভ্রাতুষ্পুত্র! তুমি খুব উত্তম কাজ করেছো। আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি:
مَنْ أَمَاطَ أَذًى عَنْ طَرِيقِ الْمُسْلِمِينَ كُتِبَ لَهُ حَسَنَةٌ، وَمَنْ تُقُبِّلَتْ لَهُ حَسَنَةٌ دَخَلَ الْجَنَّةَ‏
“যে ব্যক্তি মুসলিমদের রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করে, তার জন্য একটি সওয়াব লেখা হয়। আর যার একটি সওয়াবের কাজ কবুল হয়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” [আল-আদাবুল মুফরাদ বিবিধ বিষয়, পরিচ্ছেদ: ২৬৮- বিদ্রোহ, সনদ হাসান]

উপরোক্ত হাদিস সমূহ থেকে দ্ব্যার্থহীন ভাবে প্রমাণিত হয় যে, চলাচলের পথ কণ্টক মুক্ত রাখা, যে সব জিনিস পথিকের চলার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ও কষ্ট দেয় সেগুলো অপসারণ করা এবং রাস্তার পরিচ্ছন্নতা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
ও সওয়াবের বিষয়।
অথচ আমাদের সমাজের বেশির ভাগ মানুষ রাস্তা-ঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে অত্যন্ত উদাসীন। মানুষ ময়লা ফেলতে কুণ্ঠাবোধ করে না। যার কারণে রাস্তায় দেখা যায় ময়লা আবর্জনার ভাগাড়। আমরা যত্রতত্র থুতু ফেলছি। নাকে কোনও কিছু না দিয়ে হাঁচি দিচ্ছি। যেখানে সেখানে ময়লা ফেলছি। বাদামের খোসা, কলার খোসা, বাসার ময়লা, চিপসের প্যাকেট, সিগারেটের প্যাকেট, পানের পিক, পলিথিন ইত্যাদি রাস্তায় ফেলছি। এমনকি বাসার উপর থেকে ময়লা ডাস্টবিনে না ফেলে রাস্তার উপর ফেলে দিচ্ছি। এতে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। রোগ জীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে। রাস্তা অপরিচ্ছন্ন হচ্ছে। দুর্গন্ধের সৃষ্টি হচ্ছে। রাস্তার পাশে ডাস্টবিন আছে। কিন্তু সময়মত ডাস্টবিনগুলো পরিষ্কার করা হয় না।
গ্রামে গঞ্জে দেখা যায়, ছোট-বড় প্রায় সকল রাস্তাই চাষিদের দখলে। অধিকাংশ রাস্তার উপর ধান মাড়াই, ভুট্টা মাড়াই, পাট ও পাটকাঠি শুকানো, ধানের খড় শুকানো সহ খড় ও পাটকাঠির গাদা তৈরি করা হচ্ছে। আর ধান, ভুট্টা ও পাটে একাকার হয়ে আছে রাস্তার দুই-তৃতীয়াংশ জায়গা। ফলে প্রতিনিয়তই ঘটছে দুর্ঘটনা এবং মানুষ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এগুলো সবই ইসলামের শিখানো রাস্তার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং তা পথিকের জন্য নিরাপদ করার প্রতি গুরুত্ব হীনতা এবং তার হকের ব্যাপারে উদাসীনতার প্রমাণ।

❑ ৭. রাস্তায় মল-মূত্র ত্যাগ করা করা থেকে বিরত থাকা:

রাস্তার অন্যতম হক হল, রাস্তায় মল-মূত্র ত্যাগ না করা। এটি কবিরা গুনাহ।

আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
اتَّقُوْا اللَّاعِنَيْنِ، قَالُوْا: وَمَا اللَّاعِنَانِ يَا رَسُوْلَ اللهِ ؟! قَالَ: الَّذِيْ يَتَخَلَّى فِيْ طَرِيْقِ النَّاسِ أَوْ ظِلِّهِمْ.
‘‘তোমরা অভিশাপের দু টি কারণ হতে দূরে থাকো। সাহাবিগণ বললেন, অভিশাপের কারণ দুটি কি? তিনি বললেন, মানুষ চলাচলের রাস্তায় অথবা ছায়াবিশিষ্ট গাছের তলায় মল-মূত্র ত্যাগ করা।” [সহিহ মুসলিম]

অথচ আমাদের সমাজে-বিশেষ করে শহরের রাস্তায় নগরবাসীকে যত্রতত্র মল মূত্র ত্যাগ করতে দেখা যায়। অনেক লোক রাস্তা সংলগ্ন স্থানে মূত্র ত্যাগ করে। ফলে, তা ড্রেন গড়িয়ে রাস্তায় চলে আসে। এতে পথচারীদের ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। একটু বৃষ্টি হলে সড়ক দ্বীপের নালায় জমা হওয়া প্রস্রাবের উৎকট দুর্গন্ধে হাঁটা যায় না। বৃষ্টির পানি ও নালার পানি একত্রে মিশে অস্বস্তিকর অবস্থা তৈরি করে। পথিকের হাঁটতে গেলে দম বন্ধ হয়ে আসে।
আমাদের দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ পথের ধারে অথবা ফুটপাথে প্রস্রাব করতে লজ্জাবোধ করেন না। এটি লজ্জাহীনতার পাশাপাশি অসভ্যতারও প্রমাণ।

❑ ৮. গতি নিয়ন্ত্রণ করা:

গাড়ি চালানো বা পায়ে হাঁটা সকল ক্ষেত্রেই ইসলামের নির্দেশনা হল, পায়ে হেঁটে পথ চলা বা গাড়ি চালনা করার ক্ষেত্রে মধ্যম গতি অবলম্বন করা। খুব দ্রুত বা খুব ধীরে চলা ঠিক নয়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন,
اقْصِدْ فِي مَشْيِكَ وَاغْضُضْ مِن صَوْتِكَ ۚ إِنَّ أَنكَرَ الْأَصْوَاتِ لَصَوْتُ الْحَمِيرِ
”বরং তোমার চলাফেরায় তুমি মধ্যপন্থা অবলম্বন করো (সুসংযত থাকো) আর তোমার কণ্ঠস্বর নিচু রেখো।” [সূরা লোকমান: ১৯]

বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইন্সটিটিউট (এআরআই) দুর্ঘটনার কারণ-সংক্রান্ত পুলিশের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে থাকে। ১৯৯৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনার বিশ্লেষণ করে এআরআই বলছে, দেশে ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে। আর চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও গতির কারণে ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে। আর পরিবেশ-পরিস্থিতিসহ অন্যান্য কারণে দুর্ঘটনার পরিমাণ ১০ শতাংশ।” [প্রথম আলো পত্রিকা অনলাইন]

❑ ৯. দম্ভভরে না চলা (বিনয় অবলম্বন করা):
মহান আল্লাহ বলেন,

وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا ۖ إِنَّكَ لَن تَخْرِقَ الْأَرْضَ وَلَن تَبْلُغَ الْجِبَالَ طُولًا ‎-=كُلُّ ذَٰلِكَ كَانَ سَيِّئُهُ عِندَ رَبِّكَ مَكْرُوهًا
“পৃথিবীতে দম্ভভরে পাদচারণা করো না। তুমি তো ভূ-পৃষ্ঠকে বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি পর্বত সমান হতে পারবে না।” [সূরা ইসরা: ৩৭]

মানুষের উচিত, দয়ালু, বিনয়ী ও নম্র হওয়া। প্রকৃতপক্ষে মানুষের অহংকার করা সাজে না। কারণ সে তো অতিশয় দুর্বল ও অন্যের মুখাপেক্ষী। সে রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, ক্ষুধা-পিপাসায় অচল হয়ে পড়ে, শারীরিক আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়, মানসিক কষ্টে মুষড়ে পড়ে, ভয়ঙ্কর কিছু দেখলে বা শুনলে ভয়ে বিহ্বল হয়, বিভিন্ন কারণে দু:শ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠায় অস্থির হয়, ঠাণ্ডা ও গরমে কাতর হয়, কষ্টে কান্না করে, বয়সের ভারে দুর্বল হয় এবং এক সময় সবকিছু ছেড়ে শূন্য হস্তে দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নিতে হয়।

এমন যার বৈশিষ্ট্য সে অহংকার করার যোগ্য নয়। অহংকার তো কেবল তাকে সাজে যে এসকল দুর্বলতা ও অন্যের মুখাপেক্ষিতা থেকে ঊর্ধ্বে। আর তিনি হলেন একমাত্র বিশ্বচরাচরের একচ্ছত্র অধিপতি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। তিনি ছাড়া কোনও সৃষ্টির অহংকার করার অধিকার নেই।

কিন্তু অজ্ঞ মানুষ গাড়ি, বাড়ি, সম্পদের প্রাচুর্যতা, ক্ষমতা ও পদমর্যাদা লাভ করেই নিজের সব অক্ষমতা, দুর্বলতা ও মুখাপেক্ষিতার কথা ভুলে যায়! কিছু অহংকারী গাড়ি চালকের বেপরোয়া গাড়ি চালনা ও অহংকার সূলভ আচরণের ফলে কত রিক্সাওয়ালা, টেম্পুওয়ালা, রাস্তার হকার, ভিক্ষুক এবং সাধারণ পথচারী ক্ষতিগ্রস্ত হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অথচ ইসলামে পথ চলায় দম্ভ ও অহমিকা পরিহার করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এছাড়াও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও কতিপয় রাস্তার হকের কথা বলেছেন। যেমন:

❑ ১০ ও ১১. পথহারাকে পথ দেখিয়ে দেওয়া এবং মজলুম ও বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করা:
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«إن كنتم لا بد فاعلين فأفشوا السلام، وأعينوا المظلوم، واهدوا السبيل
“তোমাদেরকে যদি রাস্তায় বসতেই হয় তাহলে, সালামের সম্প্রসারণ কর, মাজলুমকে সাহায্য করো এবং মানুষকে পথ দেখাও।” [মুসনাদে আহমদ, হা ১৭৭৫২]

অন্য হাদিসে এসেছে,
وتغيثوا الملهوف، وتهدوا الضال“

“”আর তোমরা বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করবে এবং পথহারাকে পথ দেখাবে।
সহিহ আবু দাউদ, হা/২/৬৭২

রাস্তায় মানুষ নানা বিপদাপদে পতিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে একজন মুসলিমের দায়িত্ব হল, তাকে সাহায্য-সহযোগিতার জন্য ছুটে আসা। যেমন: অনাহারীকে খাবার দান, নিঃস্বকে আর্থিকভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করা, দুর্বল ও নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাকে নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করা ইত্যাদি।

কিন্তু আশ্চর্য বিষয় হল, অনেক সময় গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হলে, কিছু নিকৃষ্ট মানুষ বিপদগ্রস্তকে সাহায্যের পরিবর্তে তার মালামাল ও অর্থ-সম্পদ লুটতে শুরু করে! মানুষ হিসেবে এটা যে, কত বড় অমানবিক ও লজ্জাজনক কাজ তা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। [আল্লাহ তাআলা অবুঝ ও অজ্ঞদেরকে সঠিক জ্ঞান দান করুন]

অনুরূপভাবে ভিনদেশী, পথভোলা বা নতুন আগন্তুক ব্যক্তিকে সঠিক পথ দেখানোও
রাস্তার অন্যতম হক। কেউ এ ক্ষেত্রে অবহেলা করলে বা তাকে ভুল পথ দেখালে নিঃসন্দেহে মানুষের হক নষ্ট করার অপরাধে গুনাহগার হবে।

❑ ১২. বোঝা বহনকারীকে (বোঝা উঠানো বা নামানোর ক্ষেত্রে) সহযোগিতা করা:

في حديث ابن عباس عند البزار من الزيادة: «وأعينوا على الحمولة»،
মুসনাদে বাযযারে ইবনে আব্বাস রা. এর বর্ণনায় রাস্তার হক সম্পর্কে অতিরিক্ত এসেছে, “তোমরা বোঝা বহনকারীকে (বোঝা উঠানো বা নামানোর ক্ষেত্রে) সহযোগিতা কর।”

চলার পথে মানুষকে তার বোঝাটা উঠাতে সাহায্য করা উচিৎ। একজন পথচারী অন্য পথচারীর নিকট এই সামান্য সহযোগিতা পাওয়ার অধিকার রাখে।

❑ ১৩. ভালো কথা বলা:

ইসহাক ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবু তালহার পিতা [আবদুল্লাহ রা.] থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, (আমার পিতা) আবু তালহা রা. বলেছেন, আমরা (বাড়ির সামনের খোলা) আঙ্গিনায় বসে কথাবার্তা বলছিলাম। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এলেন এবং আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, রাস্তা-ঘাটে বৈঠক-মজলিস করা তোমাদের অভ্যাস কেন? রাস্তাঘাটে মজলিস-বৈঠক করা তোমরা বর্জন করবে।

আমরা বললাম, আমরা তো বসেছি কোনও অসুবিধা করার উদ্দেশ্য নিয়ে নয়। আমরা বসে আলাপ-আলোচনা ও কথাবার্তা বলছি।

তিনি বললেন, যদি তা না করে না-ই পার, (সেখানে বসতেই হয়) তা হলে রাস্তার হক আদায় করবে। আর তা হল,
حَقَّهَا غَضُّ الْبَصَرِ وَرَدُّ السَّلاَمِ وَحُسْنُ الْكَلاَمِ ‏”‏ ‏.
“দৃষ্টি অবনত রাখা, সালামের জবাব দেওয়া এবং উত্তম কথা বলা।” [সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ৪০/ সালাম, পরিচ্ছেদ: ২. সালামের জবাব দেয়া রাস্তায় বসার অন্যতম হক]

একজন মুসলিমের চরিত্র হল, সে সর্বদা সুন্দর কথা বলবে। রাস্তায় যাতায়াতের পথে, বাহনে থাকা অবস্থায়, তার সফর সঙ্গী বা পাশের যাত্রীর সাথে দ্বীন বা দুনিয়ার উপকারী কথা বলবে এবং সুন্দর ভাষা ব্যবহার করবে। গালাগালি, সমালোচনা, গিবত, পরনিন্দা, অশ্লীল বাক্যালাপ ইত্যাদি থেকে দুরে থাকবে।

❑ ১৪. হাঁচির জবাব দেয়া:

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাড়ির আঙ্গিনায় এবং উঁচু স্থানসমূহের ঢালে বসতে নিষেধ করলেন। মুসলিমগণ বলেন, তা তো আমাদের সাধ্যের বাইরে। তিনি বলেন, “যদি তাই হয় তবে তোমরা তার দাবি পূরণ করো।
তারা বলেন, রাস্তার দাবি কি?
তিনি বলেন,
غَضُّ الْبَصَرِ، وَإِرْشَادُ ابْنِ السَّبِيلِ، وَتَشْمِيتُ الْعَاطِسِ إِذَا حَمِدَ اللَّهَ، وَرَدُّ التَّحِيَّةِ‏.‏
“দৃষ্টি সংযত রাখা, পথিককে পথ দেখিয়ে দেওয়া, হাঁচি দাতা ‘আলহামদু লিল্লাহ’ বললে তার জবাব দেয়া এবং সালামের উত্তর দেয়া।” [আবু দাউদ, আল-আদাবুল মুফরাদ পরস্পর সালাম বিনিময়-সহিহ]
যে ব্যক্তি হাঁচি দিবে সে বলবে, আল হামদুলিল্লাহ (সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য)। আর হাঁচির উত্তরদাতা বলবে, “ইয়ার হামুকাল্লাহ” (আল্লাহ আপনার উপর দয়া করুন)। এর প্রতিউত্তরে হাঁচি দাতা আবার বলবে, “ইয়াহদিকুমুল্লাহু ওয়া ইউসলিহু বা-লাকুম” (আল্লাহ আপনাকে সঠিক পথ দেখান এবং আপনার অন্তরকে পরিশুদ্ধ রাখুন।)

❑ ১৫. অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির করা:

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
سهل بن حنيف عند الطبراني من الزيادة: «ذكر الله كثيراً»
রাস্তার হক সংক্রান্ত হাদিসে সাহল ইবনে হানিফ কর্তৃক তবরানির বর্ণনায় রয়েছে, “অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির করা।” [তবারানী, হা/৫৫৯২]

মুমিনের কর্তব্য, চলতে-ফিরতে, উঠতে, বসতে, বাহনে থাকা অবস্থায়, কারও জন্য অপেক্ষার সময়, কর্মক্ষেত্রে, সংসারের কাজ করার সময় ইত্যাদি সর্বাবস্থায় অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির করা। সফরের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে দুআ পড়ে বের হওয়া, আল্লাহর নামে গাড়ি চালু করা, সফরের দুআ পাঠ, গাড়িতে আরোহণের দুআ পাঠ ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করবে। এতে সে অবারিত সওয়াব লাভের পাশাপাশি তার উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হবে এবং সে নানাভাবে সাহায্য প্রাপ্ত হবে।

পরিশেষে বলব, আমরা যদি নিরাপদ সড়ক চাই, নিরাপত্তার সাথে পথ চলতে চাই এবং সর্বোপরি একটি সুস্থ ও সুন্দর বসবাসযোগ্য পৃথিবী চাই তাহলে ইসলামের এসব মানবিক এবং চমৎকার নির্দেশনা, শিষ্টাচার এবং বিধিবিধানগুলো বাস্তবায়ন করা জরুরি। এ ছাড়া যতাই হৈচৈ করা হোক-তাতে নিরাপদ সড়ক পাওয়া তো দূরের কথা আমরা একটি অসভ্য সমাজে পরিণত হবো।

আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন। আমিন।
▬▬▬❂❂❂▬▬▬
গ্রন্থনায়:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।।