কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর প্রচার করাই হল এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

যারা হাট-বাজারের খাজনা/হাসিল আদায়ে ফাঁকিবাজি করে তারা সাবধান

প্রশ্ন: হাট-বাজারের খাজনা/হাসিল না দিয়ে চলে এলে মাফ হবে কি? এ জন্য শেষ বিচারের দিন কি জবাবদিহি করতে হবে?

উত্তর:
আমাদের দেশের হাট-বাজারগুলো সরকার কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যে ইজারা দেওয়া হয়। ইজারা গ্রহীতাগণ উক্ত বাজারে যে সকল ব্যবসায়ী ব্যবসা করে বা যে সকল কৃষকরা তাদের পণ্য ও মালামাল বিক্রয় করে তাদের নিকট থেকে অথবা কোন কোন ক্ষেত্রে ক্রেতার নিকট থেকেও (যেমন: গরু-ছাগলের হাট) সরকার কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যে খাজনা/হাসিল আদায় করে থাকে।

সুতরাং কেউ যদি কৌশলে খাজনা/হাসিল আদায় না করে তাহলে একদিকে যেমন সরকারি আইন লঙ্ঘন করা হয় অন্য দিকে ইজারা গ্রহণকারীর প্রাপ্য হক নষ্ট করা হয়।
নি:সন্দেহে উভয় দিক থেকে এ কাজটি অন্যায়। আর এমন অন্যায় ও ফাঁকিবাজি ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
কারো হক নষ্ট করা হলে আখিরাতে বিচারের দিন আল্লাহর কাঠ গড়ায় মানুষের হক নষ্ট করার অপরাধে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে-যদি দুনিয়ায় বেঁচে থাকা অবস্থায় প্রাপককে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে না দেয়া হয় বা তার নিকট ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে বিষয়টি মিটমাট করা না হয়।

মনে রাখতে হবে, পৃথিবীতে এক জন মানুষ অন্যজনের প্রতি যে জুলুম-নিপীড়ন করেছে, অধিকার ক্ষুণ্ণ করেছে, সম্পদ হরণ ও সম্মানের ওপর যে আঘাত করেছে তার বিচার হবে কিয়ামতের দিন।-এ ব্যাপারে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। যেমন:

◈ আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لِأَخِيهِ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ، فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ اليَوْمَ، قَبْلَ أَنْ لاَ يَكُونَ دِينَارٌ وَلاَ دِرْهَمٌ، إِنْ كَانَ لَهُ عَمَلٌ صَالِحٌ أُخِذَ مِنْهُ بِقَدْرِ مَظْلَمَتِهِ، وَإِنْ لَمْ تَكُنْ لَهُ حَسَنَاتٌ أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِ صَاحِبِهِ فَحُمِلَ عَلَيْهِ»

“যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রতি কোনও অন্যায় করেছে অথবা তার সম্মানহানি করেছে কিংবা অন্য কোনভাবে তার ক্ষতি করেছে সে যেন যেদিন কোনও টাকা-পয়সা কাজে আসবে না সে দিন আসার পূর্বে আজই (দুনিয়াতে থাকাবস্থায়) তার প্রতিকার করে নেয়। কিয়ামতের বিচারে অন্যায়কারীর কোনও নেক আমল থাকলে তা থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পাওনা আদায় করা হবে। আর যদি অন্যায়কারীর নেক আমল না থাকে তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পাপগুলো তার উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে”।[ সহীহ বুখারী, হাদিস নং ২৪৪৯।]

◈ হাদিসে আরও এসেছে: আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«أَتَدْرُونَ مَا الْمُفْلِسُ؟» قَالُوا: الْمُفْلِسُ فِينَا مَنْ لَا دِرْهَمَ لَهُ وَلَا مَتَاعَ، فَقَالَ: «إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلَاةٍ، وَصِيَامٍ، وَزَكَاةٍ، وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ هَذَا، وَقَذَفَ هَذَا، وَأَكَلَ مَالَ هَذَا، وَسَفَكَ دَمَ هَذَا، وَضَرَبَ هَذَا، فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُقْضَى مَا عَلَيْهِ أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطُرِحَتْ عَلَيْهِ، ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ»

“তোমরা কি জানো নি:স্ব’ ব্যক্তি কে? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আমাদের মধ্যে নি:স্ব তো সে যার কোনো টাকা পয়সা বা সম্পদ নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: আমার উম্মতের মধ্যে সত্যিকার দরিদ্র অসহায় হলো সেই ব্যক্তি যে কিয়ামতের দিন সালাত, সিয়াম ও যাকাতসহ অনেক ভালো কাজ নিয়ে উপস্থিত হবে, অথচ দুনিয়াতে বসে সে কাউকে গালি দিয়েছিল, কারো প্রতি অপবাদ দিয়েছিল, করো সম্পদ আত্নসাৎ করেছিল, কারো রক্তপাত ঘটিয়েছিল, কাউকে মারধোর করেছিল ফলে তার নেক আমলগুলো থেকে নিয়ে তার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পাওনা আদায় করা হবে। এভাবে যখন তার নেক আমলগুলো শেষ হয়ে যাবে ক্ষতিগ্রস্তদের দেওয়ার জন্য আর কিছু থাকবে না তখন তাদের পাপগুলো তাকে দেওয়া হবে ফলে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে”। [সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২৫৮১]ঃ

➧ এ হাদিস দুটো থেকে আমরা যা শিখতে পারলাম:

● ১. গুনাহ, পাপ বা অপরাধ দু প্রকার। প্রথম প্রকার হলো যা দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার অধিকার বা হক ক্ষুণ্ণ হয়। যেমন শিরক করা, সালাত পরিত্যাগ করা, হজ আদায় না করা ইত্যাদি। আর দ্বিতীয় প্রকার হলো যা দ্বারা মানবাধিকার বা হুকুকুল ইবাদ ক্ষুণ্ণ হয়। যেমন, করো সম্পদ দখল করা, গালি দেওয়া, মারধোর করা ইত্যাদি। প্রথম প্রকারের পাপগুলো ক্ষমা করা আল্লাহর দায়িত্বে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা ইচ্ছা করলে এগুলো ক্ষমা করে দিতে পারেন। আর দ্বিতীয় প্রকার পাপগুলো আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমা করবেন না। যতক্ষণ না ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ক্ষমা না করে।

● ২. দুনিয়াতে বসে মৃত্যুর পূর্বেই ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে। বা তার কাছ থেকে দাবী ছাড়িয়ে নিতে হবে।

● ৩. যার মাধ্যমে ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার নেক আমল বা সৎকর্ম থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পাওনা পরিশোধ করা হবে। এমনি পাওনা পরিশোধ করতে করতে যদি নেক আমলগুলো শেষ হয়ে যায় তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পাপগুলো তার উপর চাপিয়ে দিয়ে তার পাওনা পরিশোধ করা হবে।

● ৪. আলোচিত ব্যক্তি আসলে ধনীই ছিল। তার অনেক নেক আমল ছিল। কিন্তু এগুলো এমনভাবে আর এমন সময়ে নিঃশেষ হয়ে গেল যে, তা অর্জন করার আর কোনও পথই থাকলো না। এ জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যক্তিকে সত্যিকার অসহায় বলেছেন। কারণ দুনিয়াতে কেউ নিঃস্ব হয়ে গেলে সে আবার পরিশ্রম করে সম্পদ অর্জন করতে পারে। কিন্তু বিচার দিবসে কেউ নিঃস্ব হয়ে গেলে তার সামনে আর সম্পদ অর্জনের সুযোগ থাকে না।

● ৫. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ হাদিস আমাদেরকে মানুষের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে যত্নবান হতে নির্দেশ দেয়। মানুষের সম্মান, সম্পদ, শরীর সবকিছু আমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে। এগুলোর কোনটি ক্ষতিগ্রস্ত করলে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়। [হাদিস দ্বয় ও সেগুলোর ব্যাখ্যা আব্দুল্লাহ শহীদ আব্দুর রহমান কর্তৃক অনুদিত কেয়ামতের ভয়াবহতা শীর্ষক বই থেকে নেয়া হয়েছে]

সুতরাং হাটবাজারের যৎসামান্য নির্ধারিত খাজনা/হাসিল দেয়া থেকে পলায়ন করা বা ফাঁকিবাজি করা অনৈতিক ও হারাম। এটি মানুষের অধিকার লঙ্ঘনের শামিল। কেউ অজ্ঞতা বশত: এমনটি করে থাকলে তার কর্তব্য, অনতিবিলম্বে আল্লাহর নিকট লজ্জিত অন্তরে তওবা করা এবং ইজারাদারদেরকে তাদের প্রাপ্য খাজনা পরিশোধ করা। অন্যথায় কিয়ামতের কঠিন বিচারের দিন হয়ত মুক্তির সম্ভাবনা থাকবে না। আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন। আমিন।

➧ প্রশ্ন: কেউ যদি কুরবানি হাটের ক্রয় কৃত গরুর হাসিল না দিয়ে কুরবানি দিয়ে থাকে তাহলে তার কুরবানি জায়েজ হবে কি?

উত্তর:

কুরবানি উপলক্ষে গরু-ছাগলের হাটে গরুর হাসিল না দিয়ে ফাঁকিবাজি করে চলে আসে তাহলে সে গুনাহগার হবে। কারণ সে সরকারি আইন লঙ্ঘন করেছে এবং মানুষে হক পা পাওনা ফাঁকি দিয়েছে।
কিন্তু যদি সে হালাল অর্থ দ্বারা কুরবানির পশু ক্রয় করে তাহলে এতে তার কুরবানি হারাম হবে না। কিন্তু উক্ত ফাঁকিবাজি করে মানুষের হক নষ্ট করার জন্য গুনাহগার হবে। তার কর্তব্য, অনতিবিলম্বে আল্লাহর নিকট তওবা করত: হাটের ইজারাদারদের নিকট তাদের পাওনা পরিশোধ করা।
আল্লাহু আলাম।

আল্লাহ আলাম।
▬▬▬◆◯◆▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Share This Post