যাকে দুআ করার তাওফিক দেয়া হয় তাকে দুআ কবুল হওয়া থেকে বঞ্চিত করা হয় না

“যাকে দুআ করার তাওফিক দেয়া হয় তাকে দুআ কবুল হওয়া থেকে বঞ্চিত করা হয় না।” এ হাদিসের মান এবং দুআ কবুলের শর্তাবলী:

প্রশ্ন: নিম্নোক্ত হাদিসটি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায় চোখে পড়ে। তা হল: রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যাকে দুআ করার তাওফিক দেয়া হয় তাকে দুআ কবুল হওয়া থেকে বঞ্চিত করা হয় না।” [ শুয়াবুল ঈমান, হা/৪৫২৮] এটি কি সহীহ? আরও জানতে চাই, দুআ কবুলের আবশ্যকীয় শর্তাবলী কি?

উত্তর:
দুআ করা হলে কবুল করা থেকে বঞ্চিত করা হয় না বা অবশ্যই কবুল করা হয় এ প্রসঙ্গে বেশ কিছু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তবে সেগুলো কোনটিই সহিহ নয়।
নিম্নে এ প্রসঙ্গে একাধিক হাদিস এবং সেগুলো সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের অভিমত তুলে ধরা হল:
من رزق الدعاء لم يحرم الإجابة

قال صاحب الروض البسام بترتيب وتخريج فوائد تمام: في إسناده مجاهيل
ثم بسط الكلام حول ذلك مبينًا ضعف كل الروايات التي روي بها هذا الأثر، وناقلًا تضعيف البيهقي، وابن الجوزي، وغيرهما له

ما كان اللهُ لِيفتَحَ لعبدٍ بابَ الدُّعاءِ ويُغلِقَ عنه بابَ الإجابةِ؛ اللهُ أكرَمُ مِن ذلكَ

الراوي:أنس بن مالك المحدث:العقيلي المصدر:الضعفاء الكبير الجزء أو الصفحة:1/242 حكم المحدث:ليس له أصل-

ما أذِنَ الله لعبدٍ في الدعاءِ حتى أُذِنَ له في الإجابةِ

الراوي:أنس بن مالك المحدث:محمد جار الله الصعدي المصدر:النوافح العطرة الجزء أو الصفحة:301 حكم المحدث:ضعيف
المحدث:الألباني المصدر:السلسلة الضعيفة الجزء أو الصفحة:4416 حكم المحدث:موضوع

❑ দুআ কবুলের শর্তাবলী:

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন,
أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ
“যে দুআ করে তার দুআ আমি কবুল করি যখন সে আমার নিকট দুআ করে।” [সূরা বাকারা: ১৮৬]
তিনি আরও বলেন,
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ
“তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমার নিকট দুআ করা, আমি তা কবুল করবো।” [সূরা গাফির/মুমিনুন: ৬০]

এ সকল আয়াত থেকে জানা যায় যে, বান্দা যখন রব্বুল আলামিন এর নিকট দুআ করেন তখন তিনি তা কবুল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে এ কবুলের কিছু শর্ত রয়েছে যা বিভিন্ন আয়াত ও হাদিস থেকে প্রমাণিত। যেমন:

◈ ১. ইখলাস বা আন্তরিকতা অর্থাৎ একনিষ্ঠ চিত্তে পূর্ণ আন্তরিকতা সহকারে আল্লাহর নিকট দুআ করা।
◈ ২. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুসরণে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস সহকারে তার প্রতি অন্তরে ভয়-ভীতি ও প্রত্যাশা জাগ্রত রেখে বিনয়াবনত চিত্তে দুআ করা।
◈ ৩. দুআয় হারাম, পাপাচারিতা ও আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন সংক্রান্ত বিষয় না থাকা।
◈ ৪. দুআ করার সময় অবহেলা ও অমনোযোগিতা না থাকা। কারণ আল্লাহ তাআলা অমনোযোগী হৃদয়ের দুআ কবুল করেন না। বরং দুআ করতে হবে পূর্ণ মনোযোগ সহকারে এই দৃঢ় আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে যে, আল্লাহ দুআ কবুল করবেন।

◈ ৫. খাদ্য, পানীয় ও পরিধেয় বস্ত্র ইত্যাদিতে হারামের সংস্পর্শ না থাকা। অন্যথায় দুআ কবুলের সব শর্ত উপস্থিত থাকার পরও শুধু এ কারণে তা আল্লাহর নিকট প্রত্যাখ্যাত হতে পারে।

◈ ৬. দুআ মধ্যে সীমালঙ্ঘন না থাকা। যেমন: কেউ যদি অসম্ভব বিষয়ের জন্য বা এমন বিষয়ের জন্য দুআ করে যা তার প্রাপ্য নয় তাহলে আল্লাহর নিকট তা গৃহীত হবে না। যেমন: অমর হওয়ার দুআ করা, নিজের জন্য জান্নাতে ওসিলা বা সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ স্থান লাভের দুআ করা-যা কেবল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্য নির্ধারিত- ইত্যাদি।

উল্লেখ্য যে, উপরোক্ত শর্তাবলীর প্রত্যেকটির পেছনেই কুরআন-সুন্নাহর দলিল রয়েছে। এ ছাড়াও হাদিসে দুআ কবুলের সহায়ক কতিপয় আদব (শিষ্টাচার) উল্লেখিত হয়েছে। আমাদের কতর্ব্য, উপরোক্ত শতার্বলী ‌এবং এর আদব সমূহের প্রতি লক্ষ রেখে রাব্বুল আলামিনের নিকট দুআ করা। তাহলে আশা করা যায়, তিনি আমাদেরকে ফিরিয়ে দেবেন না।

মোটকথা, দুআ করলেই আল্লাহ তা অবশ্যই কবুল করবেন বা দুআ কারীকে বঞ্চিত করবেন না- এ সংক্রান্ত হাদিসগুলো মুহাদ্দিসদের দৃষ্টিতে সহিহ নয়। তবে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে এবং দুআর আদব সমূহের প্রতি লক্ষ রেখে দুআ করলে মহান দয়ালু দাতা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বান্দাকে বঞ্চিত করেন না।
আমরা পূর্ণ আস্থা, বিশ্বাস ও আন্তরিকতা সহকারে বিশ্বচরাচরের অধিপতি মহান আল্লাহর করুণা ভিক্ষা করি এবং এক বুক আশা নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকি তিনি যেন আমাদেরকে তার দয়া থেকে বঞ্চিত না করেন। নিশ্চয় তিনি পরম দয়ালু, দাতা ও দুআ কবুল কারী। আল্লাহু আলাম।

-আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল-