কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর প্রচার করাই হল এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

মুমিন কিভাবে মুনাফিক হয়?

প্রশ্ন: ঈমান আনার পরও মানুষ কিভাবে মুনাফিক হিসেবে গণ্য হয়?
উত্তর:
কোন ব্যক্তি যদি খালিস অন্তরে আল্লাহর ও তার রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং ইসলাম মেনে চলার চেষ্টা করে সে মুনাফিক (বিশ্বাসগত প্রকৃত মুনাফিক) হতে পারে না। তবে তার মধ্যে মুনাফিকের কিছু চরিত্র ও আচরণ থাকা অস্বাভাবিক নয়। কারো মধ্যে এমন কিছু থাকলে তার জন্য আবশ্যক হল, দ্রুত তওবা করে নিজেকে সংশোধন করা।

এ সম্পর্কে আরও ভালোভাবে বুঝতে হলে জানা আবশ্যক যে, নিফাকী (কপটতা) দু প্রকার। যথা:

 ক. বিশ্বাসগত নিফাক (النفاق الاعتقادي) [বড় নিফাক]
 খ. কর্মগত নিফাক (النفاق العملي) [ছোট নিফাক]

উক্ত দু প্রকার নিফাকের পরিচয় ও পরিণতি:

 প্রকৃত মুনাফেক (কপট) সে ব্যক্তি যে অন্তরে কুফরি লুকিয়ে রাখে কিন্তু বাহ্যিক ভাবে ইসলাম প্রকাশ করে।
অর্থাৎ সে মূলত কাফের-অবিশ্বাসী কিন্তু বিশেষ কোন উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন বা স্বার্থ হাসিলের নিমিত্তে মুসলিমদের কাছে নিজেকে মুসলিম হিসেবে প্রকাশ করে।
এটিকে النفاق الاعتقادي বা বিশ্বাসগত নিফাকী বলা হয়।

সুতরাং কোন ব্যক্তি যদি মুখে মুখে বা জনগণের সামনে ইসলাম প্রকাশ করে কিন্তু অন্তরে ইসলামের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণ করে, আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি অবিশ্বাস রাখে বা কাফির-মুশরিক বা অনৈসলামিক মতাদর্শ বা মতবাদকে ইসলামের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে অথবা তার মাঝে ঈমান বিধ্বংসী কারণগুলো থেকে কোন একটি ঘটে তাহলে সে ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত মুরতাদ (ইসলাম চ্যুত) হয়ে যাবে। কিন্তু লোকসমাজে নিজেকে মুসলিম দাবী করা বা ইসলাম প্রীতি প্রকাশের কারণে আল্লাহর দরবারে সে খাঁটি ‘মুনাফিক’ হিসেবে পরিগণিত হবে। আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন। আমীন।

এ ধরণের নিফাকীতে লিপ্ত ব্যক্তিরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান করবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلَن تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا
“নিঃসন্দেহে মুনাফিকরা অবস্থান করবে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে। আর তোমরা তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী কখনও পাবে না।” সূরা নিসা: ১৪৫)
 এদের ব্যাপারেই আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন:
ﻳَﺎ ﺃَﻳُّﻬَﺎ ﺍﻟﻨَّﺒِﻲُّ ﺟَﺎﻫِﺪِ ﺍﻟْﻜُﻔَّﺎﺭَ ﻭَﺍﻟْﻤُﻨَﺎﻓِﻘِﻴﻦَ ﻭَﺍﻏْﻠُﻆْ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢْ ﻭَﻣَﺄْﻭَﺍﻫُﻢْ ﺟَﻬَﻨَّﻢُ ﻭَﺑِﺌْﺲَ ﺍﻟْﻤَﺼِﻴﺮ
“হে নবী! কাফির ও মুনাফিকদের (অবিশ্বাসীদের ও কপটদের) বিরুদ্ধে জিহাদ করুন আর তাদের প্রতি কঠোর হোন। তাদের আবাসস্থল জাহান্নাম। আর কত খারাপ তাদের পরিণতি।” (সূরা তওবা: ৭৩)

 পক্ষান্তরে আরেক প্রকার মুনাফিক চরিত্রের লোক আছে যারা মূলত মুসলিম কিন্তু তাদের কিছু আচার-আচরণ ও চরিত্র মুনাফিকের মত।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
آيَةُ المُنَافِقِ ثَلاَثٌ: إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ
মুনাফিকের আলামত তিনটি:
(১) কথা বললে মিথ্যা বলে
(২) ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে
(৩) আমানত রাখা হ’লে খেয়ানত করে। [বুখারী হা/৩৩।]
অন্যত্র তিনি বলেন,
أَرْبَعٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقًا خَالِصًا، وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنَ النِّفَاقِ حَتَّى يَدَعَهَا: إِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ، وَإِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَر
“যার মধ্যে চারটি স্বভাব পাওয়া যাবে সে খাঁটি মুনাফিক এবং যার মধ্যে তার একটি দেখা যাবে তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব রয়েছে। যতক্ষণ না সে তা পরিত্যাগ করে।
(১) তার নিকট আমানত রাখা হ’লে তা খিয়ানত করে
(২) কথা বললে মিথ্যা বলে
(৩) ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে
(৪) ঝগড়া করলে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করে।” [মুসলিম হা/৫৮৩; মিশকাত হা/৫৬।]
উপরোক্ত বিষয়গুলো কবিরা গুনাহ বা বড় পাপ- তাতে কোন সন্দেহ নাই কিন্তু এগুলোর কারণে কোন ব্যক্তি ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় না বরং গুনাহগার হয়। এটাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদা।
এটিকে বলা হয়, نفاق عملي বা কর্মগত নিফাকী।

এই ধরণের মুনাফেকি বৈশিষ্ট্য অনেক মুসলিমের মাঝেই দেখা যায়। এই কারণে সে ফাসেক বা পাপাচারী হিসেবে পরিগণিত হয় কিন্তু তাকে কাফের বা স্থায়ী জাহান্নামী বলা বৈধ নয়।

সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস রাখে তার মধ্যে মুনাফিকের কিছু স্বভাব-চরিত্র পাওয়া গেলেও সে প্রকৃত মুনাফিক (বিশ্বাসগত মুনাফিক) হয় না। তার উচিত অনতিবিলম্বে আল্লাহর কাছে তওবা করা এবং এ সকল মুনাফিকী আচার-আচরণ ও বৈশিষ্ট্য পরিত্যাগ করে উন্নত চরিত্রবান মুসলিম হওয়ার চেষ্টা করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে নিফাক বা কপটতার মত ভয়াবহ রোগ থেকে রক্ষা করুন। আমীন।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানী
লিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সউদী আরব

Share This Post