মাইরি শব্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ শিরক

জানেন কি? ‘মাইরি’ শব্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ শিরক!

আমাদের সমাজে কিছু মানুষ শ্রোতাকে কোনও বিষয় নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করানো, জোর দিয়ে কিছু বলা, বিস্ময় প্রকাশ করা, আবার কোন কারণ ছাড়াই বাক্যের আগে-পরে এ শব্দটি ব্যবহার করে থাকে। বাংলাদেশের তুলনায় ভারতের পশ্চিম বাংলায় এ শব্দটির ব্যবহার বেশি লক্ষ করা যায়। কিন্তু এর অর্থ কী বা ইসলামের দৃষ্টিতে এ শব্দটির ব্যবহারে কোনও আপত্তি আছে কি না তা জানা জরুরি।

তাই নিম্নে আমরা অতি সংক্ষেপে এ শব্দটির ভাষা গত বিশ্লেষণ করার পর ইসলামের দৃষ্টিতে এটি ব্যবহারের বিধান সম্পর্কে জানব ইনশাআল্লাহ।

❑ মাইরি শব্দটির আভিধানিক অর্থ এবং শব্দগত বিশ্লেষণ:

◆ মাইরি শব্দটির আভিধানিক অর্থ:

১. শপথ করতে ব্যবহৃত শব্দ। (অব্যয়)
২. বিরক্তি বা ক্রোধসূচক
৩. যিশু খ্রিস্টের মা মেরির নামে দিব্যি বা তাঁর দোহাই।

উদাহরণ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, “বিধু কহিল মাইরি স্যার, আমি বুঝি এখানে একলা বসিয়া থাকিব।” [উৎস: জীবিত ও মৃত]
উৎস মূল: পর্তুগিজ: Maria, ইংরেজি: Mary
[বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান (পরিমার্জিত সংস্করণ)]

✪ ভারত উপমহাদেশে উরোপ থেকে আগত পর্তুগিজরা মাদার মেরি (ইসলামের দৃষ্টিতে যিনি ছিলেন, আল্লাহর নবী ঈসা আ.-এর পবিত্র মা মরিয়ম আ.) এর নামে দিব্যি (কসম) করতো। পরবর্তীতে লোকমুখে বাংলায় মাইরি হয়েছে।

-বিশিষ্ট ভাষাবিদ শুবাচ পরিচালক ড. মোহাম্মদ আমীন বলেন, “বাংলা একাডেমী আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, পর্তুগিজ (Maria) থেকে উদ্ভূত মাইরি অর্থ (অব্যয়ে) যিশু খ্রিষ্টের মা মেরির নামে দিব্যি; বিরক্তি বা ক্রোধসূচক উক্তি। পর্তুগিজদের মুখে চড়ে Maria কথাটি ভারতবর্ষ আসে। পরবর্তীকালে তা ভারতবাসীর মুখে মাইরি হয়ে যায়। এখন অনেকের মুখে শুনি ‘মাইরি’। ছেলে বলছে: মাইরি বলছি মা, বাবার পকেট থেকে চুরি করে তোমার ভ্যানিটি ব্যাগে রাখা টাকাগুলো আমি চুরি করিনি।
মা বলছেন, মাইরি বলছি খোকা, ওই টাকাগুলো তোমার বাবার পকেট থেকে নয়, আমার বাবার বাড়ি থেকে এনেছি। আমার টাকা না নিলে তোমার পকেটে টাকা এল কোত্থেকে?
মাইরি বলছি মা, এগুলো আমার বাবার টাকা।” [উৎস: বাংলা শব্দের শুদ্ধ প্রয়োগ শেখার বই বাংলা ভাষার মজা-ড. মোহাম্মদ আমীন]

– বাংলা একাডেমির ভাষা-সাহিত্য, সংস্কৃতি ও পত্রিকা বিভাগের সাবেক পরিচালক বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক ফরহাদ খান তার শব্দের চালচিত্র বইয়ে মাইরি শব্দের বিশ্লেষণে লিখেছেন, বাক্যে ব্যবহার: মাইরি বলছি, আমি এটা করিনি অর্থ: শপথ করে বলা। দিব্যি দিয়ে বলা। মাইরি শব্দটি এসেছে পর্তুগিজ ‘মারিয়া’ শব্দ থেকে। যিশুখ্রিস্টের মাতা মেরি হলেন পর্তুগিজ ভাষায় মারিয়া। খ্রিস্টানরা যিশুর মাতা মেরির নামে শপথ গ্রহণ করে থাকেন। তা থেকে বাংলায় দিব্যি বা শপথ অর্থে মাইরি শব্দটি প্রচলিত হয়েছে।

❑ কোনও সৃষ্টির নামে কসম খাওয়া শিরক:

ইসলামের দৃষ্টিতে কসম খাওয়ার ক্ষেত্রে মাইরি শব্দটির ব্যবহার হারাম ও কবিরা গুনাহ। কারণ তার মাধ্যমে মূলত: খৃষ্টানদের মাদার মেরি ( মরিয়ম আ.) এর নামে কসম করা হয়-যা সরাসরি শিরক। আল্লাহ আমাদেরকে রক্ষা করুন। আমিন।

নিম্নে গাইরুল্লাহর নামে কসম খাওয়া শিরক মর্মে কয়েকটি হাদিস উপস্থাপন করা হলো:

১. সাদ ইবনে উবায়দা রা. হতে বর্ণিত,

أَنَّ ابْنَ عُمَرَ، سَمِعَ رَجُلاً، يَقُولُ لاَ وَالْكَعْبَةِ ‏.‏ فَقَالَ ابْنُ عُمَرَ لاَ يُحْلَفُ بِغَيْرِ اللَّهِ فَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ‏”‏ مَنْ حَلَفَ بِغَيْرِ اللَّهِ فَقَدْ كَفَرَ أَوْ أَشْرَكَ

ইবনে উমর রা. একজন লোককে বলতে শুনলেন, “না, কাবার শপথ।” তখন ইবনে উমর রা. বললেন, “আল্লাহ তাআলার নাম ব্যতীত অন্য কিছুর নামে শপথ করা যাবে না। কেননা রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আমি বলতে শুনেছি, আল্লাহ তাআলার নাম ব্যতীত অন্য কিছুর নামে যে লোক কসম করল সে যেন কুফরি করল অথবা শিরক করল।” [সহীহ, ইরওয়া/২৫৬১, সহীহা/২০৪২]

এ হাদিসটিকে আবু ঈসা হাসান বলেছেন। এ হাদিসের ব্যাখ্যায় কতিপয় আহলে ইলম বলেছেন, “সে কুফরি করল অথবা শিরক করল” কথাটি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঠোর ধমকি হিসেবে বলেছেন।

তারা নিম্নের হাদিসটি নিজেদের দলিল হিসাবে গ্রহণ করেছেন: উমর রা. কে তার পিতার নামে শপথ করতে শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,

أَلاَ إِنَّ اللَّهَ يَنْهَاكُمْ أَنْ تَحْلِفُوا بِآبَائِكُمْ ‏

“সাবধান! তোমাদেরকে তোমাদের বাপদাদার নামে শপথ করতে আল্লাহ তাআলা নিষেধ ‌করেছেন।”

আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত হাদিস, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,

مَنْ قَالَ فِي حَلِفِهِ وَاللاَّتِ وَالْعُزَّى فَلْيَقُلْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّه

“যে লোক কসম করতে গিয়ে বলে, “লাতের কসম, উজ্জার কসম।” সে যেন বলে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনও উপাস্য নেই)।”

আবু ঈসা তিরিমিজি বলেন, এ হাদিসের তাৎপর্য এরূপ যেমন রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “রিয়া বা লোক দেখানোর মনোবৃত্তি শিরকের সমতুল্য।”
[সুনান আত তিরমিজী (তাহকীক কৃত), অধ্যায়: ১৮/ মানত ও শপথ, পরিচ্ছেদ: ৮. আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অন্য কিছুর নামে শপথ করা নিষেধ, সহিহ]

২. আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

أَلا مَنْ كَانَ حَالِفًا فَلا يَحْلِفْ إِلاَّ بِاللَّهِ- فَكَانَتْ قُرَيْشٌ تَحْلِفُ بِآبَائِهَا، فَقَالَ: لاَ تَحْلِفُوا بِآبَائِكُمْ

“খবরদার! যে ব্যক্তি শপথ করতে চায়, সে যেন আল্লাহর নাম ছাড়া অন্য কারো নামে শপথ না করে। কুরাইশরা তাদের বাপদাদার নামে শপথ করত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা তোমাদের বাপদাদাদের নামে কসম করো না’’। [বুখারী, হাদিস নং ৩৮৩৬]

৩. ইবনে উমর রা. হতে আরও বর্ণিত যে, তিনি তার পিতা উমর ইবনুল খাত্তাব রা. কে একদিন আরোহীর মাঝে এমন সময় পেলেন, যখন তিনি তাঁর পিতার নামে শপথ করছিলেন। তখন রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উচ্চস্বরে তাদেরকে বললেন,

أَلاَ إِنَّ اللَّهَ يَنْهَاكُمْ أَنْ تَحْلِفُوا بِآبَائِكُمْ، فَمَنْ كَانَ حَالِفًا فَلْيَحْلِفْ بِاللَّهِ، وَإِلاَّ فَلْيَصْمُتْ

“জেনে রাখ! আল্লাহ তোমাদের বাপ দাদার নামে শপথ করতে নিষেধ করেছেন। যদি কাউকে শপথ করতেই হয়, তবে সে যেন আল্লাহর নামেই শপথ করে। অন্যথায় যেন চুপ থাকে।” [২৬৭৮; মুসলিম ১/২৭, হা/ ১৬৪৬, আহমদ ৬২৯৬] (আধুনিক প্রকাশনী- ৫৬৬৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৫৬৫)

সুপ্রিয় পাঠক আর আমরা জানি, ইসলামের দৃষ্টিতে শিরকের চেয়ে বড় ও ভয়াবহ অপরাধ আর দ্বিতীয়টি নেই। তাই আমাদের কর্তব্য, একমাত্র আল্লাহর নামে অথবা আল্লাহর কোনও গুনের কসম করা। যেমন: আল্লাহর কসম, কাবার রবের কসম, আল্লাহর ইজ্জতের কসম ইত্যাদি। কিন্তু পিতা-মাতার নামে, পীরের নামে কসম খাওয়া থেকে, মাটির কসম, শহিদের রক্তের কসম, দানার কসম, টাকার হাতে নিয়ে কসম ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা অপরিহার্য।
আল্লাহ আমাদেরকে ইসলাম সম্পর্কে সঠিক বুঝ দান করুন এবং শরিয়ত নিষিদ্ধ সব ধরণের শব্দের ব্যবহার এবং সর্ব প্রকার হারাম কার্যক্রম থেকে হেফাজত করুন। আমিন। আল্লাহ তাওফিক দাতা।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার। সৌদি আরব।

Share On Social Media