ভেষজ বা হারবাল চিকিৎসা কখন জায়েজ আর কখন নাজায়েজ

প্রশ্ন: হাত-পা ভেঙ্গে গেলে কবিরাজ গাছগাছালির মিশ্রণ থেকে তৈরিকৃত ওষুধ ভাঙ্গা স্থানে প্রলেপ দেয় বা আহত স্থান ব্যান্ডেজ করে। এটা কি শিরক হবে?
উত্তর: চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভেষজ বা উদ্ভিজ্জ প্রাকৃতিক উপাদানের ব্যবহার সুপ্রাচীনকালের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিশ্বের ৮০ শতাংশ মানুষ রোগবালাইয়ের প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে নানা ধরনের হারবাল বা প্রাকৃতিক ওষুধ ব্যবহার করে থাকে। শুধু তা–ই নয়, পশ্চিমা বিশ্বেও ‘ওভার দ্য কাউন্টার মেডিসিন’ হিসেবে জনপ্রিয় এই অলটারনেটিভ বা হারবাল পণ্যগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ শতাংশ মানুষ নিয়মিত নানা শারীরিক সমস্যায় এগুলো ব্যবহার করে। [প্রথম আলো]

যাহোক, বিভিন্ন হালাল ওষধি গাছ-গাছালির শিকড়, বাকল, লতা-পাতা ইত্যাদি বেটে তৈরি কৃত ওষুধ বা কোন ঔষধি গাছে ভস্ম ইত্যাদি শরীরের ভাঙ্গা, মচকা, আগুনে পোড়া বা আঘাত জনিত কারণে আহত বা ক্ষতস্থানে প্রলেপ/ব্যান্ডেজ দেওয়া, সেখানে এগুলোর রস লাগানো কিংবা ওষুধ হিসেবে তা সেবন করা জায়েজ যদি তা দ্বারা উপকার পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে কিংবা অভিজ্ঞ ইউনানি ডাক্তার বা কবিরাজ কর্তৃক ব্যবহারের নির্দেশনা থাকে।

হাদিসে বর্ণিত আছে যে, ওহুদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ডানদিকের একটি দাঁত ভেঙ্গে গিয়েছিল, চেহারা জখম হয়েছিল এবং লৌহ শিরস্ত্রাণ ভেঙ্গে গিয়ে মাথায় বিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। তখন তার কন্যা ফাতিমা রা.

أَخَذَتْ قِطْعَةً مِنْ حَصِيرٍ، فَأَحْرَقَتْهَا وَأَلْصَقَتْهَا فَاسْتَمْسَكَ الدَّمُ

“একখণ্ড চাটাই নিয়ে তা জ্বালিয়ে তার ছাই জখমের উপর লাগিয়ে দিলেন। এতে রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে গেল।” [বর্ণনাকারী সাহল বিন সা’দ রা., সহীহ বুখারি (ই.ফা.),অধ্যায়: ৫১/ মাগাযী (যুদ্ধাভিযান), পরিচ্ছেদ: ২১৮৮]

তাছাড়া আহত স্থানে পট্টি বা ব্যান্ডেজ লাগানো অবস্থায় ওজু-গোসল করা এবং এ সংক্রান্ত বহু মাসয়ালা-মাসায়েল প্রায় সব ফিকহের গ্রন্থেই বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে। সুতরাং এতে প্রমাণিত হয় যে, আহত স্থানে ওষুধ লাগানো বা প্রলেপ/ব্যান্ডেজ ব্যবহারে ইসলামে কোনও বাধা নেই।

অনুরূপভাবে রোগ-ব্যাধির চিকিৎসা হিসেবে ডাক্তারি পরামর্শ মোতাবেক শরীরে মধু, কালোজিরা বা বিভিন্ন বীজের তেল ব্যবহার করা বা উপকারী যে কোন হালাল বস্তুর রস লাগানো, বিভিন্ন ওষুধ বা হালাল কেমিক্যাল যুক্ত গরম পানির ভাপ নেয়া ইত্যাদিতে কোনও আপত্তি নাই। এগুলো সব বৈধ চিকিৎসা পদ্ধতি।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মধু, কালোজিরা, মেথি ইত্যাদি ভেষজ বস্তু দ্বারা চিকিৎসা করেছেন এবং উম্মতকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোগ-ব্যাধিতে চিকিৎসা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন: হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, কিছু বেদুঈন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বিভিন্ন প্রশ্ন করলো। তন্মধ্যে একটি প্রশ্ন হল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা যদি (রোগীর) চিকিৎসা না করি তবে কি আমাদের গুনাহ হবে?
তিনি বললেন,

تَدَاوَوْا عِبَادَ اللَّهِ فَإِنَّ اللَّهَ سُبْحَانَهُ لَمْ يَضَعْ دَاءً إِلاَّ وَضَعَ مَعَهُ شِفَاءً إِلاَّ الْهَرَمَ

“হে আল্লাহর বান্দাগণ তোমরা চিকিৎসা করো। কেননা মহান আল্লাহ বার্ধক্য ছাড়া এমন কোন রোগ সৃষ্টি করেননি যার সাথে প্রতিষেধকেরও ব্যবস্থা করেননি (রোগও রেখেছেন, নিরাময়ের ব্যবস্থাও রেখেছেন)।” [সুনান ইবনে মাজাহ, অধ্যায়: ২৫/ চিকিৎসা, পরিচ্ছেদ: ২৫/১: আল্লাহ যে রোগই সৃষ্টি করেছেন, তার প্রতিষেধকও সৃষ্টি করেছেন। আলবানি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]

◍◍ ঔষধি গাছের শিকড়, লতাপাতা, ছাল-বাকল ইত্যাদি সুতা দিয়ে বেঁধে বা মাদুলিতে ভরে তাবিজের মত করে রোগীর শরীরে ঝুলানো জায়েজ নয়:

কোনও ঔষধি গাছের শিকড়, লতাপাতা, ছাল-বাকল ইত্যাদি সুতা দিয়ে বেঁধে বা মাদুলিতে ভরে তাবিজের মত করে রোগীর বাহু, গলা, কোমর বা শরীরের অন্য কোথাও ঝুলানো জায়েজ নাই। একই বিধান গবাদি পশুর গায়ে, দোকান-পাট, বাহন, ফলদার গাছ ইত্যাদিতে ঝুলানো ক্ষেত্রেও। রোগ-ব্যাধি, বদনজর, যাদু-টোনা ও বিপদাপদ থেকে আত্মরক্ষা কিংবা আক্রান্ত ব্যক্তির আরোগ্যের উদ্দেশ্যে অনেক নারী, শিশু ও রোগীর শরীরে এসব জিনিস ঝুলাতে দেখা যায়। অনেকে ফলদার গাছে গরুর মাথার খুলি, শিং, হাড্ডি ইত্যাদি ঝুলিয়ে রাখে। অনেকে দোকানে বা ঘরের কোণেও এসব জিনিস ঝুলিয়ে রাখে। অনেক সময় যানবাহনে জুতা ঝুলতে দেখা যায়। তাদের ধারণা, এর দ্বারা হয়ত গাড়ি এক্সিডেন্ট থেকে রক্ষা পাবে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এসব কিছু হারাম। এগুলো মূলত: জাহেলি প্রথা-যা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

নিম্নে এ প্রসঙ্গে কয়েকটি হাদিস তুলে ধরা হল:

● প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

مَن علَّقَ شيئًا وُكِلَ إليهِ

“যে ব্যক্তি কোন জিনিষ লটকাবে, তাকে ঐ জিনিষের দিকেই সোপর্দ করে দেওয়া হবে”। [তিরমিযি, অধ্যায়: কিতাবুত্‌ তিব্ব। শায়খ নাসির উদ্দিন আলবানি রহ. হাসান বলেছেন। দেখুন: সহীহুত্‌ তিরমিযি হা/০৭২ ]

● আরও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, কোন এক সফরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একজন লোক পাঠিয়ে বলে দিলেন যে,

أَنْ لاَ يَبْقَيَنَّ فِي رَقَبَةِ بَعِيرٍ قِلاَدَةٌ مِنْ وَتَرٍ أَوْ قِلاَدَةٌ إِلاَّ قُطِعَتْ

“কোন উটের গলায় ধনুকের রশি বা গাছের ছাল দিয়ে তৈরি হার ঝুলানো থাকলে অথবা যে কোন মালা থাকলে সেটি যেন অবশ্যই কেটে ফেলা হয়।”[সহিহ বুখারি, অধ্যায়: কিতাবুত্‌ তিব্ব]

● নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তির হাতে পিতলের একটি আংটা দেখে বললেন, এটি কী?
সে বলল, এটি দুর্বলতা দূর করার জন্যে পরিধান করেছি।

তিনি বললেন,

انْزِعْهَا فَإِنَّهَا لَا تَزِيدُكَ إِلَّا وَهْنًا فَإِنَّكَ لَوْ مِتَّ وَهِيَ عَلَيْكَ مَا أَفْلَحْتَ أَبَدًا
“তুমি এটি খুলে ফেল। কারণ এটি তোমার দুর্বলতা আরও বাড়িয়ে দিবে। আর তুমি যদি এটি পরিহিত অবস্থায় মৃত্যু বরণ কর, তাহলে তুমি কখনই সফলতা অর্জন করতে পারবে না”। [মুসনাদে আহমদ, দেখুন: আহমদ শাকেরের তাহকীক, (১৭/৪৩৫) তিনি হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।]

রোগ-ব্যাধি, জিন-শয়তানের সংক্রামণ, জাদু-টোনা, বদনজর ইত্যাদি থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে শরীরে সুতা বাধা, বালা, রিং ইত্যাদি পরিধান করা বা কোনও কিছু ঝুলানো হারাম হওয়া প্রসঙ্গে আরও একাধিক হাদিস ও সাহাবি-তাবেঈদের বক্তব্য রয়েছে।

মোটকথা, রোগ-ব্যাধিতে ঔষধি গাছ-গাছালি সুতা দ্বারা বেধে বা মাদুলিতে ভরে তাবিজের মত করে শরীরে ঝুলিয়ে দেওয়া হারাম পক্ষান্তরে তা বেঁটে আহত স্থানে প্রলেপ দেওয়া বা তা ওষুধ হিসেবে সেবন করা জায়েজ। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার। সৌদি আরব।

Share On Social Media