কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর প্রচার করাই হল এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

ভারত উপমহাদেশের দেওবন্দি হানাফিরা ইমাম আবু হানিফা রহ. এর আকিদা ও আদর্শচ্যুত ঐতিহাসিক প্রমাণ

প্রশ্ন: মাজহাবিদের সহিহ দীনের দাওয়াত দেয়া শুরু করার উপায় কি? ভারত উপমহাদেশের দেওবন্দি হানাফিগণ কি ইমাম আবু হানিফা রাহ. কে অনুসরণ করে?

উত্তর:
আমাদের সর্ব প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে, মানুষকে কুরআন-সুন্নাহ ও ইসলামের সোনালী যুগ (খাইরুল কুরূন) এর মানুষ তথা নবী সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবি এবং তাবেঈদের যে আকিদা-বিশ্বাস ছিল সে দিকে দাওয়াত দেয়া।

বর্তমান যুগের প্রচলিত চার মাজহাবের অনুসারীরা যদি তাদের ইমামদের আকিদাকে সঠিকভাবে গ্রহণ করতো তাহলে কোন সমস্যা ছিল না। কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্য যে, তারা অধিকাংশই তাদের মাজহাবের ইমামদের মৌলিক আকিদা-বিশ্বাসকে পরিত্যাগ করে পরবর্তী যুগের অন্য কারও আকিদা-বিশ্বাসকে গ্রহণ করেছে!
শুনে আশ্চর্য মনে হলেও এটাই বাস্তবতা।

যেমন: হানাফি-দেওবন্দিগণ আকিদার ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা রহ. এর আকিদাকে পরিত্যাগ করে আবুল হাসান আশয়ারি রহ. ও ইমাম আবু মানসুর মাতুরিদি রহ. কে গ্রহণ করেছে।
প্রমাণ দেখুন:
বিখ্যাত দেওবন্দি আলেম খলিল আহমদ সাহারানপুরি রহ. [মৃত্যু: ১৩৪৬ হি.] তার ‘আল মুহান্নাদ আলাল মুফান্নাদ’ গ্রন্থে স্পষ্টভাবে লিখেছেন:

“প্রথমত: আমাদের শায়খগণ, আমাদের সমস্ত জামাত ও দল আল-হামদুলিল্লাহ শাখাগত মাসয়ালা-মাসায়েলের ক্ষেত্রে ইমাম আজম ইমাম আবু হানিফা রহ. এর মাজহাবের অনুসারী। উসুলুদ্দীন তথা দ্বীনের মৌলিক আকিদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ইমাম আবুল হাসান আশআরী রহ. ও ইমাম আবু মনসুর মাতুরীদি রহ. এর অনুসারী। সুলুক ও আত্মশুদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে নকশবন্দিয়া, চিশতিয়া, কাদেরিয়া ও সোহরাওয়ার্দীয়া তরীকার সাথে সম্পর্ক রাখি।”
খলিল আহমদ সাহারানপুরী রহ. কর্তৃক রচিত এই গ্রন্থে দেওবন্দের সমস্ত উলামায়ে কেরাম সত্যায়ন ও সাক্ষ্য প্রদান করেন। যেমন:
– শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান রহ.
– হাকিমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ.
– উসওয়াতুস সুলাহা হযরত মাওলানা শাহ আব্দুর রহীম রাইপুরী রহ.
– বাকিয়্যাতুস সালাফ হযরত মাওলানা হাফেজ মোহাম্মাদ আহমদ সাহেব.
– মুফতি আজম হযরত মাওলানা কিফায়াতুল্লাহ সাহেব।
এছাড়াও শীর্ষস্থানীয় দেওবন্দি উলামায়ে কেরামের সত্যায়ন রয়েছে। এটি ১৩২৫ হিজরিতে প্রকাশিত হয়। সর্বস্তরের দেওবন্দি উলামায়ে কেরামের সত্যায়ন থাকায় পুস্তকটি দেওবন্দি আকিদা বর্ণনার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক সনদ অর্জন করেছে।” [‘আল মুহান্নাদ আলাল মুফান্নাদ’ (বাংলা অনুদিত) গ্রন্থের ভূমিকা থেকে নেয়া]

আর বর্তমানেও এ কথা দেওবন্দি আলেমগণ অকপটে স্বীকার করে।

তাহলে তাদের দাবী অনুযায়ী তারা শাখাগত মাসআলা-মাসায়েলের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা রহ. এর অনুসরণ করে। এছাড়া আকিদা (যা শাখাগত মাসআলা-মাসায়েল থেকেও গুরুত্বপূর্ণ) ও আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্রে তাঁকে অনুসরণ করে না।

ভারত উপমহাদেশের দেওবন্দি হানাফিরা যদি ইমাম আবু হানিফা রহ. কর্তৃক রচিত ‘আল ফিকহুল আকবার’, (যদিও এটি তাঁর লেখা কি না তা মতবিরোধপূর্ণ), বিখ্যাত হানাফি আলেম ইমাম আবু জাফর ত্বাহাবি রহ. [মৃত্যু: ৩২২ হি.] কর্তৃক রচিত ‘আক্বীদা ত্বাহাবিয়া’ এবং আরেক বিখ্যাত হানাফি আলেম ইবনে আব্দিল ইয আল হানাফি [জন্ম: ৭৩১, মৃত্যু: ৭৯২ হি.] কর্তৃক তার বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘শারহু আক্বীদা ত্বাহাবিয়া’ গ্রন্থে বর্ণিত আকিদাকেও গ্রহণ করত তাহলে তাদের মাঝে আর আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াহ বা সালাফি/আহলে হাদিসদের মাঝে আকিদাগত বিষয়ে মৌলিক কোন বিরোধ থাকত না (সামান্য কিছু ছাড়া)।

উক্ত স্বীকারোক্তি থেকে এও সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হল যে, আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্রেও দেওবন্দি হানাফিদের নিকট ইমাম আবু হানিফা রহ. উপেক্ষিত। এর পরিবর্তে তারা নকশবন্দিয়া, চিশতিয়া, কাদেরিয়া ও সোহরাওয়ার্দীয়া তরীকার অনুসরণ করে!
সে কারণে স্বভাবতই তারা ইমাম আবু হানিফা রহ. এর আদর্শচ্যুত হয়ে বিদআতি পীর-মুরিদি প্রথায় ডুবে গেছে। আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্রে তারা ইমাম আবু হানিফা রহ. কে অনুসরণ করলে কখনো পীর-মুরিদি নামক বিদআতে লিপ্ত হতো না। কারণ ইমাম আবু হানিফা রহ. কোথাও এসব বিদআতের পক্ষে ফতোয়া দেন নি।

অথচ প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জরুরি হল, আকিদা, আমল, উসুল-ফুরু (মূল-শাখা) বিধিবিধান, আত্মশুদ্ধি ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফুল উম্মাহ তথা রাসূল সাল্লাহু সাল্লাম, সাহাবি, তাবেঈদের আকিদা ও মানহাজ গ্রহণ করা। এর বাইরে গেলেই গোমরাহি নিশ্চিত।

সুতরাং আমাদের কর্তব্য, সর্বপ্রথম আকিদাচ্যুত মুসলিমদেরকে কুরআন-সুন্নাহ ও সাহাবি-তাবেঈ প্রমুখ সালাফদের নির্ভেজাল ও পরিচ্ছন্ন আকিদা ও মানহাজের দিকে আহ্বান জানানো। এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ আর নেই।
আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমীন।
الله أعلم بالصواب وهو الهادي الى سواء السبيل.

উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Share This Post